উল্কা বৃষ্টি

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

মহাকাশ থেকে পৃথিবীতে উল্কাসমূহের আগমন।

উল্কা বৃষ্টি

এই প্রবন্ধ উল্কা বৃষ্টি সম্বন্ধে। টিভি অনুষ্ঠানের জন্যে দেখুন 'মেটেয়র শাওয়ার' (টিভি ধারাবাহিক), নাটকের জন্যে দেখুন স্টিভ মার্টিনের মেটেয়র শাওয়ার (নাটক)।

উল্কা বৃষ্টি হচ্ছে এক ধরনের আকাশ সম্বন্ধীয় ঘটনা যার ফলে মহাকাশ থেকে অনেক উল্কা এসে পৃথিবীর মাটিতে আছড়ে পড়ে অথবা তা মাটিতে পতিত হওয়ার আগেই মিলিয়ে যায়।উল্কা বৃষ্টি প্রধানত রাতের আকাশে দেখা যায়।উল্কা বৃষ্টি হয় কারণ মহাকাশে যখন কোনো ধুমকেতুর বিস্ফোরণ হয় তখন তার ধ্বংসাবশেষ পৃথিবীর অভিকর্ষ বলের প্রভাবে পৃথিবীর পৃষ্ঠে আসতে থাকে।আর এর ফলে পৃথিবী থেকে তা উল্কা বৃষ্টি হিসেবে দেখা যায়। অপ্রয়োজনীয় উল্কা বৃষ্টি উল্কা ঝড় নামেও পরিচিত,যা ঘণ্টায় এক হাজারেরো বেশি উল্কা পৃথিবীতে এসে পড়ে। বেশির ভাগ উল্কা বৃষ্টিই শস্য দানার চেয়েও ছোটো। তাই বেশির ভাগ সময় উল্কা বৃষ্টির উল্কা পৃথিবী পৃষ্ঠে এসে পড়েনা, পড়ার আগেই তা মিলিয়ে যায়।

উল্কা বৃষ্টির ইতিহাস[সম্পাদনা]

উল্কা বৃষ্টি নিয়ে চিত্রকর্ম

আধুনিক যুগে সর্বপ্রথম সবচেয়ে বিরাট উল্কা বৃষ্টি হয় ১৮৩৩ খ্রিষ্টাব্দে যা লিওনিড নামে পরিচিত। আনুমানিক ঘণ্টায় এক হাজারেরো বেশি উল্কা পৃথিবীতে এসে পড়েছিল। কিন্তু অন্যদিকে ,দক্ষিণ আমেরিকার রকি মাউন্টেইন্স এ উল্কা বৃষ্টি কিছুটা কমার পর তা ৯ ঘণ্টার পর দেখা যায় দু-হাজারের মতো। আমেরিকান ডেনিসন অমস্টেড[১](১৭৯১-১৮৫৯) বিষয়টি খুব পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করেন। ১৮৩৩ খ্রিষ্টাব্দের শেষ দিকে এবিষয়ে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করার পর তিনি ১৮৩৪ খ্রিস্টব্দে এই বিষয়টি আমেরিকান জার্নাল অফ সাইন্স অ্যান্ড আর্টস[২] এ উপস্থাপন করেন, যা ১৮৩৪ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি-এপ্রিল মাসের দিকে এবং ১৮৩৬ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়। তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে, এই উল্কা বৃষ্টি অনেকটা কম সময়ের ছিল এবং তা ইউরোপ এ দেখা যায়নি। এবং যে উল্কা কন্সটেলেশন অফ লিও এর কেন্দ্র থেকে বিচ্ছুরিত হয়েছিল এবং তিনি অনুমান করেছিলেন যে, উল্কাগুলোর উৎপত্তি হয়েছিল মহাকাশের কোনো এক ক্লাউড পার্টিক্যাল থেকে। কাজ চলতে থাকে, যদিও এই ঘটনাটি গবেষকদের কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে দিয়েছিল।

১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দে ডোনাল্ড কে ইয়োমানস লিওনিদের ঘটনাটি পরীক্ষা করেন। তারপর আবার ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে কনড্রাতেভা এবং ই এ রেজনিকভ এই বিষয় সম্পর্কে আরো বিস্তারিত বর্ণনা করেন।পরবর্তীতে অনেক বিজ্ঞানী এই বিষয়কে প্রাধান্য দেন এবং লিওনিদ সম্পর্কে আরো বর্ণনা করেন এবং অনেকেই লিওনিদ সম্বন্ধে ভবিষ্যৎবাণী দেন।

রাতের আকাশে উল্কা বৃষ্টি

উজ্জ্বল কেন্দ্র[সম্পাদনা]

রেডিয়েন্ট পয়েন্ট বা উজ্জ্বল কেন্দ্র

যেহেতু উল্কা বৃষ্টি কনাগুলো সমান্তরালভাবে পতিত হয়, এবং তাদের পতন হয় একটি বিন্দুকে কেন্দ্র করে। পৃথিবী থেকে দেখলে মনে হবে যেন উল্কাগুলো একটি নির্দিষ্ট বিন্দু থেকে ছড়িয়ে চারিদিকে সমান্তরালভাবে পরছে। অর্থাৎ অনেকটা শেকলের মতো আর উল্কাগুলোর গতিবেগ প্রায় একই থাকে। অর্থাৎ সবাই একই গতি,ত্বরণ নিয়ে পৃথিবীতে পড়তে থাকে। তাদের ছড়িয়ে পড়ার মাঝে এক উজ্জ্বল কেন্দ্র দেখা যায়। এই উজ্জ্বল কেন্দ্রের সৃষ্টি হয়েছে একটি পরিপ্রেক্ষিতের প্রভাবের কারণে।

অনেকটা রাস্তার মোড়ের মতো যেখানে অনেকগুলো রাস্তার মুখ এসে মিলিত হয়। এই উজ্জ্বল কেন্দ্রকে রেডিয়েন্ট পয়েন্টও[৩] বলা হয়ে থাকে। এই পয়েন্ট পৃথিবীর ঘূর্ণনের কারণে ধীরে ধীরে এক জায়গা থেকে অন্যদিকে সরে যায়। অর্থাৎ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবী থেকে দেখলে মনে হবে স্থান পরিবর্তন করছে।

নামকরণ[সম্পাদনা]

উল্কা বৃষ্টি ইংরেজিতে নামকরণ করা হয়েছিল meteor shower সবচেয়ে কাছের নক্ষত্রপুঞ্জ থেকে যা গ্রিক অক্ষর যেটি রেডিয়েন্ট অবস্থানের[৪] খুবই কাছাকাছি ছিল।

উল্কা বৃষ্টির উৎপত্তি[সম্পাদনা]

সাধারণত মহাকাশে বিভিন্ন ধুমকেতুর ধ্বংসাবশেষ থেকে উল্কা বৃষ্টির সৃষ্টি হয়।

পৃথিবীর কাছাকাছি কোনো ধুমকেতুর ধ্বংসাবশেষ থাকলে তা অভিকর্ষজ বলের প্রভাবে পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসে। আর এরা এতো বেগ নিয়ে আসে যে, তা উত্তপ্ত হয়ে পৃথিবী পৃষ্ঠে পতিত হওয়ার আগেই ছাই হয়ে মিলিয়ে যায়।

বিখ্যাত উল্কা বৃষ্টি[সম্পাদনা]

পারসাইড এবং লিওনিড[সম্পাদনা]

আজ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান উল্কা বৃষ্টি হচ্ছে পারসাইড, যা প্রায় প্রত্যেক বছরের ১২ অগস্ট দেখা যায়, তা-ও প্রতি মিনিটে ১টি। এছাড়াও অন্যান্য সময় এবং মাঝে মাঝে দেখা যায়। নাসার (নাসা)এক বিশেষ গণনাকারী যন্ত্র রয়েছে যার মাধ্যমে তারা প্রতি মিনিটে উল্কার সংখ্যা হিসাব করতে পারে যে অবস্থান থেকে তা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

লিওনিড প্রত্যেক বছরের ১৭ নভেম্বর দৃশ্যমান হয়। প্রায় ৩৩ বছর পর পর, লিওনিদ উল্কা বৃষ্টি এক ধরনের উল্কা ঝড় সৃষ্টি করে, যা ঘণ্টায় হাজারেরো বেশি উল্কা দৃশ্যমান হয়। লিওনিদ থেকেই সর্বপ্রথম উল্কা বৃষ্টি নামকরণ করা হয় ১৮৩৩ খ্রিষ্টাব্দের পর থেকে। ১৮৩৩ খ্রিষ্টাব্দের দিকে উল্কা বৃষ্টি হওয়ার পর বিজ্ঞানীরা দেখতে পান যে, তা বিচ্ছুরিত হয়েছিল গামা লিওনিস নামের তারা থেকে।

সর্বশেষ বড়ো লিওনিড উল্কা বৃষ্টি হয়েছিল ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দে, ২০০১ খ্রিষ্টাব্দে (দু-বার), ২০০২ খ্রিষ্টাব্দে (দু-বার) । এর আগেও উল্কা বৃষ্টি হয়েছিল ১৭৬৭, ১৭৯৯, ১৮৩৩, ১৮৬৬ এবং ১৮৬৭ খ্রিষ্টাব্দে, তবে তা পারসাইড থেকে অনেক কম ছিল ।

গতানুগতিক উল্কা বৃষ্টি[সম্পাদনা]

ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিকাল ইউনিয়ন কর্তৃক উল্কা বৃষ্টিসমূহের নামকরণ করা হয়েছে।

উক্ত ছকটি অসম্পুর্ণ রয়ে গিয়েছে। আপনি চাইলে তা বর্ধিত করতে পারেন।

নাম সময় উৎপত্তি স্থান
কোয়াডরান্টিডস

(quadrantids)

জানুয়ারির প্রথম দিকে মাইনর প্লেনেট ২০০৩ ইএইচ১-এর মতো
লিরিডস

(Lyrids)

এপ্রিলের শেষে ধুমকেতু থ্যাচার
ইটা অ্যাকোয়ারিডস

(Eta Aquariids)

মে-এর শেষে ধুমকেতু ১পি/হেলি
এরিয়েটিডস

(Arietids)

জুনের মধ্যভাগে ধুমকেতু ৯৬পি/মাছোলজ
জুন বুটিডস

(june bootids)

জুনের শেষে ধুমকেতু ৭পি/পনস উইনেক
আলফা ক্যাপরিকর্নিডস

(Alpha capricornids)

জুলাইর শেষে ধুমকেতু ১৬৯পি/নিট
পারসাইড

(perseid)

আগস্টের মধ্যভাগে ধুমকেতু ১০৯পি/সুইফট-টাটল

পৃথিবী বহির্ভূত উল্কা বৃষ্টিসমূহ[সম্পাদনা]

উল্কা বৃষ্টির ফলে সৃষ্ট গর্ত

পৃথিবীর মতো অন্যান্য স্বচ্ছ বায়ুমন্ডলেও উল্কা বৃষ্টি হতে পারে। যেহেতু চাঁদ পৃথিবীর প্রতিবেশী ,তাই চাঁদ ও উল্কা বৃষ্টির সম্মুখীন হতে পারে। বর্তমানে নাসা চাঁদের উল্কা বৃষ্টি নিয়ে গবেষণা চালিয়েছে,যা রক্ষনাবেক্ষণের মধ্যে আছে মার্শাল স্পেস ফ্লাইট সেন্টার

মঙ্গল গ্রহে উল্কা বৃষ্টি

অনেক গ্রহতেই বিভিন্নরকম সংঘর্ষের ফলে সৃষ্ট বিভিন্নরকম গর্ত[৫] দেখা যায় যা অনেক দিন ধরে অবস্থান করে। কিন্তু নতুন গর্ত অনেক সময় উল্কা বৃষ্টির ফলে হতে পারে। মঙ্গল গ্রহ এবং এর উপগ্রহে উল্কা বৃষ্টি পর্যবেক্ষন করা গিয়েছে। এই বিষয় অন্যান্য গ্রহে এখন পর্যন্ত দেখা যায় নি তবে তা হতে পারে। মঙ্গল গ্রহে বিশেষ করে,যদিও তা পৃথিবীতে উল্কা বৃষ্টির মতো নয় তা আলাদা দেখায়। কারন পৃথিবীর কক্ষপথ এবং মঙ্গল গ্রহের কক্ষপথ এক নয়। আর পৃথিবী ও মঙ্গলের মাঝে ধুমকেতুর কক্ষপথ এক নয়। পৃথিবীর ভু পৃষ্ঠ থেকে ১% এরও কম ঘনত্ব মঙ্গল গ্রহের ভু পৃষ্ঠ,এর উপরের অংশ যেখানে উল্কা বৃষ্টি এসে আঘাত করে ,এই বিষয় খুবই সমার্থক। কারন বায়ুচাপের ফলে উভয় ঘটনাই একইরকম দেখায়। তবে যেহেতু মঙ্গল গ্রহ এবং পৃথিবী সূর্য থেকে দুরত্ব ভিন্ন, তাই সূর্যের আলোর প্রতিফলনে উল্কা বৃষ্টি কিছুটা ভিন্ন দেখায়।

৭ই মার্চ ,২০০৪ এ মার্স এক্সপ্লোরেশন রোভার স্পিরিট[৬] একটি সরু দাগ রেকর্ড করেছিল যা বর্তমানে মনে করা হয় যে, এটি মঙ্গল গ্রহের উল্কা বৃষ্টি ছিল যা ধুমকেতু ১১৪পি/ওয়াইজম্যান স্কিফ থেকে সৃষ্টি হয়েছিল। এটাতে খুবই কঠিন দৃশ্য অনুমান করা হয়েছিল ২০ ডিসেম্বর ২০০৭ এ। আরো অনেক উল্কা বৃষ্টি দেখা গিয়েছিল যা 'ল্যামডা জেমিনিড' নামে পরিচিত ছিল। এগুলো ইটা একুয়ারিডস থেকে সৃষ্টি হয়েছিল।

এছাড়াও ১৯৯৪ সালে অনেক বৃহৎ উল্কা বৃষ্টি দেখা যায় যা পরে অনেক গবেষণা করা হয় এবং বলা হয় যে সৌরজগতের অনেক বস্তু থেকে এটি এসেছিল যেমনঃ বৃহস্পতি,বুধ,শনির উপগ্রহ টাইটান,নেপচুনের উপগ্রহ ট্রাইটন এবং প্লুটো ।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "Denison Olmsted, 18 June 1791-13 May 1859"। সংগ্রহের তারিখ ২০১৮-০২-১০ 
  2. The American journal of science and arts। New-Haven : S. Converse। ১৮২০। 
  3. "radiant point | Definition of radiant point in English by Oxford Dictionaries"। সংগ্রহের তারিখ ২০১৮-০২-১০ 
  4. "Geminids Radiant Position" (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০১৮-০২-১০ 
  5. "চাঁদে নতুন ছয় হাজার গর্তের খোঁজ দিল এআই - bdnews24.com"। সংগ্রহের তারিখ ২০১৮-০৩-৩১  line feed character in |শিরোনাম= at position 43 (সাহায্য)
  6. "অন্যান্য মঙ্গল অভিযান — বিকাশপিডিয়া"। সংগ্রহের তারিখ ২০১৮-০৩-৩১