হায়রে মানুষ রঙ্গীন ফানুস

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
"হায়রে মানুষ রঙ্গীন ফানুস"
Hayre Manush Song Cover.jpg
বড় ভালো লোক ছিল অ্যালবাম থেকে
এন্ড্রু কিশোর কর্তৃক সঙ্গীত
ভাষাবাংলা
মুক্তিপ্রাপ্ত১৯৮২
স্টুডিওশ্রুতি রেকর্ডিং স্টুডিও
স্থানঢাকা, বাংলাদেশ
ধারামরমী সংগীত, চলচ্চিত্র সংগীত
দৈর্ঘ্য০৩:৫৫
লেবেলজি-সিরিজ (২০১৮- বর্তমান)
গান লেখকসৈয়দ শামসুল হক
সঙ্গীত রচয়িতাআলম খান
প্রযোজকআলম খান
সঙ্গীত ভিডিও
ইউটিউবে "হায়রে মানুষ রঙ্গীন ফানুস"

'হায়রে মানুষ রঙ্গীন ফানুস' বাংলা ভাষায় রচিত একটি চলচ্চিত্র সংগীত। এই সংগীত বা গানটি ১৯৮২ সালে বাংলাদেশের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার প্রাপ্ত ছায়াছবি বড় ভালো লোক ছিল চলচ্চিত্রে ব্যবহার করা হয়েছে।[১] ধীর-লয়ের এই মরমী সংগীতের গীতিকার ছিলেন খ্যাতনামা সাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হক[২]আলম খানের সুর ও সংগীত আয়োজনে এই গানে কন্ঠ দেন এন্ড্রু কিশোর[৩][৪] চলচ্চিত্রে এই গান ঠোঁট মিলান অভিনেতা আনোয়ার হোসেন। এই গানের দৃশ্যায়নে প্রবীর মিত্রও ছিলেন। গানটি এখনো জনপ্রিয়[৫] এবং কালজয়ী হিসেবে স্বীকৃত।[৬] এই গানটি ছাড়াও ঐ চলচ্চিত্রের তোরা দেখ দেখরে চাহিয়া [৬] ও আমি চক্ষু দিয়া দেখতাসিলাম জগৎ রঙ্গিলা গান দুইটি এখনো জনপ্রিয়।[৪][৭] চলচ্চিত্রটি মুক্তির পর আরও দুটো গান বেশ জনপ্রিয় হয়। রুনা লায়লার কন্ঠে ‘পাগল পাগল মানুষগুলো পাগল সারা দুনিয়া, কেহ পাগল রূপ দেখিয়া, কেহ পাগল শুনিয়া’ এবং রুনা লায়লা ও বিপুল ভট্টাচার্যের গাওয়া ‘চাম্বেলিরও তেল দিয়া কেশ বান্ধিয়া’[৭]

পটভূমি ও বিশেষত্ব[সম্পাদনা]

আমি আরেকটি ছবির সবগুলো গান লিখেছিলাম। ছবির নাম বড় ভালো লোক ছিল। এই ছবির চিত্রনাট্য, সংলাপও আমার। আমি পীর বংশের ছেলে। ভেতরে একটা আধ্যাত্মিকতা কাজ করে। এ ছবির চিত্রনাট্য, সংলাপ লেখার সময় আমি অনেকটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম। ঘোরের মধ্যেই ছবির গানগুলো লেখা। বিশেষ করে ‘হায় রে মানুষ রঙিন ফানুস দম ফুরাইলে ঠুস’ গানটির কথা বলব।

কবির বকুলের প্রতি সৈয়দ শামসুল হক[৭]

পটভূমি[সম্পাদনা]

'শাওন সাগর' এই চলচ্চিত্রটির প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ছিল। 'শাওন সাগর'-এর চিত্র পরিচালক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন এই চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য লেখার জন্য সৈয়দ শামসুল হক এবং সংগীত পরিচালনার জন্য আলম খানকে মনোনীত করেছিলেন। সৈয়দ শামসুল হক এই চলচ্চিত্রের গীতিকার হতে আগ্রহী ছিলেন না। চিত্রনাট্যর সাথে গানগুলির প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখার জন্য মোহাম্মদ মহিউদ্দিনের অনুরোধে সৈয়দ শামসুল হক এই চলচ্চিত্রের জন্য 'হায়রে মানুষ রঙ্গীন মানুষ' সহ সকল গান লিখেছিলেন।[৮]

বিশেষত্ব[সম্পাদনা]

মানব জীবনের অবধারিত পরিণতি এই গানের মুখ্য বিষয়।[৯] গীতি রচনা করার ক্ষেত্রে সৈয়দ শামসুল হক রবীন্দ্র সঙ্গীতনজরুল গীতিতে ব্যবহার হয়নি, এমন শব্দ ব্যবহার করেছেন।[৮] গানের কথায় বাংলাদেশের লোকজ শব্দকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে।[১০] এই গানের মাধ্যমে 'হুঁশ', 'ঠুশ', 'ফুশ', 'ভুস'-এর মত দেশী বাংলা শব্দগুলোকে কাব্যরূপ দেয়া হয়েছে।[৬] গীতিকার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার বাংলা গানের গীতি নিয়ে গবেষণা করতেন, তাদের পর্যবেক্ষণে 'হুঁশ', 'ঠুশ', 'ফুশ', 'ভুস'-শব্দ গুলি বাংলা গানে ইতোপূর্বে ব্যবহার হয়নি।[১১]

সুর আরোপ[সম্পাদনা]

ওরে নীল দরিয়া গানের মত, এই গানেও দুই ধাপে সুর আরোপ করা হয়েছিল। সৈয়দ শামসুল হক এই গানটি চলচ্চিত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গান বিবেচনায় প্রাথমিকভাবে এই গানের প্রথম চার লাইন একটি চিরকুটে লিখে, এই গানের গায়ক এন্ড্রু কিশোরের উপস্থিতিতে সুরকার আলম খানকে দিয়েছিলেন। আলম খান গানের মুখের জন্য ত্রিশ থেকে চল্লিশ বার পরীক্ষামূলক সুর আরোপের পর বর্তমান সুর মনোনীত করেন। এই গানের মুখ সুর করতে আলম খানের দুই থেকে তিন মাস সময় লেগেছিল।[১২] প্রথম চার লাইন বা মুখরার সুর, সৈয়দ শামসুল হকের পছন্দ হওয়ার পর এই গানের অবশিষ্ট অন্তরা আলম খানকে সুর আরোপের জন্য সরবরাহ করেছিলেন।[৮] মগবাজারের শ্রুতি রেকর্ডিং স্টুডিওতে এই গানের রেকর্ড করা হয়েছিল।[৭][১২]

মুক্তিলাভ[সম্পাদনা]

১৯৮২ সালে গানটি চলচ্চিত্রের অংশ হিসেবে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়। চলচ্চিত্র মুক্তির ছত্রিশ বছর পর গানটি জি-সিরিজের ব্যানারে তাদের 'অফিসিয়াল' ইউটিউব চ্যানেলে ৫ এপ্রিল,২০১৮ তারিখে অবমুক্ত করা হয়।[১৩]

জনপ্রিয়তা ও স্বীকৃতি[সম্পাদনা]

আমার দৃঢ় বিশ্বাস, যদি গানটা পুরোপুরি শেষ করতে পারি, তাহলে এ গানের জন্য জাতীয় পুরস্কার দিতে বাধ্য। কারণ, এ ধরনের গানের কথা আগে হয়নি। আপনি যদি আমার চাওয়ামতো সুর করতে পারেন, তাহলে আপনিও পুরস্কার পাবেন। আর আপনি যাকে দিয়ে গাওয়াবেন, তার ১০০ পার্সেন্ট লাগবে না, ৬০ পার্সেন্টও যদি গাইতে পারে, তাহলে সেও জাতীয় পুরস্কার পাবে- নিশ্চিত।

—এন্ড্রু কিশোর ও আলম খানের প্রতি সৈয়দ শামসুল হক[৮]

মুক্তির পর এই ছায়াছবির সব গান লোকপ্রিয় হয়েছিল, তবে এই গানটি সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়। এই গানের জাতীয় পুরষ্কার পাওয়া নিয়ে সৈয়দ শামসুল হক ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন।[৮][১১] আলম খান এই চলচ্চিত্রের গানে সুর ও সঙ্গীত পরিচালনার জন্য ১৯৮২ সালে শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালক ও গায়ক এন্ড্রু কিশোর শ্রেষ্ঠ গায়ক বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার জয় করেন।[৫] এন্ড্রু কিশোরের জন্য এটা ছিল প্রথম জাতীয় পুরষ্কার।[৮][১১]

বছর পুরষ্কার মনোনীত বিভাগ ফলাফল তথ্যসুত্র
১৯৮২ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার আলম খান শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালক বিজয়ী [১৪]
এন্ড্রু কিশোর শ্রেষ্ঠ পুরুষ কন্ঠশিল্পী

বাংলাদেশ টেলিভিশনের ছায়াছবির গানের অনুষ্ঠান ও বাংলাদেশ বেতারে এই গান নিয়মিত প্রচার হয়েছে। সম্প্রচার টেলিভিশনের যুগে এই গান নতুন করে বিভিন্ন রিয়েলিটি শো-তে পরিবেশন করা হয়েছে।[১৫][১৬] জনপ্রিয়তার নিরিখে নতুন প্রজন্মের গায়ক গায়িকারা এই গান নতুন করে পরিবেশন করেছেন।[১৭][১৮] এছাড়া এই গান নিয়ে নৃত্য পরিবেশনের উদাহরণ রয়েছে।[১৯]

পুনঃউৎপাদন[সম্পাদনা]

  • ২০০৫-এ গানটি সাউন্ডটেকের প্রযোজনায়, ডিজে মোর্তাজার সংগীত পরিচালনায় 'রঙ্গীন মানুষ'-নামক এলবামে নতুন করে প্রকাশিত হয়। এই সংস্করণে পান্থ কানাই কন্ঠ দেন।[১৭]
  • ২৩ আগস্ট, ২০১৬-তে গান বাংলা নামক বাংলাদেশী সম্প্রচার টেলিভিশন নেটওয়ার্কের 'উইন্ড অব চেঞ্জ' নামক সংগীতানুষ্ঠানের জন্য এই গানের মূল গীতি ঠিক রেখে সংগীত পরিচালক কৈশিক হোসেন তাপস নতুন করে সংগীত পরিচালনা করেন। মূল গানের গায়ক এন্ড্রু কিশোর এই সংস্করণেও কন্ঠ দেন। এই সংস্করণে মূল কন্ঠের নেপথ্যে কোরাস ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশনে এই সংস্করণের দৃশ্য ধারণ করা হয়। গানের রেকর্ডিংয়ে বারো জন বিদেশী বাদ্যযন্ত্র শিল্পী অংশগ্রহণ করেন।[২০] এই সংস্করণটি ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ তারিখে গান বাংলা টেলিভিশনের 'অফিসিয়াল' ইউটিউব চ্যানেলে অবমুক্ত করা হয়।[২১]

তথ্যসুত্র[সম্পাদনা]

  1. "রাজ্জাকের সেরা দশ চলচ্চিত্র"somoynews.tv। ২০১৭-০৮-২১। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০৯-১৫ 
  2. "সৈয়দ শামসুল হকের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী"চ্যানেল আই অনলাইন। ২০১৮-০৯-২৭। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০৯-২২ 
  3. "'হায়রে মানুষ, রঙিন ফানুস'"Bangla Tribune। ২০১৬-০৯-১৬। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০৯-১৫ 
  4. "'হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস দম ফুরাইলেই ঠুস'"Kalerkantho। ২০১৬-০৯-২৭। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০৯-১৫ 
  5. "'দম ফুরাইলে ঠুস'"bangla.bdnews24.com। ২০১৬-০৯-২৭। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০৯-১৫ 
  6. "হায়রে মানুষ রঙ্গিন ফানুস দম ফুরাইলে ঠুস"somoynews.tv। ২০১৬-০৯-২৭। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০৯-১৫ 
  7. "আমি কখনো গান লিখতে চাইনি"প্রথম আলো। ২০১৫-১২-২৪। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০৯-১৬ 
  8. "সেই সব গানের গল্প"সমকাল। ২০১৭-০৮-২৫। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০৯-১৫ 
  9. "তিনি সৈয়দ শামসুল হক"usbanglanews24.com। ২০১৬-১০-০৪। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০৯-১৭ 
  10. "গানে ও চলচ্চিত্রে অনিবার্য সৈয়দ হক : ফরিদ আহমদ দুলাল"ভোরের কাগজ। ২০১৮-০৯-২৮। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০৯-১৫ 
  11. "তিনি যদি আরও কয়েকটা গান দিয়ে যান..."প্রথম আলো। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০৯-২২ 
  12. "আলম খানের গান ও গল্প"প্রথম আলো। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০৯-২২ 
  13. "Old Movie Songs | Haire Manush Rongin Fanush | by Andrew Kishore | Boro Valo Lok Chilo" 
  14. "জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রাপ্তদের নামের তালিকা (১৯৭৫-২০১২)"fdc.gov.bd। ২ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০৯-১৫ 
  15. "Closeup1 2006 [Boishakh.com] Haire Manush - Muhin" 
  16. "Hayre Manush Rongin Fanush | Nannu | Shera Kontho 2017 | Piano Round | Channel i TV" 
  17. "Haire Manush || Dj Mo Mortuza feat Pantha Kanai || Official Video" 
  18. "Haire Manus Rongin Fanus | Konal | Bangla New Song | BanglaVision | 2018 | HD" 
  19. "Haire Manush" 
  20. "এন্ড্রু কিশোরের কণ্ঠে নতুন করে 'হায়রে মানুষ'"banglanews24.com। ২০১৬-০৮-২৪। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০৯-১৫ 
  21. "HAAIREY MANUSH - TAPOSH featuring ANDREW KISHORE : ROBI YONDER MUSIC WIND OF CHANGE [ PS:02 ]" 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

আরো দেখুন[সম্পাদনা]