বিষয়বস্তুতে চলুন

পেরিয়াচি

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পেরিয়াচি
ধাত্রীবিদ্যা দেবী[]
শ্রী বীরমাকালিয়াম্মান মন্দিরে পেরিয়াচি আম্মান তাঁর বাহুতে একটি নবজাত শিশুকে সুরক্ষা দিতে, রানীকে হত্যা করতে এবং রাজাকে পদদলিত করতে দেখা যাচ্ছে
অন্তর্ভুক্তিদেবী, আদি পরাশক্তি, পার্বতী
আবাসকৈলাস পর্বত
মন্ত্রওম শ্রী মাত্রে নমঃ
অস্ত্রত্রিশূল, তরবারি, ফাঁস
বাহনসিংহ
মন্দিরসমূহশ্রী বীরমাকালিয়াম্মান মন্দির, শ্রী মারিয়াম্মান মন্দির, সিঙ্গাপুর
উৎসবনবরাত্রি, পুংসবন
সঙ্গীশিব

পেরিয়াচি (তামিল : பெரியாச்சி) হলেন হিন্দুধর্মে পার্বতীর একটি হিংস্র দিকের প্রকাশ। তিনি পেরিয়াচি আম্মান নামেও পরিচিত ( আম্মান অর্থ "মা") এবং কখনও কখনও পেরিয়াচি কালী আম্মান নামেও তাঁকে ডাকা হয় কারণ তিনি দেবী কালীর সাথে যুক্ত। কিছু বিবরণ অনুসারে, পেরিয়াচি দেবী মাতৃদেবীর একটি অভিভাবক রূপ, এঁকে প্রসবের সময় দুর্ভাগ্য রোধ করার জন্য পূজা করা হয়।[] পেরিয়াচিকে শিশুদের রক্ষক বলা হয় এবং তিনি প্রসব ও গর্ভধারণের সাথে জড়িত। এই দেবী সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং রিইউনিয়ন দ্বীপে পূজনীয়।[][]

কিংবদন্তি

[সম্পাদনা]

প্রাচীনকালে বল্লালরাজন নামে একজন পাণ্ড্য রাজা ছিলেন। তিনি নিজের প্রজাদের শয়তানের মতো নির্যাতন করতেন। এক দৈববাণীতে বলা হয়েছিল যে, যদি তাঁর সন্তান জন্ম নিয়ে পৃথিবীর মাটি স্পর্শ করে তবে রাজার জীবনের অবসান ঘটাবে। রানির প্রসব বেদনা শুরু হলে রাজা কোনো ধাত্রীকে খুঁজে পাননি। তাঁকে পেরিয়াচি নামের একজন নারীকে বেছে নিতে হয়েছিল। এই অদম্য মহিলা সফলভাবে সন্তানের প্রসব সম্পন্ন করেছিলেন এবং বাচ্চাটিকে ধরে রেখেছিলেন যাতে এটি পৃথিবী স্পর্শ না করে। রাজা নিজের জীবন রক্ষার উদ্দেশ্যে নবজাতককে হত্যা করতে চেয়েছিলেন । রাজা জানতেন না যে পেরিয়াচি দেবী আদি পরাশক্তি। দেবী যখন নিজের আসল রূপ ধারণ করেছিলেন তখন রাজা অবাক হয়েছিলেন। দেবী একাধিক বাহু ব্যবহার করেছিলেন, তিনি রাজাকে নিজের পায়ের তলায় মাড়িয়ে রেখেছিলেন। তারপর, তিনি অস্ত্র ব্যবহার করে রাজাকে হত্যা করেছিলেন। একই সময়ে, রানিও শিশুটিকে হত্যা করতে চেয়েছিলেন, কারণ রানি জানতেন শিশুটি রাজার মৃত্যু ডেকে আনবে। কিন্তু পেরিয়াচি রানিকে হত্যা করে, তাঁর পেট চিরে পাকস্থলী বার করে খেয়ে ফেলেছিলেন এবং শিশুটিকে বাঁচিয়েছিলেন। অতএব, পেরিয়াচি শিশু এবং গর্ভবতী মায়েদের রক্ষাকারী হিসাবে পরিচিত ছিলেন। বলা হয় যে, এই শিশুটি পেরিয়াচির তত্ত্বাবধানে বড় হয়েছিলেন এবং পরে পাণ্ড্য রাজা হয়েছিলেন। তিনি পরে পেরিয়াচি আম্মানের জন্য অনেক মন্দির এবং মঠ তৈরি করেছিলেন।

মূর্তি শিল্প

[সম্পাদনা]

পেরিয়াচি তাঁর আটটি বাহু এবং ভয়ঙ্কর চেহারা দ্বারা পরিচিত। তাঁকে সাধারণত অস্ত্র এবং একটি শিশুকে ধারণ করা অবস্থায় দেখানো হয়। তিনি একটি ত্রিশূল, একটি ফাঁস, একটি সাপ সহ একটি ডমরু, একটি তলোয়ার এবং রক্তে ভরা একটি পাত্র ধারণ করে থাকেন। তাঁকে প্রায়ই ছিন্নভিন্ন উদরযুক্ত রাজার উপর পা রেখে দণ্ডায়মান বা উপবিষ্ট হিসাবে দেখানো হয়। অনেক স্থানে তাঁকে দেখানো হয়েছে, তিনি তাঁর সামনের দুই হাত দিয়ে তাঁর কোলে শুয়ে থাকা রানির পেট ও গর্ভাশয় ছিঁড়ে বার করে এনেছেন। তিনি রানির অন্ত্র চিবিয়ে খাচ্ছেন, তাঁর মুখ থেকে সরু ধারায় রক্ত ঝরে পড়ছে। তিনি দুই হাতে অন্ত্র ধরে রাখেন এবং অন্য হাতে রাজার সন্তানকে উঁচু করে ধরে থাকেন।[][] বলা হয় তাঁর হিংস্র চেহারা মন্দ আত্মাদের তাড়িয়ে দেয়।[]

ভূমিকা

[সম্পাদনা]

পেরিয়াচিকে কাভাল দেবিয়াম বা অভিভাবক আত্মা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অন্যান্য পুরুষ কাভাল দেব যেমন মুনিশ্বরণ এবং মধুরাই বীরানকে তাঁর অভিভাবক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।[] বলা হয় জাদা-মুনিস্বরণের (মুনিস্বরণের একটি দিক) সাথে পেরিয়াচি একটি জুটি হিসাবে পৃথিবীকে রক্ষা করার জন্য এবং মন্দ আত্মাদের তাড়াতে পৃথিবীতে এসেছেন।[] পেরিয়াচি সেই নারীদের শাস্তি দিতে এসেছেন যারা অন্যকে আঘাত করার জন্য কিছু করে এবং বলে। দেবী সেইসাথে সেইসব পুরুষদের শাস্তি দেন যারা নারীদের শোষণ করে এবং তাদের পদদলিত করে।[] তিনি শিশুদের রক্ষাকারী হিসাবেও বিবেচিত।[]

উপাসনা

[সম্পাদনা]

তামিল গ্রামীণ হিন্দু প্রবাসীদের মধ্যে, গর্ভাবস্থার তৃতীয় মাসে মা ও শিশুকে মন্দ নজর থেকে রক্ষা করার জন্য পেরিয়াচির কাছে প্রার্থনা সহ পুংসবন ("ভ্রূণের সুরক্ষা") অনুষ্ঠান করা হয়। এরপর সপ্তম মাসে, প্রসব বেদনা কমাতে এবং প্রসবের সময় মা ও শিশুকে রক্ষা করার জন্য দেবীর কাছে প্রার্থনা সহ সিমন্তোন্নয়ন ("চুড়ি অনুষ্ঠান") করা হয়। প্রসবের ৩০তম দিনে, বাড়িতে একটি অনুষ্ঠানে একটি কালো শাড়ি, আমিষ খাবার এবং শুভ জিনিস দেবীকে নিবেদন করা হয়। নবজাত শিশুর দুর্ভাগ্য এড়াতে গর্ভবতী মহিলারা দেবীর কাছে প্রার্থনা করেন এবং নিরাপদে সন্তানের জন্মের পরে মায়েরা দেবীর কাছে প্রার্থনা করবেন বলে আশা করা হয়।[১০] প্রসবের পরে প্রথম মন্দির দর্শনের সময়, পিতামাতারা তাঁদের এক মাস বয়সী শিশুকে দেবীর কাছে উৎসর্গ করেন। শিশুটিকে দেবীর সামনে মাটিতে বা তাঁর পায়ের কাছে রেখে দেন। শিশুর মাথা ন্যাড়া করে হলুদ কাপড় দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। শিশুর ভাইবোন ব্যতীত সকলেই গর্ভকালীন এবং জন্মের প্রথম কয়েক মাসের জন্য শিশুর প্রতি দেবীর সুরক্ষার কথা স্বীকার করে পেছনে চলে আসেন। তারপর পুরোহিত পেরিয়াচি দেবীর পূজা করার জন্য স্বাভাবিক আচার পালন করেন।[][] কথিত আছে যে দম্পতিরা ১২টি রবিবার ধরে দেবীর উপাসনা করলে তাঁদের বংশধর লাভ হয়।[১১]

মঙ্গল ও শুক্রবার পেরিয়াচি এবং মুনিশ্বরনের উপাসনার জন্য বিশেষ শুভ দিন বলে মনে করা হয়।[] দেবীকে সম্মান জানাতে তামিল মাস আদিতে (আটি) পেরিয়াচি পূজা নামে একটি উৎসব অনুষ্ঠিত হয়।[১২] তামিল মাসথাইতেও তাঁর পূজা করা হয়। তাঁর উপাসনার অংশ হিসাবে একটি পড়াইয়াল নৈবেদ্য তাঁকে উপস্থাপন করা হয়। যার মধ্যে বলি দেওয়া পশুর মাংস এবং নিরামিষ খাবার থাকে। তারপর সেগুলি প্রসাদ হিসাবে ভক্তদের দেওয়া হয়। এই প্রসাদ খেলে সৌভাগ্য এবং সুস্বাস্থ্য আসে বলে বিশ্বাস করা হয়।[১১] থিমিথি উৎসবের সময়, ভক্তরা এবং নাট্যদলগুলি মহাকাব্য মহাভারতের দৃশ্য অভিনয় করে। আগুন ওপর দিয়ে হাঁটার এক সপ্তাহ আগে, তাঁরা পেরিয়াচির কাছে প্রার্থনা করেন। ভক্তদের প্রতি দেবীর আশীর্বাদ চেয়ে এবং উৎসব চলাকালীন কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে না ঘটতে পারে তার প্রার্থনা করে অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।[১৩] পেরিয়াচিকে ভক্তরা গৃহস্থালি বা পারিবারিক দেবতা হিসেবেও পূজা করেন।[১৪] বলা হয় তিনি তাঁর কিছু ভক্তকে অধিকার করে থাকেন।[১৫]

শ্রী বীরমাকালিয়াম্মান মন্দিরে, সিঙ্গাপুরের শ্রী মারিয়াম্মান মন্দিরে এবং কেপং-এর শ্রী মহা মরিয়ম্মান মন্দিরে পেরিয়াচির মন্দিরগুলি দেখা যায়। পেনাংয়ের দেবী শ্রী পেরিয়াচি আম্মান মন্দিরের মতো শুধুমাত্র তাঁকে উৎসর্গ করা পৃথক মন্দিরও বিদ্যমান।

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. Encyclopedia of the Divine Feminine: Goddess of 10,000 Names। Xlibris Corporation। ২৬ মে ২০২১। আইএসবিএন ৯৭৮১৬৬৪১০৫৬৯০। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১০ অক্টোবর ২০২৩
  2. Sinha, Vineeta (২০০৫)। A New God in the Diaspora?: Muneeswaran Worship in Contemporary Singapore (ইংরেজি ভাষায়)। NUS Press। পৃ. ৩০৩। আইএসবিএন ৯৭৮-৯৯৭১-৬৯-৩২১-৩। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১০ অক্টোবর ২০২৩
  3. Sinha p.303
  4. 1 2 3 Mark Lewis (২০০৩)। The Rough Guide to Singapore। Rough Guides। পৃ. ৬৪। আইএসবিএন ৯৭৮১৮৪৩৫৩০৭৫৬। ১০ অক্টোবর ২০২৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১০ অক্টোবর ২০২৩
  5. 1 2 3 উদ্ধৃতি ত্রুটি: <ref> ট্যাগ বৈধ নয়; Corduan নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি
  6. Sinha p. 105
  7. 1 2 Sinha p. 122
  8. Eveland, Jennifer (২৪ জুন ২০০৯)। Frommer's Singapore & Malaysia। Frommer's। পৃ. ১৩৫। আইএসবিএন ৯৭৮০৪৭০৫২৩৫৩৭। ১০ অক্টোবর ২০২৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১০ অক্টোবর ২০২৩
  9. Mat Oakley, Joshua Samuel Brown (১৫ সেপ্টেম্বর ২০১০)। Singapore। Lonely Planet। পৃ. ৬১। আইএসবিএন ৯৭৮১৭৪২২০৪০১৭। ১০ অক্টোবর ২০২৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১০ অক্টোবর ২০২৩
  10. Sinha p. 303
  11. 1 2 "About its Deities and Festivals: Sree Periyachi"Sree Maha Mariamman Temple official site। ২০০৮। ১৩ জানুয়ারি ২০১০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২১ মার্চ ২০১০
  12. Sinha p. 87
  13. "Mahabharathathil Uruvaana thiruvizha," by Radha Kasiramu. Tamil Murasu, October 2005, p. 3.
  14. Sinha p.140
  15. Sinha p. 126

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]