পদাশ্রিত নির্দেশক
| বাংলা ব্যাকরণ |
|---|
| ধারাবাহিকের একটি অংশ |
পদাশ্রিত নির্দেশক,[১] সংক্ষেপে নির্দেশক,[২] বলতে বাক্যে ব্যবহৃত সেসব শব্দাংশকে বোঝায় যেগুলো বিশেষ্য বা বিশেষণ পদের পরে বা “আশ্রয়ে” সংযুক্ত হয়ে উক্ত পদের নির্দিষ্টতা বা অনির্দিষ্টতা বোঝায়।[৩] এগুলো মূলত অব্যয় পদ, তাই এদের পদাশ্রিত অব্যয়ও বলে।[১][৪] বাংলা ও অসমীয়া ভাষায় নির্দেশকগুলো প্রত্যয় হিসেবে পদের পরে বসে, তাই উক্ত ভাষাগুলোর ক্ষেত্রে পদাশ্রিত নির্দেশককে নির্দেশক প্রত্যয়ও[৫] বলা যায়। পদাশ্রিত নির্দেশক ব্যাকরণিক বর্গ গঠনে ভূমিকা রাখে।
বাংলা ভাষায় সাধারণত ব্যবহৃত নির্দেশকগুলো হলো – -টা, -টি, -টে -টু, -টুক, -টুকু, -টুকুন, -গুলা, -গুলি, -গুলো, -খান, -খানা, -খানি, -গাছ, -গাছা, -গাছি, -জন, -এক।[১][৫][৪] বাংলা ব্যাকরণে নির্দেশকসমূহ লগ্নক শ্রেণিভুক্ত।[২] “পদাশ্রিত নির্দেশক হচ্ছে খাঁটি বাংলা ভাষার নিজস্ব সম্পদ।”[৫]
ব্যুৎপত্তি ও সংজ্ঞা
[সম্পাদনা]পদাশ্রিত শব্দটির অর্থ “পদে আশ্রিত” আর নির্দেশক অর্থ “নির্দেশনাকারী”। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বলেছেন,
“কোনো বিশেষ্য দ্বারা দ্যোতিত পদার্থের রূপ, প্রকৃতি অথবা তৎসম্বন্ধে বক্তার মনের ভাব প্রকাশ করার একটা বিশেষ উপায় বাঙ্গালা ভাষায় আছে। টা, টি, টুকু, টুক, খানা, খানী (খানি) জল প্রভৃতি কতগুলো শব্দ বা শব্দাংশ আছে যেগুলি বিশেষ্যের সহিত (অথবা বিশেষ্যের পূর্বে ব্যবহৃত সংখ্যাবাচক বিশেষণের সহিত) সংযুক্ত হইয়া যায়। পদার্থ বা বস্তুর গুণ বা প্রকৃতি নির্দেশ করে। এই রূপ শব্দ বা শব্দাংশকে পদাশ্রিত বলা যাইতে পারে।”[৬]
বাংলার পদাশ্রিত নির্দেশক ইংরেজি definite article (‘the’) এর “সমতুল্য”।[৩]
প্রকারভেদ
[সম্পাদনা]নির্দিষ্টতাবাচক
[সম্পাদনা]নির্দিষ্টতাবাচক নির্দেশক বিশেষ্য, সর্বনাম বা বিশেষণ পদ বা বর্গের পরে বসে পদ বা বর্গটিকে নির্দিষ্টতা প্রদান করে। বাংলা এ ধরনের নির্দেশকের মধ্যে রয়েছে – -টা, -টি, -টো, -টে, -টু, -টুক, -টুকু, -টুকুন, -গুলা, -গুলি, -গুলো, -খান, -খানা, -খানি, -গাছ, -গাছা, -গাছি, -জন।
- একটি বিশেষ্য, সর্বনাম ও বিশেষণ পদ বা বর্গকে নির্দিষ্ট করে বোঝাতে -টা, -টি, -খানা ও -খানি নির্দেশক বসে, রূপান্তর: -টো ও -টে এবং -খান। উদাহরণ: বইটা, বইখানি, দিনটি, একটা, একটি, একখানা, একখান, দুটো, তিনটে। স্বল্পতা বোঝাতে অগণনযোগ্য নামপদের পর -টুক বসে, রূপান্তর: -টু, -টুকু। উদাহরণ: একটু, এইটুক, ভাতটুকু।
- একের বেশি বিশেষ্য, সর্বনাম ও বিশেষণ পদ বা বর্গকে নির্দিষ্ট করে বোঝাতে -গুলা, -গুলি নির্দেশক বসে। এর রূপান্তর: -গুলো। যেমন: বইগুলা, এগুলো, সেগুলি। আধিক্য বোঝাতে বিশেষত “লম্বা বা সরু” নির্দেশ করে এমন অগণনযোগ্য নামপদের পর -গাছ বসে, রূপান্তর: -গাছা, -গাছি। উদাহরণ: একগাছ, চুলগাছা।
- এক বা একের বেশি মানুষ বোঝাতে বিশেষ্য, সর্বনাম বা বিশেষণ পদ বা বর্গের পর -জন নির্দেশক ব্যবহৃত হয়। উদাহরণ: লোকজন, সেইজন, অনেকজন, কয়জন৷
অনির্দিষ্টতাবাচক
[সম্পাদনা]অনির্দেশক প্রত্যয় এমনই একটি নির্দেশক প্রত্যয় যেটি অনির্দিষ্টতাবাচক বিশেষ্য, সর্বনাম বা বিশেষণ পদ বা বর্গের পরে বসে। এই প্রত্যয় দিয়ে সাধারণত সংখ্যা বা পরিমাণের অনির্দিষ্টতা বোঝায়। বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত একমাত্র অনির্দেশক প্রত্যয় হলো -এক।[ক] নিচের উদাহরণে ব্যবহৃত দশেক (দশ্ + -এক্) বলতে কমবেশি দশ বোঝায় বলে এখানে -এক একটি অনির্দেশক প্রত্যয়।[৫]
- জন দশেক ছাত্র।
-এক প্রত্যয়টিকে -টা বা -খান নির্দেশকের পরে যুক্ত হয়ে -টাক (-টা + -এক্) ও -খানেক (-খান্ + -এক্) – দুটি সাধিত নির্দেশক তৈরি করে। নিচের দুটি উদাহরণে উক্ত নির্দেশক দুটির প্রচলিত ব্যবহার দেখানো হলো।[৫]
- মাইলটাক গিয়ে পেয়ে গেলাম
- ঘণ্টাখানেক হলো বসে আছি।
শূন্য
[সম্পাদনা]শূন্য নির্দেশক হলো বাক্যে পদাশ্রিত নির্দেশকের অনুপস্থিতি। যেসব নির্দিষ্টতাবাচক নির্দেশক আছে সেখানে কোনো বাক্যে বা পদ/বর্গের সঙ্গে নির্দেশকের অঅনুপস্থিতি বিশেষভাবে নির্দেশ করে যে পদটি “অনির্দিষ্টতাবাচক”। যেসব ভাষায় অনির্দিষ্টতাবাচক নির্দেশক বিরল বা নগণ্য (যেমন: বাংলা), সেখানে শূন্য নির্দেশক বিশেষভাবে অনির্দিষ্টতাবাচক নির্দেশকের কাজ করে। নিচের উদাহরণে দর্শনার্থীরা ও কাদা পদ দুটির পরিমাণ অনির্দিষ্ট, কিন্তু এখানে কোনো নির্দেশক যুক্ত হয় নি।
- দর্শনার্থীরা কাদায় হাঁটা শেষ করলেন।
পদাশ্রিত নির্দেশক লেখার নিয়ম-রীতি
[সম্পাদনা]বাংলা ব্যাকরণ ও প্রমিত বানানের নিয়ম অনুযায়ী— সংখ্যা এবং তার পরবর্তী পদাশ্রিত নির্দেশক (Classifiers) বা পরিমাপক এককের মাঝে কোনো ফাঁকা স্থান (space) রাখা যাবে না।
নিচে বিস্তারিত সূত্র এবং বিশ্লেষণ দেওয়া হলো:
“সংখ্যাবাচক শব্দের সাথে ‘টি’, ‘টা’, ‘খানা’, ‘খানি’, ‘গাছা’, ‘গাছি’, ‘জন’ ইত্যাদি পদাশ্রিত নির্দেশক ও পরিমাপক শব্দাংশ যুক্ত করে লিখতে হয়।”
অর্থাৎ, যখন আপনি অংকে (যেমন: ১০) বা কথায় (যেমন: দশ) সংখ্যা লিখবেন, তার ঠিক পরেই নির্দেশকটি বসবে। মাঝখানে স্পেস দেওয়া অশুদ্ধ।
২. শব্দভেদে প্রয়োগের বিশ্লেষণ
[সম্পাদনা]শব্দগুলোকে ব্যাকরণগতভাবে দুই ভাগে ভাগ করা যায়:
ক. পদাশ্রিত নির্দেশক (Enclitics)
[সম্পাদনা]এগুলো সরাসরি সংখ্যার সাথে মিলে একটি পূর্ণ অর্থ প্রকাশ করে।
জন: ১০০জন (মানুষের ক্ষেত্রে)।
টি / টা: ১০টি কলা, ৫টা বাজলে।
খানা / খানি: ২খানা রুটি, ৫খানি শাড়ি।
গাছা / গাছি: ৩গাছা চুড়ি, ৪গাছি দড়ি।
খ. পরিমাপক একক (Measure Units)
[সম্পাদনা]এগুলো একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ বা সেট বোঝায়। আধুনিক প্রমিত রীতিতে এগুলোকেও সংখ্যার সাথে জুড়ে দেওয়া হয়।
জোড়া: ১০জোড়া মোজা।
হালি: ৪হালি ডিম।
থোকা: ৩থোকা আঙুর।
টুকু / টুক: এই নির্দেশকগুলো সাধারণত বিশেষ্য বা সর্বনামের সাথে বসে (যেমন: দুধটুকু, একটুখানি)। তবে সংখ্যার সাথে বসলে (যেমন: ‘একটুকু’) তাও যুক্ত হয়ে বসবে।
৩. উদাহরণ তুলনা
[সম্পাদনা]| ধরন | শুদ্ধ রূপ (স্পেস ছাড়া) | অশুদ্ধ রূপ (স্পেসসহ) |
|---|---|---|
| সংখ্যা + টি | ৪৫টি কলম | ৪৫ টি কলম |
| সংখ্যা + জন | ৫০জন শ্রমিক | ৫০ জন শ্রমিক |
| সংখ্যা + খানি | ১০খানি কাগজ | ১০ খানি কাগজ |
| সংখ্যা + গাছা | ২গাছা লাঠি | ২ গাছা লাঠি |
| সংখ্যা + হালি | ২হালি লেবু | ২ হালি লেবু |
৪. ব্যতিক্রম ও বিশেষ দ্রষ্টব্য
[সম্পাদনা]১. কথায় লিখলে: যদি আপনি সংখ্যাটি অংকে না লিখে কথায় লেখেন, তখনও তা একসাথে বসবে। যেমন: ‘পাঁচটি’, ‘দশজন’, ‘চারহালি’।
২. একাধিক শব্দের একক: যদি পরিমাপক এককটি বড় কোনো শব্দ হয় (যেমন: কিলোগ্রাম, সেন্টিমিটার), তবে আন্তর্জাতিক রীতিতে অনেক সময় সংখ্যার পর স্পেস দেওয়া হয় (যেমন: ১০ কেজি বা ১০কেজি — উভয়ই প্রচলিত)। তবে ক্ষুদ্র শব্দাংশগুলো (টি, জন, হালি) সব সময় যুক্ত থাকবে।
৩. বিরাম চিহ্ন: সংখ্যা ও নির্দেশক মিলে একটি একক শব্দ হিসেবে গণ্য হয়, তাই এদের মাঝে ড্যাশ (—) বা অন্য কোনো চিহ্ন বসবে না।
ভাষাভেদে প্রচলন
[সম্পাদনা]
অনেক ইন্দো-ইউরোপীয়, সেমিটীয় (কেবল নির্দিষ্টতাবাচক) ও পলিনেশীয় ভাষাসমূহে নির্দেশক দেখা যায়; তবে, চীনা, জাপানি, কোরীয়, মঙ্গোলীয়, তুর্কীয় ভাষাসমূহ (তাতার, বাশকির, তুভাই ও চুভাশসহ), উরালীয় ভাষাসমূহ (ফিনীয় ও সামি ভাষাসমূহসহ), ইন্দোনেশীয়, হিন্দি-উর্দু, পাঞ্জাবি, তামিল, বাল্টীয় ভাষাসমূহ, অধিকাংশ স্লাভীয় ভাষা, বান্টু ভাষাসমূহ (সোয়াহিলিসহ) ও ইয়োরুবাসহ বিশ্বের অনেক প্রধান প্রধান ভাষায় নির্দেশকের ব্যবহার অনুপস্থিত। কিছু ভাষায় নির্দেশকের ব্যবহার রয়েছে, যেমন কিছু উত্তর ককেশীয় ভাষাসমূহতে নির্দেশকের ব্যবহার ঐচ্ছিক; তবে, বাংলা, অসমীয়, ইংরেজি ও জার্মানের মতো আরও কিছু ভাষার ক্ষেত্রে অর্থ ও সাবলীলতা রক্ষায় নির্দেশক ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক, যদিও এরা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাপরিবারের সদস্য।
ভাষাবিদরা বিশ্বাস করেন যে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার পূর্বপুরুষ আদি ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাতে নির্দেশকের কোনো ব্যবহার ছিল না। এই পরিবারের বেশিরভাগ ভাষায় নির্দিষ্টতাবাচক বা অনির্দিষ্টতাবাচক নির্দেশক নেই: লাতিন বা সংস্কৃত ভাষায় কোনো নির্দেশকের ব্যবহার নেই, এমন কি কিছু আধুনিক ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাতেও, যেমন স্লাভীয় ভাষাসমূহ (বুলগেরীয়, মেসেডোনীয় ও কিছু উত্তর রুশ উপভাষা বাদে), বল্টীয় ভাষাসমূহ এবং অনেক ইন্দো-আর্য ভাষাতেও নির্দেশক নেই। যদিও ধ্রুপদী গ্রিক ভাষায় নির্দিষ্টতাবাচক নির্দেশকের ব্যবহার ছিল[খ], পূর্ববর্তী হোমারীয় গ্রিকে নির্দেশককে মূলত সর্বনাম বা প্রদর্শনমূলক পদ হিসাবে ব্যবহার করা হত, যেখানে প্রথম দিকে মাইসেনীয় গ্রিক নামে পরিচিত গ্রিক ভাষায় পরিচিত রূপে কোনো নির্দেশক ছিল না। বিভিন্ন ভাষা পরিবারে অঞ্চলভেদে নির্দেশকের ব্যবহার স্বাধীনভাবে বিকশিত হয়েছে।
আরও দেখুন
[সম্পাদনা]টীকা
[সম্পাদনা]- ↑ একে সংখ্যাবাচক "এক" (১) এর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলবেন না, কারণ শব্দের সাথে একীভূত না হলে প্রত্যয় হয় না। তাই বাক্যে স্বতন্ত্র পদরূপে ব্যবহৃত "এক" প্রত্যয়বাচক নয়, এমন কি এক এর পর নির্দেশক যুক্ত হলেও (যেমন: একটি) এটি পদ হিসাবেই বাক্যে আচরণ করবে।
- ↑ নির্দেশকের ব্যবহার আধুনিক গ্রিকেও টিকে আছে এবং এটি জার্মান ভাষার নির্দিষ্টতাবাচক নির্দেশকের সাথে একটি শক্তিশালী কার্যকরী সাদৃশ্য বহন করে, যার সাথে এটি সম্পর্কিত।
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- 1 2 3 বাংলা ভাষার ব্যাকরণ। খণ্ড নবম-দশম শ্রেণি। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ঢাকা, বাংলাদেশ। ২০১৮।
- 1 2 বাংলা ভাষার ব্যাকরণ ও নির্মিতি। খণ্ড নবম-দশম শ্রেণি। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ঢাকা, বাংলাদেশ। নভেম্বর ২০২০।
- 1 2 "পদাশ্রিত নির্দেশক"। Job Preparation BD। ৯ জুলাই ২০২২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৯ জুলাই ২০২২।
- 1 2 "পদাশ্রিতি নির্দেশক কাকে বলে?"। One Sigma Education।
- 1 2 3 4 5 হাসান, মাহমুদুল; সুলতানা, মেহরিন (২০১৯)। ভাষা মঞ্জুরী - বাংলা ব্যাকরণ ও নির্মিতি। খণ্ড সপ্তম শ্রেণি। ৩৮/২-খ, তাজমহল মার্কেট (৩য় তলা) বাংলাবাজার, ঢাকা: গ্রন্থপুঞ্জি প্রকাশনী। পৃ. ১৬৬–১৬৭।
{{বই উদ্ধৃতি}}: উদ্ধৃতি শৈলী রক্ষণাবেক্ষণ: অবস্থান (লিঙ্ক) - ↑ "পদাশ্রিত নির্দেশক কাকে বলে ও কত প্রকার? পদাশ্রিত নির্দেশকের ব্যবহার"। My Syllabus Notes। সংগ্রহের তারিখ ২৫ জানুয়ারি, ২০২২।
{{ওয়েব উদ্ধৃতি}}:|সংগ্রহের-তারিখ=এর মান পরীক্ষা করুন (সাহায্য) - ↑ বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম এবং বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা ব্যাকরণ (২য় খণ্ড)। বাংলা একাডেমি।