প্রবাদ-প্রবচন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

প্রবাদ প্রবচন প্রতিটি ভাষার অমূল্য সম্পদ। বাঙালীর হাজার বছরের সংস্কৃতি তথা সামগ্রিক জীবনাচরণে প্রবাদ প্রবচন সমৃদ্ধ একটি ধারা হিসেবে বিবেচিত। প্রবাদ প্রবচনের মাধ্যমে বাঙালির জীবন, ধর্ম, সংস্কৃতি, আচার, বিশ্বাস ও রসবোধের পরিচয় পাওয়া যায়।

প্রবাদ ও প্রবচন প্রায় একই অর্থে এবং পাশাপাশি ব্যবহৃত হলেও এর মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান।

প্রবাদ ও প্রবচনের সংজ্ঞা[সম্পাদনা]

প্রবাদ[সম্পাদনা]

মানবসমাজের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতালব্ধ জীবনসত্যের স্মারক কোনো জনপ্রিয় বিদ্রুপাত্মক সংক্ষিপ্ত উক্তিকে প্রবাদ বলে।[১]

প্রবচন[সম্পাদনা]

প্রবচন হলো প্রজ্ঞাবান, মননশীল বা সৃজনশীল ব্যক্তির অভিজ্ঞতাপ্রসূত ব্যক্তিগত সৃষ্টি। এগুলো সাধারণত স্রষ্টার নামেই প্রচলিত হয় (যেমন: খনার বচন)। কবি, সাহিত্যিক বা প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিবর্গ এর উদ্ভাবক বা রচয়িতা। যেমন:

প্রবাদ ও প্রবচনের পার্থক্য[সম্পাদনা]

প্রবাদ ও প্রবচনের সবচেয়ে সুনির্দিষ্ট পার্থক্য হলো প্রবাদ লোকসমাজ বা কালের সৃষ্টি। কিন্তু প্রবচন কবি, সাহিত্যিক বা প্রজ্ঞাবান ব্যক্তির সৃষ্টি।[১] প্রবাদের কোনো লিখিত ভিত্তি নেই, কিন্তু প্রবচনের আছে। প্রবাদকে বলা যায়, লোকসমাজের অভিজ্ঞতার নির্যাস, একক কোনো ব্যক্তি এর রচয়িতা হিসেবে দাবি করতে পারে না। অন্যদিকে প্রবচন ব্যক্তিগত প্রতিভার দ্বারা সৃষ্ট বাক্য বা বাক্যাংশ। তবে, প্রবচন একসঙ্গে লোকসমাজের অধিকারে চলে আসে।

প্রবাদ প্রবচনের বৈশিষ্ট্য[সম্পাদনা]

প্রবাদ-প্রবচনের সংক্ষিপ্ত বাক্যে একটি জাতির নানান বৈশিষ্ট্য লুকিয়ে থাকে। প্রবাদের বৈশিষ্ট্যগুলো নিম্নরূপ:

  • অর্থব্যঞ্জনা: প্রবাদের অর্থ গভীর ও তাৎপর্যময়। এর তীক্ষ্ণ অর্থভেদী মন্তব্য শ্রোতা ও পাঠককে সহজে সচকিত করে তোলে। এর শব্দার্থ নয়, রূপক অর্থই গুরুত্বপূর্ণ।
  • অভিজ্ঞতার নির্যাস: প্রবাদের শক্তিই হলো অভিজ্ঞতা। লোকসমাজের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার সারৎসার থাকে প্রবাদে। যুগের সঞ্চিত অভিজ্ঞতা মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় যোগ হয়।
  • সরল প্রকাশভঙ্গি: প্রবাদ সহজ সরল হওয়ার কারণে তা সহজেই শ্রোতার মনে সাড়া জাগায়। প্রবাদের আলঙ্কারিক গুণ রয়েছে বলে মানুষ তা সহজে ভুলে যায় না। সাধারণত ছন্দ ও অন্ত্যমিলের জন্য বা কখনও উপযুক্ত অনুষঙ্গের জন্য প্রবাদ দীর্ঘদিন মানুষের মনে থাকে। যেমন: অর্থ অনর্থের মূল। কাজের সময় কাজি, কাজ ফুরালে পাজি। ইত্যাদি।

প্রবাদের শ্রেণিবিভাগ[সম্পাদনা]

অর্থদ্যোতকতার দিক বিবেচনা করে প্রবাদকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন:

  1. সাধারণ অভিজ্ঞতামূলক: কান টানলে মাথা আসে, অল্পবিদ্যা ভয়ঙ্করী।
  2. নীতিমূলক: চোরা না শুনে ধর্মের কাহিনী, অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট।
  3. সমালোচনামূলক: উচিত কথায় মামা বেজার।
  4. সামাজিক রীতিবিষয়ক: মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত, অতি লোভে তাঁতি নষ্ট ইত্যাদি।
  5. ব্যঙ্গাত্মক: চোরে চোরে মাসতুতো ভাই, ঠেলার নাম বাবাজি।

বাংলা প্রবাদ-প্রবচন[সম্পাদনা]

এই তালিকায় বাংলা ভাষার সমস্ত প্রবাদ-প্রবচনের উদাহরণ সন্নিবেশিত করা সম্ভব হয়নি। আপনি এই তালিকায় আরো প্রবাদ যুক্ত করে সাহায্য করতে পারেন।
প্রবাদ-প্রবচন অর্থ

[সম্পাদনা]

অতি চালাকের গলায় দড়ি বেশি চালাকি করে অপরকে ঠকালে নিজেকেও বিপদগ্রস্ত হতে হয়।
অতি দর্পে হত লংকা অহংকার করলে পতন অনিবার্য।
অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ ভক্তির আতিশয্যে গোপন উদ্দেশ্য সাধনের প্রয়াস।
অতি লোভে তাঁতি নষ্ট বেশি লোভে আসলই হারাতে হয়।
অনুরোধে ঢেঁকি গেলা অনুরুদ্ধ হয়ে অসম্ভব কাজ সম্পাদন করা।
অনেক/ অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট অকারণে অনেক লোকের অংশগ্রহণে কাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়।
অভাগা যেদিকে যায়, সাগর শুকিয়ে যায় ভাগ্য যার খারাপ, কোনোদিকেই সে আশা দেখতে পায় না।
অভাবে স্বভাব নষ্ট অভাব হলে ভালো মানুষও অসৎ হয়।
অর্থই অনর্থের মূল অর্থ দ্বারাই যত রকমের হাঙ্গামার সৃষ্টি
অল্প বিদ্যা ভয়ঙ্করী অল্প লেখাপড়া জানা ব্যক্তির অতিদর্প।
অল্প শোকে কাতর, অধিক শোকে পাথর বেশি দুঃখে স্তব্ধ হওয়া।
অসারের তর্জন গর্জন সার গুণহীন ব্যক্তির বৃথা আস্ফালন করা।

[সম্পাদনা]

আঙুল ফুলে কলাগাছ অবৈধ পথে দ্রুত উন্নতি লাভ।
আটে পিঠে দড় তবে ঘোড়ায় চড় দক্ষতা নিয়ে কাজ করতে যাওয়া উচিত।
আঠারো মাসে বছর অতিশয় দীর্ঘসূত্রতা।
আদার ব্যাপারীর জাহাজের খবর নিজের অধিকারের বাইরে যাওয়া।
আপন চরকায় তেল দেওয়া নিজের কাজে মন দেওয়া।
আপনি বাঁচলে বাপের নাম নিজের স্বার্থ দেখা।
আপনি ভালো তো জগৎ ভালো নিজে ভালো হলে অন্যরাও ভালো হয়।
আমও গেল ছালাও গেল লাভ করতে গিয়ে সর্বস্ব হারানো।
আলালের ঘরের দুলাল ধনী ঘরের অতি আদরের ও আবদারে ছেলে।

[সম্পাদনা]

ইট মারলে পাটকেল খেতে হয় অন্যের ক্ষতি করলে নিজেরও ক্ষতি হয়।
ইচ্ছা থাকলে উপায় হয় ইচ্ছা থাকলে কাজের উপায় বেরুবেই।

[সম্পাদনা]

উঠন্তি বৃক্ষ পত্তনেই চেনা যায় কাজের আরম্ভটা দেখে কাজের শেষটা বুঝতে পারা।
উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে নির্দোষ ব্যক্তির ওপর দোষী ব্যক্তির অপরাধ পতিত হওয়া।
উলুবনে মুক্তা ছড়ানো অযোগ্য পাত্রে দান করা।
উলটা বুঝলি রাম ভালো কথার মন্দ ব্যাখ্যা করা।
উড়ে এসে জুড়ে বসা অযাচিতভাবে (বিনা অধিকারে) হঠাৎ এসে সর্বেসর্বা হয়ে বসা।

[সম্পাদনা]

ঊনো ভাতে দুনো বল, অতি ভাতে রসাতল পরিমিত আহারে স্বাস্থ্য রক্ষা হয়, অপরিমিত আহারে স্বাস্থ্য নষ্ট হয়।

[সম্পাদনা]

এঁটোপাত না যায় স্বর্গে পরমুখাপেক্ষীর সমৃদ্ধি সম্ভব হয় না।
এক ক্ষুরে মাথা কামানো একরকম অপরাধে অপরাধী হওয়া।
এক ঢিলে দুই পাখি মারা একবারের চেষ্টাতেই উভয় স্বার্থসিদ্ধি করা।
একতাই বল সমষ্টির শক্তিই আসল শক্তি।
এক মাঘে শীত যায় না বিপদাপদ একবারই আসে না।
এক হাতে তালি বাজে না এক পক্ষের দোষে বিবাদ হয় না।
একে নাচনি বুড়ি তাতে পড়েছে ঢোলের বাড়ি ইন্ধন যোগানো।

[সম্পাদনা]

কইয়ের তেলে কই ভাজা যার কাজ তাকে দিয়েই কাজ হাসিল করা।
কত ধানে কত চাল (হয়) কোনো বিষয়ের প্রকৃত অবস্থা বা খবর।
কপালগুণে গোপাল ঠাকুর ভাগ্য ভালো থাকলে অযোগ্য ব্যক্তিও বড়ো হয়।
কপালের লিখন যায় না খণ্ডন ভাগ্যে যা আছে তা ঘটবেই।
কড়িতে বাঘের দুধ মিলে অর্থে দুষ্প্রাপ্য বস্তুও সুলভ হয়।
কষ্ট না করলে কেষ্ট মিলে না পরিশ্রম না-করলে সফলতা পাওয়া যায় না।
কয়লা ধুলে ময়লা যায় না স্বভাবের পরিবর্তন হওয়া কঠিন।
কয়লা যায় না ধুলে, স্বভাব যায় না মলে খারাপ লোক সহজে তার স্বভাব পরিবর্তন করতে পারে না।
কাঁচায় না নোয়ালে বাঁশ পাকলে করে ঠাস ঠাস সময় থাকতে কাজে না-লাগালে অসময়ে আর কাজ হয় না।
কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা এক দুষ্টের বিরুদ্ধে অন্য দুষ্টকে লেলিয়ে দিয়ে উভয়ের বিনাশ সাধন করা।
কাকের মাংস কাকে খায় না স্বজন বা স্বগোত্রের প্রতি অনুরাগ।
কাঙালের কথা বাসি হলে ফলে ছোটো মানুষের সঠিক কথা প্রথমে উপেক্ষিত হলেও পরবর্তীতে ঠিকই সত্য হিসেবে প্রমাণিত হয়।
কাজের বেলায় কাজি কাজ ফুরালে পাজি কাজ করবার জন্য সনির্বন্ধ অনুরোধ করা কিন্তু কাজ শেষ হলে খোঁজখবর না নেওয়া।
কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা ব্যথার উপরে আরও ব্যথা দেওয়া।
কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন কুৎসিতকে বেমানানভাবে সজ্জিত করা হাস্যকর ব্যাপার।
কারো পৌষ মাস কারো সর্বনাশ কারো বিরাট লাভের পাশাপাশি অন্য কারো বিরাট ক্ষতি হওয়া।
কুমিরের সঙ্গে বিবাদ করে পানিতে বাস যার যেখানে প্রভুত্ব সেখানে তার সাথে বিবাদ করে বাস করা যায় না।
কুল রাখি না শ্যাম রাখি উভয় সঙ্কটে পড়া
কেউ মরে বিল ছেঁচে, কেউ খায় কৈ একের পরিশ্রমে অন্যের বিলাসিতা

[সম্পাদনা]

খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি মূলকাজের চেয়ে অনাবশ্যক আড়ম্বর বেশি করা।
খাল কেটে কুমির আনা নিজের দোষে বিপদ ডেকে আনা।
খালি কলসি বাজে বেশি অন্তঃসারশূন্য ব্যক্তি বা বস্তুর বাহ্যিকভাবে তর্জন-গর্জন করা।
খুঁটোর জোরে ভেড়া নাচে শক্তিশালী ব্যক্তির পৃষ্ঠপোষকতায় অযোগ্য ব্যক্তিরও উন্নতি সম্ভব।
খোদার মার দুনিয়ার বার আল্লাহর বিধান অপ্রতিরোধ্য।

[সম্পাদনা]

গোরু মেরে জুতা দান জঘন্য অন্যায় কাজের প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে সামান্য প্রতিদান দেওয়া।
গাইতে গাইতে গায়েন, বাজাতে বাজাতে বায়েন অধ্যবসায়ের ফলে দক্ষতা আসে।
গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল মূর্খ ও অযোগ্য ব্যক্তির নিজে নিজেই নেতা সাজা।
গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল প্রাপ্তির পূর্বেই ভোগের আয়োজন।
গাছে তুলে মই কাড়া কাজে নামিয়ে সরে পড়া।
গাছে না উঠতেই এক কাঁদি কাজ আরম্ভ করার সাথে সাথে ফলের প্রত্যাশা করা।
গাছেরও খায় তলারও কুড়ায় সম্পদের সবটুকুই ভোগ করা।
গেঁয়ো যোগী ভিখ পায় না নিজের দেশে গুণীর কদর নেই।

[সম্পাদনা]

ঘটি ডোবে না, নামে তালপুকুর ক্ষুদ্র ব্যক্তির বড় নাম গ্রহণ।
ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরায় পূর্বে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি সব সময় আতঙ্কগ্রস্ত থাকে।
ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো নিজের খরচায় অপরের স্বার্থ দেখা।
ঘরের শত্রু বিভীষণ যে শত্রু আপনজন।
ঘুঘু দেখেছ ফাঁদ দেখনি চতুর ব্যক্তির প্রতি প্রাপ্ত শাস্তির ইঙ্গিত।
ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাওয়া উপরওয়ালাকে ডিঙিয়ে নিজের স্বার্থ হাসিল করা।

[সম্পাদনা]

চকচক করলেই সোনা হয় না। নকল না খাঁটি, তা চেহারা দেখে বোঝা যায় না।
চাচা আপন প্রাণ বাঁচা নিজের প্রাণ বাঁচিয়ে তারপর অন্য কথা।
চোখে সরষে ফুল দেখা বিপদে পড়ে দিশেহারা হওয়া।
চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে সুযোগ হাতছাড়া হলে মাথায় নানা ফন্দি-ফিকির আসে।
চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনী অসৎ ব্যক্তিকে উপদেশ দিলেও সে সৎ হয় না।
চোরের ধন বাটপাড়ে খায় অসৎ উপায়ে অর্জিত ধন নিজে ভোগ করতে না-পারা।

[সম্পাদনা]

ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো অবহেলার পাত্র কিন্তু কাজের সময় ডাক পড়ে।
ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্ন দেখা সামর্থ্য নেই অথচ প্রাচুর্যের প্রত্যাশা।

[সম্পাদনা]

জলে কুমির ডাঙায় বাঘ দুদিকেই বিপদে পড়া।
জলে বাস করে কুমিরের সঙ্গে বিবাদ পরাক্রমশালীর এলাকায় গিয়ে পরাক্রমশালীর সাথেই বিবাদে জড়িয়ে পড়া
জাতে মাতাল তালে ঠিক দেখতে বেহিসাবি মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে নিজের কাজে হিসাবি।
জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ ছোট-বড় যাবতীয় কাজ।
জোর যার মুল্লুক তার শক্তি থাকলে সবকিছু জয় করা যায়।

[সম্পাদনা]

ঝিকে মেরে বৌকে শেখানো পরোক্ষভাবে তিরস্কার করা।
ঝোপ বুঝে কোপ মারা অবস্থা বুঝে সুযোগ গ্রহণ করা।

[সম্পাদনা]

ঠগ বাছতে গাঁঁ উজাড় যেখানে মন্দের ভাগ বেশি।
ঠেলার নাম বাবাজি চাপে পড়ে কাবু হওয়া।

[সম্পাদনা]

ডুবে ডুবে পানি খাওয়া লোকচক্ষুর অগোচরে কার্যসিদ্ধি করা।

[সম্পাদনা]

ঢাল নেই তলোয়ার নেই নিধিরাম সর্দার শূন্য হাতেই বাহাদুরি করা।
ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে অভ্যাস কখনও বদলায় না।

[সম্পাদনা]

তপ্ত ভাতে নুন জোটে না, পান্তা ভাতে ঘি যার নিত্ত-নৈমিত্তিক প্রয়োজন মেটানোর সামর্থ্য নেই তার বিলাসিতার প্রশ্নই ওঠে না।
তেলা মাথায় তেল দেওয়া যার আছে তাকে আরো দেওয়া।

[সম্পাদনা]

দশে মিলে করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ সকলে মিলেমিশে কাজ করে ব্যর্থ হলেও তাতে লজ্জা নেই।
দশের লাঠি একের বোঝা কোনো কাজ একার পক্ষে করা কঠিন, কিন্তু দশজনের পক্ষে খুব সহজ।
দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা বোঝে না সুযোগের সদ্ব্যবহার না করা।
দুধ-কলা দিয়ে সাপ পোষা সযত্নে দুশমনকে প্রতিপালন করা।
দুষ্টু গরুর চেয়ে শূণ্য গোয়াল ভালো খারাপ জিনিস থাকার চেয়ে না থাকা ভালো।

[সম্পাদনা]

ধরাকে সরা জ্ঞান করা কাউকে গ্রাহ্য না করা।
ধরি মাছ না ছুঁই পানি কিছুমাত্র বেগ না পেতে হয় এমন কৌশলে কার্যসিদ্ধি করা।
ধর্মের ঢাক আপনি বাজে/ ধর্মের কল বাতাসে নড়ে শেষ অবধি সত্য উদঘাটিত হয়।

[সম্পাদনা]

নগর পুড়িলে কি দেবালয় এড়ায়? বিপদে সবার ক্ষতি।
নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো একেবারে না পাওয়ার চেয়ে সামান্য কিছু পাওয়াও ভালো।
নাচতে না জানলে উঠান বাঁকা অকর্মণ্যতার ফলে ব্যর্থতার জন্য অপরকে দোষারোপ করা।
নানা মুনির নানা মত বিভিন্ন লোকের বিভিন্ন মতামত।
নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করা নিজের অনিষ্ট সাধন করেও অপরকে জব্দ করার চেষ্টা করা।
নেড়া দুবার বেলতলায় যায় না মানুষ একবারই ঠকে, বারবার ঠকে না।

[সম্পাদনা]

পরের মাথায় কাঁঠাল ভাঙা অন্যকে কষ্ট দিয়ে নিজের স্বার্থ উদ্ধার করা।
পরের মুখে ঝাল খাওয়া নিজে না বুঝে অন্যের কথায় বিশ্বাস স্থাপন করা।
পাকা ধানে মই দেওয়া সুসম্পাদিত কাজ পণ্ড করা।
পানিতে কুমির ডাঙায় বাঘ দুদিকেই বিপদ, রক্ষার কোনো পথ নেই। (উভয়সংকট)
পাপের ধন প্রায়শ্চিত্তে যায় অসৎ পথে উপার্জিত ধন কুপথে নষ্ট হয়।
পিপীলিকার পাখা গজায় মরিবার তরে ধ্বংসের আগে অনেকের বাড় বাড়ে।
পেটে খেলা পিঠে সয় লাভের আশায় দুঃখকষ্ট সহ্য করা। পাকায় না নোয়ালে বাশ পাকলে করে ঠাস ঠাস

[সম্পাদনা]

ফুলের ঘায়ে মূর্ছা যাওয়া অল্প পরিশ্রমেই ক্লান্ত হওয়া।

[সম্পাদনা]

বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো ছোটখাট ব্যাপারে নিয়মের বাড়াবাড়ি কিন্তু বড় বিষয়ে উদাসীন।
বাঁদরের/ বানরের গলায় মুক্তার মালা যে ভালো জিনিসের কদর বা দাম বোঝে না তাকে ভালো বা দামি জিনিস দেওয়া।
বামন হয়ে চাঁদে হাত অতি ছোট ব্যক্তির বড় আকাড়া।
বামুন গেল ঘর তো লাঙল তুলে ধর উপযুক্ত তদারকির অভাবে নিযুক্ত কর্মীদের কাজে অবহেলা করা।
বিনা মেঘে বজ্রপাত হঠাৎ বিপদ উপস্থিত।
বিষ নাই কুলোপনা চক্কর ক্ষমতাহীন ব্যক্তির মৌখিক আস্ফালন।
বুদ্ধি যার বল তার যার বুদ্ধি আছে তার শক্তিও আছে।
বুদ্ধি যার যশ তার গায়ের জোরের চেয়্ব মেধার জোর বেশি।
বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ বৃদ্ধ ব্যক্তির উন্মাদনা।
বেঁচে থাকলে বাপের নাম নিজেকে বাঁচানোই আগে দরকার, তারপর অব্য কথা।
বেল পাকলে কাকের কী উপভোগ করতে অক্ষম ব্যক্তির পক্ষে উৎকৃষ্ট বস্তুর প্রতি লোভ করা নিষ্ফল।
বোঝার ওপর শাকের আঁটি অনেক বোঝার উপর আরও কিছু চাপানো।

[সম্পাদনা]

ভাঙবে তবু মচকাবে না মনের জোর থাকলে সংকল্প টলে না।
ভিক্ষার চাল কাঁড়া আর আকাঁড়া বিনামূল্যে যা পাওয়া যায় তাতেই লাভ।
ভীমরুলের চাকে খোঁচা দেওয়া প্রতিশোধপরায়ণ জনমণ্ডলীকে উত্তেজিত করা।
ভূতের মুখে রামনাম স্বভাব বিরুদ্ধ কথা বা বাক্য, অসম্ভব ব্যাপার।
ভেড়ার গোয়ালে আগুন লাগা বিপদে প্রতিকারের চেষ্টা নেই অথচ কোলাহল করা হচ্ছে।

[সম্পাদনা]

মরা হাতি লাখ টাকা শক্তিমানদের পতন ঘটলেও তাদের ব্যক্তিত্ব মর্যাদা বহন করে।
মশা মারতে কামান দাগা সামান্য কাজে বড় আয়োজন।
মাছের তেলে মাছ ভাজা নিজে খরচপত্র না করে অন্যের উপর দিয়ে স্বার্থরক্ষা করা।
মাছের মায়ের পুত্রশোক মাছ তার বাচ্চা খেয়ে ফেলে, সেক্ষেত্রে তার পুত্রশোক অস্বাভাবিক।
মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত সীমিত পরিধির মধ্যে বিচরণশীল মানুষ।

[সম্পাদনা]

যত গর্জে তত বর্ষে না আড়ম্বর অনুসারে কার্য হয় না।
যস্মিন দেশে যদাচার যে দেশে যে নিয়ম।
যাকে/ যারে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা যাকে অপছন্দ তার প্রত্যেক কাজই ত্রুটিপূর্ণ মনে হয়।
যার কর্ম তারে সাজে, অন্য লোকের লাঠি বাজে যার যে-কাজ সে কাজ তাকেই মানায়, অন্যে করতে গেলে নানা বিড়ম্বনা সৃষ্টি হয়।
যার বিয়ে তার খোঁজ নেই পাড়াপড়শির ঘুম নেই অকারণে অতিউৎসাহ প্রদর্শন।
যার নুন খাই তার গুণ গাই উপকারীর উপকার করা।
যার লাঠি তার মাটি যার শক্তি আছে সে-ই দখল পায়।
যে করে চক্ষুদান, তারেই কর অপমান উপকারীর উপকার স্বীকার করার পরিবর্তে তাকে অপদস্থ করা।
যে যায় লঙ্কায় সে-ই হয় রাবণ ক্ষমতা লাভ করলে সবাই এক রকম হয়।
যে সয় সে রয় কষ্ট করলে বিনাশ নেই।
যেখানে বাঘের ভয় সেখানে সন্ধ্যা হয় সমস্যা থাকলে ঘুরেফিরে সে সমস্যার মধ্যেই জড়িয়ে পড়া।
যেমন কর্ম তেমন ফল যে যেমন কাজ করে, সে তেমন ফল ভোগ করে।
যেমন বুনো ওল, তেমনি বাঘা তেঁতুল যেমন কঠিন রোগ, তেমনি তীব্র ঔষধ।

[সম্পাদনা]

রথ দেখা কলা বেচা একসাথে দুইটি কাজ করা।
রাখে আল্লাহ মারে কে ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে কেউ ধ্বংস করতে পারে না।

[সম্পাদনা]

লাগে টাকা দেবে গৌরীসেন চাহিবামাত্র যার কাছে টাকা পাওয়া যায় তার সম্পর্কে বলা।
লাথির ঢেঁকি চড়ে ওঠে না পদাঘাতের যোগ্য ব্যক্তি চড় খেয়েও কাজ করে না বা লঘু শাসন মানে না।
লেবু বেশি কচলালে তেতো হয় কোনো কার্যোদ্ধারের জন্য বারংবার অনুরোধ করলে বিরক্তি সৃষ্টি করা হয়।
লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু বেশি লোভ করলে পাপ হয় এবং পাপ করলে ধ্বংস অনিবার্য।
লোম বাছতে কম্বল উজাড় ভালো কিছু নির্বাচন করা কঠিন।

[সম্পাদনা]

শক্তের ভক্ত নরমের যম শক্তিমান লোকের কাছে বিনীত ও বাধ্য থাকে এবং দুর্বলের ওপর অত্যাচার করে এমন।
শাক দিয়ে মাছ ঢাকা জঘন্য অপরাধ গোপনের হাস্যকর চেষ্টা করা।
শুঁড়ির সাক্ষী মাতাল দুষ্টের সহায়ক দুষ্ট লোক।
শুভংকরের ফাঁকি আসল কথা গোপন রেখে ছলনা করা

[সম্পাদনা]

সবুরে মেওয়া ফলে ধৈর্য ধরলে কাজে সাফল্য আসে।
সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড় সময় থাকতে সাবধান হওয়া।
সর্বাঙ্গে ব্যথা ঔষধ দেবো কোথা? সর্বত্র গলদ থাকলে দূর করা যায় না।
সস্তার তিন অবস্থা অল্পমূল্যের জিনিস খারাপ হয়।
সাপের পাঁচ পা দেখা অহঙ্কারে স্ফিত হয়ে ওঠা।
সাপের হাঁচি বেদেয় চেনে প্রকৃত চরিত্র অভিজ্ঞ ব্যক্তিই বুঝতে পারে।
সুখে থাকতে ভূতে কিলায় সুখের মর্যাদা না বুঝে স্বেচ্ছায় দুঃখ বরণ করা।

[সম্পাদনা]

হবুচন্দ্র রাজার গবুচন্দ্র মন্ত্রী অকর্মণ্য ব্যক্তির ততোধিক অযোগ্য দোসর।
হাটে হাঁড়ি ভাঙা গোপন কথা ফাঁস করে দেওয়া।
হাত ঝাড়া দিলে পর্বত ধনাঢ্য ব্যক্তির ধনাধিক্যের নিদর্শন।
হাত দিয়ে হাতি ঠেলা অসম্ভব ব্যাপারকে সম্ভব করার চেষ্টা করা।
হাতি ঘোড়া গেল তল, মশা বলে কত জল বিজ্ঞরা যেখানে ব্যর্থ সেখানে নির্বোধের নাক গলানো।
হাতির পাঁচ পা দেখা অহঙ্কারী ব্যক্তির দাম্ভিক আচরণ।
হাতে নয় ভাতে মারা প্রহার না করে কেবল উপবাসী রেখে দুর্বল করা।
হাতে পাঁজি মঙ্গলবার সাথে সাথে প্রমাণ।
হাতেরও যাবে পাতেরও যাবে একূল ওকূল উভয় কূল হারানো।
হায়রে আমড়া কেবল আঁটি আর চামড়া বাইরে চাকচিক্য ভেতরে শূণ্যতা।

আরো দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. রচনা-সম্ভার, সপ্তম-অষ্টম শ্রেণি, শিক্ষাবর্ষ ২০১২, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ঢাকা, বাংলাদেশ