ধাতু (বাংলা ব্যাকরণ)

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

ব্যাকরণ শাস্ত্রে, ক্রিয়ামূল বলতে ক্রিয়াপদের অবিভাজ্য বা মূল অংশের অন্তর্নিহিত ভাবটির দ্যোতনা [১] করে অথবা বিশ্লেষণ করা যায় না এ রকম যে ক্ষুদ্রতম ধ্বনিসমষ্টি ক্রিয়ার বস্তু বা গুণ বা অবস্থানকে বুঝায়। ক্রিয়ামূলকে ধাতুও বলে। ক্রিয়ামূল বা ধাতু নির্দেশ করতে মূল শব্দের পূর্বে "√" করণী চিহ্ন ব্যবহার করা হয়।

প্রকারভেদ[সম্পাদনা]

ক্রিয়ামূল বা ধাতু প্রধানত তিন প্রকার।

  • মৌলিক ধাতু
    • বাংলা ধাতু
    • সংস্কৃত ধাতু
    • বিদেশি ধাতু
  • সাধিত ধাতু
    • নাম ধাতু
    • প্রযোজক ধাতু বা ণিজন্ত ধাতু
    • কর্মবাচ্যের ধাতু
  • যৌগিক বা সংযোগমূলক ধাতু
    • বিশেষ্যের সাথে যুক্ত হওয়া ধাতু
    • বিশেষণের সাথে যুক্ত হওয়া ধাতু
    • ধ্বন্যাত্মক অব্যয়ের সাথে যুক্ত হওয়া ধাতু

মৌলিক বা সিদ্ধ ধাতু[সম্পাদনা]

যেসকল ধাতুকে ভাঙা বা বিশ্লেষণ করা যায় না তাদের মৌলিক বা সিদ্ধ ধাতু বলে। উদাহরণ: √কর্‌, √চল, √দেখ্‌, √খেল,√পড়, √খা।

উৎস বিবেচনায় মৌলিক ধাতুগুলোকে তিন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়: (ক) বাংলা ধাতু (খ) সংস্কৃত ধাতু এবং (গ) বিদেশি ধাতু

সাধিত ধাতু[সম্পাদনা]

কোনো মৌলিক ধাতু কিংবা নাম শব্দের সাথে প্রত্যয় যুক্ত হয়ে যে ধাতু গঠিত হয় তাকে সাধিত ধাতু বলে। উদাহরণ: √কর + আ = √করা, √দেখ্‌ + আ = √দেখা, √পড়্+আ= √পড়া।

সংযোগমূলক বা যৌগিক ধাতু[সম্পাদনা]

বিশেষ্য ও বিশেষণের সাথে √কর্, √দে, √হ, √পা ইত্যাদি মৌলিক ধাতু যুক্ত হয়ে যে ধাতু গঠন করে তাকে সংযোগমূলক বা যৌগিক ধাতু বলে। উদাহরণ: পূজা কর্‌, রাজি হ, কষ্ট পা, শাস্তি দে।

অন্যান্য ধাতুসমূহ[সম্পাদনা]

নাম ধাতু[সম্পাদনা]

নাম শব্দ অথ্যাৎ বিশেষ্য, বিশেষণ, অব্যয় প্রভৃতি শব্দ কখনও কখনও প্রত্যয়যোগে, কখনওবা প্রত্যয় যুক্ত না হয়ে ক্রিয়ারূপে ব্যবহৃত হয়, এ ধরনের ক্রিয়ার মূলকে নাম ধাতু বলে। উদাহরণ: জুতা > জুতানো, বেত > বেতানো, হাত > হাতানো, বাঁকা > বাঁকানো।

ণিজন্ত বা প্রযোজক ধাতু[সম্পাদনা]

মৌলিক ধাতুর সাথে 'আ' বা 'ওয়া' যুক্ত হয়ে ণিজন্ত বা প্রযোজক ধাতু গঠিত হয়। উদাহরণ: √কর + আ =করা। যা কিছু হারায় গিন্নী। বলেন, "কেষ্টা বেটাই চোর", এখানে হারায় হলো প্রযোজক ধাতু। এটা এক ধরনের সাধিত ধাতু।

ধ্বন্যাত্মক ধাতু[সম্পাদনা]

ধাতুরূপে ব্যবহৃত অনুকার (অনুকার = সাদৃশ্যকরণ, অনুকরণ) ধ্বনিকে ধ্বন্যাত্মক ধাতু বলে। উদাহরণ: ফোঁসা, হাঁপা, মচ্‌মচা, টল্‌টলা।

নঞ্‌র্থক ধাতু[সম্পাদনা]

"অস্তি" বাচক √হ ধাতুর পূর্বে নঞ্‌র্থক 'ন' শব্দের যোগে গঠিত √নহ্‌ ধাতুকে নঞ্‌র্থক ধাতু বলে। উদাহরণ: নহি, নই, নহ, নও, নহে, নয়।

ধাতুর মূল[সম্পাদনা]

শব্দ বা ধাতুর মূলকে প্রকৃতি বলে। সাধারণ অর্থে শব্দের মূল বলতে মৌলিক শব্দকে এবং ধাতুর মূল বলতে সিদ্ধ বা মৌলিক ধাতুকেই বুঝায়। উদাহরণ: "দোকান" শব্দের মূল "দোকান", "ঢাকা" শব্দের মূল "ঢাকা" এবং √লিখ ধাতুর মূল "লিখ্‌", √কর ধাতুর মূল "কর্"।

প্রকৃতি দুই প্রকার। যথা-

১. নাম-প্রকৃতি:[সম্পাদনা]

নাম-প্রকৃতি হলো শব্দের মূল। নাম-প্রকৃতির আগে বা পরে কিছু যোগ না করলেও এগুলো "শব্দ" বলে গণ্য হয়। তবুও ব্যাকরণের সুবিধার্থে বাক্যে ব্যবহার করতে গেলে নাম-প্রকৃতির সাথে বিভিন্ন প্রকার বিভক্তি চিহ্ন যোগ করতে হয়।

২. ক্রিয়া-প্রকৃতি:[সম্পাদনা]

ধাতু-প্রকৃতি বা ক্রিয়া-প্রকৃতি হলো ধাতুর মূল। ধাতু-প্রকৃতি বা ক্রিয়া-প্রকৃতি প্রত্যয় বা বিভক্তিযুক্ত না হয়ে শব্দরূপে ব্যবহৃত হয় না। যে সমস্ত ধাতু শব্দরূপে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়, সেগুলোতে একটি "শূন্য প্রত্যয় (০)" যুক্ত আছে বলে ধরে নেওয়া হয় । উদাহরণ: লিখ্‌, কর্‌ ।

বিভিন্ন ধাতু[সম্পাদনা]

বাংলা ভাষার সমস্ত ধাতুকে ২০টি গণে ভাগ করা হয়েছে। যথা:-

ক্রমিক নং ধাতুগণ উদাহরণ
হ-আদিগণ হ (হওয়া), ল (লওয়া) ইত্যাদি।
খা-আদিগণ খা (খাওয়া), ধা (ধাওয়া), পা (পাওয়া), যা (যাওয়া) ইত্যাদি।
দি-আদিগণ দি (দেওয়া), নি (নেওয়া) ইত্যাদি।
শু-আদিগণ চু (চোঁয়ানো), নু (নোয়ানো), ছু (ছোঁয়া) ইত্যাদি।
কর্-আদিগণ কর্ ( করা), কম্ (কমা), গড় (গড়া), চল (চলা) ইত্যাদি।
কহ্-আদিগণ কহ্ (কহা), সহ্ (সহা), বহ্ (বহা) ইত্যাদি।
কাট্-আদিগণ গাঁথ্, চাল্, আক্, বাঁধ্, কাঁদ্ ইত্যাদি।
গাহ্-আদিগণ চাহ্, বাহ্, নাহ্ (নাহান>স্নান) ইত্যাদি।
লিখ্-আদিগণ কিন্, ঘির্, জিত্, ফির্, ভিড়্, চিন্ ইত্যাদি।
১০ উঠ্-আদিগণ উড়্, শুন্, ফুট্, খুঁজ্, খুল্, ডুব্, তুল্ ইত্যাদি।
১১ লাফা-আদিগণ কাটা, ডাকা, বাজা, আগা (অগ্রসর হওয়া) ইত্যাদি।
১২ নাহা-আদিগণ গাহা ইত্যাদি।
১৩ ফিরা-আদিগণ ছিটা, শিখা, ঝিমা, চিরা ইত্যাদি।
১৪ ঘুরা-আদিগণ উঁচা, লুকা, কুড়া (কুড়াচ্ছে) ইত্যাদি।
১৫ ধোয়া-আদিগণ শোয়া, খোঁচা, খোয়া, গোছা, যোগা ইত্যাদি।
১৬ দৌড়া-আদিগণ পৌঁছা, দৌড়া ইত্যাদি।
১৭ চটকা-আদিগণ সমঝা, ধমকা, কচলা ইত্যাদি।
১৮ বিগড়া-আদিগণ হিচড়া, ছিটকা, সিটকা ইত্যাদি।
১৯ উলটা-আদিগণ দুমড়া, মুচড়া, উপচা ইত্যাদি।
২০ ছোবলা-আদিগণ কোঁচকা, কোঁকড়া, কোদলা ইত্যাদি।

প্রাতিপাদিক[সম্পাদনা]

প্রতিপাদিক হলো বিভক্তিহীন নাম-প্রকৃতি বা সাধিত শব্দ এবং বিভক্তিহীন তবে প্রত্যয়যুক্ত ক্রিয়ামূল বা ক্রিয়া-প্রকৃতি। প্রকৃতির সাথে প্রত্যয়ের যোগে যে শব্দ ও ক্রিয়ামূল গঠিত হয় তার নাম প্রাতিপাদিক। [২]

নাম-প্রাতিপাদিক[সম্পাদনা]

বিভক্তহীন ও প্রত্যয়হীন কিংবা বিভক্তিহীন অথচ প্রত্যয়যুক্ত নাম-প্রকৃতিকে নাম প্রাতিপাদিক বলে। উদাহরণ: দোকান + দার = দোকানদার + কে = দোকানদারকে।

ক্রিয়া-প্রাতিপাদিক[সম্পাদনা]

বিভক্তহীন ও প্রত্যয়যুক্ত ধাতু-প্রকৃতিকে ক্রিয়া-প্রাতিপাদিক বলে। উদাহরণ: কর্‌ + অ = করা + কে = করাকে

টীকা[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. দ্যোতনা= সূচনা, প্রকাশনা
  2. "প্রাতিপাদিক" মানে যা দিয়ে শুরু করা হয়