ধাতু (বাংলা ব্যাকরণ)

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

ক্রিয়ার মূল কিংবা এর যে অবিভাজ্য অংশ এর অন্তর্নিহিত মূল ভাবটির দ্যোতনা (দ্যোতনা=সূচনা, প্রকাশনা) করে, অথবা বিশ্লেষণ করা যায় না এ রকম যে ক্ষুদ্রতম ধ্বনি-সমষ্টি ক্রিয়ার বস্তু বা গুণ বা অবস্থান বুঝায় তাকে ধাতু বলে। যেমন- 'করা' ক্রিয়ার মূল 'কর্‌' একটি ধাতু।

ধাতুর প্রকারভেদ[সম্পাদনা]

ধাতু প্রধানত তিন প্রকার। ধাতুর সম্পর্কিত সব কিছুই তিন প্রকার। যথা :

  • মৌলিক ধাতু
    • বাংলা ধাতু
    • সংস্কৃত ধাতু
    • বিদেশি ধাতু
  • সাধিত ধাতু
    • নাম ধাতু
    • প্রযোজক ধাতু বা ণিজন্ত ধাতু
    • কর্মবাচ্যের ধাতু
  • যৌগিক বা সংযোগমূলক ধাতু
    • বিশেষ্যের সাথে যুক্ত হওয়া ধাতু
    • বিশেষণের সাথে যুক্ত হওয়া ধাতু
    • ধ্বন্যাত্মক অব্যয়ের সাথে যুক্ত হওয়া ধাতু

মৌলিক বা সিদ্ধ ধাতু[সম্পাদনা]

যে সকল ধাতু বিশ্লেষণ করলে কোন প্রত্যয় পাওয়া যায় না বা যারা স্বয়ংসিদ্ধ ধাতু, তাদেরকে মৌলিক ধাতু কিংবা সিদ্ধ ধাতু বলে। যেমন- √কর্‌, √চল, √দেখ্‌।

বাংলা ভাষায় মৌলিক ধাতুগুলোকে তিন শ্রেণিতে ভাগ করা যায়ঃ (ক)বাংলা ধাতু (খ)সংস্কৃত ধাতু এবং (গ)বিদেশি ধাতু

সাধিত ধাতু[সম্পাদনা]

কোন মৌলিক ধাতু কিংবা নাম শব্দের সাথে প্রত্যয় যুক্ত হয়ে যে ধাতু গঠিত হয় তাকে সাধিত ধাতু বলে। যেমন- √কর + আ = √করা, √দেখ্‌ + আ = √দেখা।

সংযোগমূলক বা যৌগিক ধাতু[সম্পাদনা]

বিশেষ্য,বিশেষণ ইত্যাদির সাথে কর্, দে, হ,পা ইত্যাদি মৌলিক ধাতু যুক্ত হয়ে যে ধাতু গঠন করে তাকে সংযোগমূলক বা যৌগিক ধাতু বলে। যেমন- পূজা কর্‌, রাজি হ, কষ্ট পা, শাস্তি দে।

অন্যান্য ধাতুসমূহ[সম্পাদনা]

নাম ধাতু[সম্পাদনা]

নাম শব্দ অথ্যাৎ বিশেষ্য, বিশেষণ, অব্যয় প্রভৃতি শব্দ কখনও কখনও প্রত্যয়যোগে, কখনওবা প্রত্যয় যুক্ত না হয়ে ক্রিয়ারূপে ব্যবহৃত হয়। এ ধরনের ক্রিয়ার মূলকে নাম ধাতু বলে। যেমন- জুতা > জুতানো, বেত > বেতানো, হাত > হাতানো, বাঁকা>বাঁকানো।

ণিজন্ত বা প্রযোজক ধাতু[সম্পাদনা]

মৌলিক ধাতুর সাথে 'আ' বা 'ওয়া' যুক্ত হয়ে ণিজন্ত বা প্রযোজন ধাতু গঠিত হয়। এটা এক ধরনের সাধিত ধাতু। যেমন- _/কর + আ =করা। ''যা কিছু হারায় গিন্নী বলেন, কেষ্টা বেটাই চোর।'', এখানে ''হারায়'' হল প্রযোজক ধাতু।

ধ্বন্যাত্মক ধাতু[সম্পাদনা]

ধাতুরূপে ব্যবহৃত অনুকার (অনুকার = সাদৃশ্যকরণ, অনুকরণ) ধ্বনিকে ধ্বন্যাত্মক ধাতু বলে। যেমন- ফোঁসা, হাঁপা, মচ্‌মচা, টল্‌টলা।

নঞ্‌র্থক ধাতু[সম্পাদনা]

'অস্তি' বাচক 'হ' ধাতুর পূর্বে নঞ্‌র্থক 'ন' শব্দের যোগে গঠিত 'নহ্‌' ধাতুকে নঞ্‌র্থক ধাতু বলে। যেমন- নহি, নই, নহ, নও, নহে, নয়।

প্রকৃতি[সম্পাদনা]

শব্দ বা ধাতুর মূলকে প্রকৃতি বলে। শব্দের মূল বলতে মৌলিক শব্দকে এবং ধাতুর মূল বলতে সিদ্ধ বা মৌলিক ধাতুকেই সাধারণত বুঝায়। যেমন- 'দোকান' শব্দের মূল 'দোকান', 'ঢাকা' শব্দের মূল 'ঢাকা' এবং √লিখ ধাতুর মূল 'লিখ্‌', √কর ধাতুর মূল 'কর,'।

প্রকৃতি দুই প্রকার। যথা-

নাম-প্রকৃতি[সম্পাদনা]

শব্দের মূলকে নাম-প্রকৃতি বলে। নাম-প্রকৃতির আগে বা পরে কিছু যোগ না করলেও এইগলো শব্দ বলে গণ্য হয়। তবুও বাক্যে ব্যবহার করতে গেলে এ নাম-প্রকৃতির সাথে বিভক্তি চিহ্ন যোগ করতে হয়। যেমন- ঢাকা, দোকান।

ক্রিয়া-প্রকৃতি[সম্পাদনা]

ধাতুর মূলকে ধাতু-প্রকৃতি বা ক্রিয়া-প্রকৃতি বলে । ধাতু-প্রকৃতি বা ক্রিয়া-প্রকৃতি প্রত্যয় বা বিভক্তিযুক্ত না হয়ে শব্দরূপে ব্যবহৃত হয় না । যে সমস্ত ধাতু শব্দরূপে ব্যবহৃত হতে দেখা যায় , সেগুলোতে একটি শূন্য প্রত্যয় যুক্ত আছে ব'লে ধ'রে নেওয়া হয় । যেমন: লিখ্‌, কর্‌ ।

বাংলা ধাতুর গণ[সম্পাদনা]

বাংলা ভাষার সমস্ত ধাতুকে ২০টি গণে ভাগ করা হয়েছে। যথা:-

ক্রমিক নং ধাতুগণ উদাহরণ
হ-আদিগণ হ (হওয়া), ল (লওয়া) ইত্যাদি।
খা-আদিগণ খা (খাওয়া), ধা (ধাওয়া), পা (পাওয়া), যা (যাওয়া) ইত্যাদি।
দি-আদিগণ দি (দেওয়া), নি (নেওয়া) ইত্যাদি।
শু-আদিগণ চু (চোঁয়ানো), নু (নোয়ানো), ছু (ছোঁয়া) ইত্যাদি।
কর্-আদিগণ কর্ ( করা), কম্ (কমা), গড় (গড়া), চল (চলা) ইত্যাদি।
কহ্-আদিগণ কহ্ (কহা), সহ্ (সহা), বহ্ (বহা) ইত্যাদি।
কাট্-আদিগণ গাঁথ্, চাল্, আক্, বাঁধ্, কাঁদ্ ইত্যাদি।
গাহ্-আদিগণ চাহ্, বাহ্, নাহ্ (নাহান>স্নান) ইত্যাদি।
লিখ্-আদিগণ কিন্, ঘির্, জিত্, ফির্, ভিড়্, চিন্ ইত্যাদি।
১০ উঠ্-আদিগণ উড়্, শুন্, ফুট্, খুঁজ্, খুল্, ডুব্, তুল্ ইত্যাদি।
১১ লাফা-আদিগণ কাটা, ডাকা, বাজা, আগা (অগ্রসর হওয়া) ইত্যাদি।
১২ নাহা-আদিগণ গাহা ইত্যাদি।
১৩ ফিরা-আদিগণ ছিটা, শিখা, ঝিমা, চিরা ইত্যাদি।
১৪ ঘুরা-আদিগণ উঁচা, লুকা, কুড়া (কুড়াচ্ছে) ইত্যাদি।
১৫ ধোয়া-আদিগণ শোয়া, খোঁচা, খোয়া, গোছা, যোগা ইত্যাদি।
১৬ দৌড়া-আদিগণ পৌঁছা, দৌড়া ইত্যাদি।
১৭ চটকা-আদিগণ সমঝা, ধমকা, কচলা ইত্যাদি।
১৮ বিগড়া-আদিগণ হিচড়া, ছিটকা, সিটকা ইত্যাদি।
১৯ উলটা-আদিগণ দুমড়া, মুচড়া, উপচা ইত্যাদি।
২০ ছোবলা-আদিগণ কোঁচকা, কোঁকড়া, কোদলা ইত্যাদি।

প্রাতিপাদিক[সম্পাদনা]

বিভক্তিহীন নাম-প্রকৃতি বা সাধিত শব্দকে এবং বিভক্তিহীন অথচ প্রত্যয়যুক্ত ধাতু বা ক্রিয়া-প্রকৃতিকে প্রাতিপাদিক বলে। সংক্ষেপে বল্‌লে, প্রকৃতির সাথে প্রত্যয়ের যোগে যে শব্দ বা ধাতু গঠিত হয় তার নাম প্রাতিপাদিক। 'প্রাতিপাদিক' মানে যা দিয়ে শুরু করা হয়।

নাম-প্রাতিপাদিক[সম্পাদনা]

বিভক্তহীন ও প্রত্যয়হীন কংবা বিভক্তিহীন অথচ প্রত্যয়যুক্ত নাম-প্রকৃতিকে নাম প্রাতিপাদিক বলে। যেমন- দোকান + দার = দোকানদার + কে = দোকানদারকে

ক্রিয়া-প্রাতিপাদিক[সম্পাদনা]

বিভক্তহীন ও প্রত্যয়যুক্ত ধাতু-প্রকৃতিকে ক্রিয়া-প্রাতিপাদিক বলে। যেমন- কর্‌ + অ = করা + কে = করাকে

বহি:সংযোগ[সম্পাদনা]