ওয়াল্ট হুইটম্যান

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান
ওয়াল্ট হুইটম্যান
Walt Whitman - George Collins Cox.jpg
ওয়াল্ট হুইটম্যান, ১৮৮৭

ওয়াল্টার "ওয়াল্ট" হুইটম্যান (ইংরেজি: Walter "Walt" Whitman) (৩১ মে, ১৮১৯ – ২৬ মার্চ, ১৮৯২) ছিলেন একজন মার্কিন কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক। মানবতাবাদী হিসেবে প্রসিদ্ধ হুইটম্যান তাঁর রচনায় তুরীয়বাদবাস্তবতাবাদের সম্মিলন ঘটিয়েছিলেন। হুইটম্যান সর্বাধিক প্রভাবশালী মার্কিন কবিদের অন্যতম। তাঁকে মুক্তছন্দের জনকও বলা হয়।[১] তাঁর রচনা সেযুগে যথেষ্ট বিতর্কের সৃষ্টি করে। বিশেষত তাঁর কাব্যসংকলন লিভস অফ গ্রাস মাত্রাতিরিক্ত অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত হয়।

হুইটম্যানের জন্ম লং আইল্যান্ডে। তিনি নিজের কবিতা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে সাংবাদিকতা, শিক্ষকতা, সরকারি করণিক বৃত্তি এবং আমেরিকান গৃহযুদ্ধে স্বেচ্ছাসেবক শুশ্রুষাকারীর কাজও করেন। কর্মজীবনের প্রথম ভাগে তিনি ফ্র্যাঙ্কলিন ইভান্স (১৮৪২) নামে একটি টেম্পারেন্স উপন্যাস রচনা করেন। ১৮৫৫ সালে তিনি নিজের অর্থে তাঁর প্রধান গ্রন্থ লিভস অফ গ্রাস প্রকাশ করেন। এই কাব্যের উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ মানুষের পাঠযোগ্য এক আমেরিকান মহাকাব্য রচনা। ১৮৯২ সালে মৃত্যুর পূর্বাবধি তিনি নানাভাবে এই কাব্যটিকে পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত করেছিলেন। জীবনের শেষ পর্বে একবার হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর তিনি নিউ জার্সির ক্যামডেনে চলে যান। সেখানেই ৭২ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান হয়। তাঁর অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়ায় বহু সাধারণ মানুষ অংশ নেন।[২][৩]

হুইটম্যানের কবিতার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর যৌনপ্রবৃত্তির বিষয়টিও বহু আলোচিত। জীবনীকারদের মধ্যে তাঁর যৌনতাবোধ নিয়ে তর্ক থাকলেও, তিনি সাধারণত সমকামী বা উভকামী হিসেবে বর্ণিত হন।[৪] যদিও কোনো পুরুষের সঙ্গে হুইটম্যানের যৌন অভিজ্ঞতা ছিল কিনা, সে নিয়েও তাঁর জীবনীকারদের মধ্যে মতবিরোধ আছে।[৫] সারাজীবনই হুইটম্যান ছিলেন রাজনীতি সচেতন। তিনি উইলমট প্রোভিসোর সমর্থক ছিলেন এবং সাধারণভাবে দাসত্বপ্রথার বিস্তারের বিরোধিতা করেন। তাঁর কবিতায় জাতিগোষ্ঠীগুলি সম্পর্কে সমতাবাদী সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পাওয়া যায়। এক সময়ে তিনি দাসত্বপ্রথা বিলোপের ডাক দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে দাসত্ববিলোপবাদী আন্দোলনকে তিনি গণতন্ত্রের পক্ষে ক্ষতিকর মনে করতে শুরু করেন।[৬]

জীবন ও সাহিত্যকর্ম[সম্পাদনা]

প্রারম্ভিক জীবন[সম্পাদনা]

১৮১৯ সালের ৩১ মে, লং আইল্যান্ডের টাউন অফ হান্টিংটনের অন্তঃপাতী ওয়েস্ট হিলসে ওয়াল্ট হুইটম্যান জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ও মাতার নাম ছিল ওয়াল্টার ও লুসিয়া ভন ভেলসর হুইটম্যান। তাঁরা কোয়াকার চিন্তাধারার অনুগামী ছিলেন। হুইটম্যান ছিলেন তাঁর পিতামাতার নয় সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয়।[৭] নামকরণের অব্যবহিত পরেই, পিতার নামের সঙ্গে তাঁর নামের পার্থক্য নির্ণয়ের জন্য তাঁর ডাকনাম "ওয়াল্ট" রাখা হয়।[৮] ওয়াল্টার হুইটম্যান সিনিয়র তাঁর সাত পুত্রের মধ্যে তিন জনের নামকরণ করেন মার্কিন নেতা অ্যান্ড্রু জ্যাকসন, জর্জ ওয়াশিংটন ও টমাস জেফারসনের নামানুসারে। তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্রের নাম ছিল জেস এবং এক পুত্র নামকরণের পূর্বেই মাত্র ছয় মাস বয়সে মৃত্যুমুখে পতিত হয়। তাঁর ষষ্ঠ তথা কনিষ্ঠ পুত্রের নাম ছিল এডওয়ার্ড।[৮] চার বছর বয়সে হুইটম্যান তাঁর পরিবারের সঙ্গে ওয়েস্ট হিলস থেকে ব্রুকলিনে চলে আসেন। এখানে আর্থিক কারণে তাঁদের বারংবার বাসস্থান পরিবর্তন করতে হচ্ছিল।[৯] হুইটম্যান তাঁর স্মৃতিচারণাতেও খারাপ আর্থিক অবস্থার দরুন এক অশান্ত ও বিষন্ন ছেলেবেলার ছবি এঁকেছেন।[১০] অবশ্য ছেলেবেলার একটি আনন্দঘন মুহুর্তের কথাও তিনি জানান। ১৮২৫ সালের ৪ জুলাইয়ের অনুষ্ঠানে ব্রুকলিনে একবার তাঁকে শূন্যে তুলে ধরা হয়েছিল এবং সেই সময় মার্কুইস ডে লাফায়েট তাঁর গালে চুমু খান।[১১]

এগারো বছর বয়সে হুইটম্যান প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন।[১২] এরপর তিনি পরিবারের সাহায্যার্থে কাজকর্মের চেষ্টা করতে থাকেন। প্রথমে তিনি দুইজন আইনজীবীর অফিস বয় হিসেবে কাজ করেন। এরপর প্যাট্রিয়ট নামে স্যামুয়েল ই. ক্লিমেন্টস সম্পাদিত লং আইল্যান্ডের সাপ্তাহিক সংবাদপত্রে শিক্ষানবিশি ও ‘পেইন্টার’স ডেভিল’-এর কাজ করেন।[১৩] এখানেই হুইটম্যান প্রিন্টিং প্রেসের কাজ ও টাইপসেটিং শিক্ষা করেন।[১৪] কোনো কোনো সংখ্যার পৃষ্ঠা ভরানোর জন্য এই সময় তিনি কিছু "sentimental bits"-ও রচনা করে থাকবেন।[১৫] ক্লিমেন্টস ও তাঁর দুই বন্ধু এই সময় এলিয়াস হিকসের কবর খুঁড়ে তাঁর মাথাটির প্লাস্টার মল্ড তৈরি করতে গিয়ে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন।[১৬] এর কিছুকাল পরেই ক্লিমেন্টস প্যাট্রিয়ট পত্রিকার কাজ ছেড়ে দেন, সম্ভবত এই বিতর্কের জেরেই।[১৭]

প্রারম্ভিক কর্মজীবন[সম্পাদনা]

হুইটম্যান, ২৮ বছর বয়সে

পরের গ্রীষ্মে হুইটম্যান ব্রুকলিনে এরাস্টাস ওরদিংটন নামে অপর এক প্রিন্টারের হয়ে কাজ করেন।[১৮] সেই বসন্তে তাঁর পরিবার ওয়েস্ট হিলে ফিরে যায়। কিন্তু হুইটম্যান থেকে যান এবং অগ্রণী হুইগ সাপ্তাহিক সংবাদপত্র লং-আইল্যান্ড স্টার-এর সম্পাদক অ্যালডেন স্পুনারের দোকানে একটি কাজ নেন।[১৮] এখানে কাজ করার সময়ই হুইটম্যান স্থানীয় গ্রন্থাগারের একজন নিয়মিত পৃষ্টপোষক হয়ে ওঠেন। এই সময় তিনি শহরের এক বিতর্ক সমিতির সদস্য হন এবং নাট্যাভিনয় দেখা শুরু করেন।[১৯] নিউ ইয়র্ক মিরর পত্রিকায় বেনামে তাঁর প্রথম যুগের কয়েকটি কবিতাও ছাপান।[২০] ১৮৩৫ সালের মে মাসে ষোলো বছর বয়সে তিনি লং-আইল্যান্ড স্টার ও ব্রুকলিন পরিত্যাগ করেন।[২১] চলে আসেন নিউ ইয়র্ক সিটিতে। এখানে তিনি কম্পোসিটরের কাজ শুরু করেন।[২২] অবশ্য জীবনের পরবর্তী পর্বে পৌঁছে তিনি ঠিক কোথায় এই কাজ করতেন, তা স্মরণ করতে পারেননি।[২৩] তিনি অন্য কাজের সন্ধান করতে থাকেন। কিন্তু একটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে সেই অঞ্চলের মুদ্রণ ও প্রকাশন অঞ্চলটি ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ায় তাঁর অন্য কাজ পাওয়া কঠিন হয়ে যায়।[২৩] এর সঙ্গে যুক্ত হয় ১৮৩৭-এর আতঙ্কের ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক দুরবস্থা।[২৪] ১৮৩৬ সালের মে মাসে তিনি তাঁর পরিবারের সঙ্গে যোগ দেন। এঁরা সেই সময় লং আইল্যান্ডের হ্যাম্পস্টেডে বসবাস করছিলেন।[২৫] ১৮৩৮ সালের বসন্ত পর্যন্ত হুইটম্যান এখানে ওখানে স্কুল শিক্ষকতার কাজও করেন। তবে শিক্ষকতার কাজে তিনি বিশেষ তৃপ্তি পাননি।[২৬]

কয়েকবার শিক্ষকতার প্রচেষ্টার পর, হুইটম্যান ফিরে যান নিউ ইয়র্কের হান্টিংটনে। এখানে তিনি নিজের সংবাদপত্র লং আইল্যান্ডার প্রকাশ করেন। হুইটম্যান শুধুমাত্র এই সংবাদপত্রের প্রকাশক, সম্পাদক, মুদ্রক ও বিতরকই ছিলেন না, তিনি তা ঘরে ঘরে পৌঁছেও দিতেন। দশ মাস পর তিনি কাগজটি এ. ও. ক্রোওয়েলকে বিক্রি করে দেন। ক্রোওয়েল ১৮৩৯ সালের ১২ জুলাই তাঁর নিজের প্রথম সংখ্যাটি প্রকাশ করেন।[২৭] হুইটম্যান প্রকাশিত লং-আইল্যান্ডার কাগজটির কোনো কপি আজ আর পাওয়া যায় না।[২৮] ১৮৩৯ সালের গ্রীষ্মে কুইনসের জামাইকায় তিনি জেমস জে. ব্রেন্টন সম্পাদিত লং আইল্যান্ড ডেমোক্র্যাট পত্রিকায় টাইপসেটারের কাজ পান।[২৭] অনতিকাল পরেই তিনি সেই কাজ ছেড়ে দেন এবং ১৮৪০ সালের শীত থেকে ১৮৪১ সালের বসন্ত পর্যন্ত আর একবার শিক্ষকতা করার চেষ্টা করেন।[২৯] এই সময় ১৮৪০ সালের শীত থেকে ১৮৪১ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত তিনটি সংবাদপত্রে তিনি "সান-ডাউন পেপারস—ফ্রম দ্য ডেস্ক অফ আ স্কুলমাস্টার" নামে দশটি সম্পাদয়ীকের একটি সিরিজ প্রকাশ করেন। এই প্রবন্ধগুলিতে তিনি এমন এক চেতনার অভিব্যক্তি ও শৈলী ব্যবহার করেন যা তার সারাজীবনের সাহিত্যকর্মের পরিচায়ক হয়ে ওঠে।[৩০] মে মাসে হুইটম্যান নিউ ইয়র্কে চলে আসেন। প্রথমে তিনি পার্ক বেঞ্জামিন, সিনিয়ররুফুস উইলমট গ্রিসওল্ডের অধীনে নিউ ওয়ার্ল্ড পত্রিকায় একটি ছোটোখাটো কাজ পান।[৩১] এরপর তিনি বিভিন্ন সংবাদপত্রে স্বল্প সময়ের কাজ চালিয়ে যান। ১৮৪২ সালে তিনি অরোরা এবং ১৮৪৬ সাল থেকে ১৮৪৮ সাল পর্যন্ত ব্রুকলিন ইগল পত্রিকা সম্পাদনা করেন।[৩২] সমগ্র ১৮৪০-এর দশক জুড়ে তিনি অনেকগুলি ফ্রিল্যান্স কবিতা ও কথাসাহিত্য নানা পত্রিকায় প্রকাশ করেন।[৩৩] ১৮৪৮ সালে ডেমোক্রেটিক পার্টির রক্ষণশীল বা "হাঙ্কনার্স" শাখার বিরুদ্ধে দলের দাসত্বপ্রথা-বিরোধী "বার্নবার্নার" শাখার পক্ষাবলম্বন করেন। ব্রুকলিন ইগল পত্রিকার মালিক আইজ্যাক ভ্যান অ্যান্ডেন হাঙ্কার শাখার অনুগামী ছিলেন। এর ফলে তিনি পত্রিকায় তাঁর কাজটি খোয়ান।[৩৪] ১৮৪৮ সালে হুইটম্যান ফ্রি সয়েল পার্টির প্রতিষ্ঠা সম্মেলনের একজন ডেলিগেট হন।

পাদটীকা[সম্পাদনা]

  1. Reynolds, 314
  2. Loving, 480
  3. Reynolds, 589
  4. Buckham, Luke. "Walt Whitman's Vision of Liberty", Keene Free Press. October 11, 2006.
  5. Loving, 19
  6. "The Walt WHitman Encyclopedia" 
  7. Miller, 17
  8. Loving, 29
  9. Loving, 30
  10. Reynolds, 24
  11. Reynolds, 33–34
  12. Loving, 32
  13. Reynolds, 44
  14. Kaplan, 74
  15. Callow, 30
  16. Callow, 29
  17. Loving, 34
  18. Reynolds, 45
  19. Callow, 32
  20. Kaplan, 79
  21. Kaplan, 77
  22. Callow, 35
  23. Kaplan, 81
  24. Loving, 36
  25. Callow, 36
  26. Loving, 37
  27. Reynolds, 60
  28. Loving, 38
  29. Kaplan, 93–94
  30. Stacy, 25
  31. Callow, 56
  32. Stacy, 6
  33. Reynolds, 83–84
  34. Stacy, 87–91

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

উইকিসোর্স
উইকিসোর্স-এ এই লেখকের লেখা মূল বই রয়েছে:

Sites