হুয়াংহো নদী

স্থানাঙ্ক: ৩৭°৪৫′৪৭″ উত্তর ১১৯°০৯′৪৩″ পূর্ব / ৩৭.৭৬৩° উত্তর ১১৯.১৬২° পূর্ব / 37.763; 119.162
উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
হুয়াংহো নদী
বা
পীত নদী
Yellow River - panoramio.jpg
হুয়াংহো নদী, সানমেনশিয়া, হনান প্রদেশ
Yellowrivermap.jpg
Map of the Yellow River with approximate borders of its basin.
স্থানীয় নাম黄河 (Huáng Hé)
দেশগণচীন
প্রদেশছিংহাই, সিছুয়ান, কানসু, নিংশিয়া, অন্তর্দেশীয় মঙ্গোলিয়া, শাআনশি, শানশি, হনান, শানতুং
অববাহিকার বৈশিষ্ট্য
মূল উৎসবায়ান হার পর্বতমালা
ইউশু জেলা, ছিংহাই
৪,৮০০ মি (১৫,৭০০ ফু)
৩৪°২৯′৩১″ উত্তর ৯৬°২০′২৫″ পূর্ব / ৩৪.৪৯১৯৪° উত্তর ৯৬.৩৪০২৮° পূর্ব / 34.49194; 96.34028
মোহনাবোহাই সাগর
Kenli District, Dongying, শানতুং
০ মি (০ ফু)
৩৭°৪৫′৪৭″ উত্তর ১১৯°০৯′৪৩″ পূর্ব / ৩৭.৭৬৩° উত্তর ১১৯.১৬২° পূর্ব / 37.763; 119.162
অববাহিকার আকার৭,৫২,৫৪৬ কিমি (২,৯০,৫৬০ মা)
উপনদী
প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য
দৈর্ঘ্য৫,৪৬৪ কিমি (৩,৩৯৫ মা)
নিষ্কাশন
  • সর্বনিম্ন হার:
    ১,০৩০ মি/সে (৩৬,০০০ ঘনফুট/সে)
  • গড় হার:
    ২,৫৭১ মি/সে (৯০,৮০০ ঘনফুট/সে)
  • সর্বোচ্চ হার:
    ৫৮,০০০ মি/সে (২০,০০,০০০ ঘনফুট/সে)
হুয়াংহো নদী
Yellow River (Chinese characters).svg
সরলীকৃত (শীর্ষ) এবং ঐতিহ্যগত (নীচে) চীনা অক্ষরগুলিতে "হুয়াংহো নদী"
চীনা নাম
সরলীকৃত চীনা 黄河
ঐতিহ্যবাহী চীনা 黃河
পোস্টালHwang Ho
তিব্বতি নাম
তিব্বতি རྨ་ཆུ།
মঙ্গোলীয় নাম
মঙ্গোলীয়Хатан гол
Ȟatan Gol
Шар мөрөн
Šar Mörön
গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলিসহ হুয়াংহো নদীর বর্তমান গতিপথ

হুয়াংহো নদী (黃河, ফিনিন:Huáng hé, আ-ধ্ব-ব:[xwǎŋ xɤ̌], এই শব্দ সম্পর্কেশুনুন )[টীকা ১] উত্তর চীনের সর্বপ্রধান নদী। ৫৪৬৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট হুয়াংহো চীনের দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী (ছাং চিয়াং তথা ইয়াং ৎসি চিয়াং নদীর পরেই) ও বিশ্বের ৬ষ্ঠ দীর্ঘতম নদী[১] চীনা ভাষায় হুয়াং হো কথাটির অর্থ "পীত (হলুদ) নদী"। নদীটির পানি কর্দমাক্ত হলুদাভ বলে এই নাম দেওয়া হয়েছে।

হুয়াংহো নদীটি পশ্চিম চীনের ছিংহাই প্রদেশের বায়ান হার পর্বতমালার উত্তরাংশে উৎপত্তিলাভ করে দ্রুত অনেকগুলি গভীর গিরিখাতে পতিত হয়েছে, এরপর মাঝপথে এটি প্রথমে উত্তর-পূর্ব, তারপরে পূর্ব ও সবশেষে দক্ষিণ দিকে একটি বিশাল প্যাঁচ দিয়ে ঘুরে উত্তর-পশ্চিম চীনের ওর্দোস মরুভূমি ও লোয়েস মালভূমির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে (লোয়েস হল এক ধরনের ভঙ্গুর মাটি, যা দিয়ে ঐ মালভূমিটি গঠিত), ফলে বিপুল পরিমাণ হলুদ-বাদামী পলিমাটি বায়ুবাহিত হয়ে বা ধুয়ে নদীতে পড়ে। এই মাঝপথে ফেন নদী ও সর্বপ্রধান উপনদী ওয়েই নদীটি হুয়াংহোর সাথে যুক্ত হয়েছে। মালভূমি থেকে নিচে পতিত হয়ে নদীটি পূর্বদিকে মোড় নিয়ে (হনান প্রদেশের উত্তর ভাগ থেকে) উত্তর চীন সমভূমির মধ্য দিয়ে ও সব মিলিয়ে নয়টি প্রদেশ অতিক্রম করে শানতুং প্রদেশের তুংইং শহরের কাছে প্রশান্ত মহাসাগরের পীত সাগরের পোহাই উপসাগরে পতিত হয়েছে। মোহনা থেকে ৮০ কিলমিটার পর্যন্ত নদীটি একটি জলাভূমি গঠন করেছে। হুয়াংহো নদীর অববাহিকা অঞ্চলটি পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় ১৯০০ কিলোমিটার প্রশস্ত ও উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ১১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ। এটির মোট নিকাশ এলাকার আয়তন প্রায় ৭,৯৫,০০০ বর্গকিলোমিটার (বাংলাদেশের আয়তনের ৫ গুণেরও বেশি)।

হুয়াংহো নদীর পানি অত্যন্ত পলিবহুল, প্রতি ঘনফুট পানিতে প্রায় ১ কিলোগ্রাম পলিমাটি থাকে, যা বিশ্বের সর্বোচ্চ। পলি জমে জমে নদীর তলদেশ ক্রমাগত উত্তোলিত হবার কারণে (কখনও কখনও নদীর তীরের চেয়েও বেশি উঁচু হয়ে যায়) নদীটি এর নিম্নভূমি পর্যায়ে প্রায়শই গতিপথ পরিবর্তন করে (এ পর্যন্ত ২৬ বার) ও বাঁধ উপচে বন্যা ঘটায় (এ পর্যন্ত ১৬০০ বারের বেশি)। বন্যার কারণে দুর্ভিক্ষ-মহামারী হয়ে প্রতিবার বহু লক্ষ চীনা মারা যেত। এ কারণে হুয়াংহোকে "চীনের দুঃখ" বা "অশ্রুর নদী" নামেও ডাকা হয়। হুয়াংহো নদীর প্লাবনের ফলে উর্বর পলিমাটি উত্তর চীনের সমভূমিতে জমা হয়, যার ফলে সেখানে চাষাবাদ অনেক ভালো হয়। এ কারণে বহু হাজার বছর ধরে চীনারা উত্তর চীন সমভূমিতে কৃষিকাজ করে আসছে। হুয়াংহো নদীর তীরে খ্রিস্টপূর্ব ১৭শ শতক নাগাদ একটি বিরাট চীনা সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতকের আগে থাকেই চীনারা হুয়াংহোর বন্যা থেকে রক্ষা পাবার জন্য তীর ঘেঁষে বাঁধ নির্মাণ করা শুরু করে, কিন্তু বাঁধ ভেঙে গেলে বিরাট দুর্যোগের সৃষ্টি হয়। ১৯৫০-এর দশক থেকে চীনা সরকার নদীটির উপরে অনেক বড় বড় বাঁধ বসানো শুরু করে, ফলে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ও কৃষিকাজে ব্যবহারের জন্য পানি ধরে রাখার মতো কাজগুলি সম্ভব হয়েছে।

হুয়াংহো নদীর অববাহিকা প্রাচীন চীনা সভ্যতা এবং এর সূত্র ধরে দূরপ্রাচ্য সভ্যতার আঁতুড়ঘর।[২] একে চীনের মাতৃনদী নামেও ডাকা হয়। এটি চীনের ইতিহাসের প্রথম দিকের সবচেয়ে সমৃদ্ধ অঞ্চল ছিল। চীনের শাআনশি প্রদেশের লানথিয়েন উপজেলাতে হোমো ইরেক্টাস নামের আদি মানবের ফসিল পাওয়া গেছে, যারা আজ থেকে ১১ লক্ষ বছর আগে হুয়াংহো নদীর অববাহিকা অঞ্চলে বাস করত বলে ধারণা করা হয়। চীনা কিংবদন্তী অনুযায়ী চীনা জাতির অন্যতম পূর্বপুরুষ পীত সম্রাট আজ থেকে ৪ হাজার বছর আগে এই নদীর অববাহিকায় হনান প্রদেশের শিনচেং শহরে জন্মগ্রহণ করেন। এরপর তিন হাজার বছর ধরে চীনের ইতিহাসের বেশ কিছু প্রধান রাজবংশ তাদের রাজধানীগুলিকে (বিশেষ করে আন-ইয়াংলুও-ইয়াং) এই অববাহিকায় স্থাপন করে, ফলে অঞ্চলটি চীনদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির একটি কেন্দ্রে পরিণত হয়। এখানেই প্রাচীন চীনের চারটি বিরাট উদ্ভাবন ঘটেছিল: মুদ্রণকৌশল, কাগজ প্রস্তুতি, বারুদ ও দিকনির্ণয় যন্ত্র। সব মিলিয়ে এই নদী ৫ হাজার বছরের পুরনো চীনা সংস্কৃতি ও সভ্যতার জন্মস্থল। নদীশাসনের ফলে যে খাদ্যশস্যের বিরাট বাড়তি হয়, সেটিকে ব্যবহার করে খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতকে ছিন রাজবংশ চীনের সামরিক ও রাজনৈতিক সম্প্রসারণ শুরু করে।

বর্তমানে চীনে নদীটির গুরুত্ব অপরিসীম। নদীটি চীনের ছিংহাই, সিছুয়ান, কানসু , নিংশিয়া, অন্তর্দেশীয় মঙ্গোলিয়া, শাআনশি, শানশি, হনানশানতুং প্রদেশগুলির ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। লানচৌ, ইনছুয়ান, উহাই, পাওথৌ, লুও-ইয়াং, চেংচৌ, খাইফেংচিনান নদীর উপরে অবস্থিত কিছু প্রধান নগরী। এটি চীনের প্রায় ১২% জনসংখ্যা ও ৬০টি শহরে পানি সরবরাহ করে, চীনের প্রায় ১৫% আবাদী জমিতে সেচের পানির যোগান দেয় এবং চীনের মোট জাতীয় উৎপাদনের ১৪% এই নদীর উপর নির্ভরশীল।

চীনের দুঃখ[সম্পাদনা]

হুয়াংহো নদী অর্থাৎ পীতনদীকে "চীনের দুঃখ" বলা হত। প্রাচীন চীনে প্রায়ই হুয়াংহো নদী ছাপিয়ে উঠে সবকিছু বন্যায় ভাসিয়ে দিত বলে এই নদীর নাম ছিল "চিনের দুঃখ"। ইতিহাসে ছাব্বিশবার এই নদীর গতিপথ বদল হয়েছে অতি প্রচন্ডভাবে। এর ফলে প্রত্যেকবারই চীনের জনগণের জীবনে নেমে এসেছে অবর্ণনীয় দুঃখদুদর্শা। নয়া চীন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর চীন সরকার হুয়াংহো নদীর উজানের দিকে ও মধ্য এলাকা বরাবর মৌলিক গুরুত্বসম্পন্ন কতকগুলো জলসংরক্ষণ প্রকল্প নিমার্ণ করেছে এবং ভাটির দিকে নদীর পাড়ের বেড়িগুলোকে আরো মজবুত করেছে। এভাবে বিংশ শতাব্দীতে নদীর তীরবর্তী জনসাধারণের নিরাপত্তা সুরক্ষিত করা হয়েছে।

গুরুত্ব[সম্পাদনা]

হুয়াংহো নদীর অববাহিকার পশুচারণ ভূমি বেশ উর্বর ও খনিজ পদার্থে সমৃদ্ধ। এই নদীর অববাহিকাতে চীনের প্রাচীনতম সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। এ নদীর অববাহিকা চীনের সভ্যতা, ইতিহাস ও সংস্কৃতির লালনাগর।

আলোকচিত্ৰ[সম্পাদনা]

টীকা[সম্পাদনা]

  1. এই ম্যান্ডারিন চীনা ব্যক্তিনাম বা স্থাননামটির বাংলা প্রতিবর্ণীকরণে উইকিপিডিয়া:বাংলা ভাষায় ম্যান্ডারিন চীনা শব্দের প্রতিবর্ণীকরণ শীর্ষক রচনাশৈলী নিদের্শিকাতে ব্যাখ্যাকৃত নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

  1. Yellow River (Huang He) Delta, China, Asia. Geol.lsu.edu (28 February 2000). Retrieved on 2013-02-04.
  2. Little, Archibald John (১৯০৫)। The Far EastClarendon Press। পৃষ্ঠা 53আইএসবিএন 9781108013871