শতরঞ্জি

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

শতরঞ্জি বাংলাদেশের রংপুর অঞ্চলের একটি ঐতিহ্যবাহী কারুপন্য। এর ইতিহাস কয়েক শত বছরের। মূলত আসন, শয্যা ও দেয়াল মাদুর হিসেবে শতরঞ্জি ব্যবহৃত হয়। এ অঞ্চলের মানুষের বিত্ত ও আভিজাত্যের প্রতীক এই শতরঞ্জি। শতরঞ্জি বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম হস্তশিল্পজাত রপ্তানীপন্য। বাংলাদেশ বিশ্বের প্রায় ৫০টির অধিক দেশে শতরঞ্জী রপ্তানী করে থাকে। রংপুরের শতরঞ্জি বাংলাদেশের একটি ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (জিআই)।[১]

রংপুরের শতরঞ্জি (৭'×৫')

ইতিহাস-[সম্পাদনা]

শতরঞ্জির ঐতিহাসিক সূত্র প্রায় কয়েক শত বছরের পুরোনো। স্থানীয় ভাষ্যমতে, মোঘল আমল থেকেই রংপুরে শতরঞ্জি তৈরি হতো। আবার এখানে যারা শতরঞ্জি তৈরিতে নিয়োজিত তারা শুধু বলতে পারেন তাদের পেশা বংশ পরম্পরায় এসেছে। তাদের পিতা-পিতামহরা একই পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। ফলে এটুকু অনুমান করা যায় যে, এ দেশে শতরঞ্জির শেকড় প্রোথিত হয়েছে অনেক আগেই। তবে ১৮৩০ সালে মিস্টার নিসবেত নামক জনৈক ব্রিটিশ কালেক্টর রঙ্গপুর নগরের শহরতলী পীরপুর গ্রামে গিয়ে শতরঞ্জী দেখে মুগ্ধ হন। তিনি শতরঞ্জীর প্রচারে ব্যাপক অবদান রাখেন। তাঁর সম্মানে আজো এলাকাটির নাম নিসবেতগঞ্জ।[২] সেসময় শতরঞ্জি বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পায় এবং বিভিন্ন স্থানে রপ্তানীও হয়। ব্রিটিশ শাসনামলে সমগ্র ভারত, শ্রীলংকা, বার্মা, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া সহ নানা দেশে প্রচুর শতরঞ্জি বিক্রি হতো।[৩] মূলত ভারতবিভাগের পরেই শতরঞ্জি ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে। কিছু পূর্বেও বাংলাদেশে এটি বিলুপ্তপ্রায় হয়ে গিয়েছিল। তবে গত কয়েক দশক ধরে রংপুরের কারুপণ্য নামক সংস্থাটি এই শিল্প বৃহৎ আকারে ফিরিয়ে এনেছে এবং এটি বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম একটি রপ্তানীযোগ্য হস্তশিল্পজাত পণ্য।

বুননশৈলী[সম্পাদনা]

শতরঞ্জির বুননশৈলী সম্পূর্ণ আধুনিকতামুক্ত একটি যান্ত্রিক প্রক্রিয়া। এর মূল উপাদান সুতা। বাঁশ এবং রশি দিয়ে ছোট বড় চরকার মাধ্যমে সুতা দিয়ে টানা প্রস্তত করে প্রতিটি সুতা গণনা করে জ্যামিতিক মাপে হাত দিয়ে গ্রাম্য বুনন শিল্পীরা নিজস্ব মননে নকশা করা শতরঞ্জী তৈরী করেন।[২]

নকশা[সম্পাদনা]

শতরঞ্জি তৈরিতে সাধারণতঃ দুই ধরনের মোটিভ নকশায় ব্যবহার করা হয়। একটি প্রাচীন বা ঐতিহ্যবাহী নকশা এবং অপরটি আধুনিক নকশা। প্রাচীন নকশাগুলো হলো হাতির পা, জাফরি, ইটকাঠি, নাটাই, রাজা-রাণী, দেব-দেবী, প্রজাপতি, ঘুড়ি, নারীর মুখ, রাখাল বালক, কলসী কাঁখে রমণী, বাঘবন্ধি, পালকি, মোড়া ফুল, জামরুল পাতা, রথ পাড়ি, দাবারঘর, লাইট, পৌরাণিক চরিত্র, নবান্ন, পৌষপার্বণ, প্রাকৃতিক দৃশ্য ইত্যাদি।আধুনিক নকশার মধ্যে আছে পুষ্পিতপাতা, পানপাতা, কাবাঘর, মসজিদ-মিনার, মাছ, পাখি, নৌকা, গ্রামের দৃশ্য, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, বুটিদার জরি ও তেরছি নকশা, বিবি রাসেলের উদ্ভাবিত নকশা ইত্যাদি। নকশায় লাল, কালো বা নীল রঙের প্রাধান্য দেয়া হয়। অন্যান্য রঙের সুতাও ব্যবহার করা হয়। শতরঞ্জির নকশা হাতে বুনা হয় যার ফলে দুই পাশ থেকে নকশা দেখতে একই রকম হয় এবং এর কোনো উল্টো-সোজা নেই। [৪]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "জিআই সনদ পেলো আরও ছয় পণ্য, ইত্তেফাক, ১৮ জুন ২০২১"। ১৮ জুন ২০২১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১৮ জুন ২০২১ 
  2. বাংলাদেশ লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা, রংপুর। বাংলা একাডেমী। পৃষ্ঠা 122,123। আইএসবিএন 984-07-5118-2 
  3. "শতরঞ্জি"বাংলাপিডিয়া 
  4. শতরঞ্জির শহরে, মানব জমিন, ১ মে ২০২২