বিষয়বস্তুতে চলুন

বর্ণান্ধতা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
বর্ণান্ধতা
প্রতিশব্দবর্ণান্ধতা, বর্ণবৈকল্য, অস্পষ্ট বর্ণদৃষ্টি[]
ইশিহারা কালার টেস্ট প্লেটের সঠিকভাবে কনফিগার করা কম্পিউটার ডিসপ্লের উদাহরণ, স্বাভাবিক দৃষ্টিভঙ্গি সহ মানুষ "৭৪" সংখ্যাটি দেখতে পারবে। যারা স্বল্প বর্নান্ধ তাঁরা "২১" লেখাটি দেখতে পারেন, কিন্তু যারা সম্পূর্ণ বর্ণান্ধ তাঁরা কোন নম্বরই সম্ভবত দেখতে পাবেন না।
বিশেষত্বচক্ষু চিকিৎসা
লক্ষণবর্ণের দৃশ্যমানতা কমে যাওয়া[]
স্থিতিকালদীর্ঘকালীন[]
কারণজীনগত (বংশগত সাধারণত সেক্স লিঙ্কড জিনের ইনহেরিট্যান্স)[]
রোগনির্ণয়ের পদ্ধতিইশিহারা পরীক্ষা[]
চিকিৎসাশিক্ষণ পদ্ধতির সামঞ্জস্যতা, মোবাইল অ্যাপস[][]
সংঘটনের হারলাল-সবুজ: ৮% পুরুষ, ০.৫% মহিলা (উত্তর ইউরোপীয় বংশদ্ভুত)[]

বর্ণান্ধতা বা বর্ণান্ধত্ব বা বর্ণবৈকল্য[] (ইংরেজি: Color Blindness) হলো মানুষের, কতিপয় রঙ দেখার, শনাক্ত করার বা তাদের মধ্যে পার্থক্য করার অক্ষমতাজনিত এক প্রকার শারীরিক বৈকল্য। সাধারণত প্রতি ১০জন পুরুষে ১জনের এই সমস্যা দেখা যায়।

লক্ষণ ও উপসর্গ

[সম্পাদনা]
লাল এবং সবুজ আপেলের অনুভব স্বাভাবিক দৃষ্টি সম্পন্নের (উপরে) এবং দ্বিবর্ণী (নিচের) যেমন দেখবেন

[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

কানাডার নোভা স্কটিয়ার হ্যালিফ্যাক্সে, উল্লম্ব ট্রাফিক লাইট

প্রায় সব ক্ষেত্রে, বর্ণান্ধ মানুষ নীল-হলুদ বৈষম্য বজায় রাখতে পারে, এবং বেশির ভাগ বর্ণান্ধ ব্যক্তি সম্পূর্ণ দ্বিবর্ণীর পরিবর্তে খাপছাড়া ত্রিবর্ণী হয়। বাস্তবে, এর মানে হল যে তারা প্রায়ই রঙিন স্থানে লাল-সবুজ অক্ষ বরাবর একটি সীমিত বৈষম্য বজায় রাখতে পারে, যদিও এই মাত্রার মধ্যে রং পৃথক করার ক্ষমতা তাদের হ্রাস পায়। বর্ণান্ধত্ব খুব কমই একবর্ণী অন্ধত্বকে বোঝায়।[] Dichromats প্রায়ই লাল এবং সবুজ রঙের বস্তুকে পৃথক করতে বিভ্রান্ত হন। উদাহরণস্বরূপ, সবুজ আপেল থেকে লাল আপেলকে পার্থক্য করা অথবা উদাহরণস্বরূপ, আকৃতি বা অবস্থান ইত্যাদি অন্যান্য সূত্র ছাড়াই ট্র্যাফিক লাইটে সবুজ লাল পার্থক্য করা কঠিন হতে পারে। ডাইক্রোমাটস প্রকৃতি এবং আকৃতির সূত্র ব্যবহার করতে শেখে যাতে সাধারণ দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তিকে ঠকাবার জন্য যে ডিজাইন করা হয়েছে সেই মেশানো রঙের বস্তুকে তফাৎ করতে সক্ষম হতে পারে।[]

কারণ ও বিবরণ

[সম্পাদনা]

বর্ণান্ধতা জন্মগত কিংবা অর্জিত হতে পারে। জন্মগত বর্ণান্ধতার কারণে লাল ও সবুজ রঙয়েই বেশি সমস্যা হয়, আর অর্জিত বর্ণান্ধতার কারণে নীল ও হলুদ রঙ শনাক্ত করতে সমস্যা হয়।[] যেসব কারণে মানুষ বর্ণান্ধ হতে পারে সেগুলো হল:-

  • বংশগত / জন্মগত: (জেনেটিক) মা-বাবা বর্ণান্ধ হলে সন্তানেরাও বর্ণান্ধ হতে পারে। তবে এক্ষেত্রে লক্ষণীয় বিষয়গুলো হল:-
  1. নারীর চেয়ে পুরুষে বর্ণান্ধতা বেশি পরিলক্ষিত হয়
  2. বর্ণান্ধ মায়ের ছেলেসন্তান সবসময় বর্ণান্ধ হয়
  3. মা-বাবার উভয়েই বর্ণান্ধ হলে, তাদের মেয়েসন্তান বর্ণান্ধ হয়
  • লব্ধ / অর্জিত:
  1. চোখের বিভিন্ন রোগ
  2. চোখে আঘাত লাগা
  3. ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া(বাত রোগের জন্য হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইনিন সেবনে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে চোখের রঙ্গিন পিগমেন্ট নষ্ট হয়ে যাওয়া)
  4. ভিটামিন ‘এ’-এর অভাব

চোখ নষ্ট হতে পারে।

প্রজননশাস্ত্র

[সম্পাদনা]

বর্ণান্ধত্ব সাধারণত উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত জেনেটিক ডিসঅর্ডার। এটি উত্তরাধিকারসূত্রে এক্স ক্রোমোজোমের পরিবর্তনের উপর নির্ভর করে পাওয়া যায়। কিন্তু মানুষের জিনোমের ম্যাপিং দেখিয়েছে যে অনেক কারণসূচক পরিব্যক্তি আছে- পরিব্যক্তি বা পরিবর্তন অন্তত ১৯টি বিভিন্ন ক্রোমোজোমের এবং ৫৬টি বিভিন্ন জিনের উৎস থেকে বর্ণান্ধতা ঘটাতে সক্ষম। বর্ণান্ধত্বের উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সবচেয়ে প্রচলিত রূপটি হল প্রোট্যানোমালি (এবং, খুব কমই, প্রোটানোপিয়া- একসঙ্গে দুটি "প্রোট্যানস" হিসাবে অনেকবার পরিচিত) এবং ডিউটেরানোমালি ( আরো কমই, ডিউটেরানোপিয়া - দুটি একসাথে প্রায়ই "ডুউটিন" হিসাবে পরিচিত) ।

বর্ণান্ধতার ব্যাখ্যা

[সম্পাদনা]

মানুষের চোখের ভিতরে রেটিনায় দুই ধরনের আলোকসংবেদী কোষ (photoreceptor) আছে। এরা হল – রডকোষ (rod) এবং কোন্‌কোষ (cone)। কোন্‌কোষ থাকার জন্য আমরা বিভিন্ন রং চিনতে পারি এবং তাদের মধ্যে পার্থক্য করতে পারি। অর্থাৎ আমাদের রঙিন বস্তু দর্শনে কোন্‌কোষগুলো দায়ী। রডকোষগুলো শুধু দর্শনের অনুভূতি জাগায়, কিন্তু কোন ধরনের রং দেখতে/চিনতে সাহায্য করে না।

কোন্ তিন ধরনের। আর এই তিন ধরনের কোন্ লাল (R), সবুজ (G) ও নীল (B) -এই তিনটি মৌলিক রং শনাক্ত করতে পারে। চোখের রেটিনায় এই তিন প্রকারের কোন্-এর যেকোন একটি, দুটি বা সবগুলির অনুপস্থিতি অথবা ত্রুটিই হলো বর্ণান্ধতার মূল কারণ। কোনো ব্যক্তির সবগুলো কোন্ই যদি ত্রুটিযুক্ত হয়, তাহলে তিনি সব রংকেই ধূসর দেখবেন। বর্ণান্ধতা এমনই মারাত্মক হয় যে, কোনো ব্যক্তি লাল রঙের রক্ত দেখলেও তা যে রক্ত, তা শনাক্ত করতে পারে না। []

বর্ণান্ধতা যদি কৈশোরেই নির্ণয় করা যায়, তাহলে অনেক ক্ষেত্রে তা সুস্থ করা সম্ভব হয়। জাপানে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের সময় ছাত্রছাত্রীদের বর্ণদৃষ্টি নির্ণয় করা হয়ে থাকে।[]

প্রকার

[সম্পাদনা]

পরীক্ষা ও অনুসন্ধানে যা দেখা যায় তাঁর উপর ভিত্তি করে, বর্ণান্ধত্ব সম্পূর্ণ বা আংশিক হিসাবে বর্ণিত হতে পারে। সম্পূর্ণ বর্ণান্ধত্বের সংখ্যা, আংশিক বর্ণান্ধত্বের তুলনায় অনেক কম। দুটি প্রধান ধরনের বর্ণান্ধত্ব রয়েছে: যাদের লাল এবং সবুজের মধ্যে পার্থক্য করতে অসুবিধা রয়েছে, এবং যাদের নীল এবং হলুদের মধ্যে পার্থক্য করতে অসুবিধা রয়েছে।

লাল-সবুজ বর্ণান্ধত্ব

[সম্পাদনা]

প্রোটানোপিয়া, ডিউটারনোপিয়া, প্রোটানোমালি, এবং ডিউটারনোমালিটি সাধারণভাবে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া লাল-সবুজ রঙের বর্ণান্ধত্ব যা জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে প্রভাবিত করে। যারা ক্ষতিগ্রস্ত তাঁদের রেটিনার লাল ও সবুজবর্ণের আলোকসংবেদী কোষের(photoreceptor) অনুপস্থিতি বা পরিবর্তনের কারণে লাল সবুজ বর্ণের মধ্যে পৃথকীকরণে সমস্যা থাকে। [][] এটি বংশগত। জন্মসূত্রে লাল-সবুজ রঙের অন্ধত্ব নারীদের তুলনায়, পুরুষকে প্রভাবিত করে অনেক বেশি। কারণ লাল ও সবুজ রং আলোকসংবেদীগুলির জন্য জিনগুলি এক্স ক্রোমোজোমের মধ্যে উপস্থিত থাকে, যা পুরুষের মাত্র একটি এবং নারীর দুটি থাকে। নারী (৪৬, এক্সএক্স), যদি তাদের উভয় এক্স ক্রোমোজোমেই একই রকম অসুবিধার কারণে ত্রুটিপূর্ণ হয় তবেই লাল-সবুজ রঙের অন্ধত্ব হয়, সেখানে পুরুষের (৪৬, এক্স ওয়াই) বর্ণান্ধত্ব হয় যদি তাদের একক এক্স ক্রোমোজোম ত্রুটিপূর্ণ হয়। []

নীল-হলুদ বর্ণান্ধত্ব

[সম্পাদনা]

ট্রাইটানোপিয়া এবং ট্রাইটানোমালি যাঁদের আছে তাঁদের নীলাভ এবং সবুজাভ বর্ণের মধ্যে পৃথকীকরণে অসুবিধা আছে , সেইসাথে হরিদ্রাভ এবং লালচে বর্ণের পৃথকীকরণে অসুবিধা আছে।

ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘ্য সংবেদনশীল কোন সিস্টেমের নিষ্ক্রিয়তা ঘটিত বর্ণান্ধত্ব( যার শোষণ বর্ণালীর শীর্ষে নীলাভ-বেগুনি) ট্রাইটানোপিয়া বলা হয় বা, ঢিলেঢালাভাবে, নীল-হলুদ বর্ণান্ধত্ব।.[১০]

সম্পূর্ণ বর্ণান্ধত্ব

[সম্পাদনা]

সম্পূর্ণ বর্ণান্ধত্বটি কোন রঙ দেখতে অসমর্থতা হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। এটি প্রথাগতভাবে জন্মগত বর্ণান্ধত্ব রোগ বোঝায়(কোণ কোষের একবর্ণিতার থেকে বেশি রড, কোষের একবর্ণিতা)[১১][১২]

লাল-সবুজ বর্ণান্ধত্ব

[সম্পাদনা]
লাল-সবুজ বর্ণান্ধতা প্রকোপ[১৩]
জনসংখ্যা গবেষণা
সংখ্যা
%
আরব জাতি (দ্রুজ) ৩৩৭ ১০.০
অস্ট্রেলীয় আদিবাসী ৪,৪৫৫ ১.৯
বেলজিয়ামবাসী ৯,৫৪০ ৭.৪
বসনিয়াবাসী ৪,৮৩৬ ৬.২
ব্রিটিশ জনগণ ১৬,১৮০ ৬.৬
চীনা ১,১৬৪ ৬.৯
ডাচ ৩,১৬৮ ৮.০
এস্কিমো 297 2.5
ফিজিবাসী ৬০৮ ০.৮
ফরাসি ১,২৪৩ ৮.৬
জার্মান ৭,৮৬১ ৭.৭
হুটু ১,০০০ ২.৯
ভারতীয় (অন্ধ্রপ্রদেশ) ২৯২ ৭.৫
ইরানি ১৬,১৮০ 6.6
জাপানি ২৫৯,০০০ ৪.০
নাভাজো ৫৭১ ২.৩
নরওয়েনিবাসীগণ ৯,০৪৭ ৯.০
মেক্সিকোর অধিবাসী ৫৭১ ২.৩
রাশিয়ান ১,৩৪৩ ৯.২
স্কটিশ ৪৬৩ ৭.৮
সুইস ২,০০০ ৮.০
তিব্বতী ২৪১ ৫.০
সোয়ানা ৪০৭ ২.০
টুট্‌সি ১,০০০ ২.৫
সার্ব ৪,৭৫০ ৭.৪
কঙ্গো প্রজাতন্ত্র ৯২৯ ১.৭

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. 1 2 Gordon, N (মার্চ ১৯৯৮)। "Colour blindness."Public health১১২ (2): ৮১–৪। ডিওআই:10.1038/sj.ph.1900446পিএমআইডি 9581449
  2. 1 2 3 4 5 6 "Facts About Color Blindness"NEI। ফেব্রুয়ারি ২০১৫। ২৮ জুলাই ২০১৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২৯ জুলাই ২০১৬
  3. 1 2 3 "বর্ণান্ধতা:কৈশরেই নির্ণয় প্রয়োজন", ডা. মো: শফিকুল ইসলাম; দৈনিক প্রথম আলো, স্বাস্থ্য কুশল; ১ মে ২০০৫ খ্রিস্টাব্দ। পরিদর্শনের তারিখ: ১ মে ২০০৫ খ্রিস্টাব্দ।
  4. Sembulingam, K.; Sembulingam, Prema (২০১২)। Essentials of Medical Physiology (ইংরেজি ভাষায়)। JP Medical Ltd.। পৃ. ১০০২। আইএসবিএন ৯৭৮৯৩৫০২৫৯৩৬৮। ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত
  5. Morgan, M. J.; Adam, A.; Mollon, J. D. (জুন ১৯৯২)। "Dichromats detect colour-camouflaged objects that are not detected by trichromats"। Proc. Biol. Sci.২৪৮ (1323): ২৯১–৫। ডিওআই:10.1098/rspb.1992.0074পিএমআইডি 1354367
  6. "চোখ আলো ও রঙ", মুহম্মদ জাফর ইকবাল; একটুখানি বিজ্ঞান, ফেব্রুয়ারি ২০০৭; কাকলী প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ৮৩; আইএসবিএন ৯৮৪-৪৩৭-৩৫২-২। পরিদর্শনের তারিখ: ২৬ মার্চ ২০১১ খ্রিস্টাব্দ।
  7. Wong, Bang (২০১১)। "Color blindness"। Nature Methods (6): ৪৪১। ডিওআই:10.1038/nmeth.1618পিএমআইডি 21774112
  8. Neitz, Jay; Neitz, Maureen (২০১১)। "The genetics of normal and defective color vision"Vision Research৫১ (7): ৬৩৩–৫১। ডিওআই:10.1016/j.visres.2010.12.002পিএমসি 3075382পিএমআইডি 21167193
  9. Harrison, G.A.; Tanner, J.M.; Pilbeam, D.R.; Baker, P.T. (১৯৮৮)। Human Biology.। Oxford: Oxford University Press। পৃ. ১৮৩–১৮৭, ২৮৭–২৯০। আইএসবিএন ০-১৯-৮৫৪১৪৪-৯
  10. Goldstein, E. Bruce (২০০৭)। Sensation and perception (7th সংস্করণ)। Wadsworth: Thomson। পৃ. ১৫২আইএসবিএন ৯৭৮-০-৫৩৪-৫৫৮১০-৯
  11. "Types of Colour Blindness"Colour Blind Awareness। ২৯ মে ২০১৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত
  12. Blom, Jan Dirk (২০০৯)। A Dictionary of Hallucinations। Springer। পৃ. ৪। আইএসবিএন ৯৭৮-১-৪৪১৯-১২২২-০। ২৭ ডিসেম্বর ২০১৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত
  13. Harrison, G.A. et al. (1977): Human Biology, Oxford University Press, Oxford, আইএসবিএন ০-১৯-৮৫৭১৬৪-X.