জম্মু ও কাশ্মীর (পূর্বতন করদ রাজ্য)

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

জম্মু ও কাশ্মীরের জন্ম হয়েছিল ১৮৪৬ সালে প্রথম ইঙ্গ-শিখ যুদ্ধএর পর । হেনরি লরেন্সএর পরামর্শে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লর্ড হার্ডিঞ্জ কাশ্মীর উপত্যকাকে তাদের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সংযুক্ত করেন। ইঙ্গ-শিখ যুদ্ধের সময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বিশাল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। সেই ক্ষয় ক্ষতি পুনরুদ্ধার করতে অমৃতসর চুক্তি অনুসারে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কাশ্মীরকে জম্মুর দোগড়া শাসকদের কাছে বিক্রি করা হয় । তখন থেকে শুরু করে অর্থাৎ ১৮৪৬ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত জম্মু ও কাশ্মীর মহারাজা দ্বারা শাসিত একটি দেশীয় রাজ্য ছিল ।

চুক্তি অনুসারে এই রাজ্যের বিস্তার ছিল সিন্ধু নদের পশ্চিম দিক থেকে রাভি নদীর পূর্ব দিক পর্যন্ত এবং আয়তন ছিল প্রায় ৮০৯০০ বর্গ মাইল ( ২১০০০০ বর্গ কিমি) । পরবর্তী কালে হুনযা,নাগার এবং গিল গিট এই রাজ্যের সাথে সংযুক্ত হয় ।

দেশ বিভাজনের সময় তৎকালীন মহারাজা হরি সিং ভারত বা পাকিস্তান কারোর সাথেই যুক্ত না হয়ে স্বাধীনভাবে থাকতে চেয়েছিলেন । তার স্বপ্ন ছিল , ভারত এবং পাকিস্তান উভয়েই তার রাজ্যকে সুইজারল্যান্ড-এর মত একটি স্বাধীন এবং নিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি দেবে।

সৃষ্টি[সম্পাদনা]

জম্মু ও কাশ্মীরের পতাকা (১৮৪৬-১৯৩৬)
জম্মু ও কাশ্মীরের মহারাজার পতাকা (১৮৪৬-১৯৩৬)

দেশীয় রাজ্য হওয়ার আগে কাশ্মীর পাস্তুন দুরানি সাম্রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। পরবর্তীকালে রণজিৎ সিংহ এটিকে শিখ সাম্রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত করেন । জম্মু ছিল তখনকার শিখ সাম্রাজ্যের একটি করদ রাজ্য ।

১৮২২ সালে জম্মুর রাজা কিশোর সিং প্রয়াত হলে শিখেরা উত্তরাধিকারী হিসাবে পুত্র গুলাব সিং কে স্বীকৃতী দেয়। গুলাব সিং প্রাথমিকভাবে শিখেদের অধীনে থেকে তার সাম্রাজ্য বিস্তার শুরু করেন ।

জম্মুর শাসক হিসাবে গুলাব সিং ভদ্রাওয়া দখল করেন, কিন্ত এই অভিযানে ওনাকে সামান্য প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। তারপর তার রাজ্যসীমায় যুক্ত হয় কিস্ত্বার, যার মন্ত্রী ওয়াজির লাখপত তৎকালীন শাসকের সঙ্গে মনমালিন্য হওয়ার জন্য গুলাব সিং-এর সাহায্য প্রার্থনা করেন। গুলাব সিং-এর সৈন্যদলকে আসতে দেখে কিস্ত্বার রাজ বিনাযুদ্ধে আত্মসমর্পণ করেন। কিস্ত্বার অধিগ্রহণ করায় গুলাব সিং লাদাখ অভিমুখী দুটি রাস্তার নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা অর্জন করেন, যা পরবর্তীকালে ওই অঞ্চল জয় করার সময় বিশেষভাবে সাহায্য করেছিল । যদিও সুবিশাল পর্বত এবং হিমবাহ থাকার জন্য গুলাব সিং কে বিশাল সমস্যার মোকাবিলা করতে হয় । গুলাব সিং-এর আধিকারিক জোরওয়ার সিং দোগড়া-দের সহায়তায় দু বারের প্রচেষ্টায় সম্পূর্ণ লাদাখ জয় করেন ।

তার কয়েক বছর পর, ১৮৪০ সালে জেনেরাল জোরওয়ার সিং বালতিস্তান আক্রমণ করেন এবং স্কারদু-র রাজাকে পরাস্ত করেন। ১৮৪১ সালে তিব্বত আক্রমণ করার সময় প্রচণ্ড শীতের প্রকোপে জোরওয়ার সিং-এর প্রায় সমস্ত সৈন্যদলই বিনষ্ট হয় ।

১৮৪৫ সালের শীতকালে ব্রিটিশ এবং শিখদের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয় । ১৮৪৬ সালে সব্রাওন এর যুদ্ধ পর্যন্ত গুলাব সিং নিরপেক্ষ থাকেন, তারপর তিনি একজন মধ্যস্থ এবং স্যর হেনরি লরেন্স-এর বিশ্বস্ত পরামর্শদাতা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন। অবশেষে দুটি চুক্তি হয় । প্রথম চুক্তি অনুসারে লাহোর-কে ব্রিটিশদের হাতে তুলে দেওয়া হয়,দশ মিলিয়ন টাকা মূল্যের বিপাশা ও সিন্ধুর নদের মধ্যবর্তী পার্বত্য রাজ্য নানকশাহীর ক্ষতিপূরণের সমতূল্য হিসাবে; এবং দ্বিতীয় চুক্তি অনুযায়ী ব্রিটিশরা সাড়ে সাত মিলিয়ন টাকার বিনিময়ে সিন্ধু নদের পূর্বে এবং রাভি নদীর পশ্চিমে অবস্থিত সমস্ত পার্বত্য অঞ্চল গুলাব সিং এর কাছ থেকে নিয়ে নেয় ।

তৎকালীন শিখ সাম্রাজ্যের প্রধান সেনাপতি লাল সিং, যিনি পরবর্তীকালে প্রধান মন্ত্রী হয়েছিলেন, কাশ্মীরের শাসনকর্তা ইমামউদ্দিন কে দোগড়াদের প্রতিরোধ করতে অনুরোধ করেছিলেন যারা সদ্য প্রতিষ্ঠিত রাজ্য থেকে শিখদের প্রতিস্থাপন করার চেষ্টা করেছিল । ব্রিটিশরা গুলাব সিং এর সহায়তায় কাশ্মীরের শাসনকর্তা ইমামউদ্দিন কে উৎখাত করে এবং কাশ্মীর ও জম্মুর নতুন মহারাজা হিসাবে গুলাব সিং কে নিযুক্ত করে । এই বিশ্বাসঘাতকতা জন্য লাল সিং কে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ক্রোধের সম্মুখীন হতে হয় । ইমামউদ্দিন ব্রিটিশ এবং গুলাব সিং কে সেইসমস্ত তথ্য পেশ করে যার থেকে জানা যায় যে শিখেরা তাকে দোগড়া সৈন্যদের আক্রমণ করতে পাঠিয়েছিল তখন, যখন সেই সৈন্যদল কাশ্মীর উপত্যকা থেকে শিখ সৈন্যদলকে প্রতিস্থাপন করার জন্য সচেষ্ট হয় । লাল সিং তার পদ থেকে অপসারন এবং পাঞ্জাব অঞ্চলে প্রবেশ করা থেকে নির্বাসিত করা হয়।

প্রশাসন[সম্পাদনা]

মহারাজা[সম্পাদনা]

ক্রম তালিকা নাম অঞ্চল
১. গুলাব সিং ১৮৪৬-১৮৫৭
২. রনবীর সিং ১৮৫৭-১৮৮৫
৩. প্রতাপ সিং ১৮৮৫-১৯২৫
৪. হরি সিং ১৯২৫-১৯৪৭

সম্প্রসারণ[সম্পাদনা]

কিছুদিন পরে হুনযা রাজা, গিল গিট অঞ্চল আক্রমণ করেন । গুলাব সিং এর পক্ষে নাথু শাহ্‌ সৈন্য দলের পুরোভাগে থেকে অভিযান শুরু করেন, কিন্তু তিনি ও তার সমস্ত সৈন্যদল বিপর্যস্ত হয়, এবং গিল গিট হুনযা রাজার হাতে চলে যায় । ষেই সঙ্গে আরও যে জায়গা গুলি হুনযা রাজা অধিগ্রহণ করেন সেগুলি হল পুনিয়াল, ইয়াসিন এবং দারেল l এই সময় মহারাজা আস্তর এবং বালতিস্তান থেকে দু দল সৈন্য পাঠান, কিছুকাল যুদ্ধের পর গিল গিট দুর্গ পুনরুদ্ধার হয় । ১৮৫২ সালে ইয়াসিনের গাউর রহমান নেতৃত্বে দোগড়াদের বিলুপ্তি হয় এবং ষেই সময় থেকে আট বছর পর্যন্ত সিন্ধু নদ মহারাজের সীমানা হিসাবে পরিগণিত হয়।