গ্রুপ (গণিত)

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
এই রুবিক 'স কিউবের হাতের কৌশল রুবিক' স কিউব গ্রুপ তৈরি করে।

গণিতের পরিভাষায় গ্রুপ হল এমন একটি সেট, , যার সাথে একটি বাইনারি অপারেশান ( )যুক্ত আছে বলে বিবেচনা করা হয়, এবং যার উপাদান, গুলো ওই বাইনারি অপারেশান এর স্বাপেক্ষে নির্দিষ্ট কিছু গাণিতিক নিয়ম বা অ্যাক্সিওম মেনে চলে। অ্যাক্সিওম গুলি হলঃ

১. ক্লোজার প্রপার্টি
যেকোনো এর জন্য হবে। অর্থাৎ, থেকে যেকোন দুটি উপাদান নিয়ে তাদের ভেতর বাইনারি অপারেশানটি ঘটালে যা পাওয়া যাবে, তা আসলে এরই একটি উপাদান হবে। এই নিয়মটিকে ইংরেজিতে Closure Property বলা হয়।

২. অ্যাসোসিয়েটিভিটি
যেকোন এর জন্য হবে।

৩. আইডেন্টিটি উপাদানের অস্তিত্ব
এর মধ্যে এমন একটি উপাদান থাকবেই, যার জন্য যেকোন এর ক্ষেত্রে হবে। একটি গ্রুপের আইডেন্টিটি উপাদানটি অনোন্য বা ইউনিক।

৪. ইনভার্স উপাদানের অস্তিত্ব
যেকোন জন্য এমন একটি উপাদান, পাওয়া যাবে, যাতে করে, হয়।

কোন সেট এর উপাদান গুলো এই চারটি অ্যাক্সিওম মেনে চললে সেট-টিকে ওই বাইনারি অপারেশান এর স্বাপেক্ষে গ্রুপ বলা হয়, এবং এটিকে দ্বারা প্রকাশ করা হয়।

গ্রুপের ধারণা[সম্পাদনা]

ওপরের সংজ্ঞা পড়ে গ্রুপ জিনিসটিকে একটু কঠিন মনে হলেও, আসলে এটি ততটা কঠিন নয়। একটি সহজ উদাহরণ এক্ষেত্রে বেশ কাজ করবে। ধরা যাক, আমরা পূর্ণ সংখ্যার সেট নিয়ে গবেষণা করছি এবং বাইনারি অপারেশান হিসেবে প্রথমে যোগ (+) কে বিবেচনা করছি। আমরা দেখব গ্রুপ এর অ্যাক্সিওম গুলো মেনে চলে কিনা।

পূর্ণ সংখ্যার সেট এর উপাদান গুলি হল ... -৩, -২, ০, ১, ২, ৩, ... ইত্যাদি ধণাত্মক ও ঋণাত্মক সকল পূর্ণ সংখ্যা। এদের মধ্যে দুটি বা তিনটি বেছে নাওয়া হল। ধরা যাক সংখ্যা গুলো হলঃ ৫, ৬ ও ৭ । আমরা দেখতে পাচ্ছি, এরা বাইনারি অপারেশান (+) এর ক্ষেত্রে উপরে বর্ণিত Closure Property (অ্যাক্সিওম-১) মেনে চলে। কারন, ৫ + ৬ = ১১ । এই ১১ সংখ্যাটি বাস্তব সংখ্যার সেট-এরই একটি উপাদান।

আবার, ৫ + ( ৬ + ৭ ) = ( ৫ + ৬ ) + ৭ ।
এথেকে বোঝা যায়, ৫ কে ৬ ও ৭ এর সমষ্টির সাথে যোগ করলে যে ফল পাওয়া যায়, ৫ ও ৬ এর সমষ্টির সাথে ৭ কে যোগ করলেও একই ফল পাওয়া যায়। দুই ক্ষেত্রে যোগ করার ক্রম আলাদা হলেও, ফল একই পাওয়া যায়। সুতরাং অ্যাসোসিয়েটিভিটি (অ্যাক্সিওম-২) মেনে চলে।

লক্ষ্য করলে দেখা যায়, (+) এর স্বাপেক্ষে ০ (শূন্য) উপাদানটি এর আইডেন্টিটি উপাদান। কারণ ৫ + ০ = ০ + ৫ = ৫ । ৫ এর পরিবর্তে অন্য যেকোন পূর্ণ সংখ্যার ক্ষেত্রেও এই নিয়ম খাটে । সুতরাং এ আইডেন্টিটি উপাদান আছে এবং তা ইউনিক (অ্যাক্সিওম-৩)

আবার, (+) এর স্বাপেক্ষে -এ ৫ এর জন্য আরেকটি উপাদান (-৫) আছে, যার সাথে ৫ কে যোগ করলে উত্তর হিসেবে আইডেন্টিটি উপাদান (০) পাওয়া যায়।

৫ + (-৫) = (-৫) + ৫ = ০

-৫ ও ৫ সংখ্যা দুটি পরস্পরের ইনভার্স। তেমনি ভাবে ৬, ৭, ৮, ... এর জন্য -৬, -৭, -৮, ... সংখ্যা গুলো ইনভার্স হিসেবে খুজে পাওয়া যায়। সুতরাং, এর সকল উপাদান এর জন্য ইনভার্স উপাদান এর ভেতর রয়েছে (অ্যাক্সিওম-৪)।

তাই বলা যায়, একটি গ্রুপ নির্দেশ করে। একটু ভাবলেই বোঝা যায়, কোন গ্রুপ নয়। কারন সেখানে অ্যাসোসিয়েটিভিটি অ্যাক্সিওমটি কাজ করেনা। ৫-(৬-৭) = ৬, এবং (৫-৬)-৭ = -৮ যারা পরস্পর অসমান। একই ভাবে, -ও কোন গ্রুপ নির্দেশ করেনা। কারন, ৫ এর ইনভার্স উপাদান গুণন অপারেশান-এর স্বাপেক্ষে ১/৫ = ০.২, যা এর ভেতরে নেই।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

গ্রুপের আধুনিক ধারণা গণিতের একক কোন শাখা থেকে জন্মায়নি। গ্রুপ থিওরির একেবারে গোড়ার দিকের কাজ গুলোর উদ্দেশ্যও মোটেও গ্রুপের সংজ্ঞা তৈরি করা-জাতীয় কিছুই ছিলনা। ৪-ডিগ্রী বা তার চাইতে উঁচু ডিগ্রী (ঘাত) সম্পন্ন পলিনোমিয়াল (বহুপদি) সমীকরণের সমাধানের উপায় বের করতে গিয়েই মূলত গ্রুপ থীওরির জন্ম হয়। ঊনবিংশ শতকে ফরাসী তরুণ গণিতবিদ এভারিস্ত গালোয়া একটি বহুপদি সমীকরনকে কিভাবে এর রুট (সমাধান সেটের উপাদান) গুলোর সিমেট্রি গ্রুপের সাহায্যে সমাধান করা যায়, সে সম্পর্কে ধারনা দেন। এই কাজটি ছিল রুফিনী এবং লাগ্রাঞ্জের গবেষণারই একটি পরিবর্ধন। গ্যালওয়া গ্রুপের উপাদান গুলোর সাথে ওই বহুপদির রুট গুলোর কিছু বিন্যাসের সরাসরি সম্পর্ক আছে। প্রথমে গ্যালওয়ার এই কাজ তখনকার গণিত-সমাজে গৃহিত হয়নি। তার জীবদ্দশায় এই কাজ কোথাও প্রকাশিতও হয়নি। পরবর্তিতে কশি গবেষণা করেন বিন্যাস গ্রুপ নিয়ে। ১৮৫৪ সালে ক্যালি তার প্রকাশিত গবেষণাকর্ম, On the theory of groups, as depending on the symbolic equation -এ প্রথম সসীম গ্রুপের সংজ্ঞা দেন।

১৮৭২ সালে ফেলিক্স ক্লাইনের হাত ধরে গ্রুপ থিওরি জ্যামিতিতে প্রবেশ করে। হাইপারবলিক জ্যামিতি এবং প্রজেক্টিভ জ্যামিতি বিকাশ লাভের পর ক্লাইন গ্রুপ থিওরিকে আরো সুবিন্যস্ত উপায়ে ব্যাবহার করেন। এই ধারণা কাজে লাগিয়ে ১৮৮৪ সালে সফাস লী সুচনা করেন গণিতের আরেক বিরাট শাখা - লী গ্রুপ। কণিকা-পদার্থবিদ্যা (Particle Physics) সম্পর্কে জানতে হলে লী গ্রুপের জ্ঞান ছাড়া এখন আর অগ্রসর হওয়া সম্ভব নয়।

নাম্বার থিওরি বা সংখ্যাতত্ত্বও গ্রুপ থিওরির বিকাশে বড় ভুমিকা রেখেছে। কার্ল ফ্রিড‌রিশ গাউস ১৭৯৮ সালে প্রকাশ করেন তাঁর সংখ্যাতত্ত্ব-মূলক কাজ Disquisitiones Arithmeticae। কিছু আবেলীয় গ্রুপ কাঠামো তিনি পরোক্ষ ভাবে এই কাজে ব্যবহার করেন। এই কাঠামো আরো প্রত্যক্ষ ভাবে ব্যবহৃত হয় ক্রনেকারের গবেষণায়। ১৮৪৭ সালে কামার ফের্মার শেষ উপপাদ্য প্রমাণ করতে সচেষ্ট হন। তিনি তাঁর কাজে উৎপাদকে বিশ্লেষণ বর্ণনাকারী গ্রুপ এবং মৌলিক সংখ্যার ভেতর সমন্বয় সাধন করেন।


আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

সাধারণ তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

বিশেষ তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]