ঔদাসীন্যবাদ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

ঔদাসীন্যবাদ হচ্ছে একটি দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি যা অনুসারে, ঈশ্বরের অস্তিত্ব বা অনস্তিত্ব সংক্রান্ত বিষয়ে ব্যক্তির উদাসীন থাকা উচিৎ। একে একটি বিশ্বাস, বিশ্বাস ব্যবস্থা বা দাবীর চাইতে প্রবণতা হিসেবেই অভিহিত করা যায়।[১][২]

ঔদাসীন্যবাদীরা ঈশ্বরের অস্তিত্ব স্বীকার কিংবা অস্বীকার করতে আগ্রহী নয়। ঈশ্বরের অস্তিত্ব নেই এমনভাবেই তারা দিনযাপন করেন এবং যেকোন ঘটনা ঐশ্বরিক নয় বরং প্রাকৃতিকভাবেই সংঘটিত হয় বলে মনে করেন। ঈশ্বরের অস্তিত্ব একেবারে উড়িয়ে দেয়া হয় না বরং তার অস্তিত্ব অদরকারী ও অপ্রয়োজনীয় বলে ধরা হয়।[৩] ঈশ্বর জীবনের লক্ষ্য প্রদসান করেন না কিংবা দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব রাখেন না বলেই মানা হয়।

অন্যভাবে বলা যায়, ঐদাসীন্যবাদীরা স্রষ্টার অস্তিত্বের প্রশ্নকে তাদের জীবনে কোনভাবেই অর্থবহ বলে মনে করেন না। কিছুকিছু ঔদাসীন্যবাদীর মতে, স্রষ্টার অস্তিত্ব প্রমাণ হওয়া কিংবা না হওয়াতে তাদের জীবনযাত্রায় কোন পরিবর্তন রাখবে না বলেই মানেন।[৪]

বিজ্ঞানী ও দার্শনিক ইয়ান ভন হেগনার বলেন, ঔদাসীন্যবাদ হচ্ছে আস্তিক্যবাদ, নাস্তিক্যবাদ ও অজ্ঞেয়বাদের একটি বিকল্প অবস্থান, যা আধুনিক দার্শনিক আলোচনায় এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।[৫] অধ্যাপক ট্রেভর হেগনার ঔদাসীন্যবাদকে ধর্মদর্শনের একটি অনুল্লিখিত অঞ্চল বলে অভিহিত করেছেন।[১]

শব্দের ব্যুৎপত্তি[সম্পাদনা]

"ঔদাসীন্যবাদ" শব্দটি ইংরেজি "Apatheism" (এপাথিজম) এর পারিভাষিক শব্দ। এই এপাথিজম একটি পিন্ডারি শব্দ (portmanteau) যা apathy (এপাথি)theism (থিজম) নিয়ে গঠিত হয়েছে। আইপিএ অনুসারে এর উচ্চারণ হচ্ছে /ˌæpəˈθɪzəm/

প্রকরণ[সম্পাদনা]

ঔদাসীন্যবাদের একটি ধরনে ঈশ্বরের অস্তিত্ব বা অনস্তিত্ব বিষয়ক প্রশ্নকে জীবনের যেকোন বিষয়ে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক বলে মনে করা হয়। এই অবস্থানটি সন্দেহবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ভিন্ন, ঠিক যে দৃষ্টিভঙ্গিতে নাস্তিক্যবাদী বা অজ্ঞেয়বাদীগণ বিষয়টি দেখে থাকেন। নাস্তিক্যবাদী ও অজ্ঞেয়বাদীগণ ঈশ্বরের অস্থিত্ব নিয়ে বা আমাদের পক্ষে ঈশ্বরকে জানা সম্ভব কিনা এই বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন।

নৈতিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক (epistemic) কারণগুলোর জন্য ঈশ্বরের অস্তিত্বের বিষয়কে সরিয়ে রাখা হয় না - গণতান্ত্রিক অথবা অস্তিত্ববাদী (existentia) কারণগুলোর জন্য এই অস্তিত্বের বিষয়টিকে অপ্রয়োজনীয় মনে হয়। এটি গণতান্ত্রিক নীতির একটি বিশ্বায়িতকরণ যেখানে বলা হয়, কোন প্রজাতিতে বা সত্তায় (এদের মধ্যে মহাবিশ্বের বাইরে অবস্থিত এলিয়েন বা কল্পিত ঈশ্বরও পড়ে) কখনও প্রথম এবং দ্বিতীয় শ্রেণী থাকে না। তাই মানুষ জাতিও দ্বিতীয় শ্রেণী নয়। এই ঔদাসীন্যবাদের এই প্রকরণটিতে ঈশ্বর বা দেবতাদের অস্তিত্ব তাই জীবনের তথাকথিত মহান প্রশ্নগুলোর মধ্যে পড়ে না।[৬]

সম্পর্কিত দর্শন[সম্পাদনা]

পদ্ধতিগত প্রকৃতিবাদ[সম্পাদনা]

ব্যবহারিক নাস্তিক্যবাদের উপর বিজ্ঞান সমাজের পদ্ধতিগত প্রকৃতিবাদের প্রভাব রয়েছে। "প্রকৃতিবাদের দর্শন হতে অনুপ্রাণিত এক বৈজ্ঞানিক মতবাদ যা সম্পূর্নভাবে বিশ্বাস কিংবা মেনে নেওয়ার পক্ষপাতী নয়।" [৭]

ঔদাসীন্যবাদীয় অজ্ঞেয়বাদ[সম্পাদনা]

ঔদাসীন্যবাদীয় অজ্ঞেয়বাদ দাবী করে কোন ধরনের তর্কই ঈশ্বর এবং ঐশ্বরিক শক্তির অস্তিত্ব কিংবা অস্তিত্বহীনতার প্রমাণ করতে পারে না। যদি এক বা একাধিক ঈশ্বরের অস্তিত্ব থেকেও থাকে তারা মানবসমাজের ভাগ্য নির্ধারনের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন নয়। অতএব, যেহেতু তাদের অস্তিত্ব মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে কোন প্রভাব নেই তাই ধর্মীয় আগ্রহও ক্ষুদ্রতর হওয়াই বাঞ্ছনীয়।[৮]

ব্যবহারিক নাস্তিক্যবাদ[সম্পাদনা]

ব্যবহারিক নাস্তিক্যবাদ অনুসারে, ব্যক্তিকে ঈশ্বর বা দেবতাদেরকে অবজ্ঞা করে জীবন অতিবাহিত করা উচিৎ। ব্যবহারিক নাস্তিক্যবাদে ঈশ্বর সংক্রান্ত প্রশ্নকে ঔদাসীন্যবাদের মত অপ্রাসঙ্গিক হিসেবে দেখা হয় না।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

১৮শ শতকের ফ্রেঞ্চ দার্শনিক ডেনিস ডিডেরটকে যখন নাস্তিক বলে অভিহিত করা হয় তিনি দাবী করেন যে, ঈশ্বরের অস্তিত্ব কিংবা অস্তিত্বহীনতা নিয়ে তিনি মাথা ঘামান না।

এপাথিস্ট (ঔদাসীন্যবাদী) শব্দটি ২০০০ এর দশক থেকে ব্যবহৃত হওয়া শুরু করেছে। সাংবাদিক জোনাথন রচ নিজেকে ঔদাসীন্যবাদী বলে দাবী করেছেন।

সাধারণ ঔদাসীন্যবাদীয় বিতর্ক[সম্পাদনা]

একজন ঔদাসীন্যবাদী নিজের অবস্থান নিম্নোক্ত পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাখ্যা করতে পারেন কিংবা এসবের সমষ্টিতে ঈশ্বরের ব্যাপারে নিজস্ব চিন্তা প্রকাশ করতে পারেন। 

ধর্মীয় প্রেরণার অভাব[সম্পাদনা]

এই ঔদাসীন্যবাদীয় মতবাদ দাবী করে যে, মানুষের নৈতিকতা সমাজেই বিদ্যমান এবং তা কোন ধর্মের উপর নির্ভরশীল নয়। তাদের মতে, ধর্ম সারা বিশ্বের মানুষকে "সান্তনা" দিতে পারলেও জীবনে নৈতিকতা অক্ষুণ্ণ রাখতে এর কোন প্রয়োজন নেই। এই মতবাদকে "নৈতিক ঔদাসীন্যবাদ" বলে। দ্যা এথিষ্ট এক্সপেরিয়েন্স এর কো-হোস্ট জেফ ডী এই মতবাদ প্রায়শঃই ব্যক্ত করে থাকেন। 

নিস্পৃহতা[সম্পাদনা]

নিস্পৃহতা নির্বিশেষবাদ হিসেবেই বেশি প্রচলিত। এই মতবাদ অনুসারে সকল ধর্ম সমান মর্যাদা রাখে। ক্রিটিক অব পিউর রিজন দিয়ে কান্ট সর্বপ্রথম এই ধারনার জনপ্রীতি ঘটান। কান্ট বিভিন্ন তর্কের মাধ্যমে বোঝাতে চান যে, নির্বিশেষবাদ মূলতঃ সংশয়বাদের মৌলবাদী রূপ এবং  কোন একটি দার্শনিক মতবাদ বিশ্বাসের জন্য যুক্তিসম্মত কারণ নেই।[৯]

প্রমাণের অভাব[সম্পাদনা]

এটি তুলনামূলকভাবে বিজ্ঞানসম্মত মতবাদ যা অন্ধভাবে কোন কিছু বিশ্বাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এই মতবাদ অনুসারে কোন ঐশ্বরিক শক্তির অস্তিত্ব নিজের উপর মানুষের বিশ্বাস চাইলে তা নিজস্ব শক্তি বলেই করাতে পারে। যেহেতু ঐশ্বরিক শক্তি সব কিছুই করতে পারে বলে দাবী করা হয় সেহেতু তা যদি সত্যিই মানুষের বিশ্বাস অর্জন করতে চাইতো , সেটি নিজের শক্তি বলেই কোন অলৌকিক ঘটনাবলে করতে পারতো।  

যেহেতু ঐশ্বরিক ক্ষমতা এমন কোন কাজ করছে না, তাই ঔদাসীন্যবাদীদের মতে ঐশ্বরিক ক্ষমতাবান কোনো অস্তিত্ব থাকলেও তা আসলে মানুষের বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ব্যাপারে সচেতন নয়। আর যতদিন না ঈশ্বর কোন কারণ দেখাচ্ছেন ততদিন ঔদাসীন্যবাদীরাও ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে চিন্তিত নন। রিচার্ড ডকিন্স এখন পর্যন্ত বিভিন্ন ইন্টারভিউয়ে নিজের অবস্থান এভাবেই ব্যাখ্যা করেছেন।[১০]

আরো দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "Apatheism: Should we care whether God exists?"। ৫ আগস্ট ২০১৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮ 
  2. Austin Cline। "Definition of Apatheist" 
  3. Von Hegner, Ian। "Gods and Dictatorships: A Defence of Heroical Apatheism"। Science, Religion and Culture, Vol. 3, Issue 1, 2016। 
  4. Robinson, B.A. (২৯ জানুয়ারি ২০১২)। "Apatheism: 'Does God exist? I don't know & I don't really care'"। Ontario Consultants on Religious Tolerance। সংগ্রহের তারিখ ৬ ডিসেম্বর ২০১২ 
  5. Franklin, Smith and। "Gods and Dictatorships: A Defence of Heroical Apatheism" [স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
  6. Von Hegner, Ian: Gods and Dictatorships: a Defence of Heroical Apatheism, Science, Religion and Culture, Vol. 3, Issue 1, 2016.
  7. Schafersman, Steven D. (ফেব্রুয়ারি ১৯৯৭)। "Naturalism is an Essential Part of Science and Critical Inquiry"। Conference on Naturalism, Theism and the Scientific Enterprise. Department of Philosophy, The University of Texas। সংগ্রহের তারিখ ২০১১-০৪-০৭ 
  8. John Tyrrell (১৯৯৬)। "Commentary on the Articles of Faith"। ২০০৭-০৮-০৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১৮-১২-১৩To believe in the existence of a god is an act of faith. To believe in the nonexistence of a god is likewise an act of faith. There is no verifiable evidence that there is a Supreme Being nor is there verifiable evidence there is not a Supreme Being. Faith is not knowledge. We can only state with assurance that we do not know. 
  9. Rees, D.A. (1954) "Kant, Bayle and Indifferentism," The Philosophical Review, 63(4)
  10. "Ibo et Non Redibo: Thinking Through the Evidence with Richard Dawkins", Adam Hincks, S.J., Feb 1, 2013

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]