অ্যাপোপটোসিস

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
Jump to navigation Jump to search

অ্যাপোপটোসিস গ্রীক শব্দ "ἀπόπτωσις" থেকে এসেছে যার অর্থ পড়ে যাওয়া। মূলত অ্যাপোপটোসিস হলো সুপরিকল্পিতভাবে দেহকোষের মৃত্যু ঘটা যা বহুকোষী প্রাণীর ক্ষেত্রে হয়ে থাকে।[২] প্রাণরাসায়নিক ঘটনাবশত কোষের নানান পরিবর্তন সহ মৃত্যু হয়। কোষীয় প্লাজমা মেমব্রেনের প্রসারিত হয়ে ফুলে যাওয়া, কোষীয় সংকোচন, নিউক্লিয়াসের ভাঙ্গন, ক্রোমাটিনের ঘনত্ব বৃদ্ধি, ক্রোমোজমীয় ডিএনএ এর ভাঙ্গন, গ্লোবাল এমআরএনএ (মেসেঞ্জার আরএনএ) এর ক্ষয় হলো এই সকল পরিবর্তনের মধ্যে অন্যতম। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দেহে গড়ে প্রায় ৫০-৭০ মিলিয়ন (৫-৭ কোটি) কোষ অ্যাপোপটোসিসের কারণে মারা যায়। গড়ে ৮-১৪ বছরের শিশুদের ক্ষেত্রে গড়ে ২০-৩০ মিলিয়ন (২-৩ কোটি) কোষ অ্যাপোপটোসিস প্রক্রিয়ায় মরে।[৪]

অ্যাপোপটোসিস অত্যন্ত সূচারুভাবে নিয়ন্ত্রিত দৈহিক প্রক্রিয়া যা জীবের দেহের জন্য উপকারী এবং এটি আঘাতজনিত কোষীয় মৃত্যু বা পচন (নেক্রোসিস) থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। উদাহরণস্বরূপ, বর্ধিষ্ণু ভ্রূণে অ্যাপোপটোসিসের ফলে দুই আঙ্গুলের মধ্যবর্তী কোষসমূহ মারা যায় বলেই হাত ও পায়ের আঙ্গুলসমূহ আলাদাভাবে তৈরি হয়। অ্যাপোপটোসিসের ফলে কোষ ভেঙ্গে অসংখ্য কোষীয় খন্ড তৈরি হয় যা দ্রুতই ফ্যাগোসাইটিক কোষ গ্রাস করে নিজের অভ্যন্তরে নিয়ে এগুলো অপসারণ করে ফেলে। প্রক্রিয়াটি এত দ্রুত হয় যেন এই খন্ডিত কোষের কোনো অভ্যন্তরীণ অংশ ছাড়া পেয়ে পার্শ্ববর্তী কোষসমূহের সংস্পর্শে এসে তাদের কোনো ক্ষতি করতে না পারে।[৫] নেক্রোসিসে এমন ঘটনা ঘটেনা।

অ্যাপোপটোসিস একটি অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়া যেহেতু একবার শুরু হয়ে গেলে তা আর বন্ধ করা যায়না। অ্যাপোপটোসিস দুইভাবে হতে পারে-

  • অন্তর্নিহিত বা ইনট্রিনসিক অ্যাপোপটোসিসঃ এক্ষেত্রে কোষ নিজেই নিজস্ব দুরবস্থা উপলব্ধি করে নিজেকে মেরে ফেলে।
  • বহির্নিহিত বা এক্সট্রিনসিক অ্যাপোপটোসিসঃ এক্ষেত্রে পার্শ্ববর্তী কোষসমূহের পাঠানো সিগন্যালের কারণে কোষ নিজেকে মেরে ফেলে।

দুই ধরণের প্রক্রিয়াতেই ক্যাসপেজ নামক এক প্রকার প্রোটিয়েজ এনজাইম (যা প্রোটিনকে ভেঙ্গে ফেলে) কার্যকর করে যা কোষকে মেরে ফেলে। দুটো প্রক্রিয়ায়ই প্রথমে প্রারম্ভিক ক্যাসপেজ কার্যকরী হয় এবং পরবর্তীতে সেটি ঘাতক ক্যাসপেজকে সক্রিয় করে তোলে যা কোষীয় প্রোটিনসমূহকে এলোপাতাড়ি ভাবে ভেঙ্গে কোষের মৃত্যু নিশ্চিত করে।

১৯৯০ সালের পর থেকে অ্যাপোপটোসিস নিয়ে গবেষণা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া হিসেবে এর গুরুত্বের পাশাপাশি ত্রুটিপূর্ণ অ্যাপোপটোটিক প্রক্রিয়া নানান রোগ-ব্যাধির জন্যও দায়ী। অতিরিক্ত অ্যাপোপটোসিস যেমন দেহের অবক্ষয় ঘটায়, তেমনি অপর্যাপ্ত অ্যাপোপটোসিসের ফলে অনিয়ন্ত্রিত কোষীয় বিভাজন হয় যা সূচনা করতে পারে ক্যান্সারের। কিছু কিছু ফ্যাক্টর যেমন- ফাস রিসেপ্টর ও ক্যাসপেজ অ্যাপোপটোসিসকে বৃদ্ধি করে, অপরপক্ষে, বিসিএল-২ গোত্রের প্রোটিনসমূহ অ্যাপোপটোসিসের মাত্রা হ্রাস করে।

ব্যুত্‍পত্তি ও আবিস্কারের ইতিহাস[সম্পাদনা]

১৮৪২ সালে জার্মান বিজ্ঞানী কার্ল ভগট প্রথম অ্যাপোপটোসিসের মূলনীতি বর্ণনা করেন। ১৮৮৫ সালে শারীরস্থানবিদ ওয়ালথার ফ্লেমিং এই সুনিয়ন্ত্রিত কোষীয় মৃত্যু প্রক্রিয়ার আরো নিখুঁত বর্ণনা দেন। তবে ১৯৬৫ সালের পূর্বে এটি পুনরায় আলোচনায় আসেনি। ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্র ব্যবহার করে কোষীয় কলা বা টিস্যু পর্যবেক্ষণের সময় ইউনিভার্সিটি অফ কুইন্সল্যান্ডের জন ফক্সটন রস কের দেখতে সমর্থ হন যে, অ্যাপোপটোসিস আঘাত জনিত কোষীয় মৃত্যু থেকে আলাদা।[৬] এ সংক্রান্ত একটি গবেষণাপত্র প্রকাশের পর রস কের কে অ্যালিস্টার আর কুরি এবং অ্যান্ড্রু উইলি (কুরির স্নাতক ছাত্র)[৭] মিলে ইউনিভার্সিটি অফ এডিনবরায় তাদের সাথে যোগ দেয়ার জন্য ডেকে পাঠান। ১৯৭২ সালে তাঁরা তিনজন 'ব্রিটিশ জার্নাল অফ ক্যান্সার' এ একটি অত্যন্ত গুরুত্ববহ নিবন্ধ প্রকাশ করেন।[৮] কের যদিও প্রথমে এই ঘটনাটিকে সুনিয়ন্ত্রিত কোষীয় নেক্রোসিস হিসেবে লিখেছিলেন কিন্তু নিবন্ধটিতে প্রাকৃতিক কোষীয় মৃত্যুকে অ্যাপোপটোসিস আখ্যা দেয়া হয়। কের , উইলিয়াম এবং কুরি মিলে জেমস করম্যাক নামক ইউনিভার্সিটি অফ এডিনবরার গ্রীক ভাষার এক অধ্যাপককে এই অ্যাপোপটোসিস নামকরণের কৃতিত্ব দেন।

তথ্যসূত্রঃ[সম্পাদনা]

[১] [২] [৩] [৪] [৫] [৬] [৭]

[৮]

  1. "Quantitative phase contrast microscopy — label-free live cell imaging and quantification". Phase Holographic Imaging AB.
  2. Green, Douglas (2011). Means to an End: Apoptosis and other Cell Death Mechanisms. Cold Spring Harbor, NY: Cold Spring Harbor Laboratory Press. আইএসবিএন ৯৭৮-০-৮৭৯৬৯-৮৮৮-১.
  3. Alberts, p. 2.
  4. Karam, Jose A. (2009). Apoptosis in Carcinogenesis and Chemotherapy. Netherlands: Springer. আইএসবিএন ৯৭৮-১-৪০২০-৯৫৯৭-৯.
  5. Alberts, Bruce; Johnson, Alexander; Lewis, Julian; Raff, Martin; Roberts, Keith; Walter, Peter (2008). "Chapter 18 Apoptosis: Programmed Cell Death Eliminates Unwanted Cells". Molecular Biology of the Cell (textbook) (5th ed.). Garland Science. p. 1115. আইএসবিএন ৯৭৮-০-৮১৫৩-৪১০৫-৫.
  6. Kerr, JF. (1965). "A histochemical study of hypertrophy and ischaemic injury of rat liver with special reference to changes in lysosomes". Journal of Pathology and Bacteriology. 90 (2): 419–35. doi:10.1002/path.1700900210.
  7. Agency for Science, Technology and Research. "Prof Andrew H. Wyllie – Lecture Abstract". Archived from the original on 2007-11-13. Retrieved 2007-03-30.
  8. Kerr JF, Wyllie AH, Currie AR (August 1972). "Apoptosis: a basic biological phenomenon with wide-ranging implications in tissue kinetics". Br. J. Cancer. 26 (4): 239–57. doi:10.1038/bjc.1972.33. PMC 2008650Freely accessible. PMID 4561027.