ভাইরাস

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

ভাইরাস
Rotavirus Reconstruction.jpg
রোটাভাইরাস
ভাইরাসের শ্রেণীবিন্যাস
গ্রুপ: ১ম–৭ম
গ্রুপ

১ম: ডিএসডিএনএ ভাইরাস
২য়: এসএসডিএসডিএনএ ভাইরাস
৩য়: ডিএসআরএনএ ভাইরাস
৪র্থ: (+)এসএসআরএনএ ভাইরাস
৫ম: (−)এসএসআরএনএ ভাইরাস
৬ষ্ঠ: এসএসআরএনএ-আরটি ভাইরাস
৭ম: ডিএসডিএনএ-আরটি ভাইরাস

মানুষের সাধারণ ঠান্ডার জন্য দায়ী ভাইরাস

ভাইরাস হলো এক প্রকার অতিক্ষুদ্র জৈব কণা বা অণুজীব যারা জীবিত কোষের ভিতরেই মাত্র বংশবৃদ্ধি করতে পারে। এরা এক্যারিওটা শ্রেণির সদস্য ও‌ আণুবীক্ষণিক এবং অকোষীয়।এরা সরলতম জীব।ভাইরাস জৈব রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে গঠিত এবং উপযুক্ত পোষক দেহের অভ্যন্তরে পোষক দেহের জৈব রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করে সংখ্যা বৃদ্ধি করতে সক্ষম । সকল ভাইরাসে এ দুটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান । তাই ভাইরাসকে এক প্রকার জীব হিসেবে বিবেচনা করা হয়।ভাইরাস মানুষ,পশু-পাখি, উদ্ভিদের বিভিন্ন রোগের জন্য দায়ী। এমনকি, কিছু ভাইরাস ব্যাক্টেরিয়ার মধ্যে বংশবৃদ্ধি করে- এদের ব্যাক্টেরিওফেজ (Bacteriophage) বলা হয়।

ভাইরাস ল্যাটিন ভাষা হতে গৃহীত একটি শব্দ। এর অর্থ হল বিষ। আদিকালে রোগ সৃষ্টিকারী যে কোন বিষাক্ত পদার্থকে ভাইরাস বলা হত। বর্তমান কালে ভাইরাস বলতে এক প্রকার অতি ক্ষুদ্র আণুবীক্ষণিক অকোষীয় রোগ সৃষ্টিকারী বস্তুকে বোঝায়। উদ্ভিদ ও প্রাণীর বহু রোগ সৃষ্টির কারণ হল ভাইরাস। ভাইরাস কে জীবাণু না বলে 'বস্তু' বলা হয়। কারণ, জীবদেহ ডিএনএ,আরএনএনিওক্লিক এসিড দিয়ে গঠিত,প্রোটিন তাই ভাইরাস অকোষীয়। [১]

পটভূমি[সম্পাদনা]

হল্যান্ডের প্রাণরসায়নবিদ এডলফ মেয়ার (১৮৮৬) তামাক গাছের মোজাইক নামক ভাইরাস রোগ নিয়ে সর্বপ্রথম কাজ শুরু করেন।স্থানীয়ভাবে রোগটি বান্ট, রাস্ট বা স্মাট নামে পরিচিত ছিল।কারো মধ্যে যাতে বিভ্রান্তি সৃষ্টি না হয় সেজন্য মেয়ার একে টোবাকো মোজাইক (TMV) নামে আখ্যায়িত করেন।রাশিয়ান জীবাণুবিদ দিমিত্রি ইভানোভস্কি (১৮৯২) তামাক গাছের মোজাইক রোগ নিয়ে গবেষণা করে প্রমাণ করেন, রোগাক্রান্ত তামাক পাতার রস ব্যকটেরিয়ারোধক Chamberland filter দিয়ে ফিল্টার করার পরও সুস্থ তামাক গাছে রোগ সৃষ্টি করতে সক্ষম।তখন তিনি এ সিদ্ধান্ত নেন যে, তামাক গাছে রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু ব্যাকটেরিয়া হতে নিঃসৃত কোনো বিষাক্ত পদার্থ কিংবা এর চেয়ে ক্ষুদ্রকায় কোনো জীবাণু। ওলন্দাজ জীবাণুতত্ত্ববিদ মারটিনিয়াস বাইজেরিনিক (১৮৯৮) অনুমান করেন, তামাকের এ রোগের কারণ হয়তো কোনো এক ধরনের সংক্রমণশীল জীবন্ত তরল পদার্থ।তিনিই সর্বপ্রথম এ পদার্থকে ভাইরাস নাম দেন।পরবর্তীতে মার্কিন জীব-রসায়নবিদ ডব্লু এম স্ট্যানলি (১৯৩৫) তামাকের মোজাইক ভাইরাসকে পৃথক করে কেলাসিত করতে সক্ষম হোন। এ অবদানের কারণে তিনি ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দে চিলিতে এফ সি বাউডেন, এন ডব্লু পিরি প বার্নাল টিএমভি (TMV) হতে প্রোটিননিউক্লিক এসিডের সমন্বয়ে গঠিত এক প্রকার তরল স্ফটিকময় পদার্থ উৎপন্ন করতে সক্ষম হোন। ফ্রয়েংকাল -কনরোট ও অন্যান্য গবেষক ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় ভাইরাসের নিউক্লিক এসিডকে প্রোটিন হতে পৃথক করেন এবং প্রমাণ করেন যে, নিউক্লিক এসিডই ভাইরাস রোগের বাহক।

অবস্থান[সম্পাদনা]

উদ্ভিদ, প্রাণী, ব্যাকটেরিয়া , সায়ানোব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক প্রভৃতি জীবদেহের সজীব কোষে ভাইরাস সক্রিয় অবস্থায় অবস্থান করতে পারে। আবার নিষ্ক্রিয় অবস্থায় বাতাস, মাটি, জল ইত্যাদি প্রায় সব জড় মাধ্যমে ভাইরাস অবস্থান করে। কাজেই বলা যায়, জীবজড় পরিবেশ উভয়ই ভাইরাসের আবাস্থল।

আয়তন[সম্পাদনা]

ভাইরাস ব্যাকটেরিয়া থেকে ক্ষুদ্র। ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্র ছাড়া এদের দেখা যায়না। এদের আকার সাধারণত ১০ nm থেকে ৩০০ nm পর্যন্ত হয়ে থাকে। তবে কিছু ভাইরাস এর চেয়েও বড় হতে পারে।সবচেয়ে বড় ভাইরাস'ভ্যাকসিনিয়া'। সবচেয়ে ছোট ভাইরাস 'ফুট অ্যান্ড মাউথ'ভাইরাস।

আকার-আকৃতি[সম্পাদনা]

ভাইরাস সাধারণত নিম্ন লিখিত আকৃতির হয়ে থাকে। গোলাকার, দণ্ডাকার, বর্তুলাকার, সূত্রাকার, পাউরুটি আকার, বহুভুজাক্রিতি, ব্যাঙ্গাচি আকার প্রভৃতি।[১]

গঠন[সম্পাদনা]

ভাইরাসের দেহে কোন নিউক্লিয়াসসাইটোপ্লাজম নেই; কেবল প্রোটিন এবং নিউক্লিক এসিড দিয়ে দেহ গঠিত। কেবলমাত্র উপযুক্ত পোষকদেহের অভ্যন্তরে বংশবৃদ্ধি করতে পারে। এদের অভ্যন্তরীণ তথ্য বহনকারী সূত্রক দুই প্রকারের হতে পারে: ডিএনএ এবং আরএনএ

ভাইরাসের বাইরের প্রোটিন আবরণকে ক্যাপসিড বলা হয়। ক্যাপসিডের গঠন প্রধানত দুই প্রকার, সর্পিলাকার এবং সমবিশতলাকার।ভাইরাস অতি আণুবীক্ষণিক সত্তা। ভাইরাসের গড় ব্যাস ৮-৩০০ ন্যানোমিটার

বংশাণুগত গঠন[সম্পাদনা]

ভাইরাসের প্রজাতিভেদে বংশাণুসমগ্রের আকারও ভিন্ন হয়। এসএসডিএনএ সার্কোভাইরাসের বংশাণুসমগ্র আকারে সবচেয়ে ক্ষুদ্র। Circoviridae পরিবারের এই ভাইরাসের মাত্র দুই প্রোটিন রয়েছে ও বংশাণুসমগ্রের আকার মাত্র দুই কিলোবেস।[২] সবচেয়ে বড় বংশাণুসমগ্রের ভাইরাস হলো প্যান্ডোরাভাইরাস। প্রায় ২৫০০ প্রোটিনের কোড সংবলিত এই ভাইরাসের বংশাণুসমগ্রের আকার প্রায় দুই মেগাবেস। [৩] ভাইরাস বংশাণুর খুব কমই ইন্ট্রোন থাকে আর সেগুলো বংশাণুসমগ্রে এমনভাবে সাজানো থাকে যেন তারা উপরিস্থাপিত বা একে অপরের উপর সুবিন্যস্ত হতে পারে।[৪] সাধারণত, আরএনএ ভাইরাসের বংশাণুসমগ্রের আকার ডিএনএ ভাইরাস অপেক্ষা ছোট হয়। কেননা এই ধরনের ভাইরাসের প্রতিলিপিকরণের সময় বেশি ভ্রান্তি হওয়ার সুযোগ থাকে।

বংশবৃদ্ধি[সম্পাদনা]

ভাইরাস পোষক দেহে বংশবৃদ্ধি করে থাকে। এদের জীবনচক্র দুই প্রকারের হয়ে থাকে:

১. লাইটিক চক্র

২. লাইসোজেনিক চক্র

১. লাইটিক চক্র: ভাইরাস পরজীবী হিসেবে বংশবৃদ্ধি করে তাই এদের বংশবিস্তার প্রক্রিয়া প্রত্যক্ষ করা কঠিন। যে জীবনচক্রে বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে ফাযের (অণুজীব আক্রমণকারী ভাইরাস) অপত্য কোষগুলো শেষ পর্যায়ে ব্যাকটেরিয়াকে বিগলিত করে মুক্ত হয়, সে জীবনচক্রকে লাইটিক চক্র বলে। লাইটিক চক্র সম্পন্নকারী ফাজকে লাইটিক ফাজ বলে। লাইটিক চক্র সাধারণত ব্যাকটেরিওফাযের জীবনচক্রে দেখা যায়। নীচে T2 ভাইরাসের E. coli ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণের ক্ষেত্রে লাইটিক চক্রের ধাপগুলো বর্ণনা করা হল:

  • পৃষ্ঠলগ্ন হওয়া: এ পর্যায়ে T2 ভাইরাস পোষক E. coli ব্যাকটেরিয়ার কোষপ্রাচীরে স্পর্শকতন্তু ও স্পাইক এর সাহায্যে পৃষ্টলগ্ন হয়। E. coli ব্যাকটেরিয়ার কোষপ্রাচীরে ফায প্রোটিনের জন্য রিসেপ্টর সাইড থাকায় রিসেপ্টর সাইডের প্রোটিনের সাথে ফায ক্যাপসিডের স্পর্শক তন্তুর প্রোটিনের রাসায়নিক ক্রিয়ার ফলে ফাযটি ব্যাকটেরিয়ার প্রাচীরে সংযুক্ত হয়ে যায়।
  • অনুপ্রবেশ: পৃষ্টলগ্ন হওয়ার পর ভাইরাসের লেজের স্পাইক থেকে লাইসোজাইম এনজাইম নিঃসৃত হয়। এই এনজাইমের কার্যকারিতায় ব্যাকটেরিয়ার কোষপ্রাচীরের স্তরকে দ্রবীভূত করে সূক্ষ্ণ নালিকার সৃষ্টি করে। এ প্রক্রিয়াকে ড্রিলিং বলে। T2 ভাইরাসের লেজের প্রোটিন আবরণটি বাইরে পড়ে থাকে।
  • প্রোটিন সংশ্লেষণ: ভাইরাসের DNA পোষক কোষে প্রবেশ করার পর ব্যাকটেরিয়া কোষের DNA-এর উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে ও পলিমারেজ এনজাইমের সহায়তায় mRNA উৎপাদরেন মাধ্যমে প্রোটিন তৈরি শুরু করে। এই প্রোটিন পরবর্তীতে ভাইরাসের বহিঃরাবনণ বা খোলস (মাথা ও লেজ) তৈরিতে অংশগ্রহণ করে।
  • বংশাণুসমগ্র তৈরীঃ এ পর্যায়ে পলিমারেজ এনজাইমের সহাতায় ব্যাকটেরিয়ার নিউক্লিওটাইড ব্যবহার করে ভাইরসের DNA অসংখ্য প্রতিরূপ সৃষ্টি করে।
  • একত্রীকরণ ও নির্গমনঃ  এ দশায় বংশাণুসমগ্রগুলি প্রোটিন আবরণের দ্বারা মোড়কের ন্যায় আবৃত হয় এবং অপত্য ভাইরাসের সৃষ্টি করে। অপত্য ভাইরাসের চাপে পোষক ব্যাকটেরিয়ার প্রাচীর বিদীর্ণ হয়ে যায়। ফলে পরিণত ফাজগুলো পেষক কোষের বাইরে নির্গত হয়।

লাইটিক চক্রের মাধ্যমে T2 ব্যাকটেরিওফাজের সংখ্যা বৃদ্ধির সমগ্র প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে লাগে ২০-৩০ মিনিট এবং এ সময়ের মধ্যে প্রায় ২০০ টি নতুন অপত্য ব্যাকটেরিয়ওফাজ সৃষ্টি হয়।

২. লাইসোজেনিক চক্র: এই প্রক্রিয়ায় ভাইরাস ব্যাকটেরিয়ার কোষে তার নিউক্লিক এসিড প্রবেশ করায় ঠিকই, কিন্তু সেটা লাইটিক চক্রের মত কোষকে ভেঙে ফেলে না বা ভাইরাসের কোষের সংখ্যাবৃদ্ধি করে না। এই চক্রে ভাইরাস তার নিউক্লিক এসিড ব্যাকটেরিয়ামের কোষের ডিএনএ এর সাথে যুক্ত করে দেয় এবং ভাইরাল নিউক্লিক এসিড ব্যাকটেরিয়াল ডিএনএ এর সাথে সাথে সংখ্যা বৃদ্ধি করে। যেহেতু এখানে কোষের মৃত্যু ঘটে না, তাই একে বলে মৃদু আক্রমণ। আর যে সব ভাইরাস এই চক্র ব্যবহার করে, তাদের বলে টেমপারেট ফাজ। ল্যামডা ভাইরাস এক ধরনের টেম্পারেট ফাজ, এরা E.coli কে আক্রমণ করে।

রোগ[সম্পাদনা]




তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. উচ্চ মাধ্যমিক জীববিজ্ঞান, প্রথম পত্র (ড. মোহাম্মদ আবুল হাসান)
  2. Belyi VA, Levine AJ, Skalka AM (২০১০)। "Sequences from ancestral single-stranded DNA viruses in vertebrate genomes: the parvoviridae and circoviridae are more than 40 to 50 million years old"Journal of Virology84 (23): 12458–62। ডিওআই:10.1128/JVI.01789-10পিএমআইডি 20861255পিএমসি 2976387অবাধে প্রবেশযোগ্য 
  3. Philippe N, Legendre M, Doutre G, Couté Y, Poirot O, Lescot M, Arslan D, Seltzer V, Bertaux L, Bruley C, Garin J, Claverie JM, Abergel C (২০১৩)। "Pandoraviruses: amoeba viruses with genomes up to 2.5 Mb reaching that of parasitic eukaryotes"। Science341 (6143): 281–86। ডিওআই:10.1126/science.1239181পিএমআইডি 23869018বিবকোড:2013Sci...341..281P 
  4. Brandes, Nadav; Linial, Michal (২১ মে ২০১৬)। "Gene overlapping and size constraints in the viral world"Biology Direct11 (1): 26। ডিওআই:10.1186/s13062-016-0128-3পিএমআইডি 27209091পিএমসি 4875738অবাধে প্রবেশযোগ্য