স্ট্যান্ডস্টিল চুক্তি (ভারত)

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

স্ট্যান্ডস্টিল চুক্তি হলো নতুন রাজ্যগুলোকে একীকরনের পূর্বে ভারতপাকিস্তানের সদ্য স্বাধীন রাজ্য ও ব্রিটিশ ভারতীয় সাম্রাজ্যের মধ্যে সাক্ষরিত চুক্তি। চুক্তিটি উপনিবেশ এবং এক রাজপুত্রের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক ছিলো। এতে উল্লেখ ছিলো যে ব্রিটিশ মুকুট এবং রাজ্যের মধ্যে তখনকার সমস্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা, স্বাক্ষরকারী আধিপত্য (ভারত ও পাকিস্তান) এবং রাজপুত্রের মধ্যে অবিচ্ছিন্ন ও অব্যাহত থাকবে। যতক্ষন না নতুন কোন ব্যবস্থা আসছে। [১]

স্বাধীনতার আগে[সম্পাদনা]

চুক্তির খসড়া ব্রিটিশ ভারত সরকারের রাজনৈতিক বিভাগ দ্বারা ৩ জুন ১৯৪৭ সালে প্রণীত হয়েছিল। চুক্তিতে বিধান করা হয়েছিল যে ব্রিটিশ ক্রাউন এবং স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রের মধ্যে তৎকালীন 'সাধারণ উদ্বেগ' সম্পর্কিত সমস্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা স্বাক্ষরকারী আধিপত্য (ভারত বা পাকিস্তান) এবং রাজ্যের মধ্যে নতুন ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। একটি পৃথক তফসিল সাধারণ উদ্বেগের বিষয়গুলি নির্দিষ্ট করে। আলোচনার সময় ভারতের ভবিষ্যত প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহেরু চুক্তিতে কেবল 'প্রশাসনিক বিষয়' অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। পাকিস্তানের ভবিষ্যত গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ মতামত দিয়েছেলিন যে এটা হওয়া উচিত। [২]

স্ট্যান্ডস্টিল চুক্তিটি একীভূতকরণ দলিল(জম্মু ও কাশ্মীর) থেকে পৃথক ছিল। একই সময়ে স্টেটস ডিপার্টমেন্ট দ্বারা প্রণীত এটি একটি আইনি দলিল যা নির্দিষ্ট পরিমাণে সার্বভৌমত্বের আত্মসমর্পণে জড়িত। [১]

উভয় চুক্তির খসড়া ২৫শে জুলাই জুলাই চেম্বার অফ প্রিন্সেসে উপস্থাপিত হয়েছিল। উভয় চুক্তি নিয়ে আলোচনা করার জন্য দশজন শাসক এবং বারোজন মন্ত্রীর সমন্বয়ে একটি স্টেট নেগোসিয়েটিং কমিটি গঠন করা হয়েছিল। আলোচনার পর, কমিটি উভয় চুক্তির খসড়া ৩১শে জুলাই চূড়ান্ত করেছে। [৩]

রাজপরিবারের কিছু সদস্য কিছু সময় নিয়ে বলেছিলেন তারা চুক্তিতে সাক্ষর করবেন তবে একীভূতকরন দলিলে সাক্ষর করবেন না চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্বে। তখন ভারত সরকার সিদ্ধান্ত নেয় তারা তারা চুক্তিটি শুধুমাত্র সেইসব রাজ্যের সাথে করবে যারা অনুসরণ করছে। [৪] ১৫ই আগস্ট ১৯৪৭, ভারতের স্বাধীনতার দিন। ৪ টি রাজপদ ছাড়া বাকিগুলো ভারতের অভ্যন্তরে। তাদের মধ্যে প্রায় ৫৬০, স্ট্যান্ডস্টিল ও একীভূতকরন উভয় চুক্তি সাক্ষর করেছিলো ভারতের সাথে। হায়দ্রাবাদ ছিলো ব্যাতিক্রম। দক্ষিণ ভারতের কেদ্রের এই বৃহৎ রাজ্যটি ২ মাসের জন্যে একটি প্রসার পেয়েছিলো, এবং গুজরাটের ৩টি ছোট রাজ্য জুনাগড় এবং এর সহায়ক (মঙ্গরোল এবং বাবারিওয়াদ)। [৫]

জুনাগড় রাজ্যটি ১৫ ই আগস্ট পাকিস্তানের সাথে সংযোজন দলিলের পাশাপাশি স্ট্যান্ডসিল চুক্তি কার্যকর করে। জুনাগড়ই একমাত্র রাজ্য যা ১৫ ই আগস্টের মধ্যে পাকিস্তানের সাথে সংযোজন ঘোষণা করেছিল। [৬] এটি ১৩ সেপ্টেম্বর পাকিস্তান গ্রহণ করেছিল। [৫]

জম্মু এবং কাশ্মীর রাজ্য নিয়ে ভারত পাকিস্তানের মাঝে মতবিরোধ ছিল। তারা স্বাধীন থাকার সিদ্ধান্ত নিলো। এটি উভয় দেশের সাথে স্থবির চুক্তিতে স্বাক্ষর করার প্রস্তাব করেছিল। পাকিস্তান তাৎক্ষণিকভাবে মেনে নিয়েছিল, তবে ভারত আরও আলোচনার জন্য বলেছে।

পাকিস্তানের পশ্চিমের কালাত খানাত স্বাধীন থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। পরবর্তীতে তারা পাকিস্তানের সাথে সংযোজন চুক্তি করে।

কালাত খানাত[সম্পাদনা]

১২ই আগস্ট ১৯৪৭ থেকে ২৭শে মার্চ ১৯৪৮ এ পাকিস্তানে সংযোজনের আগে পর্যন্ত রাজ্যটি স্বাধীন ছিলো। তিনটি প্রতিবেশী রাজ্য নিয়ে ১৯৫২ সালের ৩ অক্টোবর বেলুচিস্তান স্টেটস ইউনিয়ন গঠিত হয়েছিল। ১৯৫৫ সালের ১৪ ই অক্টোবর পশ্চিম পাকিস্তান প্রদেশটি গঠিত হওয়ার পরে কালাত খানাতের অস্তিত্ব হারিয়ে যায়।

জম্মু ও কাশ্মীর[সম্পাদনা]

২২শে অক্টোবর ১৯৪৭, রাজ্যের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ থেকে পাকিস্তান সমর্থিত এই প্রদেশে আক্রমণ করে। রাজা প্রথমে লড়াই করে পরে ভারতের সাহায্য চেয়েছিলেন। রাজা হরি সিং সামরিক সহায়তার বিনিময়ে ২৬শে অক্টোবর ১৯৪৭ সালে একীভূতকরণ দলিল করেন যা পরের দিন ভারতের গভর্নর গ্রহণ করেন।

হায়দ্রাবাদ রাজ্য[সম্পাদনা]

হায়দরাবাদের নিজাম, যিনি এর আগে ভারতের কর্তৃত্বের সাথে নতুন ব্যবস্থার সাথে একমত হওয়ার জন্য তিন মাসের এক্সটেনশন পেয়েছিলেন, ১৮ই সেপ্টেম্বর তিনি ভারত সরকারকে লিখে পাঠান যে তিনি ভারতের সাথে সহায়তা চুক্তি করতে রাজি। তবে তিনি বলেছিলেন এই চুক্তি গ্রহণের মাধ্যমে রাজ্যে বিশৃঙ্খলা ও রক্তক্ষরণ হবে। [৭] ১১ই অক্টোবর, হায়দ্রাবাদ চুক্তির একটি খসড়া ও একটি প্রতিনিধি দল দিল্লিতে প্রেরণ করেছিলেন। রাজ্য বিভাগের সচির ভি.পি.মেনন এর দ্বারা বিস্তৃত হিসাব চিহ্নিত করেছিলেন। প্রতিমন্ত্রী ও বল্লভভাই প্যাটেল এমন চুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। গভর্নর জেনারেল মাউন্টব্যাটনের উপদেশে মেনন একটি নতুন খসড়া চুক্তি প্রস্তাত করে হায়দ্রাবাদের প্রতিনিধিদের সাথে ফেরত পাঠান। নিজামের কার্যনির্বাহী পরিষদে চুক্তিটি নিয়ে আলোচনা হয় এবং ৬ থেকে ৩ ভোট দিয়ে চুক্তিটি অনুমোদিত হয়। নিজাম স্বীকৃতি প্রকাশ করলেও চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বিলম্ব করেছিলেন। [৮]

শীঘ্রই নিজাম মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলেমিনের চাপে পড়ে। মুসলিম জাতীয়তাবাদী দল যা এই রাজ্যে সক্রিয় ছিল এবং চুক্তি থেকে সরে আসে। [৮] ১৭শে অক্টোবর সকালে ইত্তেহাদ-এর নেতা কাশিম রিজভি কয়েক হাজার নেতাকর্মীর বিশাল বিক্ষোভের আয়োজন করেন প্রতিনিধিদলের প্রস্থান অবরুদ্ধ করতে। সে নিজামকে এই বলে চাপপ্রয়োগ করে যে, যেহেতু ভারত কাশ্মীর রক্ষার সাথে জড়িত ছিলো। হায়দ্রাবাদের উপর চাপপ্রয়োগের জন্যে এর সংস্থান ছিলো অপর্যাপ্ত। তিনি দাবি করেন হায়দ্রাবাদের পক্ষে যথেস্ট পরিমান অনুকূল একটি চুক্তি সম্ভব। [৯] এরপরে নিজাম কার্যনির্বাহী কাউন্সিলের সদস্যদের দ্বারা একটি নতুন প্রতিনিধি নিয়োগ করেছিলেন যা পূর্ববর্তী চুক্তির বিরোধিতা করেছিল। [১০] হায়দরাবাদের প্রাক্তন আমলা মোহাম্মদ হাইদার এই অনুষ্ঠানটিকে "অক্টোবর অভ্যুত্থান" আখ্যায়িত করেছিলেন। এই বিন্দু থেকে, কাসিম রিজভী হায়দরাবাদ প্রশাসনে শট ডাকতে শুরু করেন। [১১]

নতুন প্রতিনিধিদল চুক্তির পূর্বের খসড়ার সামান্য সংশোধনী করেছিলো। [১২] এতে বলা হয়েছিল যে ব্রিটিশ ক্রাউন এবং নিজামের মধ্যে তখন বিদ্যমান সমস্ত চুক্তি এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাগুলি ভারত সরকারের সাথে অব্যাহত থাকবে। সেখানে প্রতিরক্ষা, যোগাযোগ ও বাহ্যিক বিষয় উল্লেখ ছিলো। হায়দরাবাদ ও ভারতের মধ্যে এজেন্টদের আদান-প্রদান হবে। ভারত সরকার সর্বজনীনতার কাজগুলি ত্যাগ করতে সম্মত হয়। স্ট্যান্ডসিল চুক্তিটি এক বছরের জন্য কার্যকর থাকবে। [১৩] এই চুক্তিটি নিজাম স্বাক্ষর করেছিলেন ২৯শে নভেম্বর ১৯৪৭ সালে। [১৪]

উল্লেখযোগ্যভাবে, এই চুক্তিতে ভারতের আধিপত্যের রাজ্যটিতে ভারতীয় বাহিনীকে স্থাপনের ব্যবস্থা করা হয়নি। যদিও ব্রিটিশ ভারত বিভিন্ন সেনানিবাস রক্ষণাবেক্ষণ করেছিল, বিশেষত সেকান্দারবাদে, রাষ্ট্রের সাথে এর "সহায়ক জোট" এর অংশ হিসাবে। পরবর্তী ৬ মাসে, রাজ্য থেকে ভারতীয় সেনা প্রত্যাহার করা হয়েছিলো। [১৫]

হায়দ্রাবাদে ভারতের এজেন্ট জেনারেল কে এম মুন্সি বলেন, "ভারতীয়রা মনে করেছিলো ভারতের সাথে চুক্তি করার অর্থ হায়দরাবাদ বিষয়ক ক্ষেত্রে ভারত তার হাতছাড়া হয়ে গেছে।" হায়দরাবাদ রাজ্য কংগ্রেস এটির বিরোধিতা করেছিল কারণ এটি ভারত সরকার দুর্বলতার চিহ্ন হিসাবে দেখেছে। [১৬] ভি.পি. মেনন বলেছেন যে, "নিজাম এবং তার পরামর্শদাতারা এই চুক্তিকে শ্বাস প্রশ্বাসের জায়গা হিসাবে দেখছিলেন, যে সময়কালে ভারতীয় সেনা প্রত্যাহার করা হবে এবং স্বাধীনতা প্রমাণের জন্য রাষ্ট্র তার অবস্থান তৈরি করতে পারে।" [১৭]

হায়দরাবাদ চুক্তির সমস্ত ধারা লঙ্ঘন করেছিলো: বাহ্যিক বিষয়গুলিতে, পাকিস্তানের সাথে ষড়যন্ত্র চালিয়ে, যা গোপনে ১৫ মিলিয়ন পাউন্ড নিয়েছিলো; প্রতিরক্ষা হিসাবে, একটি বৃহত আধা-বেসরকারী সেনা গঠন করে; যোগাযোগের ক্ষেত্রে, সীমান্তের ট্র্যাফিক এবং ভারতীয় রেলপথের ট্র্যাফিকের মাধ্যমে হস্তক্ষেপ করে। [১৮] অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে এই চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ ছিল ভারতের বিরুদ্ধেও। দেখা গেল যে বোম্বে রাজ্য দিল্লির অজান্তেই হায়দরাবাদের অভ্যন্তরে হস্তক্ষেপ করছে। সরকার প্রাদেশিক সরকারদের কাছে বিষয়টি গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তবে পণ্ডিত লুসিয়েন বেনিচু বলেছেন যে এটি কখনও হয়নি। ভারত হায়দরাবাদে অস্ত্রের চালানও বিলম্ব করেছিল, যা পরে চুক্তির লঙ্ঘন বলে দাবি করা হয়েছিল। [১৯]

অপরদিকে, ইত্তেহাদ রাজাকারদের বিশাল সশস্ত্র দলকে প্রচার করেছিল যারা রাজ্যের অভ্যন্তরে এবং সীমান্তে সাম্প্রদায়িক শান্তিকে হুমকি দিয়েছিল। একাধিক আলোচনার পরে, ভারত সরকার ১৯৪৮ সালের ৩১শে আগস্ট একটি আলটিমেটাম প্রদান করে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য রাজাকারদের উপর নিষেধাজ্ঞা এবং রাজ্যে ভারতীয় সেনা মোতায়েনের দাবি জানান। যখন এগুলি অস্বীকার করা হয়েছিল, ১৩ সেপ্টেম্বর ভারত তিনটি প্রবেশ পথ দিয়ে সেনা প্রেরণ করে রাজ্য আক্রমণ করেছিল। চার দিন পর নিজাম আত্মসমর্পণ করে এবং ভারতীয় দাবিতে রাজি হয়। [২০]

এরপরে, তিনি ১৯৪৮ সালের নভেম্বরে দলিলটিতে স্বাক্ষর করেন। [২১]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Hodson, The Great Divide (1969), p. 370.
  2. Hodson, The Great Divide (1969), p. 370; Menon, The Story of Integration of the Indian States (1956), p. 62
  3. Hodson, The Great Divide (1969), p. 370; Menon, The Story of Integration of the Indian States (1956), p. 75
  4. Menon, The Story of Integration of the Indian States (1956), p. 78
  5. Menon, The Story of Integration of the Indian States (1956), p. 82.
  6. Behera, Demystifying Kashmir (2007), pp. 12–13
  7. Menon, The Story of Integration of the Indian States (1956), p. 222.
  8. Menon, The Story of Integration of the Indian States (1956), p. 225.
  9. Menon, The Story of Integration of the Indian States (1956), p. 226; Hyder, October Coup (2012), Chapter: The Beginning of the End
  10. Menon, The Story of Integration of the Indian States (1956), pp. 225–227.
  11. Hyder, October Coup (2012), Chapter: The Beginning of the End.
  12. Hodson, The Great Divide (1969), p. 480; Hyder, October Coup (2012), Chapter: The Beginning of the End
  13. Hodson, The Great Divide (1969), p. 480
  14. Menon, The Story of Integration of the Indian States (1956), p. 229.
  15. Menon, The Story of Integration of the Indian States (1956), pp. 231–232.
  16. Kamat, Border incidents, internal disorder and the nizam's claim (2007), p. 216.
  17. Menon, The Story of Integration of the Indian States (1956), p. 231.
  18. Hodson, The Great Divide (1969), pp. 480–481.
  19. Hodson, The Great Divide (1969), pp. 480–481; Raghavan, War and Peace in Modern India (2010), p. 77; Benichou, From Autocracy to Integration (2000), pp. 213–215
  20. Raghavan, War and Peace in Modern India (2010), p. 98
  21. Chandra, Mukherjee & Mukherjee, India since Independence (2008), p. 96.