বিষয়বস্তুতে চলুন

সাইটোসল

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সাইটোসল এক ধরনের তরল পদার্থ যা বিভিন্ন ধরনের মলিকিঊল সমন্বয়ে পরিপূর্ণ। []

সাইটোসল অথবা সাইটোপ্লাজমীয় মাতৃকা হল একপ্রকারের তরল পদার্থ যা কোষের মধ্যে থাকে। এটি সাধারনতঃ ইন্ট্রা সেলুলার ফ্লুইড অর্থাৎ দুটি কোষের অন্তরবর্তী জলীয় পদার্থ। এরা ঝিল্লী পর্দার দ্বারা পৃথক অবস্থায় থাকে। উদাহরণস্বরূপ মাইটোকন্ড্রিয়াল ম্যাট্রিক্সকে মাইটোকন্ড্রিয়ন বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করেছে।

ইউক্যারিওটিক কোষ এর ক্ষেত্রে, কোষের মধ্যবর্তী সাইটোসল, যা সাইটোপ্লাজমের অংশ এবং সাইটোসল বিভিন্ন অরগান্যালস যেমন- প্লাসটিড এবং মাইটোকন্ড্রিয়া পৃথক করেছে একে অপরের থেকে কিন্তু কখনই তাদের মধ্যেকার জলীয় পদার্থর আকৃতি অথবা গঠন নষ্ট না করে। সাইটোসল হল জলীয় অংশ যা অরগান্যালস গুলির চারপাশে বিরাজমান এবং কোষ নিউক্লিয়াসগুলি্কে পৃথক করে। প্রোক্যারিওটিক কোষের ক্ষেত্রে মেটাবলিসম এর বিভিন্ন রাসায়নিক ক্রিয়া অধিকাংশই সাইটোসলে সম্পন্ন হয়। কিছু কিছু রাসায়নিক ক্রিয়া ঝিল্লী পর্দা অথবা পেরিপ্লাজমিক অংশে হয়। ইউক্যারিওটিক কোষেও অধিকাংশ মেটাবলিক রাসায়নিক ক্রিয়া সাইটোসলেই হয়, বাকী রাসায়নিক ক্রিয়া অরগান্যালস এর মধ্যে সম্পন্ন হয়।

সাইটোসল হল জলের দ্রবনীয় বিভিন্ন পদার্থর জটিল মিশ্রণ। সাইটোসলের বেশির ভাগ অংশই জলীয়। তবে কোষের ভেতরের আকৃতি এবং বৈশিষ্ট কিরকম তা এখনও বোঝা যায়নি। সাইটোসলে প্রাপ্ত আয়নের ঘনত্ব বিশেষতঃ সোডিয়াম এবং পটাশিয়াম এক্সট্রা সেলুলার ফ্লুইড এর থেকে পৃথক হয়। আয়নের ঘনত্বের এই পার্থক্যটা খুব জরুরী ওসমোরেগুলেশন, কোষের সিগন্যাল প্রেরণ ইত্যাদি পদ্ধতিগুলির জন্য। এছাড়া এন্ডোক্রাইন, নার্ভ এবং মাসল কোষের মধ্যে অ্যাকশন-পোটেনসিয়াল ক্রিয়া বজায় রাখার জন্য। সাইটোসল, জলীয় অংশ ছাড়াও অনেকটা পরিমাণে ম্যাক্রো মলিকিউলস থাকে। যারা অন্যান্য মলিকিউলসের আচরনের সাথে নিজেদের সামঞ্জস্য বজায় রাখে, এই পদ্ধতিকে ম্যাক্রো মলিকিউলার ক্রাউডিং বলে।

পূর্বে সাইটোসলকে বিভিন্ন মলিকিউলসের সরল দ্রবন মনে করা হত কিন্তু সাইটোসলে বিভিন্ন প্রকার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এখানে যেমন ক্যালসিয়াম এর মতো ছোট কনার অথবা মলিকিউলসের কনসেন্ট্রেশন গ্রেডিয়েন্ট আবার উৎসেচক এর দীর্ঘ এবং জটিল প্রক্রিয়া যা একসাথে বিভিন্ন মেটাবলিক পাথওয়েকে চালনা করে। আবার প্রোটিন কমপ্লেক্স যেমন-প্রটিওজোম এবং কার্বক্সিজোম এইগুলি সাইটোসলের পৃথক অংশ।

সংজ্ঞা

[সম্পাদনা]

সাইটোসল কথাটি প্রথম ব্যবহার করা হয় ১৯৬৫ সালে এইচ এ লার্ডে র দ্বারা, আলট্রাসেন্ট্রিফিউগেশনএর ফলে কোষের অবদ্রব্য অংশ পড়ে থাকে[][] এবং কোষের ভাঙ্গনের ফলে যে তরল পাওয়া যেত তাকে বোঝানো হত। কিন্তু কোষ ভাংগনের ফলে দ্রাব্য তরল এবং কোষ সাইটোপ্লাজমের দ্রাব্য অংশ একই নয়, সাধারনত একে সাইটোপ্লাসমিক ফ্রেকশন বলে। বর্তমানে সাইটোসল বলতে বোঝানো হয় কোনো সম্পূর্ণ কোষের সাইটোপ্লাজমের তরল অবস্থা। [] সাইটোপ্লাসমের মধ্যস্থ অরগ্যানিলস ব্যতীত বাকি অংশকে সাইটোসল বলা হয়। [] কোনো রকম ভ্রান্ত ধারণা যাতে তৈরী না হয়, তাই সাইটোসল বোঝাতে ভগ্ন কোষের নির্যাস এবং সম্পূর্ণ কোষের দ্রাব্য অংশ উভয়ই বোঝানো হয় এবং জলীয় সাইটোপ্লাজম বলতে বোঝানো হয় জীবিত সাইটোপ্লাজমের জলীয় অংশ।[]

ধর্ম এবং উপাদান

[সম্পাদনা]
মানব কোষের ইন্ট্রা সেলুলার ফ্লুইড

সাধারণতঃ কোষের আয়তন অনুসারে সাইটোসল এর ধর্মের অথবা বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। উদ্ভিদ এর ক্ষেত্রে মুখ্য প্রকোষ্ঠ হল বয়োর কেন্দ্রীয় ভ্যাকুওল।[] সাইটোসলের প্রধান উপাদান হল জল এবং জলে দ্রাব্য বিভিন্ন আয়নস, ছোট কনা অথবা মলিকিউলস এবং জলে দ্রাব্য বৃহৎ মলিকিউলস যেমন-প্রোটিন। বেশিরভাগ প্রোটিন ব্যতীত কণাগুলির আণবিক ভর থাকে যা ৩০০ ডাল্টন [] এর কম হয়। এই ক্ষুদ্র মলিকিউলগুলির কার্যকারিতা জটিল এবং ভিন্নধর্মী। এই ক্ষুদ্র কণাগুলি বিভিন্ন বিপাক ক্রিয়ার সাথে যুক্ত এবং বিপাকজাত কনার সাথে মিশে থাকে। যেমন-২০০০০০ রকমের ভিন্ন ভিন্ন খুদ্র কনা উদ্ভিদ কোষে পাওয়া যায়, কিন্তু কখনই তা একটি কষে অথবা একই প্রজাতির মধ্যে সব কণা পাওয়া অসম্ভব। [] একটি মাত্র কোষ যেমন- ''Escherichia coli অথবা ''Saccharomyces cerevisiae'' এ বিপাকজাত কনা প্রায় ১০০০ সংখ্যক উতপন্ন হয়।[][]

স্তন্যপায়ী প্রানীদের সাইটোসল এবং রক্তে আয়নের ঘনত্ব.[]
আয়ন  সাইটোসলে ঘনত্ব (মিলিমোলার)   রক্তে ঘনত্ব (মিলিমোলার) 
 পটাশিয়াম   ১৩৯    
 সোডিয়াম   ১২   ১৪৫ 
 ক্লোরাইড      ১১৬ 
 বাইকার্বোনেট   ১২   ২৯ 
 অ্যামাইনো অ্যাসিড প্রোটিনের   ১৩৪    
 ম্যাগনেশিয়াম   ০.৮   ১.৫ 
 ক্যালশিয়াম   <০.০০০২   ১.৮ 

ম্যাক্রো-মলিকিউলস

[সম্পাদনা]

প্রোটিনের কণা কোষ পর্দার অথবা সাইটোস্কেলিটন এর সাথে যুক্ত হয় না কিন্তু এরা সাইটোসলে দ্রাব্য। কোষের মধ্যে প্রোটিন পরিমাণ খুব বেশি ২০০মিগ্রা/মিলি যা সাইটোসলের ২০-৩০% আয়তন পূর্ন করে।

প্রোক্যারিওটিক কোষের সাইটোসল কোষের জিনোম বহন করে এবং এই গঠনযুক্ত অংশকে নিউক্লিয়োড বলে। এগুলি হল ডিএনএ এর অংশ এবং এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত প্রোটিন, যারা ব্যাকটেরিয়ার ক্রোমোজোম এবং প্লাসমিড ট্রান্সক্রিপশন এবং রেপ্লিকেশন নিয়ন্ত্রণ করে। ইউক্যারিওটিক্সদের ক্ষেত্রে কোষ নিউক্লিয়াসের ভেতরে জিনোমের বিভিন্ন প্রক্রিয়া ঘটে এবং কোষ নিউক্লিয়াস থেকে সাইটোসলকে পৃথক করছে নিউক্লিওরন্ধ্রগুলি যারা ১০ ন্যানোমিটার আকারের বড় মলিকিউলের মুক্ত ব্যাপন প্রক্রিয়া বাধার সৃষ্টি করে।[১০]

কার্যকারিতা

[সম্পাদনা]

সাইটোসল কোনো একটি কার্য সম্পন্ন করেনা,কষের বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে। উদাহরণ স্বরূপ, ঝীল্লিপর্দা থেকে কোষের মধ্যবর্তী অংশ যেমন-নিউক্লিয়ার্স কোষ ট্রান্সডাকশন [১১] এ সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। মাইটোসিস পদ্ধতিতে কোষ বিভাজনের সময় যে নিউক্লিয়ার মেমব্রেন বিভক্ত হয় অর্থাৎ সাইটোকাইনেসিস এর বিভিন্ন প্রক্রিয়া সাইটোসলে সম্পন্ন হয়।[১২] সাইটোসল এর অপর গুরুত্ব পূর্ন কাজ হল- বিপাক ক্রিয়াজাত কনা অথবা মলিকিউলগুলিকে তাদের উৎপত্তি স্থল থেকে, যে অঞ্চলে এই কনাগুলি ব্যবহৃত হবে, সেই অঞ্চলে অথবা স্থানে পৌঁছে দেওয়া। জলে দ্রাব্য কনা যেমন- অ্যামিনো অ্যাসিড দের পৌঁছে দেওয়ার কাজটি তুলনামূলক সহজ কারণ এই কনাগুলি সহজেই সাইটোসলে ব্যাপন ক্রিয়ার মাধ্যমে চালিত হয় কিন্তু জলে অদ্রাব্য মলিকিউলস যেমন- ফ্যাটি অ্যাসিড অথবা স্টেরল ইত্যাদি কনা সাইটোসল এর মধ্যে দিয়ে চালিত হতে গেলে কিছু নির্দিষ্ট বাইন্ডিং প্রোটিন এর প্র্যোজন হয়, যারা কনাগুলিকে কোষ পর্দার ভিতরে প্রবেশ করতে সাহায্য করে।[১৩][১৪]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. Goodsell DS (জুন ১৯৯১)। "Inside a living cell"। Trends Biochem. Sci.১৬ (6): ২০৩–৬। ডিওআই:10.1016/0968-0004(91)90083-8পিএমআইডি 1891800
  2. 1 2 উদ্ধৃতি ত্রুটি: <ref> ট্যাগ বৈধ নয়; Clegg1984 নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি
  3. 1 2 Cammack, Richard; Teresa Atwood; Attwood, Teresa K.; Campbell, Peter Scott; Parish, Howard I.; Smith, Tony; Vella, Frank; Stirling, John (২০০৬)। Oxford dictionary of biochemistry and molecular biology। Oxford [Oxfordshire]: Oxford University Press। আইএসবিএন ০-১৯-৮৫২৯১৭-১ওসিএলসি 225587597
  4. 1 2 Lodish, Harvey F. (১৯৯৯)। Molecular cell biology। New York: Scientific American Books। আইএসবিএন ০-৭১৬৭-৩১৩৬-৩ওসিএলসি 174431482
  5. Bowsher CG, Tobin AK (এপ্রিল ২০০১)। "Compartmentation of metabolism within mitochondria and plastids"J. Exp. Bot.৫২ (356): ৫১৩–২৭। ডিওআই:10.1093/jexbot/52.356.513পিএমআইডি 11373301 {{সাময়িকী উদ্ধৃতি}}: অজানা প্যারামিটার |লেখকগণ= উপেক্ষা করা হয়েছে (সাহায্য)[স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
  6. Goodacre R, Vaidyanathan S, Dunn WB, Harrigan GG, Kell DB (মে ২০০৪)। "Metabolomics by numbers: acquiring and understanding global metabolite data" (পিডিএফ)Trends Biotechnol.২২ (5): ২৪৫–৫২। ডিওআই:10.1016/j.tibtech.2004.03.007পিএমআইডি 15109811। ১৭ ডিসেম্বর ২০০৮ তারিখে মূল থেকে (PDF) আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২৫ জুলাই ২০১৬ {{সাময়িকী উদ্ধৃতি}}: অজানা প্যারামিটার |লেখকগণ= উপেক্ষা করা হয়েছে (সাহায্য)
  7. Weckwerth W (২০০৩)। "Metabolomics in systems biology"Annu Rev Plant Biol৫৪: ৬৬৯–৮৯। ডিওআই:10.1146/annurev.arplant.54.031902.135014পিএমআইডি 14503007
  8. Reed JL, Vo TD, Schilling CH, Palsson BO (২০০৩)। "An expanded genome-scale model of Escherichia coli K-12 (iJR904 GSM/GPR)"Genome Biol. (9): R৫৪। ডিওআই:10.1186/gb-2003-4-9-r54পিএমসি 193654পিএমআইডি 12952533। ১১ জানুয়ারি ২০১৯ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২৫ জুলাই ২০১৬ {{সাময়িকী উদ্ধৃতি}}: অজানা প্যারামিটার |লেখকগণ= উপেক্ষা করা হয়েছে (সাহায্য)উদ্ধৃতি শৈলী রক্ষণাবেক্ষণ: পতাকাভুক্ত নয় এমন বিনামূল্যে ডিওআই (লিঙ্ক)
  9. Förster J, Famili I, Fu P, Palsson BØ, Nielsen J (ফেব্রুয়ারি ২০০৩)। "Genome-Scale Reconstruction of the Saccharomyces cerevisiae Metabolic Network"Genome Res.১৩ (2): ২৪৪–৫৩। ডিওআই:10.1101/gr.234503পিএমসি 420374পিএমআইডি 12566402 {{সাময়িকী উদ্ধৃতি}}: অজানা প্যারামিটার |লেখকগণ= উপেক্ষা করা হয়েছে (সাহায্য)
  10. Peters R (২০০৬)। "Introduction to nucleocytoplasmic transport: molecules and mechanisms"। Methods Mol. Biol.। Methods in Molecular Biology™। ৩২২: ২৩৫–৫৮। ডিওআই:10.1007/978-1-59745-000-3_17আইএসবিএন ৯৭৮-১-৫৮৮২৯-৩৬২-৬পিএমআইডি 16739728
  11. Kholodenko BN (জুন ২০০৩)। "Four-dimensional organization of protein kinase signaling cascades: the roles of diffusion, endocytosis and molecular motors"। J. Exp. Biol.২০৬ (Pt 12): ২০৭৩–৮২। ডিওআই:10.1242/jeb.00298পিএমআইডি 12756289
  12. Winey M, Mamay CL, O'Toole ET (জুন ১৯৯৫)। "Three-dimensional ultrastructural analysis of the Saccharomyces cerevisiae mitotic spindle"J. Cell Biol.১২৯ (6): ১৬০১–১৫। ডিওআই:10.1083/jcb.129.6.1601পিএমসি 2291174পিএমআইডি 7790357 {{সাময়িকী উদ্ধৃতি}}: অজানা প্যারামিটার |লেখকগণ= উপেক্ষা করা হয়েছে (সাহায্য)
  13. Weisiger RA (অক্টোবর ২০০২)। "Cytosolic fatty acid binding proteins catalyze two distinct steps in intracellular transport of their ligands"। Mol. Cell. Biochem.২৩৯ (1–2): ৩৫–৪৩। ডিওআই:10.1023/A:1020550405578পিএমআইডি 12479566
  14. Maxfield FR, Mondal M (জুন ২০০৬)। "Sterol and lipid trafficking in mammalian cells"। Biochem. Soc. Trans.৩৪ (Pt 3): ৩৩৫–৯। ডিওআই:10.1042/BST0340335পিএমআইডি 16709155 {{সাময়িকী উদ্ধৃতি}}: অজানা প্যারামিটার |লেখকগণ= উপেক্ষা করা হয়েছে (সাহায্য)