রোগ সংক্রামক জীবাণু

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান

জীববিজ্ঞান প্রাচীনতম এবং বিস্তৃত অর্থে প্যাথোজেন (গ্রিক: πάθος pathos "যন্ত্রণা, আবেগ," ও -γενής -genēs "উৎপাদক") বা রোগ সংক্রামক জীবাণু হচ্ছে এমন যেকোন কিছু যা রোগ উৎপন্ন করতে পারে; ১৮৮০ সালে শব্দটি প্রথম ব্যবহার করা হয়েছিল।[১] সাধারণত একটি সংক্রামক এজেন্ট যেমন, একটি ভাইরাস, ব্যাকটিরিয়া, প্রিয়ন, ছত্রাক, এমনকি অন্য অণুজীব বোঝাতে এই শব্দটি ব্যবহার করা হয়।[২][৩]

একটি জীবাণু পাথওয়েসহ (pathway) বিভিন্ন নিম্নস্তর (substrate) অবলম্বন করে একটি হোস্ট জীবকে (যে রোগাক্রান্ত হবে) আক্রমণ করতে পারে। প্রধান পাথওয়েসমূহের বিভিন্ন অনিয়মিত সময়সূচি আছে, কিন্তু একটি প্যাথোজেনকে লালিত করার ক্ষেত্রে মাটি দূষণ দীর্ঘতম বা সবচেয়ে সম্ভাবনাময় অবলম্বন প্রদান করে। মানবদেহে জীবাণু দ্বারা সৃষ্ট ব্যাধিকে প্যাথোজেনিক রোগ বলা হয়।

রোগ সৃষ্টি করার ক্ষমতা[সম্পাদনা]

জীবাণুসমূহের রোগ সৃষ্টি করার ক্ষমতাকে প্যাথোজেনেসিটি (Pathogenicity) বলা হয়। প্যাথোজেনেসিটি কথার অর্থ ভাইরুলেন্স-এর (virulence) সাথে সম্পর্কিত। কিন্তু কিছু কর্তৃপক্ষ শব্দটিকে গুণগত অর্থে ব্যবহার করেন যদিও ভাইরুলেন্স শব্দটি পরিমাণগত অর্থে ব্যবহৃত হয়। এই মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি জীবাণু একটি বিশেষ প্রেক্ষাপটে প্যাথোজেনিক বা অ-প্যাথোজেনিক হতে পারে, কিন্তু একটি আরেকটির চেয়ে "অধিক প্যাথোজেনিক" হতে পারে না। বরং এইরূপ তুলনা আপেক্ষিক ভাইরুলেন্সের মাধ্যমে করা হয়। এছাড়াও প্যাথোজেনেসিটির অর্থ ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে স্বতন্ত্র যা সংক্রমণের ঝুঁকিকে পরিমাপ করে।[৪]

একটি প্যাথোজেনকে তার টক্সিন উৎপাদন ক্ষমতা, টিস্যুর অভ্যন্তরে প্রবেশ, কলোনি তৈরি, পুষ্টিনাশ ক্ষমতা এবং হোস্ট প্রাণীটির শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দমন (immunosuppress) ইত্যাদির পরিপ্রেক্ষিতে বর্ণনা করা যেতে পারে।

প্রেক্ষাপট-নির্ভর প্যাথোজেনেসিটি[সম্পাদনা]

একটি ব্যাকটেরিয়াকে যখন একটি রোগের (তুলনা করুন কোচের স্বীকার্য) কারণ হিসাবে চিহ্নিত করা হয় তখন সাধারণত ঐ ব্যাকটেরিয়ার সম্পূর্ণ প্রজাতিকে প্যাথোজেনিক আখ্যা দেওয়া হয়ে থাকে। যাইহোক আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বলা হয় যে, প্যাথোজেনেসিটি সামগ্রিকভাবে জীবাণুর বাস্তুর উপর নির্ভর করে। একটি ব্যাকটিরিয়া প্রতিরোধক্ষমতা অবদমিত হয়েছে (immunocompromised host) এমন হোস্ট প্রাণীর শরীরে সুবিধাবাদী সংক্রমণ (opportunistic infection) ঘটাতে পারে, প্লাসমিড (plasmid) সংক্রমণ দ্বারা ভাইরুলেন্স কারক (virulence factor) অর্জন করতে পারে, হোস্টের দেহের মধ্যে ভিন্ন সাইটে বা জায়গায় স্থানান্তরিত হয় বা শরীরে উপস্থিত অন্যান্য ব্যাকটেরিয়ার সামগ্রিক সংখ্যার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, ইয়েরসিনিয়া (Yersinia) ব্যাকটেরিয়া আক্রান্ত ইঁদুরের মেসেনটেরিক (mesenteric) লিম্ফ গ্রন্থির সংক্রমণের ফলে ঐ অংশে সম্ভবত "প্রতিরোধমূলক স্কারিং" (immunological scarring) প্রক্রিয়া দ্বারা ল্যাক্টোবেসিলাস (Lactobacillus) ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের পথ সুগম হয়।[৫]

সম্পর্কিত ধারণা[সম্পাদনা]

ভাইরুলেন্স[সম্পাদনা]

যখন একটি প্যাথোজেন একটি অসুস্থ হোস্ট প্রাণী নির্বল হওয়া সত্ত্বেও তার দেহ থেকে অন্য দেহে ছড়িয়ে যেতে সক্ষম হয় তখন ভাইরুলেন্স (একটি প্যাথোজেনের একটি হোস্ট প্রাণীর ফিটনেসের ক্ষতি করার প্রবণতা) বিবর্তিত হয়েছে বলা হয়।  একই প্রজাতির হোস্ট প্রাণীর (যারা মাতা-সন্তান সম্পর্কে আবদ্ধ নয়) মধ্যে অনুভূমিক সংক্রমণ ঘটে, বিপরীতে উল্লম্ব সংক্রমণ সংক্রমিত মায়ের থেকে ভ্রূণে  অভিব্যক্ত (হোস্ট প্রাণীর জনসংখ্যার মধ্যে একটি নির্দিষ্ট সময় ধরে উচ্চ অসুস্হতা ও মৃত্যুর হার বিদ্যমান হওয়ার পরে) হয় এবং হোস্ট জীবের বিবর্তনীয় সাফল্যের সঙ্গে প্যাথোজেনটির বিবর্তনীয় সাফল্যের সংযুক্তি নির্দেশ করে।

বিবর্তনীয় মেডিসিন জানাচ্ছে যে অনুভূমিক সংক্রমণ ঘটলে হোস্ট জীবের সমষ্টির প্যাথোজেনটির বিরুদ্ধে সহনশীলতা বিকশিত হতে পারে না।

সংক্রমণ[সম্পাদনা]

বিভিন্ন উপায়ে যেমন বায়ুবাহিত হয়ে, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগাযোগ, যৌন যোগাযোগের মাধ্যমে, রক্ত বা মাতৃস্তন্যের বা অন্যান্য শারীরিক তরলের মাধমে এবং বিষ্ঠা-মৌখিক রুটে প্যাথোজেনের সংক্রমণ ঘটে।

প্যাথোজেনের প্রকারভেদ[সম্পাদনা]

ব্যাকটেরিয়াল বা  ব্যাকটেরিয়াজাত[সম্পাদনা]

যদিও অধিকাংশ ব্যাকটেরিয়া হয় নিরীহ বা উপকারী কিন্তু একটি অপেক্ষাকৃত ছোট প্যাথোজেনিক ব্যাকটেরিয়ার শ্রেণী সংক্রামক রোগের কারণ হতে পারে। মাইকোব্যাকটেরিয়াম টিউবারকিউলোসিস নামক ব্যাকটেরিয়া দ্বারা যক্ষ্মা রোগের সৃষ্টি হয় যার ফলে প্রতি বছর প্রায় ২০ লক্ষ মানুষ মূলত সাব-সাহারান আফ্রিকাতে মৃত্যুবরণ করেন। প্যাথোজেনিক ব্যাকটেরিয়া অন্য কিছু বিশ্বব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ রোগের কারণ যেমন স্ট্রেপ্টোককাস (Streptococcus) এবং সিউডোমোনাস (Pseudomonas) ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সৃষ্ট নিউমোনিয়া; শিগেলা (Shigella), ক্যাম্পাইলোব্যাকটার (Campylobacter) এবং সালমোনেলা (Salmonella) ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সৃষ্ট ফুডবোর্ন (foodborne) অসুস্থতা। প্যাথোজেনিক ব্যাকটেরিয়া টিটেনাস, টাইফয়েড, জ্বর, ডিপথেরিয়া, সিফিলিস, এবং কুষ্ঠ ইত্যাদি সংক্রমণ সৃষ্টি করতে পারে।

অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করা যেতে পারে কারণ অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োগে ব্যাকটেরিয়ার কোষের বাইরের প্রাচীর  ধ্বংস হয়ে যায়, ফলে ডিএনএ কোষাবরণ থেকে বের হয়ে যায় এবং ফলস্বরূপ প্যাথোজেন প্রয়োজনীয় প্রোটিন এবং রঞ্জক পদার্থ(ডাই) উৎপাদন করতে অসমর্থ হয়। ব্যাকটেরিয়া সাধারণত ১ থেকে ৫ মাইক্রোমিটার দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট হয়। কোষপ্রাচীরহীন একপ্রকার ব্যাকটেরিয়ার শ্রেণীকে মাইকোপ্লাজমা (mycoplasma) বলে (এটি ফুসফুসের সংক্রমণের কারণ)। এক শ্রেণীর ব্যাকটেরিয়া যাকে বাধ্যতামূলকভাবে অন্যান্য কোষের মধ্যে বাস করতে হয়(বাধ্যতামূলক আন্তঃকোষীয় পরাশ্রয়ী) হচ্ছে ক্ল্যামাইডিয়া বর্গ (chlamydia genus)। এরা বিশ্বব্যাপী যৌনবাহিত সংক্রমণ (এসটিডির) অন্যতম কারণ।

ভাইরাল বা ভাইরাসজাত[সম্পাদনা]

ভাইরাল জীবাণুর দ্বারা সৃষ্ট ব্যাধির মধ্যে আছে বসন্ত, ইনফ্লুয়েঞ্জা, মাম্পস, হাম, জলবসন্ত, ইবোলা, এবং রুবেলা

রোগ সৃষ্টিকারী প্যাথোজেনিক ভাইরাসের মধ্যে আছে প্রধানত নিম্নলিখিত গোত্রীয় ভাইরাস: অ্যাডিনোভাইরিডি (Adenoviridae), পিকর্নাভাইরিডি (Picornaviridae), হার্পেসভাইরিডি (Herpesviridae), হেপাড্নাভাইরিডি (Hepadnaviridae), ফ্লাভিভাইরিডি (Flaviviridae), রেট্রোভাইরিডি (Retroviridae), অর্থোমাইক্সোভাইরিডি (Orthomyxoviridae), প্যারামাইক্সোভাইরিডি (Paramyxoviridae), পাপোভাভাইরিডি (Papovaviridae), পোলিওমাভাইরাস (Polyomavirus), রাবডোভাইরিডি(Rhabdoviridae), তোগাভাইরিডি (Togaviridae)। ভাইরাস সাধারণত ২০ থেকে ৩০০ ন্যানোমিটার দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট।[৬]

ফাংগাল বা ছত্রাকজাত[সম্পাদনা]

মাইক্রোবের একপ্রকার ইউক্যারিওটিক রাজ্য(কিংডম) নিয়ে ছত্রাক গঠিত ও এরা সাধারণত মৃতভোজী (saprophytes) (মৃত প্রাণীর দেহাংশ খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করে)। কিন্তু এরা মানুষ, অন্য প্রাণী ও উদ্ভিদের রোগের কারণ হতে পারে। ছত্রাক হল ফসল এবং অন্যান্য গাছপালার রোগের  সবচেয়ে বড় কারণ। সাধারণত ফাংগাল বীজগুটি ১ থেকে ৪০ মাইক্রোমিটার দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট হয়।

প্রিয়নিক[সম্পাদনা]

প্রিয়ন তত্ত্ব (prion theory) অনুযায়ী প্রিয়ন হচ্ছে সংক্রামক জীবাণু যার নিউক্লিক অ্যাসিড থাকে না। কিছু রোগ যেমন স্ক্র্যাপি(scrapie), বোভাইন স্পঞ্জিফর্ম এন্সেফ্যালপ্যাথি (bovine spongiform encephalopathy) (উন্মত্ত গরু ব্যাধি), ক্রেউট্জফেল্ড্ট-জেকব রোগ (Creutzfeldt–Jakob disease) ইত্যাদিতে গুণগতভাবে এই অস্বাভাবিক ভাঁজবিশিষ্ট প্রোটিন পাওয়া যায়।[৭]

অন্যান্য প্যারাসাইট[সম্পাদনা]

কিছু ইউক্যারিওটিক জীব যেমন প্রোটিস্ট (protists) এবং হেলমিন্থ (helminths) রোগ সৃষ্টি করে থাকে।

অ্যালগাল বা শৈবালজাত[সম্পাদনা]

স্তন্যপায়ী প্রাণীর শৈবাল বা শেত্তলাজাত প্যাথোজেন দ্বারা সৃষ্ট পরিচিত রোগগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল রোগ হল প্রোটোথিকোসিস (protothecosis)। প্রোটোথিকোসিস প্রোটোথিকা (prototheca) নামক এক ধরনের ক্লোরোফিলবিহীন সবুজ শৈবাল দ্বারা সৃষ্ট এবং এই রোগ কুকুর, বিড়াল, গরু, এবং মানুষের মধ্যে পরিলক্ষিত হয়।

চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা[সম্পাদনা]

সাধারণত এন্টিবায়োটিক দ্বারা ব্যাকটেরিয়ার চিকিৎসা করা হয়। অন্যদিকে এন্টিভাইরাল যৌগ দিয়ে ভাইরাসের চিকিৎসা করা হয়। ইউক্যারিওটিক প্যাথোজেন সাধারণত অ্যান্টিবায়োটিক দ্বারা নির্মূলযোগ্য নয় এবং এদের নির্দিষ্ট কিছু ওষুধের প্রয়োজন হয়। টিকা দ্বারা অনেক প্যাথোজেনের সংক্রমণ প্রতিরোধ করা যায়। ভ্যাকসিনের মাধ্যমে স্বল্প পরিমাণ প্যাথোজেন দেহে প্রবেশ করানো হয় যাতে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা সতর্ক থাকে এবং একটি বৃহত্তর পরিমাণ ভাইরাস যাতে কোনদিনও শরীরে প্রবেশ করতে সক্ষম না হয় তার জন্য প্রতিরক্ষা জোরদার হয়। প্যাথোজেনের দ্বারা সংক্রমণ প্রতিরোধে স্বাস্থ্যবিধির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "Pathogen"ডিকশনারী.কম। র‍্যান্ডম হাউজ। 
  2. Alberts B; Johnson A; Lewis J (২০০২)। "Introduction to Pathogens"Molecular Biology of the Cell (4th সংস্করণ)। Garland Science। পৃ: ১। সংগৃহীত ২৬ এপ্রিল ২০১৬ 
  3. "MetaPathogen - about various types of pathogenic organisms"। সংগৃহীত ১৫ জানুয়ারি ২০১৫ 
  4. "1.2. Definitions: pathogenicity vs virulence; incidence vs prevalence"। COLOSS। 
  5. Carl Nathan (২০১৫-১০-০৯)। "From transient infection to chronic disease"। Science 350 (6257): 161। ডিওআই:10.1126/science.aad4141পিএমআইডি 26450196 
  6. Viral Special Pathogens Branch | [26] Moved | CDC আর্কাইভ May 6, 2009, at the Wayback Machine.
  7. The prion diseases STANLEY B. PRUSINER, Scientific American

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]