ভূত চতুর্দশী

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
ভূতপ্রেত ও শিব সহ চামুণ্ডা কালী

ভূত চতুর্দশী একটি বাঙালি হিন্দু উৎসব। হিন্দু শকাব্দ অনুসারে আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশীর দিন[১] অর্থাৎ দীপান্বিতা কালীপূজার আগের দিন ভূত চতুর্দশী পালন করা হয়।[২] এই একই দিনে উত্তর ভারতে নরক চতুর্দশী বলে অপর একটি হিন্দু উৎসবও পালিত হয়।[৩][৪][৫] এই দিন বাঙ্গালী গৃহস্থের বাড়িতে চৌদ্দটি প্রদীপ জ্বালানো,চৌদ্দ রকম শাক একত্রে রান্না করে অন্নের সাথে খাওয়া ও এ দিন ছেলেদের কপালের ডানে আর মেয়েদের কপালের বায়ে ঘি-তুলসীপাতা-কাজল ধারণের প্রথা রয়েছে।[৬][৭][৮]পশ্চিমী হ্যালোইন অনেকটা এর মত।

পুরাণ[সম্পাদনা]

দৈত্যরাজ বলি স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতাল দখল করলে অসুররা সবার উপর অত্যাচার শুরু করে । বলিকে থামানোর জন্য ভগবান বিষ্ণু বামন অবতারে বলির কাছে তিন পা জমি চাইলেন । দৈত্যরাজ এতে রাজি হলেন । বামন অবতার দুই পা স্বর্গ ও মর্ত্যে দিলেন । এরপর নাভি থেকে বের হওয়া তৃতীয় পা বলির মাথায় দিয়ে তাকে পাতালে পাঠিয়ে দিলেন । নিজের কথা রাখায় ও তাকে চিনেও দান দেয়ায় বামন অবতার বলিকে প্রতি বছর পৃথিবীতে পূজা পাওয়ার আশীর্বাদ করলেন । এরপর থেকে কালীপূজার আগের রাতে রাজা বলি পাতাল থেকে পৃথিবীতে পূজা নিতে আসেন। তার সাথে সহস্র ভূত, প্রেতাত্মা এবং অশরীরী এ সময় আসে।[৯]

অন্য মতে চামুণ্ডা রূপে মা কালী এ দিন চৌদ্দখানা ভূতকে সাথে নিয়ে ভক্তের বাড়ি থেকে অশুভ শক্তিকে দূর করতে পৃথিবীতে আসেন।[১০]

নিয়ম[সম্পাদনা]

হিন্দু ধর্মে বিশ্বাস হয় মৃত পূর্ব পুরুষরা আশ্বিন মাসের কৃষ্ণ চতুর্দশীর দিন মর্ত্যে আসেন৷ তাদের আনন্দে রাখতে এবং অতৃপ্ত আত্মার অভিশাপ দূর করতে তাদের পূজা করা হয়। প্রথা অনুযায়ী চোদ্দ শাক খাওয়া হয় এবং চোদ্দ প্রদীপ জ্বালানো হয়। হিন্দু ধর্ম মতে মৃত্যুর মানব দেহ পঞ্চভূতে (ক্ষিতি-অপ-তেজ-মরুৎ-ব্যোম) বিলীন হয়ে পাঁচ উপাদানের মধ্যেই মিশে থাকেন। তাই প্রকৃতি থেকে সংগ্রহ করা ১৪ রকমের শাক মৃত ১৪ পুরুষের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়। ১৪ শাক ধোয়ার পর সেই বাড়ির প্রতিটি কোনে ছিটিয়ে দেওয়া হয় এবং প্রেত ও অশুভ শক্তি দূর করতে বাঙালি গৃহস্থরা এই দিন সন্ধেয় বাড়িতে চোদ্দ প্রদীপ জ্বালিয়ে থাকেন।[১১]

চৌদ্দ শাক[সম্পাদনা]

চৌদ্দ শাক

বাংলার ঋতু প্রকোপ অন্য প্রদেশের থেকে বেশি হওয়ার জন্য আশ্বিনকার্ত্তিক মাস দুটিকে যমদংস্টা কাল বলা হত। এই সময় ওল, কেও, বেতো, কালকাসুন্দা, নিম, সরষে, শালিঞ্চা, জয়ন্তী, গুলঞ্চ, পলতা, ঘেঁটু, হিঞ্চে, শুষুনী, শেলু এই চৌদ্দটি শাক একত্রে খাওয়া হয়। বাংলার নব্য-স্মৃতিশাস্ত্রকার রঘুনন্দন ভট্টাচার্য্য (১৬ শতাব্দী) তার অষ্টবিংশতি তত্ত্বের অন্যতম গ্রন্থ “কৃত্যতত্ত্বে” উল্লেখ করেছেন “নিৰ্ণয়া-মৃতের” (একটি প্রাচীন স্মৃতির গ্রন্থ) অভিমত অনুসরণ করে[১২]-

"ওলং কেমুকবাস্তূকং, সার্ষপং নিম্বং জয়াং।
শালিঞ্চীং হিলমোচিকাঞ্চ পটুকং শেলুকং গুড়ূচীন্তথা।
ভণ্টাকীং সুনিষন্নকং শিবদিনে খাদন্তি যে মানবাঃ,
প্রেতত্বং ন চ যান্তি কার্ত্তিকদিনে কৃষ্ণে চ ভূতে তিথৌ।"

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Sur, Atul Krishna (১৯৮৮)। Bhāratera nr̥tāttvika paricaẏa। Sāhityaloka। 
  2. De, Sushil Kumar (১৯৬৪)। Bhāratakosha। Baṅgīẏa Sāhitya Parishad। পৃষ্ঠা 84। 
  3. Ānandamūrti (১৯৮২)। Namaḥ Śibāẏa śāntāẏa। Ānandamārga Pracāraka Saṃgha। পৃষ্ঠা 115। 
  4. Mukerji, Abhay Charan (১৯১৬)। Hindu Fasts and Feasts (ইংরেজি ভাষায়)। MacMillan। 
  5. The Journal of the Anthropological Society of Bombay (ইংরেজি ভাষায়)। চতুর্দশ খণ্ড। Anthropological Society of Bombay। ১৯২৮। পৃষ্ঠা 129। 
  6. "ভূত চতুর্দশীতে চোদ্দ শাক খেয়ে বাড়িতে জ্বালাতে হয় ১৪ প্রদীপ, এর তাৎপর্য কী জানেন..."EI Samay। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-১১-১৩ 
  7. Cakrabartī, Baruṇakumāra (১৯৮৩)। Loka-biśvāsa o loka-saṃskāra। Pustaka Bipaṇi। 
  8. "এই চতুর্দশীতে কি সত্যিই ভূতেরা আসে?"sangbadpratidin (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৯-০১ 
  9. "ভূত চতুর্দশীতে কেন ১৪ শাক-১৪ প্রদীপ, জানেন?"EI Samay। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৯-০১ 
  10. সংবাদদাতা, নিজস্ব। "ভূত চতুর্দশী কেন পালন করা হয় জানেন?"anandabazar.com (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৯-০১ 
  11. "What is Bhut Chaturdashi?"Sangbad Pratidin (ইংরেজি ভাষায়)। ২০১৮-১১-০৪। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-১১-১৩ 
  12. ভট্ট্রাচার্য, আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালি। চিরঞ্জীব বনৌষধি। আনন্দ পাবলিশারস প্রাইভেট। পৃষ্ঠা ১।