বৈদ্য

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

‘বৈদ্য’ (সংস্কৃত: वैद्य) একটি সংস্কৃত শব্দ যার অর্থ চিকিৎসক, কবিরাজ বা ডাক্তার। বৈদিক যুগে যে-ব্রাহ্মণেরা সর্ববেদ পারদর্শী ছিলেন, তাঁদের বৈদ্য উপাধি দেওয়া হত। বেদ শব্দটি এসেছে বিদ ধাতু থেকে, যার অর্থ জানা। বেদ থেকে বৈদ্য।মহর্ষি শঙ্খ বলেছেন, ‘‘বেদোজ্জাতো হি বৈদ্যঃস্যাৎ’’, অর্থাৎ বেদ থেকে বৈদ্যের উৎপত্তি। আয়ুর্বেদ বেদেরই অংশ, আয়ুর্বেদকে বলা হয়েছে ঋগ্বেদের উপবেদ— ‘‘ঋগ্বেদস্য আয়ুর্বেদ উপবেদঃ’’। বৈদিক যুগে আয়ুর্বেদে পারদর্শী হয়ে চিকিৎসক হতে পারতেন একমাত্র ব্রাহ্মণরাই, তাই বৈদ্যদের বলা হত ত্রিজ। অর্থাৎ এক জন ব্রাহ্মণ সন্তানের, উপনয়নের পর দ্বিতীয় জন্ম এবং পরবর্তী কালে আয়ুর্বেদে পারদর্শী হওয়ার পর তৃতীয় জন্ম হত— ‘‘বৈদ্যস্ত্রিজঃ স্মৃতঃ’’ (মহর্ষি চরক)। ঋগ্বেদে ও যজুর্বেদে অনেক প্রমাণ আছে— ‘বৈদ্য’, জ্ঞানাধিক্য হেতু শ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণ। সায়নের টীকায় বলা হয়েছে, চিকিৎসা জ্ঞানসম্পন্ন বিদ্বান ব্রাহ্মণই বৈদ্য। ‘‘দ্বিজেষু বৈদ্যাঃ শ্রেয়াংসঃ’’— মহাভারতে দ্রুপদ কর্তৃক মনুর বচন। অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণই বৈদ্য।মহাভারতের উদ্যোগপর্বে বলা হয়েছে, ‘‘ প্রাণী অপ্রাণীর মধ্যে প্রাণীরা শ্রেষ্ঠ, প্রাণীদের মধ্যে বুদ্ধিমানরা শ্রেষ্ঠ, বুদ্ধিমানদিগের মধ্যে মানুষ শ্রেষ্ঠ, মানুষদিগের মধ্যে ব্রাহ্মণরা শ্রেষ্ঠ, ব্রাহ্মণগণের মধ্যে বৈদ্যরা শ্রেষ্ঠ, বৈদ্যগণের মধ্যে যাদের বুদ্ধি পরিণত হয়ে সাধনার অভিমুখে চালিত হয়েছে, তাঁরা শ্রেষ্ঠ। ’’ ফণিভূষণ আচার্যের ‘শব্দসন্ধান’-এ বৈদ্যের ব্যাখ্যা, ‘‘যিনি সর্ববিদ্যায় পারদর্শী: বৈদ্য, যিনি সকল বেদে দক্ষ: বৈদ্য এবং যিনি চিকিৎসাশাস্ত্রে কুশল: বৈদ্য।’’[১]

ভারতীয় উপমহাদেশের বঙ্গ বা বাংলা অঞ্চলে বসবাসকারী ভূমিপুত্র এবং চতুর্বেদ এ পারদর্শী হিন্দু জনগোষ্ঠী বৈদ্য বা বৈদ্যব্রাহ্মণ নামে পরিচিত এবং যা ভারতীয় পদ্ধতির আয়ুর্বেদ অনুশীলনকারি অর্থবহ। বাঙালি বৈদ্যরা বাংলা ভাষায় কথা বলে, যে ভাষাটি ইন্দো-অ্যারিয়ান ভাষার পরিবারভুক্ত। বাঙালি বৈদ্যরা মূলত হিন্দু দর্শনের অন্তর্গতশৈব, শাক্তবৈষ্ণব মতবাদের অনুসারী[২][৩]

মহাভারতের উদ্যোগ পর্বে বলাহয়েছে -মানুষের মধ্যে ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠ এবং ব্রাহ্মণ দের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বৈদ্যরা। বৈদ্য সম্প্রদায়ের মানুষ নিম্নলিখিত পদবী অথবা উপাধিগুলির ধারক হয়। যেমন- ওয়াদ্দেদার / কবিরাজ / করগুপ্ত / গুপ্ত / গুপ্তু / গুপ্তভায়া / গুপ্তশর্মা / গোস্বামী / চৌধুরী / দত্তগুপ্ত / দস্তিদার / দাশ / দাশগুপ্ত / / ধরগুপ্ত / নিয়োগী / পট্টনায়ক / ফৌজদার / বক্সি / বরাট / সেন বরাট / বিশ্বাস / মজুমদার / মল্লিক / মুন্সী / দাশমুন্সী / রক্ষিত / রায় / রায়চৌধুরী / সরকার / সেন / সেন চৌধুরী / সেনগুপ্ত / সেনশর্মা / খাস্তগীর প্রমুখ।বৈদিক ব্রাহ্মণদের ই একটি শাখা হলো বৈদ্য ব্রাহ্মণ গণ, অনেক পন্ডিত ব্যাক্তিদের মতে ব্রাহ্মণ দের মধ্যে যাঁরা চার বেদ ও চোদ্দো শাস্ত্র অধ্যয়ন করে পান্ডিত্ত অর্জন করতেন তাঁরা বৈদ্য নামে পরিচিতি লাভ করতেন এরা অন্য সকল ব্রাহ্মণ দের ন্যায় পৈতা ধারণ, দান গ্রহণ , অধ্যাপনা এবং নিজস্ব পুজা ইত্যাদির অধিকারী।

পাঞ্জাবি বৈদ্য স্বারস্বত ব্রাহ্মণ[সম্পাদনা]

পাঞ্জাবি বৈদ্যরা পাঞ্জাবি সারস্বত ব্রাহ্মণ।[৪]

উৎপত্তি ও জাতিতত্ব[সম্পাদনা]

প্রাচীণকালে সকল শ্রেণীর ব্রাহ্মণ বৈদ্য হতে পারত।কালক্রমে পেশাগত কারণে বৈদ্যদের একটি স্বতন্ত্র সমাজ গড়ে ওঠে এবং নিজেদের মধ্যে আয়ুর্বেদ,অথর্ববেদ ছাড়াও গুপ্তবিদ্যা বা স্বতন্ত্র দক্ষতাসম্পন্ন চিকিৎসাবিদ্যার প্রসার লাভ করে এবং বংশানুক্রমিক আলাদা একটি সম্প্রদায়ের সূচনা হয়।এ কারণে অন্য পেশার ব্রাহ্মণরা চাইলেও আর বৈদ্যদের সমকক্ষ পেশাদারী হতে পারত না।প্রাচীণ ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থা চিকিৎসা ক্ষেত্রে বৈদ্যদের উপর নির্ভরশীল ছিল।মুসলিম শাসনামলে ইউনানী, ইংরেজ উপনিবেশিক কালে হোমোপ্যাথিক এবং অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা ব্যবস্থার আবির্ভাব হলে বৈদ্যব্রাহ্মণ শ্রেণির প্রভাব কমে যায় এবং বৈদ্যদেরকে প্রচুর পরিমাণে নিজ পেশা পরিবর্তন করে অন্যান্য আধুনিক পেশায় নিয়োজিত হতে দেখা যায়।

প্রচলিত একটি মতে দেবাসুরের সমুদ্র মন্থনকালে ধন্বন্তরীর জন্ম হয় এবং বৈদ্যরা তার উত্তরপুরুষ। অন্য মতে ধন্বন্তরীর জন্ম হয় জনৈক মুনির বৈদিক মন্ত্র জপের মাধ্যমে খড়ের গাদা থেকে, তাই তিনি বৈদ্য নামে পরিচিত হন। যেহেতু তার পিতা ছিল না এবং তিনি এক পালিকা মায়ের আদর-যত্নে বড় হন, সেহেতু তাকে বলা হয় অম্বষ্ঠতবে অনেকে মনেকরেন বৌদ্ধ রাজত্ব কালে তাঁদের নানাবিধ দক্ষতার কারনে অন্য ব্রাহ্মণ অপেক্ষা সম্মানের আসনের অধিকারী হতেন বৈদ্যব্রাহ্মণ সম্প্রদায়, তাই তাঁদের হেয় প্রতিপন্ন করার জন্যই অন্য শ্রেণীর ব্রাহ্মণরা অম্বষ্ঠ শব্দের অবতারণা করেছিলেন, সম্প্রদায়ের মধ্যে এমন একটি মতও প্রচলিত আছে যে, অম্বষ্ঠ নামে সিন্ধুনদের তীরে একটি স্থান ছিল; সেখান থেকে বৈদ্যদের একটি দল দক্ষিণ ভারতে এবং অন্য একটি দল বাংলায় আসে।[৫]

প্রাচীন কাল[সম্পাদনা]

ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণের বর্ণনানুসারে ব্রাহ্মণ পিতা ও বৈশ্যমাতার সন্তানরা অম্বষ্ঠ, আর দেবচিকিৎসক অশ্বিনীকুমারের ব্রাহ্মণী স্ত্রীর সন্তানরা বৈদ্য। বৃহদ্ধর্মপুরাণে বৈদ্যবর্ণের উল্লেখ না থাকলেও অম্বষ্ঠদের উত্তম সংকর-শূদ্র উপবর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের বৃত্তি চিকিৎসা ও আয়ুর্বেদ চর্চা বিধায় তারা বৈদ্য নামে পরিচিত।[৬]

মধ্যযুগ[সম্পাদনা]

আধুনিক যুগের প্রথমভাগ[সম্পাদনা]

বৈদ্য রাজত্ব এবং রাজা[সম্পাদনা]

সেন রাজবংশ কিঞ্চিদধিক একশ বছর (১০৯৭-১২২৫ খ্রিষ্টাব্দ) বাংলা শাসন করে। প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে একাদশ শতাব্দীর অন্তিমলগ্নে পাল রাজবংশের অবসান ঘটিয়ে সেনদের উত্থান একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূ্র্ণ অধ্যায়। বাংলার পাল রাজবংশের রাজা দ্বিতীয় মহীপালের রাজত্বকালে বারেন্দ্র 'সামন্তচক্রের' বিদ্রোহের সুযোগ নিয়ে সেন রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা বিজয় সেন পশ্চিমবঙ্গে ক্রমশ স্বীয় আধিপত্য বিস্তার করেন এবং অবশেষে বাংলার পাল রাজবংশের রাজা মদনপালের রাজত্বকালে স্বাধীন সত্ত্বার বিকাশ ঘটান। বাংলায় সেন শাসনের বিশেষ তাৎপর্য এই যে, সেনগণই সর্বপ্রথম সমগ্র বাংলার ওপর তাদের নিরঙ্কুশ শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন। ভারতবর্ষের ইতিহাসে বাংলার সেন বংশীয় রাজাদের মধ্যে বিজয় সেন, বল্লাল সেন, ও লক্ষ্মণ সেন বিশিষ্ট স্থান অধিকার করছেন।

লক্ষ্মণ সেন ছিলেন বৈষ্ণব মতবাদের কঠোর অনুসারী। তিনি 'পরমবৈষ্ণব' বা 'পরমনরসিংহ' উপাধি ধারণ করেন। তার ধর্মমত পরিবর্তন সম্পর্কে সঠিক কিছু জানা যায় না। লক্ষ্মণ সেন তার অসামান্য গুণাবলী ও দানশীলতার জন্য খ্যাত ছিলেন। তবকাত-ই-নাসিরীর লেখক মিনহাজ-উস-সিরাজ তার দানশীলতায় মুগ্ধ হয়ে তাকে বাংলার 'মহান রায়' হিসেবে অভিহিত করেন এবং দিল্লীর সুলতান কুতুবউদ্দিন আইবকের তুল্য বিবেচনা করেন। তার শাসনকালের শেষ দিকে অবশ্য লক্ষ্মণ সেন রাজকার্য পরিচালনায় অশক্ত হয়ে পড়েন। এই সময় সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা ও সংহতির অভাব পরিলক্ষিত হয়। সমসাময়িক লেখসূত্রে সেন রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে বেশ কতগুলি বিদ্রোহী প্রধানের মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার আভাস পাওয়া যায়।

প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে সেন রাজবংশের রাজত্বকাল দীর্ঘস্থায়ী না হলেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাল সাম্রাজ্যের পতনের পর বাংলায় যে রাজনৈতিক অনৈক্য দেখা দিয়েছিল, সেন রাজারা তা রোধ করেন। সেন রাজারা ছিলেন গোঁড়া হিন্দু। তাই এই সময় বাংলায় হিন্দুধর্ম রাজ-পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে এবং সমাজে ব্রাহ্মণদের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। মুসলমান রাজত্বকালেও যে বাংলায় হিন্দু সংস্কৃতি টিকে ছিল, তার অন্যতম কারণ এই সংস্কৃতিতে সেন রাজাদের অবদান। সেন রাজাদের শাসন শেষ হলে বাংলায় তুর্কি শাসন শুরু হয়।

দেশবিভাগোত্তর কাল[সম্পাদনা]

বিশিষ্ঠ বাঙ্গালী বৈদ্য[সম্পাদনা]

সাহিত্য[সম্পাদনা]

গোত্র[সম্পাদনা]

বৈদ্যরা নিম্নপ্রকার গোত্রভুক্ত হয়ে থাকে।

  • আত্রেয়া
  • আদ্যঋষি
  • কাশ্যপ
  • কৃষ্ণাত্রেয়
  • কৌশিকি
  • ধন্বন্তরি
  • পরাশর
  • বৈশ্বানর
  • ভরদ্বাজ
  • মৌদ্গল্য
  • যামদগ্নি
  • শক্তিঋষি
  • শক্ত্রি
  • শান্ডিল্য
  • সত্ত্বরী
  • সপ্তঋষি
  • সালংক্রায়ন
  • অলাদি
  • অগ্নি
  • মৃগঋষি
  • বিন্ধ্যশক্তি

তথ্যসূত্রঃ[সম্পাদনা]

  1. "সম্পাদক সমীপেষু: আর তাঁর কথা?"anandabazar.com। সংগ্রহের তারিখ ২০ এপ্রিল ২০২০ 
  2. "হিন্দুধর্ম কি?", পৃ নং ২৭
  3. "The Home and the World", রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, পৃ নং ৩২০
  4. Dutta, Anil (১০ মার্চ ২০১১)। "Vaidya as Punjabi Saraswat Brahmin"Wikipedia। সংগ্রহের তারিখ ১০ নভেম্বর ২০১৯ 
  5. "উৎপত্তি"
  6. "প্রাচীন কাল"