বিশ্বায়নের ইতিহাস

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

বিশ্বায়নের উৎপত্তির ইতিহাস একটি চলমান বিতর্কের বিষয়। যদিও কয়েকজন পণ্ডিত মনে করেন, বিশ্বায়নের ধারণাটির সূত্রপাত হয়েছে আধুনিক যুগে, অন্যরা ভিন্নমত পোষণ করে বলেন যে এর সুদীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। অনেক লেখক বিশ্বায়নের শুরুর সময়কে পেছনের দিকে প্রসারিত করে যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছেন যে বিশ্বায়নের ধারণা রাজনৈতিক বিশ্লেষণের সাথে সম্পূর্ণ অচল ও অর্থহীন।[১]

প্রাচীন যুগের বিশ্বায়ন[সম্পাদনা]

আন্দ্রে গ্রান্দার ফ্র্যাঙ্ক একজন জার্মান-আমেরিকান অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ ও সমাজ বিজ্ঞানী এবং নির্ভরশীলতা তত্ত্বের সমর্থক, বিশ্বায়নের উৎপত্তি সুদূর অতীতে - এ ধারনার একজন (সম্ভবত) গোঁড়া সমর্থক। ফ্র্যাঙ্ক মনে করেন, খ্রিষ্টপূর্ব তিন হাজার অব্দে[২] যখন সুমেরীয়সিন্ধু সভ্যতার মাঝে বাণিজ্যের প্রচলন ঘটে তখন থেকে বিশ্বায়নের ধারণা বর্তমান। আলোচকদের মতে এ ধারনাটি বিশ্বায়নের অতিব্যপক একটি সংজ্ঞার উপর নির্ভরশীল।

১৪৯২ থেকে বর্তমান পর্যন্ত উপনিবেশ সাম্রাজ্য

তিনবার পুলিৎজার পুরস্কার প্রাপ্ত আমেরিকান সাংবাদিক ও লেখক থমাস ফ্রেডিম্যান বিশ্বায়নের ইতিহাসকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করেনঃ বিশ্বায়ন ১.০(১৪৯২-১৮০০), বিশ্বায়ন ২.০ (১৮০০-২০০০) এবং বিশ্বায়ন ৩.০ (২০০০-বর্তমান)। তিনি বলেন বিশ্বায়ন ১.০ বিভিন্ন দেশের মাঝে বিশ্বায়ন সম্পর্কিত, বিশ্বায়ন ২.০ বিভিন্ন কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানের মাঝে সম্পর্কিত এবং বিশ্বায়ন ৩.০ ব্যক্তি সম্পর্কিত বিশ্বায়ন। [৩]

আধুনিক বিশ্বায়নের শিকড় এমনকি প্রাগৈতিহাসিক যুগের শুরুর দিকে খুঁজলেই পাওয়া যায়। তখনকার মানুষ পাঁচ মহাদেশে তাদের ভৌগোলিক সীমানা বাড়িয়েছেন যা বিশ্বায়ন প্রতিষ্ঠার এক গুরুত্বপূর্ণ উপদান। কৃষির উন্নয়ন যাযাবর জাতিকে বসতি স্থাপন করে সুস্থিত জীবনযাপনে সহায়তা করেছে যা বিশ্বায়নের ধারণাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। কিন্তু তাদের মাঝে যোগাযোগ ও প্রযুক্তির অভাব থাকায় বিশ্বায়ন ত্বরান্বিত হয়নি।[৪] উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে মানুষ যখন মূলধন ও শ্রমের গতিশীলতার সাথে পরিবহন খরচ কমিয়ে একটি ছোট বিশ্বের দিকে এগিয়ে যায় তখন বিশ্বায়নের সমসাময়িক ধারাগুলো প্রবর্তিত হতে থাকে। [৫]

সিল্ক রোড ও মসলা বাণিজ্যের রাস্তা, নৌ ও স্থল পথ
ত্রয়োদশ শতাব্দীর বিশ্ব ব্যবস্থা

পূর্বে হেলেনীয় যুগে(অ্যালেক্সান্ডার দি গ্রেট এঁর মৃত্যু থেকে রোম সাম্রাজ্যের উত্থান পর্যন্ত সময়। ) ভারত থেকে স্পেন পর্যন্ত বিস্তৃত বাণিজ্যিক নগর কেন্দ্রগুলো এবং আলেকজান্দ্রিয়া, অ্যাথেন্স ও এ্যাণ্টিয়কের মত শহরগুলো সুবিস্তৃত গ্রিক সংস্কৃতিকে ঘিরে প্রবর্তিত হয়। সে সময়ের বৈশ্বিক অর্থনীতি ও সংস্কৃতির একটি ধারা যা প্রাচীন বিশ্বায়ন নামে পরিচিত। তখন ব্যাবসা-বাণিজ্য বিশ্বব্যাপী প্রচলিত ছিল আর সে সময়েই প্রথমবারের মত ' বৈশ্বিক উদার দৃষ্টিভঙ্গি' ধারণার জন্ম হয়। আবার অনেকেই রোমান সাম্রাজ্য, পার্থিয়ান সাম্রাজ্য ও হান সাম্রাজ্যের মধ্যকার বাণিজ্যিক যোগাযোগকে বিশ্বায়নের পূর্বরূপ হিসাবে মনে করেন। এই সাম্রাজ্যগুলোর মধ্যে বর্ধিষ্ণু বাণিজ্যিক যোগাযোগ রেশম পথ(Silk Road) তৈরিতে ভুমিকা রেখেছে, যা পশ্চিম চীন থেকে শুরু করে পার্থিয়ান সাম্রাজ্যের(ইরানের উত্তর-পূর্ব অঞ্চল) সীমা ও আরও সামনে রোম পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল । [৬]

ইসলামি স্বর্ণযুগ, বিশ্বায়নের পূর্ব ধাপগুলোর একটি, যখন ইহুদি ও মুসলিম বনীকগণ এবং পর্যটকরা বিশ্বব্যাপী একটি টেকসই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যখন গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যশস্য যেমন চিনি, তুলা ইত্যাদি অধিক পরিমাণে মুসলিম বিশ্বে চাষাবাদ করা হত। ফলত ফসল, ব্যাবসা-বাণিজ্য ও জ্ঞান বিজ্ঞানে বিশ্বায়ন ঘটে। অন্যদিকে আরবি শিক্ষাহজ্জব্রত পালন বৈশ্বিক উদার দৃষ্টিভঙ্গির সৃষ্টি করে। [৭]

মধ্যপ্রাচ্য ও চীনের বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোকে অস্থিতিশীল করে মঙ্গল সাম্রাজ্যের আগমন, রেশম পথ দিয়ে যাতায়াতকে সুগম করে। যা মার্কোপোলোর মত পর্যটক ও ধর্ম প্রচারকদের ইউরেশিয়ার এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত ভ্রমণ সহজতর এবং লাভজনক করে। ইউরেশিয়া অঞ্চলে মঙ্গল সাম্রাজ্যের বিজয় সে অঞ্চলের সমাজ সংস্কৃতি ও অর্থনীতির উপর প্রভাব ফেলে। এ প্রভাব প্যাক্স মঙ্গলিকা নামে পরিচিত। তাই এটাই প্রতীয়মান হয় যে প্যাক্স মঙ্গলিকা ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মধ্য এশিয়ায় উল্লেখযোগ্যভাবে সমাজ সংস্কৃতি ও অর্থনীতির উপর বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে।[৮] তখন আন্তর্জাতিক ডাক সেবা চালু হয়, সংক্রমণ রোগ যেমন বিউবনিক প্লেগ মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে। এ সকল আধুনিক-পূর্ব বৈশ্বিক পর্যায়গুলো, যেগুলো পৃথিবীর এক গোলার্ধ থেকে অপর গোলার্ধে ঘটে তাই প্রাচীন বিশ্বায়ন নামে পরিচিত। অর্থাৎ ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত এ সকল আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রের পারস্পারিক বিনিময় পুরাতন বিশ্বে ঘটেছে বলে ধরে নেওয়া হয়।

প্রারম্ভিক বিশ্বায়ন[সম্পাদনা]

সতেরো শতাব্দীতে পর্তুগীজ জাহাজ

প্রাচীন বিশ্বায়নের পরবর্তী ধাপ প্রারম্ভিক বিশ্বায়ন। এ ধাপকে প্রারম্ভিক বলার কারন এটি আধুনিক বিশ্বায়নের পূর্বের ধাপ। এ সময়ে অর্থাৎ ষোড়শ-সপ্তদশ শতাব্দীতে কয়েকটি ইউরোপীয় (সামুদ্রিক) সাম্রাজ্যের উত্থান ঘটে। প্রথমে পর্তুগীজস্পেন পরে ওলন্দাজব্রিটিশ সাম্রাজ্য। সপ্তদশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যাকে প্রথম বহুজাতিক কর্পোরেশন মনে করা হয় এবং ওলন্দাজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মত অনেক রাজকীয় কোম্পানির(Chartered Companies) ব্যক্তিগত বাণিজ্যের ঘটনা দ্বারা বিশ্বায়ন সাধিত হয়।

ভৌগোলিক আবিষ্কারের যুগে বিশ্বায়নে ব্যাপক পরিবর্তন আসে, যার প্রথম পর্যায়ে নতুন বিশ্বের(আমেরিকা ও এর আশেপাশের দ্বীপসমূহ) সাথে ইউরেশিয়া ও আফ্রিকার সাংস্কৃতিক, জৈবনিক ও বস্তুগত দিক দিয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সাধিত হয়। এ পরিবর্তন শুরু হয় পনেরো শতাব্দীর শেষের দিকে, যখন ইবেরীয় ও কাস্টিল সাম্রাজ্যদ্বয় উত্তমাশা অন্তরীপ ও আমেরিকার দিকে সামুদ্রিক যাত্রা করে এবং ১৪৯২ সালে ক্রিস্টোফার কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করে। ষোড়শ শাতাব্দীর শেষের অল্প আগে, রাজকীয় একছত্র আধিপাত্যে পর্তুগীজরা কাসা দা ইন্ডিয়া নামে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্র চালু করে, এবং বিভিন্ন দেশের স্থানীয় পণ্য যেমন দাস, সোনা, মসলা, কাঠ ইত্যাদির ব্যবসার জন্য বাণিজ্যকুঠি স্থাপন করে।[৯]

নতুন বিশ্বের খাদ্য যা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পরেছে, ভুট্টা, টমেটো, আলু, ভানিলা, রাবার, কোকো, তামাক

এভাবে আমেরিকায় ইউরোপীয় উপনিবেশ স্থাপনের মধ্যদিয়ে বৈশ্বিক অঙ্গীভূতকরণ চলতে থাকে, ফলে কলম্বীয় বিনিময়ের মাধ্যমে পূর্বপশ্চিম গোলার্ধে অতি ব্যাপকহারে বৃক্ষ, জীবজন্তু, খাদ্য, মানুষ(দাস সহ), সংক্রমণ রোগ ও সংস্কৃতির বিনিময় হতে থাকে।[১০] ইউরোপীয় নাবিকদের মাধ্যমে আমেরিকা থেকে বিভিন্ন নতুন নতুন খাদ্যশস্যের আগমন বিশ্ব জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। [১১]

আধুনিক বিশ্বায়ন[সম্পাদনা]

উন্নত উৎপাদন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার কারনে উনিশ শতকে গ্রেট বৃটেন পৃথিবীর প্রথম বৃহৎ অর্থনৈতির দেশে পরিণত হয়।

উনিশ শতকে বিশ্বায়ন আধুনিকতার দিকে এগিয়ে যায়। শিল্প প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন বাড়িয়ে খরচ কমানোর নীতি ব্যবহার হয়, এতে দ্রব্যসামগ্রীর দাম কমে যায়। অপরদিকে বর্ধিত জনসংখ্যার নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের চাহিদাও বাড়তে থাকে। এ শতকের সাম্রাজ্যবাদ নীতি বিশ্বায়নকে চূড়ান্ত রূপ দেয়। প্রথম ও দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধে চীনের বিরুদ্ধে বৃটেনের জয়লাভ ও ভারতে বৃটেনের আধিপত্যের কারনে চীন ও ভারত ইউরোপীয় পণ্যের বাঁধা ভোক্তা হয়ে যায়। এটা সেই সময় যখন আফ্রিকান সাব সাহারা ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপগুলো নতুন বিশ্বের অন্তর্ভূক্ত হয়। ফলে ইউরোপীয়রা এতদাঞ্চল হতে বিশেষ করে আফ্রিকান সাব সাহারা থেকে প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ যেমন রাবার, হীরা, কয়লা আহরণ করে। যা ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও তাদের উপনিবেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বাণিজ্য ও বিনিয়োগকে বাড়িয়ে দেয়।[১২]

সে সময় লন্ডনবাসি সকালে চা পান করতে করতে বিশ্বের যেকোন পণ্যের অর্ডার টেলিফোনে দিতে পারত। যা আবার গ্রহণযোগ্য নির্দিষ্ট সময়ে তাদের হাতে পৌঁছাতো। সে সোনালী সময়ের অর্থনৈতিক উন্নয়নের চমৎকার ধারা যা ১৯১৪ সালের আগস্টে থেমে যায়।

উনিশ শতক ও বিশ শতকের বিশ্বায়নের মধ্যে দুই দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বিদ্যমান। যার প্রথম দিকে আছে শতাব্দীর বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থা অপরদিকে মূলধন, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা।

বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থা[সম্পাদনা]

২০ শতকের বিশ্ব বাণিজ্যে আমদানি-রপ্তানি পণ্যের ব্যপকতা, সেবা খাতের উন্নয়ন ও বহুজাতিক ফার্মের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। এ সময় আমদানি-রপ্তানি বৃদ্ধি পায়। ১৯ শতকের চেয়ে ২০ শতকে সেবা খাতের ব্যবসাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। অপর যে বিষয়টি এই দুই শতকের বৈশ্বিক বাণিজ্যকে পৃথক করে তা হল বহুজাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি। বহুজাতিক সহযোগিতার কারনে ১৯ শতকের তুলনায় ২০ শতকে বাণিজ্যের আকস্মিক উন্নয়ন ঘটে। ২০ শতক শুরুর পূর্বে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু পোর্টফোলিও বিনিয়োগ হয়, বাণিজ্য বা উৎপাদন সম্পর্কিত কোন সরাসরি বিনিয়োগ দেখা যায়নি।

২০ শতকে বাণিজ্যিক সমন্বয় ঘটে, বাণিজ্যে প্রতিবন্ধকতা দূর কমে যায় ও পণ্য পরিবহন খরচ কমে যায়। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন চুক্তি ও মতৈক্যে পৌঁছায়, ফলে সৃষ্টি হয় শুল্ক ও বাণিজ্যে সাধারণ চুক্তি, উত্তর আমেরিকার মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাইউরোপীয় ইউনিয়নের মত প্রতিষ্ঠান। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাণিজ্যে শুল্ক বাধা অনেকাংশে হ্রাস করে। ১৮৯০ থেকে শুরু করে প্রথম বিশ্ব যুদ্ধ পর্যন্ত বাণিজ্যে অস্থিতিশীলতা বিরাজ করে কিন্তু যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন স্থিতিশীলতার দিকে যায়। জাতীয় পণ্য দেখভালের দায়িত্ব মানুষ নিজেই নিয়ে নেয়, তারা এটাও নিশ্চিত করে যে কোন বিদেশি পণ্য দেশীয় পণ্যের স্থান দখল সমাজে বেকারত্ব বাড়িয়ে সমাজকে অস্থিতিশীল করে তুলছে কি না। প্রযুক্তির উন্নয়ন পরিবহন খরচ কমিয়ে দিয়েছে, ১৯ শতকে পণ্য পরিবহনে যেখানে সপ্তাহ থেকে মাসাধিক কাল লাগতে সেখানে ২০ শতকে তা কয়েক ঘণ্টা থেকে অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই এক মহাদেশ থেকে আরে মহাদেশে পরিবহন করা যাচ্ছে।

মূলধন, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা[সম্পাদনা]

আর্থিক সংকট বিবেচনায় এই দুই শতকের মাঝে আরেকটি মূল পার্থক্য হল আর্থিক ব্যবস্থা। ১৯ শতকে যা স্বর্ণ আদর্শের স্থির বিনিময় হারে ঘটে কিন্তু ২০ শতকে তাকে নিয়ন্ত্রিত উপায়ে উঠানামা করতে দেওয়া হয়। ১৯ শতকে দেশগুলোতে শেষ আশ্রয় হিসাবে মহাজনী ঋণ ব্যবস্থার প্রবর্তিত হয়, সেসব দেশে নয় যেগুলোতে ইতোমধ্যেই মহাজনী ঋণের কুফল প্রত্যক্ষ করেছে । এর এক শতক পরেই উত্থানশীল দেশগুলোতে দেশীয় আর্থিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রদান করা হয় যাতে ব্যাংকগুলো তারল্য সংকটে পড়লে সরকার তা অধিগ্রহণ করে তারল্য সংকট কাটিয়ে তোলার চেষ্টা করে। ব্যাংকিং খাতের অস্থিতিশীলতা কাটিয়ে ওঠা অপর একটি মুল পার্থক্য। ব্যাংক সংকট কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা ২০ শতাব্দীতে প্রথমের দিকেই শুরু হয়। ১৯ শতাব্দীতে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর সংকট কাটিয়ে ওঠার কোন সহায়তা ছিল না । কিন্তু বর্তমান সময়ে এধরনের উদ্ধার সহায়তা অর্থনৈতিক দৃশ্যপটে একটি সাধারণ দৃশ্য।

১৯ শতকে তথ্যপ্রবাহে বিশেষ সুবিধা সৃষ্টি হয়নি। আটলান্টিক সাগরের টেলিগ্রাফ সংযোগ ও বেতার আবিষ্কারের আগে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে তথ্য স্থানান্তরে অনেক সময় লাগত। তাই অর্থনৈতিক তথ্য বিশ্লেষণ করা একটু কঠিন। যেমন কুঋণ ও সুঋণের মধ্যে পার্থক্য করা খুব সহজ কাজ নয়। আর তাই এই অপ্রতিসম তথ্য প্রবাহ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এক্ষেত্রে রেলওয়ে ঋণপত্র কে একটা ভাল উদাহরন হিসাবে বলা যায়। তাছাড়া চুক্তি সংক্রান্ত জটিলতা ও পরিলক্ষিত হয়। কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে পৃথিবীর এক স্থান থেকে অন্য স্থানে তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করা কষ্টকর ছিল, যা স্পষ্টতই বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এক বড় বাধা। কতিপয় সামষ্টিক অর্থনৈতিক নিয়ামক যেমন ঝুঁকি বিনিময়, অনিশ্চিত আর্থিক নীতি ও বিনিয়োগ কে ব্যহত করে। ১৯ শতকে যুক্ত্ররাষ্ট্রে হিসাব বিজ্ঞানের ধারণা তুলনামূলকভাবে অনুন্নত ছিল। তবে বৃটেনের বিনিয়গকারীরা এ অবস্থার উন্নয়নে উদীয়মান অর্থনীতির বাজারগুলোকে তাদের প্রায়োগিক জ্ঞান দিয়ে সহায়তা করে।[১৩]

প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের ফলাফলঃ বিশ্বায়নে ধ্বস[সম্পাদনা]

"আধুনিক বিশ্বায়ন"-এর প্রথম পর্ব ২০ শতাব্দীর শুরুর দিকে প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের কারনে ক্ষয়ে যেতে থাকে। তখন ইউরোপীয় শাসিত অঞ্চলগুলো 'অন্যদের' এমনসব ব্যাপারের সম্মুখীন হয় যাতে তারা নিজেরাই বিশ্বের নীতিনৈতিকতার অভিভাবক হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বর্ণবাদী ও অসম দৃষ্টিভঙ্গির সাথে তারা পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চল হতে সম্পদ আহরণ শুরু করে। ১৮৫০ এর দিকে বিশ্ব বাণিজ্য বৃদ্ধির প্রারম্ভ থেকে ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ছড়িয়ে পরার পূর্ব পর্যন্ত সময় তৃতীয় বিশ্বে সরাসরি উপনিবেশ শাসনকে উৎসাহিত করেছে। যখন অন্যান্য ইউরোপীয় মুদ্রা চারিদিকে ভালভাবে ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন সম্পদ অর্জনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।[১৪] তাই সাহিত্যিক ভিএম ইয়েটস প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারন হিসাবে বিশ্বায়নের অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর সমালোচনা করেছেন।[১৫] বলা চলে এই অর্থনৈতিক শক্তিগুলোই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের জন্য আংশিক দায়ী। যেমন বলা যায় ২০ শতাব্দীর আফ্রিকায় ফ্রান্সের উপনিবেশগুলোর কথা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আগে আফ্রিকায় ফ্রান্সের তেমন কোন লক্ষ-উদ্দেশ্য ছল না। সে দিক থেকে ফ্রান্স সেগুলোকে হৃত রাষ্ট্র হিসাবেই গণ্য করত। ফ্রান্সের কাছে আফ্রিকার অর্থনীতির চেয়ে সামরিক শক্তির গুরুত্ব বেশি পায়। সেটা তারা একটু পরে হলেও বুঝতে পারে। ফ্রান্স আর্মিতে আফ্রিকানদের খাটো চোখে দেখা হত। ১৯১৭ সালে উপনিবেশ শাসনের জন্য যখন আর্থিক প্রণদনার বিষয়টি সামনে আসে তখন ফ্রান্স খাদ্য ঘাটতিতে পরে। এটি ঘটে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার পর যখন ফ্রান্স কৃষি ক্ষেত্রে পিছিয়ে যায় কেননা ১৯১৭ সালে তাদের সার কীটনাশক ও কৃষির যন্ত্রপাতির অভাব ছিল।[১৬]

দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধোত্তর বিশ্বঃ বিশ্বায়নের পুনরুত্থান[সম্পাদনা]

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে বিশ্ব নেতাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বিশ্ব বাণিজ্যিক বাঁধাগুলো দূর হয়, ফলে অল্প হলে তা বিশ্বায়নে ভূমিকা রাখে। বিশ্ব নেতাদের চেষ্টায় ব্রেটন উড সম্মেলনে তৎকালীন অগ্রগণ্য নেতারা বিশ্ব অর্থনীতি ও বাণিজ্যের একটি কাঠামো প্রণয়ন করেন। বিশ্বায়নের গতি সন্তোষজনক হচ্ছে কি না তা পর্যবেক্ষণের জন্য আরও কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ ভিত্তিক বহুজাতিক কর্পোরেশন গুলোর ব্যপকতা, বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তির উন্নয়ন বিশ্বায়নকে আরও বেগবান করে। ব্রিটানিকা বিশ্বকোষ অনুসারে ঐ সময়ে পশ্চিমা বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ অনেক আবিষ্কারও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে।[১৭] আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও প্রসার বিশেষ ভূমিকা রাখে।

ঐ রকম আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আছে উন্নয়ন ও পুনর্গঠনে আন্তর্জাতিক ব্যাংক(বিশ্বব্যাংক), আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল। শুল্ক ও বাণিজ্যের সাধারণ চুক্তির অধিনে বিভিন্ন বাণিজ্যিক সম্মেলন অনুষ্ঠান ও বাণিজ্যের বাঁধাগুলো দূর করে মুক্ত বাণিজ্যের পথ প্রসারিত হয়, প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং পরিবহন খাতে খরচ কমে যায়। ইত্যাদি কারনে বিশ্বায়ন ত্বরান্বিত হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে বৈদেশিক বাণিজ্যের বাঁধাগুলো উল্লেখযোগ্য পরিমানে কমে যায়। GATT এর মাধ্যমে বিশেষ বিশেষ উদ্যোগ গৃহীত ফলত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সৃষ্টি হয়।

নিম্নোক্ত কার্যপরিধি নিয়ে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা:

  • মুক্ত বাণিজ্য বৃদ্ধি
  • শুল্ক দূর করা, শুল্কহীন বা অল্প শুল্কে 'মুক্ত বাণিজ্যিক এলাকা' তৈরি।
  • পরিবহন খরচ কমানো, সমুদ্রপথে পরিবহনের ক্ষেত্রে কন্টেইনার ব্যবস্থার প্রবর্তনে খরচ কমে যায়।
  • পূঁজি নিয়ন্ত্রন ব্যবস্থা দূর করা বা কমানো
  • স্থানীয় ব্যবসায় ভর্তুকি কমানো, দূরকরা বা সমন্বয় সাধন করা
  • বিশ্ব কর্পোরেশনগুলোর জন্য ভর্তুকির ব্যবস্থা করা
  • অধিক নিয়ন্ত্রন আরোপ করে অধিকাংশ রাষ্ট্রে মেধাসত্ত্ব আইনের সমন্বয়
  • মেধাস্বত্বের আধিরাষ্ট্রিক স্বীকৃতি ( যেমন চীনের মেধাস্বত্বে যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি)

পশ্চিমা সাংস্কৃতিক শিল্পের বাজার ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সাংস্কৃতিক বিশ্বায়নকে চালিত করেছে, এটাকে প্রথমে ভাবা হচ্ছিল বিশ্বব্যাপী সমসংস্কৃতির বিন্যাস হিসাবে কেননা, তখন প্রথাগত বৈচিত্রের বিনিময়ে বিশ্বব্যাপী আমেরিকান সংস্কৃতির প্রভাব লক্ষ করা গেছে। যা হোক, অচিরেই বিশ্বায়নের বিপরীতে একটি সুস্পষ্ট আন্দোলন প্রতীয়মান হয়, যা দেশীয় সাংস্কৃতির স্বাতন্ত্য রক্ষার জন্য শুরু হয়।[১৮]

উরুগুয়ে সম্মেলনের (১৯৮৬-১৯৯৪)[১৯] মাধম্যে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সৃষ্টি হয়। যা বিশ্ব বাণিজ্য সম্মপর্কিত বাঁধাগুলো দূর করে বাণিজ্যের জন্য সকলের সমান ক্ষেত্র প্রস্তুত করে। শুল্ক হ্রাস ও বাণিজ্যিক বাঁধা দূর করতে অন্যান্য দ্বিপাক্ষীয় ও বহুপাক্ষীয় বিভিন্ন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় যেমন ইউরোপের ম্যাস্ট্রিক্ট চুক্তি, আমেরিকান মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ইত্যাদি।

১৯৭০ সালে যেখানে রপ্তানি বৃদ্ধি ছিল ৮.৫% ২০০১ সালে তা ১৬.২% এ উত্তীর্ণ হয়।[২০] নব্বইয়ের দশকে ইন্টারনেট ও কম্পিউটারের মাধ্যমে সেইসকল জায়গা থেকে কাজ করে নেওয়া হয় যেখানে কম মজুরি দিতে হয়। যেমন বিভিন্ন হিসাব সংক্রান্ত কাজ, সফটওয়ার ডেভলপমেন্ট, বিভিন্ন প্রকৌশল নকশা ইত্যাদি।

২০০০ দশকের শেষের দিকে অনেক শিল্প সমৃদ্ধ দেশে মন্দা দেখা দেয়।[২১] তাই অনেক বিশ্লেষক মনে করেন বছর ধরে চলতে থাকা এই বর্ধিষ্ণু সংহতির পরে পৃথীবি এখন বিশ্বায়নের বিপরীতে চলছে।[২২][২৩] সম্প্রতি চীন জার্মানকে ডিঙিয়ে বিশ্বের বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশ হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে। [২৪]

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. See Conversi, Daniele (2010) 'The limits of cultural globalisation?', Journal of Critical Globalisation Studies, 3, pp. 36–59.
  2. Andre Gunder Frank, "Reorient: Global economy in the Asian age" U.C. Berkeley Press, 1998
  3. Thomas L Friedman, "It's a Flat World, After All", New York Times Magazine; Apr 3, 2005
  4. Steger, Manfred (2009). "Globalization: A Very Short Introduction". Oxford University Press
  5. "Globalization and Development". Retrieved 4 March 2013.
  6. Silkroad Foundation, Adela C.Y. Lee. "Ancient Silk Road Travellers". Silk-road.com. Retrieved 2010-07-31.
  7. John M. Hobson (2004), The Eastern Origins of Western Civilisation, pp. 29–30, Cambridge University Press, ISBN 0-521-54724-5.
  8. Jack Weatherford, Genghis Khan and the Making of the Modern World, Crown, 2004
  9. House of India, Encyclopædia Britannica.
  10. Crosby, Alfred W., "The Columbian exchange: biological and cultural consequences of 1492", Greenwood Publishing Group, ISBN 0-275-98073-1
  11. "The Columbian Exchange ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ১২ আগস্ট ২০১১ তারিখে". The University of North Carolina.
  12. "PBS.org". PBS.org. 1929-10-24. Retrieved 2010-07-31.
  13. Michael D. Bordo, Barry Eichengreen, Douglas A. Irwin. Is Globalization Today Really Different than Globalization a Hundred Years Ago?. NBER Working Paper No. 7195. June 1999.
  14. Steger, Manfred. Globalization: A Very Short Introduction. United States: Oxford University Press Inc.,New York, 2009. 28–37.
  15. VM Yeates. Winged Victory. Jonathan Cape. London. 1962 pp. 54–55
  16. Andrew, C.M., and A.S. Kanya-Forster. "France, Africa, and the First World War." Journal of African History. 19.1 (1978): 11–23. Print.
  17. Encyclopædia Britannica's Great Inventions Archived 2007-01-05 at the Wayback Machine.", Encyclopædia Britannica
  18. Jurgen Osterhammel and Niels P. Petersson. Globalization: a short history. (2005) p. 8
  19. WTO.org,(2009)
  20. "World Exports as Percentage of Gross World Product". Global Policy Forum. Archived from the original ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ১২ জুলাই ২০০৮ তারিখে on 12 July 2008. Retrieved 11 November 2009.
  21. Nouriel Roubini (January 15, 2009). "A Global Breakdown Of The Recession In 2009". Forbes.
  22. A Global Retreat As Economies Dry Up. The Washington Post. March 5, 2009.
  23. Economic Crisis Poses Threat To Global Stability. NPR. February 18, 2009.
  24. "In Recession, China Solidifies Its Lead in Global Trade". The New York Times. October 13, 2009.