কালনেমী
| কালনেমী | |
|---|---|
কালনেমীর অংশবিশেষ | |
| অন্তর্ভুক্তি | দৈত্য বা অসুর[১] |
| গ্রন্থসমূহ | মৎস্যপুরাণ, স্কন্দপুরাণ |
| ব্যক্তিগত তথ্য | |
| মাতাপিতা |
|
| সহোদর | মহাবলী |
| সন্তান | বৃন্দা (কন্যা)
হংস, সুবিক্রম, ক্রথ, দমন, রিপুরমর্দন এবং ক্রোধহন্তা (পুত্রগণ) |
কালনেমী বা কালনেমি (সংস্কৃত: कालनेमि) হল একজন হিন্দু পৌরাণিক অসুর। মৎস্য, স্কন্দ ও পদ্ম পুরাণ অনুযায়ী তিনি বিরোচনের পুত্র এবং প্রহ্লাদের পৌত্র। তারকাময় যুদ্ধে বিষ্ণুর হাতে তিনি নিহত হন,[২] যেখানে তাকে একজন সেনাপতি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। হরিবংশ পুরাণ এবং বৈষ্ণবীয় লোকসংস্কৃতির ধারা অনুযায়ী তিনি হিরণ্যাক্ষের পুত্র এবং অন্ধকের ভাই। হিরণ্যাক্ষের পুত্র হিসাবে তার জন্মের সময়, তিনি বিষ্ণু কর্তৃক নিহত হন এবং তার ভাই অন্ধকাসুরকে শিব বধ করেন। তার পরবর্তী পুনর্জন্মে, সে মথুরার রাজা উগ্রসেনের পুত্র কংস হিসাবে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। যেখানে তার বোন ছিলেন দেবকী এবং দেবকীর পুত্র কৃষ্ণ ছিলেন বিষ্ণুর অবতার।[৩][৪] এই জন্মেই তার ভাগিনেয় কৃষ্ণ শেষ পর্যন্ত কংসকে বধ করেছিলেন।[৫]
ব্যুৎপত্তি
[সম্পাদনা]কালনেমী একটি যৌগিক শব্দ যা ‘কাল’ (যার অর্থ “সময়”) এবং ‘নেমি’ (যার অর্থ “চাকার অংশ বা একটি অংশ”) দিয়ে গঠিত। এটি সময়চক্রের সেই সময়কালকে বোঝায় যা “বিকেল থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত” সময়কে নির্দেশ করে। ‘কাল’-এর অপর অর্থ “কালো”, যাকে অসুর কালানেমি হিসেবে গণ্য করা হয়, যিনি অন্ধকারের সেই সময়কালকে প্রতিনিধিত্ব করেন যা “দিন থেকে রাতের দিকে এবং দ্বাপর যুগ থেকে কলিযুগের দিকে অগ্রসর হওয়ার সাথে সাথে বৃদ্ধি পায়।”[৬]

কিংবদন্তি
[সম্পাদনা]তারকাময় যুদ্ধ
[সম্পাদনা]পদ্মপুরাণে, কালনেমি তারকাময় যুদ্ধে দেবতাদের বিরুদ্ধে চন্দ্রের পক্ষে অন্যান্য দৈত্যদের সঙ্গে নিয়ে যুদ্ধ করেছিলেন। তিনি দেবতাদের উপর পর্বত বর্ষণ করেছিলেন, এবং তাঁর বিশাল আকার দেখে দেবতারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি তার মুখ থেকে অগ্নিশ্বাস ত্যাগ করছিলেন এবং তার শত্রুদের উপর বেশ কিছু দিব্য ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছিলেন। বিষ্ণু তার সাথে যুদ্ধ করার জন্য গরুড়ের উপর আরোহণ করেছিলেন। তিনি রক্ষাকর্তা দেবতাকে অশ্লীল গালিগালাজ করেছিলেন, কিন্তু দেবতা কেবল হেসে তার আসন্ন বিনাশের কথা ঘোষণা করেন। ক্রুদ্ধ হয়ে কালনেমি তার শত বাহু থেকে বিষ্ণুর বক্ষে বহু অস্ত্র নিক্ষেপ করেন। যখন অসুরটি তাঁর গদা দিয়ে গরুড়ের মাথা চূর্ণ করে, তখন বিষ্ণু সুদর্শন চক্র ব্যবহার করে তার সমস্ত বাহু কেটে ফেলেন, যার ফলে তার নিথর দেহটি ভেঙে পড়ে পৃথিবীকে কাঁপিয়ে দেয়।[৭]
রামায়ণে কালনেমি
[সম্পাদনা]মহাকাব্য রামায়ণে কালনেমি ছিলেন রাবণের মামা ও মন্ত্রী মারীচ এর পুত্র যাকে হনুমানকে হত্যা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। জলন্ধরের সহধর্মিণী বৃন্দা ছিলেন কালনেমির মেয়ে। অসুর কালনেমি অন্ধকারের সময়কে প্রতিনিধিত্ব করে যা “দিন যত রাতের দিকে যায় এবং দ্বাপর যুগ কলি যুগের দিকে চলে যায় ততই বৃদ্ধি পায়।”[৬]
রাবণ যখন কালনেমিকে হনুমানের পথরোধ করার দায়িত্ব দেন, তখন কালনেমি প্রথমে রাবণকে বুঝিয়েছিলেন যে রাম-হনুমান স্বয়ং ঈশ্বরের রূপ, তাদের সাথে শত্রুতা করা ঠিক হবে না। কিন্তু রাবণের ক্রোধের ভয়ে তিনি বাধ্য হয়ে ছদ্মবেশ ধরেন। কালনেমি গন্ধমাদন পর্বতের কাছে একজন ঋষি বা সাধুর ছদ্মবেশ ধরে আশ্রম সাজিয়ে বসেছিলেন। তিনি হনুমানকে মায়াজালে আবদ্ধ করে তাঁর যাত্রায় বিলম্ব করার চেষ্টা করেন এবং পুষ্করিণীর বিষাক্ত জল পান করাতে চান। হনুমান যখন পুষ্করিণীতে জল পান করতে যান, তখন এক অপ্সরা (যিনি সেখানে কুমির হয়ে অভিশপ্ত ছিলেন) হনুমানকে কালনেমির আসল রূপ ও ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সতর্ক করে দেন। এরপর হনুমান কালনেমিকে চিনে ফেলেন এবং তাঁকে বধ করেন।
ষড়্গর্ভ পুত্রগণ
[সম্পাদনা]ভাগবত পুরাণের ১০ম স্কন্ধ অনুযায়ী কালনেমির ছয় পুত্র ছিল: হংস, সুবিক্রম, ক্রথ, দমন, রিপুরমর্দন এবং ক্রোধহন্ত,[৮] যারা তাদের পূর্বজন্মে ব্রহ্মার মানসপুত্র (মন হতে জন্ম নেওয়া পুত্র) মরীচির পুত্র ছিল।[৫] ব্রহ্মার তপ করার কারণে, তাদের পূর্বপুরুষ অর্থাৎ প্রপিতামত হিরণ্যকশিপু, প্রথমে তাদের পাতালে দীর্ঘকাল ঘুমে মগ্ন থাকার অভিশাপ দেন এবং পরে সেই অভিশাপ পরিবর্তন করে দেবকীর প্রথম ছয় পুত্র হিসেবে মর্ত্যে (পৃথিবীতে) জন্ম নেওয়ার আদেশ দেন। তাদের পিতা, কালনেমি, উগ্রসেনের পুত্র কংস রূপে পুনর্জন্ম নিয়ে তাদের মামা হন, এবং তিনি তাদের জন্মের পরপরই হত্যা করেন। পূর্বজন্মের অভিশাপ ও নিয়তির ফেরে, কংস (যিনি পূর্বজন্মে কালনেমি ছিলেন) চিনতে না পেরে নিজেরই পূর্বজন্মের ছয় পুত্রকে একে একে পাথরে আছাড় দিয়ে হত্যা করেন।[৫][৯]
সমুদ্র মন্থন
[সম্পাদনা]স্কন্দ পুরাণ অনুসারে, ক্ষীরসাগর মন্থনের পর, যখন বিষ্ণু মোহিনী রূপ ধারণ করে দৈত্য ও দানবদের অমৃত থেকে বঞ্চিত করেন, তখন দুই অসুর জাতি এবং দেবতাদের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। দেবতাদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন স্বর্গরাজ ইন্দ্র, আর অসুরদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন বিরোচনের পুত্রেরা—প্রথমে অসুরদের প্রধান বলি এবং পরে কালনেমি। ইন্দ্র বজ্র দিয়ে বলিকে বধ করার পর, বৃষপর্ব নামক আরেক দৈত্যরাজ ইন্দ্রকে আক্রমণ করেন এবং তিনিও নিহত হন। কালনেমি সিংহের পিঠে আরোহন করে ইন্দ্র ও তাঁর অনুচরদের প্রচণ্ড আক্রমণ করেন, যা দেবতাদের বিচলিত করে তোলে। তখন নারদ তাঁদেরকে বিষ্ণুর সাহায্য চাইতে পরামর্শ দেন, কারণ একমাত্র তিনিই কালনেমিকে বধ করতে পারতেন, যিনি ধ্যানের মাধ্যমে অসীম শক্তি অর্জন করেছিলেন। দেবতাদের অনুরোধে, বিষ্ণু তাঁর বাহন গরুড়ের পিঠে চড়ে কালনেমিকে আক্রমণ করেন এবং তাকে অজ্ঞান করে দেন। জ্ঞান ফিরে পেয়ে কালনেমি বুঝতে পারে যে তিনি বিষ্ণুর মুখোমুখি হয়েছেন এবং নিজের পরাজয় স্বীকার করে নেন। যেহেতু তিনি একজন দেবতার কাছে পরাজিত হয়েছেন, তাই তিনি বিষ্ণুর কাছে পরমানন্দ প্রার্থনা করেন।[১০] এইভাবে, বিষ্ণু কালনেমি-নিহ উপাধি লাভ করেন।[১০]
বংশলতিকা
[সম্পাদনা]মৎস্য, স্কন্দ ও পদ্ম পুরাণ অনুযায়ী
[সম্পাদনা]- দিতি + কশ্যপ
- হিরণ্যকশিপু
- প্রহ্লাদ
- বিরোচন
- বলি / মহাবলী
- কালনেমি
- ষড়্গর্ভ পুত্রগণ (হংস, সুবিক্রম, ক্রথ, দমন, রিপুরমর্দন ও ক্রোধহন্ত)
- পরবর্তী জন্মে: কংস
- বিরোচন
- প্রহ্লাদ
- হিরণ্যকশিপু
হরিবংশ পুরাণ অনুযায়ী
[সম্পাদনা]রামায়ণ সংস্করণ অনুযায়ী
[সম্পাদনা]তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ "Skanda Purana: Maheswara Khanda: Kedara Khanda: English Translation only without Slokas"। ২৪ অক্টোবর ২০২১।
- ↑ Matchett, Freda (১১ জানুয়ারি ২০১৩)। Krsna: Lord or Avatara?: The Relationship Between Krsna and Visnu (ইংরেজি ভাষায়)। Routledge। পৃ. ১৬৭। আইএসবিএন ৯৭৮-১-১৩৬-১১৮৪২-৫।
- ↑ Williams 2008, পৃ. 185।
- ↑ Kennedy 1831, পৃ. 441।
- 1 2 3 Williams 2008, পৃ. 172, 178।
- 1 2 Hudson 2008, পৃ. 282।
- ↑ www.wisdomlib.org (২৩ আগস্ট ২০১৯)। "The Rise of the Lotus and the War between Gods & Demons [Chapter 41]"। www.wisdomlib.org (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ১৬ নভেম্বর ২০২২।
- ↑ Prabhupāda, A. C. Bhaktivedanta Swami (১৯৯৯)। Śrīmad Bhāgavatam: pt. 1-4. The summum bonum (ইংরেজি ভাষায়)। Bhaktivedanta Book Trust। পৃ. ১১২। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৮৯২১৩-২৬১-৪।
- ↑ www.wisdomlib.org (২৮ জানুয়ারি ২০১৯)। "Story of Kaṃsa"। www.wisdomlib.org (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ১৬ নভেম্বর ২০২২।
- 1 2 Kennedy 1831, পৃ. 362।
উৎস
[সম্পাদনা]- Hudson, D Dennis (২০০৮)। The Body of God: An Emperor's Palace for Krishna in Eighth-Century Kanchipuram। Oxford University Press। আইএসবিএন ৯৭৮-০-১৯-৯৭০৯০২-১।
- Kennedy, Vans (১৮৩১)। Researches Into the Nature and Affinity of Ancient and Hindu Mythology। Longmans, Rees, Orme, Brown, and Green। পৃ. ৩৬২।
- Williams, George M. (২০০৮)। Handbook of Hindu Mythology। OUP USA। আইএসবিএন ৯৭৮-০-১৯-৫৩৩২৬১-২।