ইরানি রন্ধনশৈলী

ইরানি রন্ধনশৈলী বলতে ইরানের রন্ধন ঐতিহ্যকে বোঝায়। পশ্চিমা বিশ্বে ঐতিহাসিকভাবে ইরানকে বোঝাতে ‘পারস্য’ নামটি ব্যবহৃত হওয়ায়, এটি ‘পারস্য রন্ধনশৈলী’ নামেও পরিচিত।[১][২][৩] তবে পারস্য জনগোষ্ঠী ইরানের রন্ধন ঐতিহ্যে অবদান রাখা বহু জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে মাত্র একটি।[৪]
ইরানে ঐতিহ্যবাহী খাবারের সমৃদ্ধ বৈচিত্র্য রয়েছে[৫] এবং দেশটির রন্ধনশৈলী যুগে যুগে ককেশীয় রন্ধনশৈলী, মধ্য এশীয় রন্ধনশৈলী, গ্রীক রন্ধনশৈলী, লেভান্টাইন রন্ধনশৈলী, মেসোপটেমীয় রন্ধনশৈলী, রুশ রন্ধনশৈলী এবং তুর্কি রন্ধনশৈলীসহ বহু রন্ধনধারাকে প্রভাবিত করেছে।[৬][৭][৮][৯] ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসনামলে বিকাশ লাভ করা বিভিন্ন ঐতিহাসিক পারস্য-প্রভাবিত সালতানাতের মাধ্যমে, বিশেষ করে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রভাবে, ভারতীয় রন্ধনশৈলী এবং পাকিস্তানি রন্ধনশৈলীতেও ইরানি রন্ধনশৈলীর নানা বৈশিষ্ট্য উল্লেখযোগ্যভাবে গৃহীত হয়েছে।[১০][১১][১২]
ইরানের সাধারণ প্রধান খাবারে ভাতের সঙ্গে মাংস, শাকসবজি এবং বিভিন্ন ধরনের বাদামের সংমিশ্রণ দেখা যায়। পার্সলে, মেথি, পেঁয়াজকলি, পুদিনা, স্যাভরি এবং ধনেপাতার মতো ভেষজ তাজা ও শুকনো—উভয় রূপেই বহুল ব্যবহৃত হয়। পারস্য রন্ধনশৈলীর আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো ফলের ব্যাপক ব্যবহার, যা বিভিন্ন ধরনের মাংসের পদ এবং ভাতের খাবারে যোগ করা হয়। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ফলগুলোর মধ্যে রয়েছে আলুবোখারা, ডালিম, কুইন্স, শুকনো আলুবোখারা, খুবানি, বারবেরি এবং কিশমিশ। ইরানের স্বাতন্ত্র্যসূচক মসলা ও স্বাদবর্ধকের মধ্যে জাফরান, এলাচ, শুকনো লেবু এবং অন্যান্য টক স্বাদের উপাদান, দারুচিনি, হলুদ ও পার্সলে বিভিন্ন পদে ব্যবহার করা হয়।
ইরানের বাইরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ইরানি প্রবাসীর বসবাস রয়েছে এমন শহরগুলোতেও ইরানি রন্ধনশৈলী জনপ্রিয়। এর মধ্যে রয়েছে লন্ডন, সান ফ্রান্সিসকো উপসাগরীয় এলাকা, ওয়াশিংটন মহানগর এলাকা, ভ্যাঙ্কুভার, টরন্টো[১৩][১৪][১৫][১৬], হিউস্টন এবং বিশেষ করে লস অ্যাঞ্জেলেস ও এর আশপাশের অঞ্চল।[১৩][১৪][১৭]
ইতিহাস
[সম্পাদনা]মধ্য ফার্সি লিপিতে সংরক্ষিত লেখাগুলোর মধ্যে খোসরো ও রিদাগ গ্রন্থে সাসানীয় আমলের খাবারের বর্ণনা পাওয়া যায়। এছাড়া বহু ইরানি খাবারের নাম ও রন্ধনসম্পর্কিত পরিভাষা আরবি ভাষার গ্রন্থগুলোতেও পাওয়া যায়।[১৮]
প্রাচীন পারস্যের দার্শনিক ও চিকিৎসকেরা ইরানি ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে খাদ্যের শক্তিবর্ধক ও দুর্বলতাবর্ধক বৈশিষ্ট্যের ধারণা অনুসরণ করতেন। এই ধারণাগুলো ইরানি খাবার প্রস্তুতের পদ্ধতিকে প্রভাবিত করেছে।
ঐতিহাসিক ইরানি রান্নার বই
[সম্পাদনা]যদিও আব্বাসীয় খিলাফতের শাসনামলে রচিত আরবি রান্নার বইগুলোতে, যেমন কিতাব আল-তাবিখ, কিছু ইরানি নামের রান্নার পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, তবে ফারসি ভাষায় টিকে থাকা প্রাচীনতম ধ্রুপদী রান্নার বই হলো সাফাভি আমলের দুটি গ্রন্থ। আব্বাসীয় খিলাফত ছিল মুসলিম বিজয়ের পর ইরান শাসনকারী আরব খিলাফতগুলোর অন্যতম। প্রাচীনতম গ্রন্থটির শিরোনাম হলো “রান্না ও এর কলাকৌশলের নির্দেশিকা” (কার-নামেহ দার বাব এ তাব্বাখী ভা সানাত এ আন)। এটি ইসমাইল প্রথমের রাজত্বের শেষভাগে ৯২৭ হিজরি/১৫২১ খ্রিষ্টাব্দে একজন অভিজাত পৃষ্ঠপোষকের জন্য রচিত হয়েছিল। গ্রন্থটিতে মূলত ২৬টি অধ্যায় ছিল, যা লেখক ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন; তবে টিকে থাকা পাণ্ডুলিপিতে ২৩ থেকে ২৬ নম্বর অধ্যায় অনুপস্থিত।
এই গ্রন্থের রান্নার পদ্ধতিগুলোতে উপকরণের পরিমাণ, খাবার প্রস্তুতের বিস্তারিত নির্দেশনা, ব্যবহৃত বাসন ও পাত্রের ধরন এবং খাবার সাজানো ও পরিবেশনের নিয়ম উল্লেখ রয়েছে। সাধারণভাবে, এসব রান্নার উপকরণ ও তাদের সংমিশ্রণ বর্তমান ইরানি রান্নায় ব্যবহৃত উপকরণ ও পদ্ধতি থেকে খুব বেশি আলাদা নয়। উল্লেখিত উপকরণের বিপুল পরিমাণ এবং জাফরানের মতো মূল্যবান উপাদানের ব্যাপক ব্যবহারের মাধ্যমে বোঝা যায় যে, এসব খাবার মূলত বড় অভিজাত পরিবারের জন্য প্রস্তুত করা হতো। যদিও লেখক ভূমিকায় দাবি করেছেন যে, তিনি গ্রন্থটি “অভিজাত ও সাধারণ মানুষের উপকারের জন্য” রচনা করেছেন।
দ্বিতীয় টিকে থাকা সাফাভি রান্নার বইটির শিরোনাম হলো “জীবনের সারবস্তু, রান্নার শিল্পের ওপর একটি গ্রন্থ” (মাদ্দাত আল-হায়াত, রেসালা দর এলম এ তাব্বাখি)। এটি প্রায় ৭৬ বছর পরে আব্বাস প্রথমের একজন রাঁধুনি রচনা করেন। গ্রন্থটির ভূমিকায় ঈশ্বর, মুহাম্মদ, ইমাম এবং শাহের বিস্তারিত প্রশংসার পাশাপাশি একজন প্রধান রাঁধুনির সংজ্ঞাও দেওয়া হয়েছে। এরপর বিভিন্ন খাবার প্রস্তুতের বিষয়ে ছয়টি অধ্যায় রয়েছে—চারটি ভাতের খাবার নিয়ে, একটি কালিয়া এবং একটি আশ নিয়ে। আগের গ্রন্থের তুলনায় এখানে পরিমাপ ও রান্নার নির্দেশনা ততটা বিস্তারিত নয়। এতে রাজদরবারে প্রস্তুত করা খাবারের বিবরণ রয়েছে এবং কয়েকটি খাবার সাফাভি রাজবংশের শাহদের দ্বারা তৈরি বা উন্নত করা হয়েছিল বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া সমসাময়িক অন্যান্য রাঁধুনি ও তাদের বিশেষত্ব সম্পর্কেও তথ্য দেওয়া হয়েছে।[১৯]
খাদ্যাভ্যাস
[সম্পাদনা]চাল
[সম্পাদনা]ভাতের ব্যবহার, যা প্রথমদিকে সাফাভি সাম্রাজ্যের রাজদরবারের রান্নার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল, খ্রিস্টীয় ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগে ইরানি রন্ধনশৈলীর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়। ঐতিহ্যগতভাবে, উত্তর ইরানে এবং ধনী পরিবারগুলোর ঘরে ভাত প্রধান খাদ্যশস্য হিসেবে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত ছিল, অন্যদিকে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে রুটি ছিল প্রধান খাদ্য।
ইরানের ধানের জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে গেরদে, ডোমসিয়া (যার আক্ষরিক অর্থ কালো লেজ, কারণ এর একটি প্রান্ত কালো), চম্পা, দুদি (ধোঁয়ায় শুকানো চাল), লেঞ্জান (লেঞ্জান কাউন্টি থেকে), তারোম (তারোম কাউন্টি থেকে) এবং আনবারবু।
নিচের সারণিতে ইরানে ভাত রান্নার তিনটি প্রধান পদ্ধতি উল্লেখ করা হলো।
| পদ্ধতি | বর্ণনা |
|---|---|
| পিলাফ (পোলো) এবং চেলো | চেলো হলো সাদা ভাত, যা ঝোল বা কাবাবের সঙ্গে পরিবেশন করা হয়, আর পোলো হলো অন্যান্য উপকরণের সঙ্গে মেশানো ভাত। তবে উভয়ই একই পদ্ধতিতে রান্না করা হয়। প্রথমে ভাত লবণ পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয় এবং পরে সেদ্ধ করা হয়। আধা সেদ্ধ ভাত, যাকে চেলো বলা হয়, পানি ঝরিয়ে আবার পাত্রে ফিরিয়ে নিয়ে ভাপে রান্না করা হয়। এই পদ্ধতিতে ভাত ঝরঝরে হয়, দানাগুলো আলাদা থাকে এবং আঠালো হয় না। পাত্রের নিচে রুটি বা আলুর পাতলা টুকরো দিয়ে তাহদিগ বা তাদিগ নামে পরিচিত সোনালি স্তর তৈরি করা হয়। অনেক সময় শুধু তাহদিগ আলাদাভাবে পরিবেশন করা হয়। কখনও মাংস, সবজি, বাদাম ও ফল স্তরে স্তরে সাজিয়ে যোগ করা হয় অথবা চেলোর সঙ্গে মিশিয়ে ভাপে রান্না করা হয়। চেলো পাত্রে দেওয়ার পর আঁচ কমিয়ে দেওয়া হয় এবং অতিরিক্ত বাষ্প শোষণের জন্য পাত্রের ঢাকনার নিচে মোটা কাপড় বা তোয়ালে রাখা হয়। |
| কাতেহ | এই পদ্ধতিতে ভাত সম্পূর্ণভাবে পানি শুষে নেওয়া পর্যন্ত রান্না করা হয়। এটি গিলান প্রদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার। |
| দামি | এটি এমন এক ধরনের ভাত, যা প্রায় কাতেহর মতো করেই রান্না করা হয়। তবে শুরুতেই এমন কিছু উপকরণ, যেমন শস্যদানা ও শিমজাতীয় উপাদান, যোগ করা হয় যেগুলো ভাতের সঙ্গে সহজেই সেদ্ধ হতে পারে। কাতেহ তৈরির সময় আঁচ একেবারে কমিয়ে দেওয়া হয়, যতক্ষণ না ভাত ও অন্যান্য উপকরণ প্রায় সম্পূর্ণ সেদ্ধ হয়ে আসে। চুলায় দীর্ঘ সময় রেখে দিলে এবং পুড়ে যাওয়া বা অতিরিক্ত সেদ্ধ হওয়া এড়ানো গেলে দামি ও কাতেহ উভয় থেকেই তাহদিগ তৈরি হতে পারে। দামির একটি বিশেষ ধরন হলো তাচিন, যা দই, মুরগি (বা ভেড়ার মাংস) এবং ভাতের সংমিশ্রণে তৈরি হয়; এতে জাফরান ও ডিমের কুসুমও ব্যবহার করা হয়। |
- ইরানি শৈলীতে ভাত রান্না
- পাত্রে ভেজানো চাল
- চিলো শৈলীতে ভাত রান্নায় তাহদিগ তৈরীতে ব্যবহৃত আলু প্রক্রিয়াকরণ
- আলু তাহদিগ
- লাভাশ রুটির তাহদিগ
রুটি
[সম্পাদনা]ধানের পরে দ্বিতীয় উৎপাদিত শস্য হচ্ছে গম। নিচের তালিকায় ইরানি রন্ধনশৈলীতে ব্যবহৃত বিভিন্ন চ্যাপ্টা রুটি এবং পেস্ট্রি রুটির দেয়া হয়েছেঃ
ফল এবং শাকসবজি
[সম্পাদনা]ইরানের কৃষিতে প্রচুর পরিমাণে ফল ও শাকসবজি উৎপাদিত হয়। তাই ইরানিদের খাবারের টেবিলে তাজা ফলের একটি বাটি থাকা সাধারণ বিষয় এবং অধিকাংশ খাবারের সঙ্গে শাকসবজি নিয়মিত অনুষঙ্গ হিসেবে পরিবেশন করা হয়। এগুলো শুধু মিষ্টান্ন হিসেবে তাজা ও পাকা অবস্থায় খাওয়া হয় না, বরং প্রধান খাবারের অংশ হিসেবে মাংসের সঙ্গেও পরিবেশন করা হয়। যখন তাজা ফল পাওয়া যায় না, তখন এর পরিবর্তে খেজুর, ডুমুর, খুবানি, আলুবোখারা এবং পীচের মতো বিভিন্ন ধরনের শুকনো ফল পরিবেশন করা হয়। দক্ষিণ ইরান বিশ্বের অন্যতম প্রধান খেজুর উৎপাদনকারী অঞ্চল, যেখানে বাম খেজুরের মতো বিশেষ জাতের খেজুর চাষ করা হয়।
কুমড়া, পালং শাক, সবুজ শিম, বাবলা শিম, জুচিনি, বিভিন্ন ধরনের স্কোয়াশ, পেঁয়াজ, রসুন এবং গাজর ইরানি রান্নায় সাধারণত ব্যবহৃত হয়। টমেটো, শসা এবং পেঁয়াজকলি প্রায়ই খাবারের সঙ্গে পরিবেশন করা হয়। যদিও বেগুনকে “ইরানের আলু” বলা হয়, ইরানিরা জলপাই তেল, লেবুর রস, লবণ, মরিচের গুঁড়া এবং রসুনের গুঁড়া দিয়ে সাজানো তাজা সবুজ সালাদও পছন্দ করে।
ফলের ডোলমা সম্ভবত ইরানি রন্ধনশৈলীর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। প্রথমে ফল রান্না করা হয়, এরপর তা মাংস, মসলা এবং কখনও কখনও টমেটো সস দিয়ে ভরা হয়। পরে ডোলমা মাংসের ঝোল অথবা পেঁয়াজকলির মিষ্টি-টক সসে অল্প আঁচে রান্না করা হয়।[২২]
ভারজুস, কাঁচা আঙুর বা অন্যান্য টক ফল চেপে তৈরি অত্যন্ত অম্লীয় একটি রস, বিভিন্ন ইরানি খাবারে ব্যবহৃত হয়। এটি প্রধানত স্যুপ ও স্টু জাতীয় খাবারে ব্যবহৃত হয়, তবে এক ধরনের স্কোয়াশ ডোলমা তৈরিতেও ব্যবহার করা হয়। কাঁচা আঙুর কিছু খাবারে আস্ত অবস্থায়ও ব্যবহার করা হয়, যেমন খোরেশ-এ ঘুরেহ (টক আঙুর দিয়ে তৈরি ভেড়ার মাংসের স্টু)। মসলা হিসেবে ভারজুস পাউডার (পুদ্র-এ ঘুরেহ) কখনও কখনও ভারজুস দিয়ে মিশিয়ে শুকিয়ে তৈরি করা হয়।
সাধারণ মশলা
[সম্পাদনা]

আদভিয়েহ বা চাশনি বলতে বিভিন্ন ধরনের ঝাঁঝালো সবজি ও শুকনো ফলকে বোঝায়, যা ইরানি রন্ধনশৈলীতে খাবারের স্বাদ বাড়ানোর জন্য ব্যবহৃত হয়।
ইরানের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ও বহুল ব্যবহৃত মসলা হলো জাফরান, যা ক্রোকাস স্যাটিভাস ফুল থেকে সংগৃহীত নির্যাস দিয়ে তৈরি করা হয়। গোলাপজল, যা পানিতে গোলাপের পাপড়ি ভিজিয়ে প্রস্তুত করা এক ধরনের সুগন্ধযুক্ত জল, সেটিও বহু ইরানি খাবারের ঐতিহ্যবাহী ও প্রচলিত উপাদান।
পারস্য হগউইড (গোলপার), যা ইরানের আর্দ্র পার্বত্য অঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে জন্মায়, বিভিন্ন ইরানি স্যুপ ও স্টুতে মসলা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া এটি ভিনেগারের সঙ্গে মিশিয়ে তাতে শিম ডুবিয়ে খাওয়ার আগে ব্যবহার করা হয়।
অন্যান্য সাধারণ মসলার মধ্যে রয়েছে এলাচ, যা বিভিন্ন এলেটারিয়া ও অ্যামোমাম গাছের বীজ থেকে তৈরি হয়; শুলফা (শেভিড), যা অ্যাপিয়াসি গোত্রের একটি একবর্ষজীবী ভেষজ উদ্ভিদ; মাহলেব, যা প্রুনাস মাহলেব গাছের বীজ থেকে তৈরি সুগন্ধযুক্ত মসলা; এবং লিমু আমানি, অর্থাৎ শুকনো লেবু।
এছাড়াও মসলার কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী সংমিশ্রণ রয়েছে। এর মধ্যে দুটি হলো আরদে (তাহিনি), যা খোসা ছাড়ানো ভাজা তিল গুঁড়ো করে তৈরি করা হয়, এবং দেলাল সস, যা ধনেপাতা ও পার্সলের মতো তাজা শাকসবজির সঙ্গে প্রচুর পরিমাণে লবণ মিশিয়ে তৈরি করা হয়।
সাধারণ খাবার ও পানীয়
[সম্পাদনা]সাধারণ ইরানি রন্ধনশৈলীতে নানা ধরনের খাবার অন্তর্ভুক্ত, যার মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন প্রকারের কাবাব , স্ট্যু , স্যুপ ও পোলাও , সেইসাথে নানা রকম সালাদ, মিষ্টান্ন, পেস্ট্রি এবং পানীয়।
প্রধান খাবার
[সম্পাদনা]কাবাব
[সম্পাদনা]ইরানে কাবাব সাধারণত ভাত অথবা রুটির সঙ্গে পরিবেশন করা হয়। সাদা ভাতের সঙ্গে কাবাবের একটি পদকে চেলো কাবাব বলা হয়, যা ইরানের জাতীয় খাবার হিসেবে বিবেচিত। ভাত কাতেহ পদ্ধতিতেও প্রস্তুত করা যেতে পারে; সে ক্ষেত্রে খাবারটিকে কাতেহ কাবাব বলা হয়।
নিচের সারণিতে ইরানি রন্ধনশৈলীতে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের কাবাবের তালিকা দেওয়া হলো।
ঝোল (স্টু)
[সম্পাদনা]খোরেশ হলো এক ধরনের ইরানি স্টু, যা সাধারণত এক প্লেট সাদা ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করা হয়। খোরেশে সাধারণত বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি, ফল এবং মাংসের টুকরো থাকে, যা টমেটো পেস্ট, জাফরান এবং ডালিমের রস দিয়ে সুগন্ধযুক্ত করা হয়। খোরেশ ছাড়া অন্যান্য স্টু, যেমন দিজি, ভাতের পরিবর্তে রুটির সঙ্গে পরিবেশন করা হয়।
নিচের সারণিতে কয়েকটি ইরানি স্টু পদের তালিকা দেওয়া হলো।
স্যুপ এবং আশ
[সম্পাদনা]ইরানি রন্ধনশৈলীতে বিভিন্ন ধরনের স্যুপ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সুপ-এ জাও (বার্লি স্যুপ), সুপ-এ এসফেনাজ (পালং শাকের স্যুপ), সুপ-এ কার্চ (মাশরুম স্যুপ) এবং বিভিন্ন ধরনের ঘন স্যুপ। ইরানে ঘন স্যুপকে আশ বলা হয়, যা একটি ঐতিহ্যবাহী ইরানি স্যুপ। এছাড়াও, শোলে কালামকার হলো “হজ-পজ” স্যুপের ইরানি নাম, যা বিভিন্ন উপাদানের সংমিশ্রণে তৈরি করা হয়।
নিচের সারণিতে ইরানি রন্ধনশৈলীর কয়েকটি স্যুপ ও আশ পদের তালিকা দেওয়া হলো।
পোলো এবং দামী
[সম্পাদনা]কাবাব বা ঝোলের সঙ্গে পরিবেশিত ভাতের পদ ছাড়াও, পোলো এবং দামির ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে প্রস্তুত করা বিভিন্ন ধরনের ভাতভিত্তিক ইরানি খাবার রয়েছে।
পোলো হলো পিলাফের ফারসি নাম এবং এটি অন্যান্য ইরানি ভাষাতেও ব্যবহৃত হয়। পোলো খাবারে সাধারণত ভাতের সঙ্গে সবজি, ফল এবং শিমজাতীয় উপাদান মেশানো হয় এবং এর সঙ্গে প্রায়ই মুরগির মাংস বা লাল মাংস পরিবেশন করা হয়। দামি খাবারগুলো পোলোর মতোই, কারণ এতেও ভাতের সঙ্গে বিভিন্ন উপাদান যুক্ত থাকে; তবে এগুলো দামি পদ্ধতিতে একই পাত্রে একসঙ্গে রান্না করা হয়।
নিচে কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী ইরানি ভাতভিত্তিক খাবারের তালিকা দেওয়া হলো।
অন্যান্য
[সম্পাদনা]ক্ষুধা বর্ধক
[সম্পাদনা]ডেজার্ট
[সম্পাদনা]৪০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে প্রাচীন ইরানিরা একটি বিশেষ মজার খাবার তৈরি করেছিল যা গোলাপের পানি ও সেমাই দিয়ে তৈরি করা হতো। যা গ্রীষ্মকালে রাজপ্রাসাদে পরিবেশন করা হতো। বরফকে জাফরান এবং ফল ও অন্যান্য স্বাদের সঙ্গে মিশ্রিত করা হতো। আজকের দিনে সর্বাধিক জনপ্রিয় ইরানি মিষ্টি জাতীয় খাবার হচ্ছে আধা জমায়িত নুডলস দিয়ে তৈরী ফালুদা যার শিকড় সাবেক রাজধানী শিরাজ শহরে। বাস্তানি ই জামেরানী ফার্সি শব্দের অর্থ জাফরান আইসক্রিম একটি ঐতিহ্যবাহী ইরানি আইসক্রিম যা সাধারণত "ঐতিহ্যবাহী আইসক্রিম" নামে পরিচিত। অন্যান্য প্রকারের ইরানি ডেজার্টগুলি বিভিন্ন ধরনের চাল, গম ও দুগ্ধবৈচিত্র্যে তৈরি হয়। নিচে কয়েকটি ইরানি মিষ্টান্নের তালিকা দেওয়া হলো।
জলখাবার
[সম্পাদনা]মনে করা হয়, কুকির উৎপত্তি সপ্তম শতাব্দীর ইরানে, এই অঞ্চলে চিনির ব্যবহার তুলনামূলকভাবে প্রচলিত হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই। আধুনিক ইরানে অসংখ্য ঐতিহ্যবাহী দেশীয় এবং গৃহীত ধরণের জলখাবার রয়েছে, যার মধ্যে কয়েকটি নিম্নলিখিত সারণীতে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
পানীয়
[সম্পাদনা]
ইরান বিশ্বের অন্যতম প্রধান চা উৎপাদনকারী দেশ, যা প্রধানত দেশটির উত্তরাঞ্চলে চাষ করা হয়। ইরানি সংস্কৃতিতে চা (চায়) ব্যাপকভাবে পান করা হয় এবং সাধারণত অতিথিদের প্রথমে যে পানীয় পরিবেশন করা হয়, তা হলো চা। ঐতিহ্যগতভাবে ইরানিরা চা পান করার আগে মুখে এক টুকরো চিনির কিউব রাখে। মিছরিও বহুল ব্যবহৃত হয়, যা সাধারণত জাফরান দিয়ে সুগন্ধযুক্ত করা হয়।
ইরানের ঐতিহ্যবাহী কফি (কাহভে বা কাফে) সাধারণত গাঢ়, মিষ্টি এবং কফির তলানি রেখে পরিবেশন করা হয়। ষোড়শ শতাব্দীর সাফাভি ইরানে কফি মূলত চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হতো। ঐতিহ্যবাহী কফিহাউসগুলো ছিল জনপ্রিয় মিলনস্থল, যেখানে মানুষ কফি পান করত, তামাক সেবন করত এবং কবিতা আবৃত্তি করত—বিশেষ করে শাহনামা মহাকাব্য। বর্তমান ইরানে ক্যাফেগুলো মূলত শহরাঞ্চলে জনপ্রিয়, যেখানে বিভিন্ন ধরনের পানীয় ও মিষ্টান্ন পরিবেশন করা হয়। তুর্কি কফিও ইরানে জনপ্রিয়, বিশেষ করে ইরানি আজেরি জনগোষ্ঠীর মধ্যে।
ইরানি সংস্কৃতিতে মদ (মে)-এরও ঐতিহাসিকভাবে উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। শিরাজি ওয়াইন ইরানের ঐতিহাসিকভাবে সবচেয়ে বিখ্যাত মদ, যার উৎপত্তি শিরাজ শহরে। নবম শতাব্দীর মধ্যে শিরাজ বিশ্বের অন্যতম সেরা মদ উৎপাদনকারী অঞ্চল হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিল এবং এটি ইরানের মদ উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর ইরানে অ্যালকোহলযুক্ত পানীয় নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে অমুসলিম স্বীকৃত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, যেমন খ্রিস্টান, ইহুদি এবং জরথুস্ট্রিয়ান, নিজেদের ব্যবহারের জন্য অ্যালকোহলযুক্ত পানীয় উৎপাদনের অনুমতি পায়। যদিও অ্যালকোহলমুক্ত বিয়ার (আবজো) বৈধভাবে বিক্রি হয়, অন্যান্য নাগরিকেরা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মাধ্যমে অবৈধভাবে অ্যালকোহলযুক্ত পানীয় উৎপাদন করে এবং তা প্রধানত ইরাকি কুর্দিস্তান ও তুরস্ক থেকে সংগ্রহ করে।
আরাক সাগি, যার আক্ষরিক অর্থ “কুকুরের পাতিত পানীয়”, ইরানের এক ধরনের পাতিত অ্যালকোহলযুক্ত পানীয়, যাতে কমপক্ষে ৬৫% বিশুদ্ধ ইথানল থাকে। এটি সাধারণত বাড়িতে কিশমিশ থেকে তৈরি করা হয় এবং তুর্কি রাকির অনুরূপ। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের আগে এটি ইরানের বিভিন্ন শহরে ঐতিহ্যগতভাবে উৎপাদিত হতো। বিপ্লবের পর এটি নিষিদ্ধ হওয়ায় কালোবাজার ও গোপন ব্যবসার অংশে পরিণত হয়েছে।
নিচের সারণিতে কয়েকটি ইরানি ঠান্ডা পানীয়ের তালিকা দেওয়া হলো।
আঞ্চলিক ইরানি রন্ধনপ্রণালী
[সম্পাদনা]ইরানি আজারবাইজানীয় রন্ধনপ্রণালী
[সম্পাদনা]উত্তর-পশ্চিম ইরানের আজারবাইজান অঞ্চলে বসবাসকারী ইরানি আজারবাইজানি জনগণের বেশ কিছু নিজস্ব স্থানীয় খাবার রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জোশপারা (جوُشپَرا) নামের ডাম্পলিং, জাকুল বাকুল নামের অঙ্গপ্রত্যঙ্গভিত্তিক একটি খাবার, যাতে সাধারণত যকৃৎ ও হৃৎপিণ্ড ব্যবহার করা হয়, পিচাগ (پیچاققیمه) নামের কেইমের একটি রূপ এবং তাবরিজ মিটবল নামের কুফতের একটি ধরন। শেকেরবুরা (شَکَربورا) নামের পেস্ট্রিটি খোরাসানের শেকারপারে (šekarpāre)-এর অনুরূপ। এর স্বাদ ইরানি রন্ধনশৈলীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হলেও এতে কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যেমন অন্যান্য ইরানি জনগোষ্ঠীর তুলনায় বেশি পরিমাণে লেবুর রস ও মাখনের ব্যবহার।
বেলুচি রন্ধনশৈলী
[সম্পাদনা]ইরানের বেলুচিস্তান অঞ্চলের রন্ধনশৈলীতে প্রধান উপাদান হলো মাংস ও খেজুর। ধান প্রধানত মাকরান অঞ্চলে চাষ করা হয়। বেলুচিস্তানের বিশেষ খাবারের মধ্যে রয়েছে তানুরচে (tarōnča; tanurče), যা তানুরে প্রস্তুত করা এক ধরনের স্থানীয় গ্রিল করা মাংস; দুঘ-পা (dōq-pâ), যা দুঘযুক্ত এক ধরনের খোরেশ; এবং তাবাহাগ (tabâhag), যা ডালিমের গুঁড়ো দিয়ে প্রস্তুত করা মাংস। বেলুচি রন্ধনশৈলীতে খেজুরভিত্তিক বিভিন্ন খাবার এবং নানা ধরনের রুটিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
কাস্পিয়ান রন্ধনশৈলী
[সম্পাদনা]কাস্পিয়ান সাগরের দক্ষিণ উপকূল, যা গিলান প্রদেশ, মাজান্দেরান প্রদেশ, আলবোর্জ প্রদেশ এবং গোলেস্তান প্রদেশ নিয়ে গঠিত, একটি উর্বর অঞ্চল এবং এর প্রভাব স্থানীয় রন্ধনশৈলীতেও দেখা যায়। কাতেহ হলো ভাত রান্নার একটি পদ্ধতি, যার উৎপত্তি এই অঞ্চলে। এই ধরনের ভাত সেখানে সকালের খাবার হিসেবেও খাওয়া হয়; কখনও দুধ ও জ্যামের সঙ্গে গরম অবস্থায়, আবার কখনও পনির ও রসুনের সঙ্গে ঠান্ডা অবস্থায় পরিবেশন করা হয়।
এই অঞ্চলের ক্যাভিয়ার বা মাছের ডিমও পরিচিত এবং সাধারণত ফ্রিটাটা ও অমলেটে ডিমের সঙ্গে পরিবেশন করা হয় অথবা শুধু লাভাশ ও মাখনের সঙ্গে খাওয়া হয়। গিলান প্রদেশে মাছ সাধারণত বেশি খাওয়া হয়, যেখানে কাস্পিয়ান কুটুম একটি গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য এবং সাধারণত ভাতের সঙ্গে ভাজা অবস্থায় পরিবেশন করা হয়। ধূমায়িত মাছ (ফার্সি: ماهی دودی, রোমানীকরণ: Mahi doodi) গিলানে জনপ্রিয় এবং সাধারণত দুটি মাছ একসঙ্গে ভাপে রান্না করে ভাতের সঙ্গে মেশানো হয়।
এই অঞ্চলের স্থানীয় কোলুচে কুকি জনপ্রিয় মিষ্টান্ন, বিশেষ করে ফুমান অঞ্চলে। আরেকটি উল্লেখযোগ্য মিষ্টান্ন হলো রেশতে খোশকার (ফার্সি: رشتهخشکار), যা চিনি ও বাদামে ভরা ভাজা চালের আটার মণ্ড দিয়ে তৈরি করা হয়। মেডলার ফলও গিলানে সাধারণত খাওয়া হয় এবং স্থানীয়ভাবে “কোনোস” (ফার্সি: کونوس) নামে পরিচিত।
কুর্দি রন্ধনশৈলী
[সম্পাদনা]পশ্চিম ইরানের কুর্দিস্তান অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের স্থানীয় আশ, পিলাফ এবং স্টু জাতীয় খাবার পাওয়া যায়। স্থানীয় কুর্দি রন্ধনশৈলীর কিছু খাবারের মধ্যে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী গ্রিল করা পাঁজরের মাংস, যাকে দান্দে কাবাব বলা হয়; পেঁয়াজ পাতার সঙ্গে তৈরি এক ধরনের খোরেশ, যাকে খোরেশ-এ তারে বলা হয়; এবং ভাত ও আলু দিয়ে তৈরি সিব পোলো নামের একটি খাবার।
দক্ষিণ ইরানি রন্ধনশৈলী
[সম্পাদনা]দক্ষিণ ইরানের খাবার সাধারণত ঝাল ও মসলাদার হয়। মাহায়াওয়া হলো এই অঞ্চলের একটি টক স্বাদের সস, যা গাঁজানো মাছ দিয়ে তৈরি করা হয়। উপকূলীয় অঞ্চল হওয়ায় খুজেস্তান প্রদেশের রন্ধনশৈলীতে বিশেষ করে সামুদ্রিক খাবার এবং কিছু স্বতন্ত্র স্থানীয় পানীয়ের উপস্থিতি দেখা যায়। দক্ষিণ খুজেস্তানে কুফতের একটি ভিন্ন ধরনও রয়েছে, যা কিব্বেহ নামে পরিচিত। এটি কিমা করা মাংস, ভাঙা গম, বিভিন্ন ধরনের ভেষজ ও সবজি এবং নানা মসলা দিয়ে তৈরি করা হয়।
তুর্কমেন রন্ধনশৈলী
[সম্পাদনা]ইরানের তুর্কমেন জনগোষ্ঠী প্রধানত গোলেস্তান প্রদেশ ও উত্তর খোরাসান প্রদেশে বসবাস করে। চেকদেরমে (čekderme) হলো একটি তুর্কমেন খাবার, যা চাল, মাংস এবং টমেটো পেস্ট দিয়ে তৈরি করা হয়।
কাঠামো
[সম্পাদনা]খাবার
[সম্পাদনা]সকালের নাস্তা
[সম্পাদনা]ঐতিহ্যবাহী ইরানি সকালের নাস্তার প্রধান উপাদানগুলোর মধ্যে রয়েছে লাভাশ, তাফতান ও বারবারি রুটির মতো বিভিন্ন ধরনের রুটি; মাখনের টুকরো; সাদা পনির; ফেটানো ঘন ক্রিম (সারশির, যা প্রায়ই মধু দিয়ে মিষ্টি করা হয়); বিভিন্ন ধরনের বাদাম, বিশেষ করে আখরোট; এবং নানা ধরনের ফলের জ্যাম ও মাখনজাতীয় স্প্রেড।
ইরানের অনেক শহর ও নগরে সকালের নাস্তার নিজস্ব স্বতন্ত্র রীতি রয়েছে। পাছে হলো ইরান ও পার্শ্ববর্তী ককেশাস অঞ্চলে বহুল প্রচলিত একটি জনপ্রিয় ঐতিহ্যবাহী খাবার, যা প্রায় সব সময় ভোর তিনটা থেকে ভোরের কিছু সময় পর পর্যন্ত পরিবেশন করা হয়। পাছে পরিবেশনকারী বিশেষ রেস্তোরাঁগুলোও সাধারণত শুধু এই নির্দিষ্ট সময়েই খোলা থাকে। আরেকটি ঐতিহ্যবাহী সকালের নাস্তা হলো হালিম, যা গম বা বার্লির সঙ্গে ভেড়ার মাংস ও মসুর ডাল ধীরে ধীরে রান্না করে ঘন ও ক্রিমের মতো মসৃণ অবস্থায় প্রস্তুত করা হয়। অমলেটও ইরানে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়, যার উৎপত্তি প্রাচীন পারস্যে বলে বিবেচনা করা হয়। এর সঙ্গে পালং শাক, সসেজ, টমেটো বা খেজুরের মতো উপকরণ জনপ্রিয়ভাবে যোগ করা হয়।
দুপুরের খাবার এবং রাতের খাবার
[সম্পাদনা]ঐতিহ্যবাহী ইরানি রান্না সাধারণত ধাপে ধাপে সম্পন্ন করা হয়, যার জন্য প্রায়ই কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন পর্যন্ত প্রস্তুতি ও যত্নের প্রয়োজন হয়। এর ফলে এমন সব সুষম খাবার তৈরি হয়, যেখানে স্বাদ ও পুষ্টির মধ্যে যথাযথ সামঞ্জস্য থাকে। ইরানি খাবারের প্রধান উপাদান, যা সাধারণত প্রতিটি খাবারের সঙ্গে খাওয়া হয়, তার মধ্যে রয়েছে ভাত, মূলাসহ বিভিন্ন ধরনের তাজা শাকসবজি (সবজি খোরদান), সাদা পনির, বিভিন্ন ধরনের রুটি এবং কোনো না কোনো ধরনের মাংস, যা ধীরে ধীরে কষিয়ে বা গ্রিল করে প্রস্তুত করা হয়।
ইরানি খাবারে সবচেয়ে জনপ্রিয় মাংসের মধ্যে রয়েছে ভেড়ার মাংস, মুরগি, গরুর মাংস এবং মাছ। এর মধ্যে মাছ উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে সবচেয়ে বেশি খাওয়া হয়। খোরেশ বা কষানো মাংসের পদ, যা সাধারণত ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করা হয়, ইরানের অন্যতম জনপ্রিয় খাবার। এর অসংখ্য ধরন রয়েছে এবং অঞ্চলভেদে এর উপকরণ ও প্রস্তুতপ্রণালিতে ভিন্নতা দেখা যায়।
ঐতিহ্যবাহী টেবিল সাজানো এবং শিষ্টাচার
[সম্পাদনা]ঐতিহ্যবাহী ইরানি খাবার পরিবেশনের প্রথম ধাপে টেবিল বা গালিচার ওপর ‘সোফ্রে’ নামের একটি চাদর বিছানো হয়। প্রধান খাবারগুলো এর মাঝখানে রাখা হয় এবং চারপাশে ছোট ছোট পাত্রে ক্ষুধাবর্ধক খাবার, মসলা ও অন্যান্য সহায়ক পদ সাজানো থাকে, যাতে ভোজনকারীরা সহজেই সেগুলো নিতে পারেন। খাবার সুন্দরভাবে সাজানো ও পরিবেশন সম্পন্ন হলে, সোফ্রেতে বসে খাওয়ার জন্য সবাইকে আমন্ত্রণ জানানো হয়।
পারস্য সংস্কৃতিতে অতিথিদের অত্যন্ত সম্মানিত মনে করা হয় এবং তাঁদের দেবতুল্য মর্যাদা দেওয়া হয়। তাই অতিথিদের প্রথমে এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে খাবার পরিবেশন করা হয়, আর গৃহকর্তা সাধারণত সবার শেষে নিজের জন্য খাবার নেন। পারস্যের শিষ্টাচারের রীতি তারুফ অনুসারে, অতিথিরা নিজেরা থেকে কোনো খাবার বা পানীয় গ্রহণ করেন না, যতক্ষণ না তাঁদের তা পরিবেশন করা হয়। এমনকি খাবার বা পানীয়ের প্রস্তাব দেওয়া হলেও, অন্তত তৃতীয়বার প্রস্তাব না পাওয়া পর্যন্ত তা প্রত্যাখ্যান করা ভদ্রতার অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়, যাতে তাঁদের লোভী মনে না হয়।
এই সংযম ও শিষ্টাচারের প্রতিক্রিয়ায় গৃহকর্তা উদারতা প্রদর্শন করেন এবং অতিথিদের বারবার খাবার পরিবেশনের জন্য অনুরোধ করেন। কিছু নির্দিষ্ট সামাজিক পরিবেশে, সামান্য পরিমাণ খাবার বা পানীয় রেখে যাওয়াকেও ভদ্রতা হিসেবে দেখা হতে পারে, কারণ খালি থালা বা কাপকে কখনও কখনও গৃহকর্তার আতিথেয়তার অপর্যাপ্ততার ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ "Cultural Life"। Tehrān। Encyclopædia Britannica। সংগ্রহের তারিখ ১৬ এপ্রিল ২০১৮।
Persian cuisine is characterized by the use of lime and saffron, the blend of meats with fruits and nuts, a unique way of cooking rice, and Iranian hospitality. Food is subtly spiced, delicate in flavour and appearance, and not typically hot or spicy. Many recipes date back to ancient times; Iran's historical contacts have assisted in the exchange of ingredients, flavours, textures, and styles with various cultures ranging from the Mediterranean Sea region to China, some of whom retain these influences today.
- ↑ Clark, Melissa (১৯ এপ্রিল ২০১৬)। "Persian Cuisine, Fragrant and Rich With Symbolism"। The New York Times।
- ↑ Yarshater, Ehsan Persia or Iran, Persian or Farsi ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২৪ অক্টোবর ২০১০ তারিখে, Iranian Studies, vol. XXII no. 1 (1989)
- ↑ Majd, Hooman, The Ayatollah Begs to Differ: The Paradox of Modern Iran, by Hooman Majd, Knopf Doubleday Publishing Group, 23 September 2008, আইএসবিএন ০-৩৮৫-৫২৮৪২-৬, 9780385528429. p. 161
- ↑ Iran; international context for promoting Culinary Tourism
- ↑ "Persian Cuisine, a Brief History"। Culture of IRAN। সংগ্রহের তারিখ ৮ জানুয়ারি ২০১৬।
- ↑ electricpulp.com। "ĀŠPAZĪ – Encyclopaedia Iranica"। www.iranicaonline.org।
- ↑ "Iranian Food"। ১৪ এপ্রিল ২০১৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৩ এপ্রিল ২০১৪।
- ↑ "Culture of IRAN"। Cultureofiran.com। সংগ্রহের তারিখ ১৩ এপ্রিল ২০১৪।
- ↑ Achaya, K. T. (১৯৯৪)। Indian Food: A Historical Companion। Oxford University Press। পৃ. ১১।
- ↑ Stanton; এবং অন্যান্য (২০১২)। Cultural Sociology of the Middle East, Asia, and Africa: An Encyclopedia। SAGE Publications। পৃ. ১০৩। আইএসবিএন ৯৭৮-১-৪৫২২-৬৬৬২-৬।
- ↑ Mina Holland (৬ মার্চ ২০১৪)। The Edible Atlas: Around the World in Thirty-Nine Cuisines। Canongate Books। পৃ. ২০৭–। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৮৫৭৮৬-৮৫৬-৫।
- 1 2 Dehghan, Saeed Kamali (৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৬)। "Top five Persian restaurants in London"। The Guardian (ব্রিটিশ ইংরেজি ভাষায়)। আইএসএসএন 0261-3077। সংগ্রহের তারিখ ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৬।
- 1 2 Ta, Lien (২৭ নভেম্বর ২০১১)। "The Best Persian Food In LA (PHOTOS)"। HuffPost।
- ↑ "Bay Area chef circles back to childhood with Iranian breads"। San Francisco Chronicle। সংগ্রহের তারিখ ৩ মার্চ ২০১৮।
- ↑ Nuttall-Smith, Chris (১৩ ডিসেম্বর ২০১৩)। "The 10 best new restaurants in Toronto in 2013"। The Globe and Mail। সংগ্রহের তারিখ ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৬।
- ↑ Whitcomb, Dan (৪ জানুয়ারি ২০১৮)। "Los Angeles' large Iranian community cheers anti-regime protests"। Reuters।
- ↑ Seeney, Belinda (১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১১)। "Balancing the hot and cold"। Redcliffe, Queensland। The Redcliffe & Bayside Herald।
- ↑ Ghanoonparvar, Mohammad R.। "Cookbooks"। Encyclopedia Iranica। সংগ্রহের তারিখ ৫ এপ্রিল ২০০৯।
- ↑ Davidson, Alan. Jaine, Tom.। The Oxford Companion to Food। পৃ. ৪১৪।
{{বই উদ্ধৃতি}}: উদ্ধৃতি শৈলী রক্ষণাবেক্ষণ: একাধিক নাম: লেখকগণের তালিকা (লিঙ্ক) - ↑ Tales of a Kitchen (৫ মার্চ ২০১৩)। "Persian date bread with turmeric and cumin (Komaj)"। ৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৮ নভেম্বর ২০১৭।
- ↑ Ghanoonparvar, M. R.। "Dolma"। Encyclopedia Iranica। সংগ্রহের তারিখ ৫ এপ্রিল ২০০৯।





























































































