ইমাম আলী মসজিদ
| ইমাম আলী মসজিদ | |
|---|---|
ইমাম আলী মসজিদ যেখানে প্রথম শিয়া ইমাম আলী ইবনে তালিব শায়িত আছেন। | |
| ধর্ম | |
| অন্তর্ভুক্তি | ইসলাম |
| যাজকীয় বা সাংগঠনিক অবস্থা | মসজিদ এবং মাজার |
| অবস্থা | নির্মিত |
| অবস্থান | |
| অবস্থান | নজফ, ইরাক |
ইরাকে অবস্থিত | |
| স্থানাঙ্ক | ৩১°৫৯′৪৬″ উত্তর ৪৪°১৮′৫১″ পূর্ব / ৩১.৯৯৬১১১° উত্তর ৪৪.৩১৪১৬৭° পূর্ব |
| স্থাপত্য | |
| সম্পূর্ণ হয় | ৯৭৭ খ্রি |
| বিনির্দেশ | |
| গম্বুজসমূহ | ১ |
| গম্বুজের উচ্চতা (ভেতরে) | ৪২ মিটার (১৩৮ ফুট) |
| মিনার | ২ |
| মিনারের উচ্চতা | ৩৮ মিটার (১২৫ ফুট) |
| মঠ | ১ |
ইমাম আলীর মাজার (আরবি: حَرَم ٱلْإِمَام عَلِيّ), যা আলীর মসজিদ নামেও পরিচিত (আরবি: مَسْجِد عَلِيّ), ইসলামের শেষ নবী মুহাম্মদের চাচাতো ভাই, জামাতা এবং প্রথম শিয়া ইমাম আলী ইবনে আবি তালিবের সমাধিস্থল। এটি ইরাকের নাজাফ প্রদেশে নাজাফে অবস্থিত।
ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের সমাধিস্থল হওয়ায় শিয়া মুসলমানদের কাছে ইমাম আলীর মাজার ইসলামের চতুর্থ পবিত্রতম স্থান হিসেবে বিবেচিত। পবিত্রতার দিক থেকে এর আগে রয়েছে মসজিদুল হারাম, মসজিদে নববী এবং আল-আকসা মসজিদ। শিয়া মুসলমানরা আলীকে তাদের প্রথম ইমাম এবং নবী মুহাম্মদের বৈধ উত্তরাধিকারী হিসেবে বিশ্বাস করেন। অন্যদিকে সুন্নি মুসলমানরা তাকে চতুর্থ রাশিদুন খলিফা হিসেবে গণ্য করেন।[১] প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ তীর্থযাত্রী এই মাজার পরিদর্শন করে ইমাম আলীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
ইতিহাস
[সম্পাদনা]
আব্বাসীয় খলিফা হারুন আল-রশিদ ৭৮৬ খ্রিস্টাব্দে ইমাম আলীর সমাধির ওপর প্রথম স্থাপনাটি নির্মাণ করেন, যার মধ্যে একটি সবুজ গম্বুজ ছিল। ৮৫০ খ্রিস্টাব্দে আব্বাসীয় খলিফা আল-মুতাওয়াক্কিল স্থানটি জলমগ্ন করে দেন। তবে দশম শতাব্দীতে মসুল ও আলেপ্পোর হামদানি শাসক আবুল হায়জা ৯২৩ খ্রিস্টাব্দে একটি বৃহৎ গম্বুজসহ মাজারটি পুনর্নির্মাণ করেন। ৯৭৯–৯৮০ খ্রিস্টাব্দে বুয়িদ আমির আদুদ আল-দৌলা মাজারটি সম্প্রসারণ করেন। তিনি সমাধির ওপর একটি স্মৃতিস্তম্ভ ও একটি নতুন গম্বুজ নির্মাণ করান এবং সেখানে ঝুলন্ত বস্ত্র ও গালিচার ব্যবস্থা করেন। এছাড়া তিনি নাজাফকে প্রাচীর ও দুর্গ দিয়ে সুরক্ষিত করেন এবং একটি কানাতের মাধ্যমে ইউফ্রেটিস নদী থেকে পানির ব্যবস্থা করেন।
১০৮৬ সালে সেলজুক সুলতান প্রথম মালিক-শাহ এবং খলিফা আন-নাসির এই মাজারে বিপুল পরিমাণ অনুদান প্রদান করেন।
১২৬৭ সালে উজির শামস আল-দিন জুভাইনী তীর্থযাত্রীদের সেবার জন্য বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা সংযোজন করেন। পরে ১৩০৩ সালে গাজান খান সৈয়দদের জন্য দার আল-সিয়াদা শাখা প্রতিষ্ঠা করেন।
১৩২৬ সালে ইবনে বতুতা মাজারটি পরিদর্শন করে উল্লেখ করেন যে, এটি "রেশম ও অন্যান্য উপকরণের নানাবিধ কার্পেটে আচ্ছাদিত ছিল এবং সেখানে ছোট-বড় সোনা ও রূপার ঝাড়বাতি ঝুলছিল।" তিনি আরও লিখেছেন, তিনটি সমাধির মাঝখানে সোনা ও রূপার পাত্র রাখা ছিল, যাতে গোলাপজল, কস্তুরী ও নানা ধরনের সুগন্ধি রাখা হতো। দর্শনার্থীরা সেগুলোতে হাত ডুবিয়ে বরকতের আশায় মুখে মাখতেন।[২] ১৩৫৪ সালে একটি অগ্নিকাণ্ডে মাজারটি ধ্বংস হয়ে যায়। তবে প্রায় ১৩৫৮ সালে জালাইরীয় সুলতান শেখ আওয়াইস জালায়ির এটি পুনর্নির্মাণ করেন। তিনি তাঁর পিতা হাসান বুজুর্গের দেহাবশেষও মাজার প্রাঙ্গণে সমাহিত করেন। তৈমুর নাজাফ সফরের পর মাজারটি পুনরুদ্ধারের নির্দেশ দেন। পরে ১৫৩৪ সালে সুলেমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট মাজারটি পরিদর্শন করে মূল্যবান উপহার প্রদান করেন, যা সম্ভবত এর পুনরুদ্ধারকাজে সহায়তা করেছিল।
শাহ প্রথম ইসমাইল ১৫০৮ সালে মাজারটি পরিদর্শন করেন। তবে শাহ প্রথম আব্বাস দুইবার নাজাফ সফর করেন এবং ১৬২৩ সালে মাজারটির পুনর্নির্মাণের জন্য ৫০০ জন কর্মী নিয়োগ দেন। তাঁর নাতি শাহ সাফি ১৬৩২ সালে এই পুনরুদ্ধারকাজ সম্পন্ন করেন। এই পুনর্নির্মাণের আওতায় একটি নতুন গম্বুজ, সম্প্রসারিত প্রাঙ্গণ, একটি হাসপাতাল, রান্নাঘর এবং অতিথিশালা নির্মাণ করা হয়, যাতে বিপুলসংখ্যক তীর্থযাত্রীর আবাসনের ব্যবস্থা করা যায়। ১৭১৩ সালে স্মৃতিস্তম্ভটি পুনরুদ্ধার করা হয় এবং ১৭১৬ সালে গম্বুজটি আরও মজবুত করা হয়।
১৭৪২ সালে নাদের শাহ গম্বুজ ও মিনার স্বর্ণখচিত করার নির্দেশ দেন।[৩] নাসরুল্লাহ আল-হায়েরি তাঁর বিখ্যাত কবিতা ইযা দামাকা আদ-দাহরু ইয়াওমান ওয়া জারা (আরবি: إذا ضامك الدهر يوماً وجارا)-এ এই স্বর্ণখচিত রূপের বর্ণনা করেছেন।[৪][৫] নাদের শাহের স্ত্রী প্রাচীর ও প্রাঙ্গণের পুনর্নির্মাণ এবং ইওয়ানের ফায়েন্স টাইলসের পুনঃস্থাপনের ব্যয় বহন করেন। ১৭৪৫ সালে ইওয়ানটি নয় স্তরবিশিষ্ট স্বর্ণখচিত মুকারনাস শৈলীতে পুনর্নির্মিত হয়। ১৭৯১ সালে প্রাঙ্গণে উঁচু পাথরের মেঝে নির্মাণ করে নিচের সমাধিগুলো আচ্ছাদিত করা হয়, ফলে সেগুলোর নিচে একটি ভূগর্ভস্থ কক্ষের সৃষ্টি হয়।
প্রথম দিকের ইউরোপীয় দর্শনার্থীদের মধ্যে ছিলেন কার্স্টেন নিবুহর, যিনি ১৭৬৫ সালে মাজারটি পরিদর্শন করেন, উইলিয়াম কেনেথ লফটাস, যিনি ১৮৫৩ সালে আসেন, এবং ইয়োহান লুডভিগ বুর্কহার্ট, যিনি ১৮৬৪ সালে পরিদর্শন করেন। উসমানীয় সুলতান আবদুল আজিজ ১৮৬৩ সালে ঘড়ি তোরণ (বাব আল-সা'আ) এবং মুসলিম ইবনে আকিলের তোরণ পুনর্নির্মাণ করেন। পরে ১৮৮৮ সালে নাসের আল-দীন শাহ কাজার ঘড়ি তোরণটি স্বর্ণখচিত করেন।[৬] ১৮৮৬ সালে তিনি আবহাওয়ার প্রভাবে সৃষ্ট ফাটল মেরামতের জন্য গম্বুজটিরও সংস্কারকাজ সম্পন্ন করেন।
স্বাধীন ইরাক
[সম্পাদনা]উপসাগরীয় যুদ্ধ-পরবর্তী ১৯৯১ সালের মার্চ মাসের বিদ্রোহের সময় সাদ্দাম হোসেনের রিপাবলিকান গার্ড মাজারটিতে হামলা চালিয়ে এর ক্ষতিসাধন করে। সে সময় সেখানে অবস্থান নেওয়া শিয়া বিরোধী গোষ্ঠীর সদস্যরা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন এবং মাজার প্রাঙ্গণে অবস্থানকারী প্রায় সকল ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়। এরপর মাজারটি সংস্কারের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে দুই বছরের জন্য বন্ধ রাখা হয়। একই সময়ে সাদ্দাম হোসেন ওই অঞ্চলের ইরানি বংশোদ্ভূত বহু বাসিন্দাকে ইরানে নির্বাসিত করেন।
২০০৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ইরাক আক্রমণের পরবর্তী তিন বছরে মাজারটিতে একাধিক সহিংস ঘটনা ঘটে।
- ১০ এপ্রিল, ২০০৩ – সাদ্দাম হোসেন আমলের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক হায়দার আল-কিল্লিদার আল-রুফায়ে এবং সাদ্দামবিরোধী শিয়া নেতা সাইয়েদ আব্দুল মাজিদ আল-খোয়ি, যিনি গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ আবুল কাসিম আল-খোয়িের পুত্র, মসজিদের কাছে এক উত্তেজিত জনতার হাতে নিহত হন। আল-খোয়ি যুক্তরাজ্যে নির্বাসিত জীবন শেষে দেশে ফিরে এসে ইরাকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন দখলদার প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
- ২৯ আগস্ট, ২০০৩ – ইমাম আলী মাজার বোমা হামলা সংঘটিত হয়। জুমার প্রধান নামাজ শেষ হওয়ার পরপরই মসজিদের বাইরে একটি গাড়িবোমার বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ৮৫ থেকে ১২৫ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন ইরাকের ইসলামী বিপ্লবের সর্বোচ্চ পরিষদের শিয়া নেতা ও প্রভাবশালী আয়াতুল্লাহ সাইয়েদ মোহাম্মদ বাকির আল-হাকিম। ধারণা করা হয়, হামলাটি আবু মুসাব আল-জারকাউয়ি পরিচালনা করেছিলেন।
- ২৪ মে, ২০০৪ – অজ্ঞাত উৎস থেকে নিক্ষিপ্ত মর্টারের গোলায় মাজারটি আঘাতপ্রাপ্ত হয়। এতে ইমাম আলীর সমাধিতে প্রবেশের ফটকগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
- ৫ আগস্ট, ২০০৪ – মুকতাদা আল-সদর এবং মাহদি আর্মি মসজিদটি দখল করে এটিকে ইরাকি পুলিশ, প্রাদেশিক সরকার এবং জোট বাহিনীর বিরুদ্ধে সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে। শেষ পর্যন্ত একটি শান্তি চুক্তির মাধ্যমে সংঘর্ষের অবসান ঘটে। আশপাশের ভবনগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও মসজিদটির মূল কাঠামোতে কেবল বিক্ষিপ্ত গুলিবর্ষণ ও শার্পনেলের আঘাতে সামান্য ক্ষতি হয়।
- ১০ আগস্ট, ২০০৬ – এক আত্মঘাতী বোমা হামলাকারী মাজারের কাছে নিজেকে বিস্ফোরিত করলে ৪০ জন নিহত এবং ৫০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হন।
স্থাপত্য ও সজ্জা
[সম্পাদনা]
অষ্টম শতাব্দীতে হারুন আল-রশিদের শাসনামলে ইমাম আলীের সমাধি আবিষ্কারের পর থেকে এর ওপর একাধিক স্থাপনা নির্মিত হয়েছে।[৭] তবে বর্তমান স্থাপনাটি সাফাভীয় যুগে সপ্তদশ শতাব্দীতে নির্মিত হয় এবং এর নকশা প্রণয়ন করেন বিখ্যাত বহুবিদ্যাবিশারদ বাহা আল-দীন আল-আমিলি। মাজারটির কেন্দ্রে একটি সমাধি কক্ষ রয়েছে, যার ওপর ৪২ মিটার (১৩৮ ফুট) উঁচু একটি বিশাল দ্বিস্তরবিশিষ্ট পেঁয়াজাকৃতির গম্বুজ এবং দুই পাশে ৩৮ মিটার (১২৫ ফুট) উঁচু দুটি মিনার অবস্থিত।[৮] গম্বুজের অভ্যন্তরীণ স্তরটি সমাধি কক্ষের ভেতর থেকে দেখা যায়, আর বাইরের বৃহৎ স্তরটি মাজার প্রাঙ্গণ ও সমগ্র শহর থেকে দৃশ্যমান। সমাধি কক্ষ এবং এর চারপাশের হলগুলো আয়নার মোজাইকে সজ্জিত, যদিও এর অধিকাংশই সময়ের সঙ্গে প্রতিস্থাপিত হয়েছে। তবে গম্বুজের অভ্যন্তরের সিরামিক মোজাইকগুলো মূল সাফাভীয় যুগের নির্মাণকাল থেকেই অক্ষত রয়েছে। মাজারের সম্মুখভাগে দুটি মিনারের মাঝখানে একটি বিশাল স্বর্ণখচিত ইওয়ান রয়েছে। গম্বুজ, ইওয়ান ও মিনার তামার পাতের ওপর সোনার প্রলেপে আবৃত, যদিও এগুলো মূলত সবুজ ও নীল সিরামিক টাইল দিয়ে সজ্জিত ছিল। ১৭৪৩ সালে নাদের শাহ এবং তাঁর স্ত্রী রাজিয়া বেগমের নির্দেশে এসব অংশে সোনার প্রলেপ দেওয়া হয়। গম্বুজ, ইওয়ান ও মিনারে ফারসি ভাষা, আরবি ভাষা এবং আজেরি তুর্কি ভাষায় অসংখ্য শিলালিপি উৎকীর্ণ রয়েছে, যেখানে আলী ইবনে আবি তালিবের প্রশংসায় রচিত কবিতা এবং নাদের শাহের স্বর্ণমণ্ডনের বিবরণ সংরক্ষিত আছে। মাজারের বাম ও ডান দিকের দেয়াল কুয়ের্দা সেকা শৈলীর টাইল প্যানেলে অলংকৃত, যার অধিকাংশই অষ্টাদশ বা ঊনবিংশ শতাব্দীর। ইমাম আলীর মাজার ইরাকের শেষদিকের শিয়া মাজারগুলোর অন্যতম, যেখানে প্রায় সব প্রাচীন টাইল এখনো অক্ষত রয়েছে।[৯]
মাজারটির উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণ পাশে সূচালো খিলানবিশিষ্ট বারান্দাবেষ্টিত একটি বিশাল প্রাঙ্গণ রয়েছে এবং পশ্চিম পাশে এটি আল-রাস মসজিদের সঙ্গে সংযুক্ত। প্রাঙ্গণের বারান্দাগুলো দুই তলাবিশিষ্ট এবং এতে বহু ছোট কক্ষ রয়েছে, যা অতীতে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের আবাস হিসেবে ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে এগুলোর অধিকাংশ প্রশাসনিক কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আল-রাস মসজিদ, যার অর্থ ‘প্রধান মসজিদ’, আলী ইবনে আবি তালিবের সমাধির শিয়রের দিকে নির্মিত। ধারণা করা হয়, মূল মসজিদটি ইলখানাত আমলে চতুর্দশ শতাব্দীতে নির্মিত হয়েছিল। তবে ২০০৫ সালে মাজার কর্তৃপক্ষ সেটি ভেঙে আধুনিক নির্মাণসামগ্রী ও পদ্ধতিতে নতুন করে নির্মাণ করে। স্থানীয় স্থাপত্য ইতিহাসবিদ ও সংরক্ষণবিদদের মতে, এর ফলে মাজারের স্থাপত্য ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হারিয়ে যায় এবং আধুনিক উপকরণের ব্যবহার স্থাপনাটির স্থাপত্যগত অখণ্ডতাকে ক্ষুণ্ন করে। আল-রাস মসজিদের ইলখানাত যুগের মূল মিহরাব ১৮ বছর সংরক্ষণের পর ২০২৩ সালে পুনরুদ্ধার করা হয় এবং তা মাজারের জাদুঘরে প্রদর্শনের জন্য সংরক্ষিত হয়েছে।[১০]
মাজারে প্রবেশের জন্য পূর্ব, উত্তর ও দক্ষিণ দিকে অবস্থিত তিনটি প্রধান স্মারক ইওয়ান ব্যবহৃত হয়। এগুলো যথাক্রমে প্রধান বা ঘড়ি প্রবেশদ্বার, আল-তুসি প্রবেশদ্বার এবং কিবলা প্রবেশদ্বার নামে পরিচিত। এছাড়া আরও দুটি স্মারক প্রবেশদ্বার রয়েছে—ঘড়ি প্রবেশদ্বারের উত্তরে মুসলিম ইবনে আকিল প্রবেশদ্বার এবং দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে আল-আমারা বা আল-ফারাজ প্রবেশদ্বার। এসবের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো ঘড়ি প্রবেশদ্বার (ইওয়ান-ই-সা'আত), যার ওপর মোজাইক টাইলসখচিত একটি সুউচ্চ ঘড়ি-মিনার নির্মিত হয়েছে। ঘড়িটির যন্ত্রাংশ ও ঘণ্টা ম্যানচেস্টারে নির্মিত হয় এবং ১৮৮৭ সালে মাজারে আনা হয়, যার প্রমাণ ঘণ্টাগুলোর লোহার গায়ে উৎকীর্ণ নির্মাণলিপি।
ধর্মীয় তাৎপর্য এবং এলাকা
[সম্পাদনা]
ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের সমাধিস্থল হওয়ায়[১১] ইমাম আলীর মাজারকে সকল শিয়া মুসলমান ইসলামের চতুর্থ পবিত্রতম স্থান হিসেবে বিবেচনা করেন[১১][১২][১৩][১৪][১৫][১৬]। শিয়া বিশ্বাস অনুযায়ী[১৭], এই মসজিদের ভেতরে আলীর পাশেই আদম এবং নূহের দেহাবশেষ সমাহিত রয়েছে।[১৭][১৮] দ্য বোস্টন গ্লোবে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিয়া মুসলমানদের কাছে নাজাফ মক্কা, মদিনা এবং আল-আকসা মসজিদের পর চতুর্থ পবিত্রতম শহর।[১৯][২০][২১] ধারণা করা হয়, কেবল মাশহাদ, কারবালা, মক্কা এবং মদিনাতেই এর তুলনায় বেশি মুসলিম তীর্থযাত্রী সমবেত হন।[১৯][২২] জাফর আস-সাদিকের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি হাদিসে এই স্থানকে ‘আমাদের বিশেষভাবে সম্মানিত পাঁচটি পবিত্র স্থানের একটি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই মাজারে প্রতি বছর গড়ে অন্তত ৮০ লক্ষ তীর্থযাত্রী আগমন করেন এবং ভবিষ্যতে এই সংখ্যা ২ কোটিতে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হয়।[২৩] বহু শিয়া বিশ্বাস করেন, আলী চাননি তাঁর শত্রুরা তাঁর কবর অপবিত্র করুক। তাই তিনি তাঁর পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনদের গোপনে তাঁকে সমাহিত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে আব্বাসীয় খিলাফত আমলে জাফর আস-সাদিক সেই গোপন সমাধিস্থলের অবস্থান প্রকাশ করেন বলে বিশ্বাস করা হয়। অধিকাংশ শিয়া মুসলমানের মতে, আলীকে নাজাফের ইমাম আলীর মাজারেই সমাহিত করা হয়েছে এবং এই মাজারকে কেন্দ্র করেই শহরটির বিকাশ ঘটেছে। শিয়া ইমামদের বর্ণিত বহু হাদিস এবং নবী মুহাম্মদের সঙ্গে সম্পর্কিত বর্ণনায় এই মাজারে তীর্থযাত্রার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
নবী মুহাম্মদ বলেছেন, “জুলফিকার ছাড়া কোনো তরবারি নেই এবং আলী ছাড়া কোনো বীর নেই। যে ব্যক্তি জীবদ্দশায় আলীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে, সে যেন আমার সঙ্গেই সাক্ষাৎ করে। আর যে ব্যক্তি তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে, সে যেন আমার জীবদ্দশায় আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে।”[২৪][২৫]
দরদালান
[সম্পাদনা]- আকাশ থেকে তোলা মসজিদের দৃশ্য
- ইমাম আলীর কবর আবৃতকারী জারিহ
- ইমাম আলী মাজারের স্বর্ণের ইওয়ান
- ২০১৫ সালে আরবায়েনের সময়
- ইমাম আলীর জন্মবার্ষিকীর প্রাক্কালে তাঁর মাজারে ফুলের সজ্জা
- ১৯৯৪ সালে ইমাম আলী মাজার
- ইমাম আলী মাজারের ভিতরে
আরও দেখুন
[সম্পাদনা]- নূূূূহের সমাধি
- নূূূহের সাত আইন
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ "Ali"। Wikipedia (ইংরেজি ভাষায়)। ২৫ এপ্রিল ২০২১। সংগ্রহের তারিখ ২৮ এপ্রিল ২০২১।[ভালো উৎস প্রয়োজন]
- ↑ Battutah, Ibn (২০০২)। The Travels of Ibn Battutah। London: Picador। পৃ. ৫৬। আইএসবিএন ৯৭৮০৩৩০৪১৮৭৯৯।
- ↑ Tucker, Ernest (১৯৯৪)। "Nadir Shah and the Ja 'fari Madhhab Reconsidered"। Iranian Studies। ২৭ (1/4): ১৬৩–১৭৯। ডিওআই:10.1080/00210869408701825। আইএসএসএন 0021-0862। জেস্টোর 4310891।
- ↑ Kirmani, Abbas (১৯৫৪)। Diwan al-Sayyid Nasrallah al-Haeri (আরবি ভাষায়)। Najaf, Iraq: Matba'at al-Ghari al-Haditha। পৃ. ১৯।
- ↑ "Tarikh Tathhib al-Marqad al-Alawi al-Muttahar" [The History of the Gilding of the Holy Alid Shrine]। Imam Ali Holy Shrine (আরবি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০।
- ↑ Tabbaa, Yasser; Mervin, Sabrina; Bonnier, Erick (২০১৪)। Najaf, The Gate of Wisdom। UNESCO। পৃ. ৩২, ৭৩–৮১। আইএসবিএন ৯৭৮৯২৩১০০০২৮৭।
- ↑ "History of the shrine of Imam Ali ibn Abi Talib"। Al-Islam.org। ২৬ জুলাই ২০২২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
- ↑ Abid, Sadiq (জুলাই ২০১৫)। "Imam Ali Shrine, Institution and Cultural Monument: The implications of cultural significance and its impact on local conservation management"। WIT Transactions on the Built Environment। ১৫৩: ৮৭–৯৭ – WIT Press এর মাধ্যমে।
- ↑ "The Shrine of Imam Ali – Between Two Different Areas"। Persian Architecture Archives। ৮ মার্চ ২০২২। সংগ্রহের তারিখ ১৭ নভেম্বর ২০২৩।
- ↑ محراب ایرانی حرم امام علی (ع) مرمت شد। Atabat.org (আরবি ভাষায়)। ২০ এপ্রিল ২০২৩।
- 1 2 "Never Again!"। Shia News। ৫ আগস্ট ২০০৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
- ↑ "Iran Diary, Part 2: Knocking on heaven's door"। Asia Times Online। ৩ জুন ২০০২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
- ↑ "Muslim Shia's Saint Imam Ali Holy Shrine"। Cultural Heritage Photo Agency। ৫ সেপ্টেম্বর ২০১০ তারিখে মূল থেকে (16 images) আর্কাইভকৃত।
- ↑ "The tragic martyrdom of Ayatollah Al Hakim calls for a stance"। Modarresi News। ৪ সেপ্টেম্বর ২০০৩। ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
- ↑ "Title required"। Zaman Online। ১৩ আগস্ট ২০০৪। ২৮ অক্টোবর ২০০৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
- ↑ "Why 2003 is not 1991"। The Guardian। ১ এপ্রিল ২০০৩।
- 1 2 al-Qummi, Ja'far ibn Qūlawayh (২০০৮)। Kāmil al-Ziyārāt। Shiabooks.ca Press। পৃ. ৬৬–৬৭।
- ↑ "Najaf"। Al-Islam.org।
- 1 2 "Iraqi forces in Najaf take cover in important Shia shrine"। The Boston Globe। ২ এপ্রিল ২০০৩। ৭ এপ্রিল ২০০৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
- ↑ "Religious rivalries and political overtones in Iraq"। CNN। ২৩ এপ্রিল ২০০৩। ১১ জুন ২০০৯ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
- ↑ "Miscellaneous Relevant Links"। UGA.edu: Muslims, Islam, and Iraq। ৬ অক্টোবর ২০১১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
- ↑ Higgins, Andrew (২ জুন ২০০৭)। "Inside Iran's Holy Money Machine"। Wall Street Journal (মার্কিন ইংরেজি ভাষায়)। আইএসএসএন 0099-9660। সংগ্রহের তারিখ ২৬ জানুয়ারি ২০২৬।
- ↑ "Red tape curbs profits from Iraq religious tourism"। Reuters। ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৯। সংগ্রহের তারিখ ৯ মে ২০০৯।
- ↑ "Sunni authenticity of this quote about zulfiqar"। Islam Stack Exchange (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২৬ জানুয়ারি ২০২৬।
- ↑ Redha, Mohammad; Mohammad Agha (১৯৯৯)। Imam Ali Ibn Abi Taleb (Imam Ali the Fourth Caliph)। খণ্ড ১। Dar Al Kotob Al ilmiyah। আইএসবিএন ২-৭৪৫১-২৫৩২-X।