আত্মহত্যা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
আত্মহন্তা
শ্রেণীবিভাগ এবং বহিরাগত রিসোর্স
১৮৭৭ - ১৮৮১ সালে এডোয়ার্ড ম্যানেট কর্তৃক দ্য সুইসাইড অঙ্কিত চিত্রকর্ম
আইসিডি-১০ X60.X84.
আইসিডি- E950
মেডলাইনপ্লাস 001554
ইঔষধ article/288598
মেএসএইচ F01.145.126.980.875

আত্মহত্যা বা আত্মহনন (ইংরেজি: Suicide) হচ্ছে একজন নর কিংবা নারী কর্তৃক ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের জীবন বিসর্জন দেয়া বা স্বেচ্ছায় নিজের প্রাণনাশের প্রক্রিয়াবিশেষ। ল্যাটিন ভাষায় সুই সেইডেয়ার থেকে আত্মহত্যা শব্দটি এসেছে, যার অর্থ হচ্ছে নিজেকে হত্যা করা। যখন কেউ আত্মহত্যা করেন, তখন জনগণ এ প্রক্রিয়াকে আত্মহত্যা করেছে বলে প্রচার করে। ডাক্তার বা চিকিৎসকগণ আত্মহত্যার চেষ্টা করাকে মানসিক অবসাদজনিত গুরুতর উপসর্গ হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। ইতোমধ্যেই বিশ্বের অনেক দেশেই আত্মহত্যার প্রচেষ্টাকে এক ধরনের অপরাধরূপে ঘোষণা করা হয়েছে।[১] অনেক ধর্মেই আত্মহত্যাকে পাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।[২][৩][৪][৫] যিনি নিজেই নিজের জীবন প্রাণ বিনাশ করেন, তিনি - আত্মঘাতক, আত্মঘাতী বা আত্মঘাতিকা, আত্মঘাতিনীরূপে সমাজে পরিচিত হন।

প্রতিবছর প্রায় দশ লক্ষ মানুষ আত্মহত্যা করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-এর মতে প্রতি বছর সারা বিশ্বে যে সব কারণে মানুষের মৃত্যু ঘটে তার মধ্যে আত্মহত্যা ত্রয়োদশতম প্রধান কারণ।[৬] কিশোর-কিশোরী আর যাদের বয়স পঁয়ত্রিশ বছরের নিচে, তাদের মৃত্যুর প্রধান কারণ হচ্ছে আত্মহত্যা।[৭][৮] নারীদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে আত্মহত্যার হার অনেক বেশি। পুরুষদের আত্মহত্যা করার প্রবণতা নারীদের তুলনায় তিন থেকে চার গুণ।[৯][১০]

আত্মঘাতী হামলা[সম্পাদনা]

মূল নিবন্ধ: আত্মঘাতী হামলা

অনেক সময় নিরীহ জনসাধারণের উপর হামলার মাধ্যমে হত্যা করার জন্যও ব্যক্তির আত্মহত্যাকে এক ধরনের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।[১১][১২][১৩] আত্মঘাতী হামলার মাধ্যমে এক বা একাধিক ব্যক্তিকে হত্যার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কোন উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করে। একজন আত্মঘাতী বোমা হামলাকারী বোমা বহন করে কিংবা তার শরীরে টেপ দিয়ে বোমা বেধে রেখে জনতাকে হত্যার লক্ষ্যে অগ্রসর হয় ও বোমা ফাটায়। এরফলে আত্মঘাতী বোমা হামলাকারী নিরীহ জনগণকে হত্যা কিংবা আহত করে এবং নিজেও এর শিকার হয়। সাধারণতঃ বোমা বহনকারী ব্যক্তি নির্মমভাবে নিজের প্রাণ বিসর্জন দিয়ে থাকে কিংবা গুরুতর আহত হয়।

মানব সভ্যতার ইতিহাসে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য আত্মঘাতী হামলার উদাহরণ রয়েছে। তন্মধ্যে - কামিকাযিদের আক্রমণ অন্যতম। তারা জাপানী বোমারু বিমানের পাইলট হিসেবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকান সৈনিকদের হত্যার লক্ষ্যে নৌবহরে তাদের বিমানকে সংঘর্ষের মাধ্যমে ধ্বংস করার ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছিল।

৯/১১ খ্যাত ১১ সেপ্টেম্বর, ২০০১ তারিখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী বোমা হামলা পরিচালিত হয়। এতে উড়ন্ত বিমানকে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের সুউচ্চ ভবনপেন্টাগনকে লক্ষ্য করে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হয়েছিল যা মানব ইতিহাসে জঘন্যতম ঘটনা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

এছাড়াও, ভারতের সপ্তম প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ১৯৯১ সালের ২১ মে দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের শ্রীপেরামবুদুরে এক আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। ভারতের ইতিহাসে এই ঘটনা রাজীব গান্ধী হত্যাকাণ্ড নামে পরিচিত পায়। উক্ত বিস্ফোরণে রাজীব গান্ধী ছাড়াও আরও চৌদ্দ জন নিহত হয়েছিলেন।[১৪]

ঝুঁকিগত কারণ[সম্পাদনা]

নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে দেখা যায় যে, মানসিক ভারসাম্যহীনতার কারণে ৮৭% থেকে ৯৮% আত্মহত্যাকর্ম সংঘটিত হয়। এছাড়াও, আত্মহত্যাজনিত ঝুঁকির মধ্যে অন্যান্য বিষয়াদিও আন্তঃসম্পৃক্ত। তন্মধ্যে - নেশায় আসক্তি, জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে না পাওয়া, আত্মহত্যায় পারিবারিক ঐতিহ্য অথবা পূর্বেকার মাথায় আঘাত অন্যতম প্রধান উপাদান।[১৫][১৬]

আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে বেকারত্ব, দারিদ্র্যতা, গৃহহীনতা এবং বৈষম্যতাজনিত উপাদানগুলো আত্মহত্যায় উৎসাহিত করে থাকে।[১৭] দারিদ্র্যতা সরাসরি আত্মহত্যার সাথে জড়িত নয়। কিন্তু, এটি বৃদ্ধির ফলে আত্মহত্যার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায় এবং উদ্বেগজনিত কারণে আত্মহত্যার উচ্চস্তরে ব্যক্তি অবস্থান করে।[১৮] শৈশবকালীন শারীরিক ইতিহাস কিংবা যৌন অত্যাচার,[১৯] অথবা, কঠোর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সময় অতিবাহিতজনিত কারণও ঝুঁকিগত উপাদান হিসেবে বিবেচিত।[২০][২১][২২] বর্তমানে প্রেমে ব্যার্থতা বা প্রিয়জনের মৃত্যুতে শোকাহত হয়ে আত্মহত্যা করার প্রবণতা বেড়ে চলেছে। পরিবার বা সমাজ স্বীকৃতি না দেওয়ায় প্রেমিক যুগলের সম্মিলিত আত্মহত্যার ঘটনাও প্রায়ই ঘটছে।

আরোগ্য লাভ[সম্পাদনা]

আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতিতে আত্মহত্যাকে মানসিক অসুস্থতাসংক্রান্ত বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করেছে। উপযুক্ত চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণের মাধ্যমে এ ব্যাধি থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভবপর। যখন একজন ব্যক্তি আত্মহত্যার বিষয়ে ব্যাপক চিন্তা-ভাবনা শুরু করেন, তখনই তাকে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে। মনোবিদগণ বলেন যে, যখন ব্যক্তি নিজেকে হত্যা করার পরিকল্পনা করে তা জানামাত্রই সংশ্লিষ্টদের উচিত হবে কাউকে জানানো। ভুক্তভোগী ব্যক্তি ইতিমধ্যেই সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন যে কিভাবে আত্মহত্যা করবেন, তা সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

যে সকল ব্যক্তি দুঃশ্চিন্তায় পড়েন তারা আত্মহত্যায় সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দলের অন্তর্ভূক্ত। উন্নত দেশে বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চরম মুহুর্তজনিত হটলাইন রয়েছে যাতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তাদের চিন্তা-ভাবনা এবং আত্মহত্যার পরিকল্পনার কথা জানায়। হটলাইন ব্যবহারের মাধ্যমে ভুক্তভোগী তার সমস্যার সমাধানের পথ সম্পর্কে অবহিত হয়ে আত্মহত্যা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, নিজেকে ভালবাসাকে আত্মহত্যা থেকে বাঁচার জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়।[২৩]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "Laws - IPC - Section 309"vakilno1.com। সংগৃহীত এপ্রিল ৫, ২০১০ 
  2. "Suicide as seen in Islam"inter-islam.org। সংগৃহীত এপ্রিল ৫, ২০১০ 
  3. "Hinduism and suicide"hinduwebsite.com। সংগৃহীত এপ্রিল ৫, ২০১০ 
  4. "Euthanasia and Judaism: Jewish Views of Euthanasia and Suicide - ReligionFacts"religionfacts.com। সংগৃহীত এপ্রিল ৫, ২০১০ 
  5. Vander Heeren, Achille (১৯১২)। "Suicide"The Catholic Encyclopedia 14। New York: Robert Appleton Company। 
  6. Bruce Gross, Forrensic Examiner, Summer, 2006
  7. "CIS: UN Body Takes On Rising Suicide Rates – Radio Free Europe / Radio Liberty 2006" 
  8. O'Connor, Rory; Sheehy, Noel (২৯ Jan ২০০০)। Understanding suicidal behaviour। Leicester: BPS Books। পৃ: 33–37। আইএসবিএন 978-1-85433-290-5 
  9. [১]
  10. Gelder et al, 2005 p169. Psychiatry 3rd Ed. Oxford: New York
  11. VIRGINIA WHEELER (২০১০-০৪-০৬)। "9 dead in suicide attack on U.S. HQ"The Sun। সংগৃহীত ২০১০-০৪-০৬ 
  12. Reuters (২০১০-০৪-০৬)। "Policemen die in Ingushetia suicide bomb"Reuters। সংগৃহীত ২০১০-০৪-০৬ 
  13. Rod Nordland, Riyadh Mohammed (২০১০-০৪-০৫)। "Baghdad blasts kill dozens"New York Times। সংগৃহীত ২০১০-০৪-০৬ 
  14. "1991: Bomb kills India's former leader Rajiv Gandhi"BBC News। ১৯৯১-০৫-২১। সংগৃহীত ২০০৮-০৮-০৫ 
  15. Teasdale TW, Engberg AW (October ২০০১)। "Suicide after traumatic brain injury: a population study"। J. Neurol. Neurosurg. Psychiatr. 71 (4): 436–40। ডিওআই:10.1136/jnnp.71.4.436পিএমআইডি 11561024পিএমসি 1763534  |month= প্যারামিটার অজানা, উপেক্ষা করুন (সাহায্য)
  16. Simpson G, Tate R (December ২০০৭)। "Suicidality in people surviving a traumatic brain injury: prevalence, risk factors and implications for clinical management"। Brain Inj 21 (13-14): 1335–51। ডিওআই:10.1080/02699050701785542পিএমআইডি 18066936  |month= প্যারামিটার অজানা, উপেক্ষা করুন (সাহায্য)
  17. Qin P, Agerbo E, Mortensen PB (April ২০০৩)। "Suicide risk in relation to socioeconomic, demographic, psychiatric, and familial factors: a national register-based study of all suicides in Denmark, 1981–1997"। Am J Psychiatry 160 (4): 765–72। ডিওআই:10.1176/appi.ajp.160.4.765পিএমআইডি 12668367  |month= প্যারামিটার অজানা, উপেক্ষা করুন (সাহায্য)
  18. Birtchnell J, Masters N (September ১৯৮৯)। "Poverty and depression"। Practitioner 233 (1474): 1141–6। পিএমআইডি 2616460  |month= প্যারামিটার অজানা, উপেক্ষা করুন (সাহায্য)
  19. Dube SR, Anda RF, Felitti VJ, Chapman DP, Williamson DF, Giles WH (December ২০০১)। "Childhood abuse, household dysfunction, and the risk of attempted suicide throughout the life span: findings from the Adverse Childhood Experiences Study"। JAMA 286 (24): 3089–96। পিএমআইডি 11754674  |month= প্যারামিটার অজানা, উপেক্ষা করুন (সাহায্য)
  20. "Child Protection and Child Outcomes: Measuring the Effects of Foster Care" (PDF)। সংগৃহীত ২০১১-১১-০১ 
  21. Koch, Wendy (২০০৭-০৭-০৩)। "Study: Troubled homes better than foster care"। Usatoday.Com। সংগৃহীত ২০১১-১১-০১ 
  22. Lawrence, CR; Carlson, EA; Egeland, B (২০০৬)। "The impact of foster care on development"। Development and Psychopathology 18 (1): 57–76। ডিওআই:10.1017/S0954579406060044পিএমআইডি 16478552 
  23. Preventing Suicide, A resource for teacher and other school staff, 2000

আরও পড়ুন[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]