স্টেরয়েড

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
Complex chemical diagram
কোলেস্টেনের গঠন, ২৭টি কার্বন পরমাণুযুক্ত একটি স্টেরয়েড। এর ১৮ টি কার্বন পরমাণুর সমন্বয়ে গঠিত কোর রিং সিস্টেম (ABCD) ইউপ্যাক- অনুমোদিত রিং লেটারিং এবং পরমাণুর সংখ্যায়ন সহ দেখানো হয়েছে।[১]:১৭৮৫f
অ্যাড্রিনাল স্টেরয়েডের পথ

স্টেরয়েড হল প্রাণীদেহে স্বাভাবিকভাবে উৎপন্ন একপ্রকার জৈব যৌগ ৷ যা মূলত স্ট্রেস দূর করতে এবং বয়ঃসন্ধির সময় শারীরিক গঠন তৈরিতে কাজে লাগে ৷ একই সঙ্গে স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ সাধারণত অ্যান্টি ইনফ্লেমেটরি ড্রাগ হিসাবে ব্যবহৃত হয় নানা ব্যথা নিরাময়ে৷ একবার স্টেরয়েড ইঞ্জেকশন নিলে ৩-৬ মাস দিব্যি ভাল থাকা যায়৷

স্টেরয়েড হল হরমোন হিসাবে পরিচিত রাসায়নিকগুলির একটি মানবসৃষ্ট সংস্করণ যা মানবদেহে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হয়। এই স্টেরয়েডগুলি প্রদাহ হ্রাস করতে হরমোনগুলির মতো কাজ করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। এগুলি কর্টিকোস্টেরয়েডস নামেও পরিচিত এবং এটি বডি বিল্ডার এবং অ্যাথলেটদের জন্য ব্যবহৃত অ্যানাবলিক স্টেরয়েডগুলির থেকে পৃথক।

স্থায়িত্ব অনুযায়ী স্টেরয়েড মূলত তিনভাগে বিভক্ত–

  • শর্ট অ্যাকটিং স্টেরয়েড: এই ওষুধগুলো মূলত ৫-৭ দিনের কোর্সে দেওয়া হয়৷ যেমন Hydrocortisone৷
  • ইন্টারমিডিয়েট অ্যাকটিং স্টেরয়েড: এই স্টেরয়েডগুলো ২-৪ সপ্তাহ দেওয়া হয়৷ যেমন Prednisone এবং Methylprednisolone৷
  • লং অ্যাকটিং স্টেরয়েড: এই স্টেরয়েডগুলো দীর্ঘদিন ধরে দেওয়া যায়। তবে খুবই অল্প পরিমাণে! যেমন Dexamethasoneþ৷

গাছপালা, প্রাণী এবং ছত্রাকে শত শত স্টেরয়েড পাওয়া যায়। সমস্ত স্টেরয়েডগুলি স্টেরল ল্যানোস্টেরল (ওপিস্টোকন্টস) বা সাইক্লোয়ারটেনল (উদ্ভিদ) কোষ থেকে তৈরি করা হয়। ল্যানোস্টেরল এবং সাইক্লোয়ারটেনল চক্রাকার যৌগ ট্রাইটারপিন স্কোলেইন থেকে প্রাপ্ত । স্টেরয়েডের মূল কাঠামোটি সাধারণত সতেরোটি কার্বন পরমাণুর সমন্বয়ে গঠিত, চারটি "ফিউজড" রিংগুলিতে আবদ্ধ: তিনটি ছয় সদস্যের সাইক্লোহেক্সেন রিং (প্রথম চিত্রটিতে রিং এ, বি এবং সি) এবং পাঁচ সদস্যের একটি সাইক্লোপেনটেন রিং (ডি রিং) । স্টেরয়েডগুলি এই ফোর-রিং কোরের সাথে সংযুক্ত ক্রিয়াকলাপী গোষ্ঠীগুলির দ্বারা এবং রিংগুলির জারণ অবস্থার দ্বারা পৃথক হয়। হাইড্রোক্সিল গ্রুপের তৃতীয় অবস্থানের স্টেরয়েডগুলি নিয়ে স্টেরলগুলি গঠিত হয়।[১]:১৭৮৫f[২] স্টেরয়েডগুলি আরও মূলগতভাবে পরিবর্তিত হতে পারে যেমন রিং স্ট্রাকচারের দ্বারা পরিবর্তনগুলি উদাহরণস্বরূপ, রিংগুলির একটি কেটে নেওয়া। রিং বি কাটিং সেকোস্টেরয়েড তৈরি করে যার মধ্যে একটি হল ভিটামিন ডি

ব্যবহারের প্রকার[সম্পাদনা]

স্টেরয়েডকে ব্যবহারের দিক থেকে দু’ভাগে ভাগ করা হয়–

  •  ওরাল মেডিসিন অর্থাৎ ওষুধটি খাওয়া হয়৷ এটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিসে দেওয়া হয়৷
  •  ইনজেকটেবল অর্থাৎ ইনজেকশন হিসাবে এটি ব্যবহৃত হয়৷ এক্ষেত্রে ট্রপিকাল মানে চামড়ায় ইনজেকশন, ইন্ট্রা-আর্টিকুলার মানে জয়েন্টে ইনজেকশন এবং ইন্ট্রা-ভাসকুলার অর্থাৎ ভেইনে ইনজেকশন দেওয়া হয়৷ জয়েন্ট পেইন ও স্পাইনালের সমস্যায় এই প্রকার ওষুধ চিকিৎসকেরা দিয়ে থাকেন৷

স্টেরয়েডের সুবিধা[সম্পাদনা]

  •  দ্রুত ব্যথা নিরাময় করে।
  •  দৈনন্দিন কর্মক্ষমতা ফিরিয়ে দেয়।
  •  পেন কিলার খেতে হয় না।
  •  মাংসপেশির দৃঢ়তা বাড়িয়ে তোলে।
  •  প্যারালাইসিস হওয়ার হাত থেকে বাঁচায়।
  •  ইনফ্লেমেশন দূর করে।

সতর্কতা[সম্পাদনা]

হার্বাল ক্লিনিকগুলোও এখন যথেচ্ছ পরিমাণে স্টেরয়েড ব্যবহার করছে। তাই এ বিষয়ে সতর্ক থাকুন৷

  •  স্টেরয়েড সব সময় স্বল্প মাত্রায় স্বল্প দিনের ব্যবধানে দেওয়া উচিৎ৷
  •  ওরাল স্টেরয়েড খাওয়ার পর অ্যান্টাসিড খাওয়া জরুরি৷
  •  রাতে স্টেরয়েড নিলে তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বেশি হয়৷
  •  চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধের দোকান থেকে স্টেরয়েড কিনবেন না৷
  •  চিকিৎসককে স্টেরয়েড লিখে দেওয়ার জন্য অনুরোধ কখনই নয়!
  •  ব্লাড প্রেশার ও সুগার নিয়ন্ত্রণে রেখে স্টেরয়েড নেওয়া উচিৎ৷
  •  স্টেরয়েডের ডোজ ও কোর্স একমাত্র চিকিৎসকই নির্বাচন করবেন৷
  •  স্টেরয়েড চলাকালীন কোনও প্রকার উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসককে জানান৷

স্টেরয়েডের ব্যবহার[সম্পাদনা]

  • স্লিপ ডিস্ক: দীর্ঘ সময় বাইক চালালে বা কোনও দুর্ঘটনা হলে স্লিপ ডিস্ক হয়৷ এক্ষেত্রে মূলত কোমরে ব্যথা হয়৷ চিকিৎসক ফিজিওথেরাপির সঙ্গে অসহ্য ব্যথা কমানোর জন্য ৫-৭ দিনের একটি শর্ট কোর্স স্টেরয়েড দিয়ে থাকেন৷
  • স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি: দুর্ঘটনার ফলে এখন হামেশাই স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি দেখা যায়৷ এক্ষেত্রে ৮ ঘণ্টার মধ্যে ইন্ট্রা-ভাসকুলার স্টেরয়েড ইনজেকশন না দিলে রোগীর প্যারালাইসিস হয়ে যেতে পারে৷ তাই এক্ষেত্রে চিরতরে পঙ্গু হয়ে যাওয়ার হাত থেকে স্টেরয়েড রক্ষা করে৷
  • সারভাইকাল স্পনডিলোসিস: বয়স্কদের মধ্যে মূলত এই প্রকার সমস্যা দেখা যায়৷ এক্ষেত্রে চিকিৎসক প্রথমে ফিজিওথেরাপি ও কিছু মেডিসিন দেন৷ তাতে যদি ভাল কাজ না হয়, তখন ডিপোমেডরল স্টেরয়েড ইনজেকশন দেওয়া হয়৷ এক্ষেত্রে লোকাল অ্যানাস্থেসিয়ার দ্বারা ফেমেট জয়েন্ট ব্লক করা হয়৷
  • টেনিস এলবো: দীর্ঘদিন ভারী কাজ করার জন্য বা অত্যধিক কনুইয়ের মুভমেন্টের কারণে (বিশেষ করে খেলোয়াড়দের) এই রোগটি হয়৷ কনুইয়ে অসহ্য যন্ত্রণার পাশাপাশি এর চারপাশের টেনডন ড্যামেজ হয়ে যায়৷ এক্ষেত্রে চিকিৎসক ব্যথা কমানোর জন্য শর্ট অ্যাকটিং স্টেরয়েড দেন৷
  • প্লান্টার ফ্যাসাইটিস বা হিল স্পার: এটি একটি ক্রনিক ডিজিজ৷ এক্ষেত্রে গোড়ালির হাড় বেড়ে যায়, ফলে হাঁটাচলা করলে প্রচণ্ড যন্ত্রণা হয়৷ ওষুধ, ডক্টর-শ্যু প্রভৃতি দিয়ে চিকিৎসা করে কোনও ফল না পাওয়া গেলে গোড়ালিতে অ্যান্টি ইনফ্লেমেটরি ইনজেকশন দেওয়া হয়৷
  • টেনডন নি: হাঁটুর অতি পরিচিত ইনজুরি হল টেনডোনাইটিস৷ কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসক স্টেরয়েড দেন৷ মূলত লোকাল স্টেরয়েড দেওয়া হয়৷
  • রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস: এটি অটো ইমিউন ডিজিজ৷ এক্ষেত্রে রোগীর জয়েন্টগুলিতে প্রদাহের কারণে অসহ্য যন্ত্রণা অনুভূত হয়৷ প্রয়োজন বিশেষে চিকিৎসক শর্ট অ্যাকটিং ওরাল স্টেরয়েড দিয়ে থাকেন৷
  • ফ্রোজেন সোলডার: এক্ষেত্রে কাঁধের রেঞ্জ ওফমোশান একেবারেই কমে গিয়ে প্রায় স্টিফ হয়ে যায়৷ প্রয়োজন হলে চিকিৎসক স্টেরয়েড ইনজেকশন দিয়ে থাকেন৷
  • আর্থ্রাইটিস: কিছু ক্ষেত্রে আর্থ্রাইটিসের জন্য সিঙ্গল জয়েন্ট ডয়েলিং হয়, তখন অসহ্য যন্ত্রণার হাত থেকে মুক্তি পেতে চিকিৎসক ইন্ট্রা-আর্টিকুলার ইনজেকশন দিয়ে থাকেন৷

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াসমূহ[সম্পাদনা]

স্টেরয়েড হল এমনই এক ওযুধ যা যন্ত্রণা নির্মূল করতে বিশেষ কার্যকরী৷ কিন্তু চিকিৎসকের অনুমতি ছাড়া যথেচ্ছ ব্যবহার করা হলে নানা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়৷ • ডায়াবেটিসের প্রবণতা বেড়ে যায়। • ব্লাড প্রেশার ও কোলেস্টেরল বৃ‌দ্ধি পায়। • দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে হাড় ভঙ্গুর (অস্টিওপোরোসিস) হয়। • দীর্ঘদিন ব্যবহারের দরুণ সাইকোলজিক্যাল সমস্যা (সাইকোসিস) হতে পারে। • শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (ইমিউনিটি) হ্রাস পায়। • গ্যাসট্রিক আলসার হয়। • চামড়ার ঘনত্ব কমে আসে। • স্পাইনাল ইনজুরি বা ফ্র্যাকচার হয়। • দেহে লোমের আধিক্য হয়। • মহিলাদের গলার স্বর পরিবর্তিত হয়ে যায়।

  1. Moss GP, the Working Party of the IUPAC-IUB Joint Commission on Biochemical Nomenclature (১৯৮৯)। "Nomenclature of steroids, recommendations 1989" (PDF)Pure Appl. Chem.61 (10): 1783–1822। এসটুসিআইডি 97612891ডিওআই:10.1351/pac198961101783  Also available with the same authors at Carlson P, Bull JR, Engel K, Fried J, Kircher HW, Loaning KL, Moss GP, Popják G, Uskokovic MR (ডিসে ১৯৮৯)। "IUPAC-IUB Joint Commission on Biochemical Nomenclature (JCBN). The nomenclature of steroids. Recommendations 1989"। European Journal of Biochemistry / FEBS186 (3): 429–58। ডিওআই:10.1111/j.1432-1033.1989.tb15228.xপিএমআইডি 2606099 ; Also available online at "The Nomenclature of Steroids"। London, GBR: Queen Mary University of London। পৃষ্ঠা 3S–1.4। সংগ্রহের তারিখ ১০ মে ২০১৪ 
  2. Also available in print at Hill RA, Makin HL, Kirk DN, Murphy GM (১৯৯১)। Dictionary of Steroids। London, GBR: Chapman and Hall। পৃষ্ঠা xxx–lix। আইএসবিএন 978-0412270604। সংগ্রহের তারিখ ২০ জুন ২০১৫