উপন্যাস

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

উপন্যাস (ইং:Novel) গদ্যে লেখা দীর্ঘাবয়ব বর্ণনাত্মক কথাসাহিত্যকবিতা, নাটকছোটগল্পের ন্যায় উপন্যাস সাহিত্যের একটি বিশেষ শাখা। আধুনিক সাহিত্যে এটি তুলনামূলকভাবে নতুন আঙ্গিক। যিনি উপন্যাস রচনা করেন তিনি ঔপন্যাসিক

উপন্যাস লেখার নির্দিষ্ট নিয়ম বা কাঠামো নেই। তবে সচরাচর এগুলো ছোটগল্পের তুলনায় বৃহদাকার হয়ে থাকে। অধিকন্তু উপন্যাসের আখ্যানভাগ ও চরিত্রের বিস্তার লক্ষিত হয়। হ্রস্ব দৈর্ঘ্যের উপন্যাসকে অনু-উপন্যাস বা ইংরেজীতে নভেলা (ইং:Novella) বলা হয়ে থাকে।উপন্যাসে পরিবেশ (milieu) বর্ণনা, প্লট, চরিত্র, সংলাপ ইত্যাদি যখন মানুষের জীবনের কাহিনীকে সুন্দর ও স্বার্থকভাবে ফুটিয়ে তুলে তার মধ্যে জীবনের কোনো অর্থ বা ভাষ্য প্রকাশ করা হয়। জীবনের এই রূপায়ণ উপন্যাসের মাধ্যমে পাঠকের কাছে বাস্তব বলে প্রতীয়মান হয়। নাটক, রাজাবলি (chronicle), কাব্য ইত্যাদি থেকে উপাদান গ্রহণ করে উপন্যাস রচনারও প্রথা রয়েছে। বস্তুত: উপন্যাসের রূপ অত্যন্ত নমনীয় ও মিশ্র। তাই এর নানা রূপভেদ চোখে পড়ে।

সাহিত্যের বিভিন্ন শাখার মধ্যে উপন্যাস সর্বাধুনিক এবং সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় শাখা। অষ্টাদশ শতাব্দীর ইংল্যান্ডে প্রথম আধুনিক উপন্যাস রচিত হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝিভাগে বাংলা ভাষায় প্রথম উপন্যাসের প্রবর্তন হয়। ইংরেজি ভাষায় ড্যানিয়েল ডিফো ও বাংলায ভাষায় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় উপন্যাস ধারার প্রথম সার্থক রূপকার। তারপর থেকেই বিভিন্ন দেশে এই ধারার বিচিত্র ও বহুমুখী বিস্তার লক্ষ্য করা যায়।

পিকারেস্ক উপন্যাস[সম্পাদনা]

পিকারেস্ক উপন্যাস (Picaresque Novel) হল উপন্যাসের আদিতম রূপ। আনুমানিক পঞ্চদশ শতাব্দীতে জনৈক অজ্ঞাতনামা স্প্যানিশ লেখকের লাজারিলো ডি টর্মেস এই শ্রেণীর উপন্যাসের প্রথম উদাহরণ। সাধারণত এই জাতীয় উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র একজন দুর্বৃত্ত (picaro)। কখনও কখনও সে একজন নির্দোষ বা নির্বোধ ব্যক্তিরূপেও উপস্থিত হয়। তার জীবনে অনেক অ্যাডভেঞ্চার বা রোমাঞ্চকর ঘটনা ঘটে, যার দ্বারা তার জীবন প্রভাবিত হয়। লেখক এই ঘটনাগুলোকে বাস্তবরূপে এবং বিদ্রুপ ও কৌতুকরসের মধ্য দিয়ে বর্ণনা করেন। ফরাসি লেখক ল্যাসেগের গার ব্লাস (১৭১৫, ১৭২৪, ১৭৩৫) একটি বিশ্ববিখ্যাত পিকারেস্ক উপন্যাস। এই উপন্যাসটি উনিশ শতকের ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত বাঙালি সমাজের একটি প্রিয় বই ছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীর বিখ্যাত ইংরেজ ঔপন্যাসিক হেনরি ফিল্ডিংয়ের দ্য হিস্ট্রি অফ দি অ্যাডভেঞ্চারস অফ জোসেফ অ্যান্ড্রিউদ্য হিস্ট্রি অফ টম জোনস; টোবিয়াস স্মলেটের দি এক্সপেডিশন অফ হামফ্রে ক্লিঙ্কার; উনিশ শতকের বিশিষ্ট ঔপন্যাসিক চার্লস ডিকেন্সের পিকউইক পেপারস (১৮৩৬-৩৭) পিকারেস্ক উপন্যাসধারার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। বাংলা ভাষায় পিকারেস্ক উপন্যাসের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। জগদীশ গুপ্তের অসাধু সিদ্ধার্থ বাংলায় লেখা একটি উল্লেখযোগ্য পিকারেস্ক উপন্যাস।

সামাজিক উপন্যাস[সম্পাদনা]

সামাজিক উপন্যাস (social novel) উপন্যাসের একটি বিশেষ শ্রেণী। এই শ্রেণীর উদ্ভব ঘটে উনিশ শতকে। এই শতকে ইংরেজি সামাজিক উপন্যাসগুলিতে সমাজের নানা অন্যায়-অবিচার, কুপ্রথা প্রভৃতির উদ্‌ঘাটন এবং তাদের সমালোচনার মাধ্যমে সমাজ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করা হয়। ইংল্যান্ডের ভিক্টোরিয়ান যুগের মহিলা ঔপন্যাসিক এলিজাবেথ ক্লেগহর্ন গ্যাসকেল সমাজ সংস্কারের আদর্শ নিয়ে উপন্যাস রচনায় ব্রতী হয়েছিলেন। তিনি তাঁর মেরি বার্টন (১৮৪৮) ও নর্থ অ্যান্ড সাউথ (১৮৫৫) উপন্যাস দু'টিতে শিল্পবিপ্লবোত্তর ইংল্যান্ডের শ্রমিকসমাজের দুঃখ-দুর্গতি, পুঁজিপতিদের শোষণ, বেকারি ও অনাহার, প্রতিকূল অবস্থার চাপে নারীর গণিকাবৃত্তি গ্রহণ ইত্যাদি নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেন। পাদ্রি চার্লস কিংসলের (১৮১৯-৭১) উপন্যাসেও সমাজ সংস্কারের প্রেরণা ছিল অত্যন্ত প্রবল। তাঁর অ্যালটন লক জনৈক চার্চিস্ট শ্রমিকের কাল্পনিক আত্মজীবনী। এই উপন্যাসে লন্ডন শহরের কোনো কোনো অঞ্চলের পঙ্কিল পরিবেশ ও শ্রমিকদের শ্রেণীসচেতনতার কথা বাস্তব ও তীব্রভাবে ফুটে উঠেছে। শেষপর্যন্ত অবশ্য কিংসলে শ্রেণীসংগ্রাম নয়, খ্রিস্টধর্মে নায়কের বিশ্বাসকেই চিত্রিত করেছেন।

চার্লস ডিকেন্সের প্রায় প্রতিটি উপন্যাসেই সমাজের অন্যায়-অত্যাচার সজীব কল্পনায় চিত্রিত হয়েছে। তাঁর নিজের শৈশব অত্যন্ত দুঃখ-দারিদ্র্যের মধ্যে অতিবাহিত হয়েছিল। ডিকেন্স তাঁর অলিভার টুইস্ট (১৮৩৮) উপন্যাসে অনাথ আশ্রমে শিশুদের শোচনীয় দুর্গতির কথা, নিকোলাস নিকোলবি (১৮৩৮-৩৯) উপন্যাসে শিক্ষার নামে উৎপীড়ন ও শোষণ, ব্লেক হাউজ (১৮৫২-৫৩) উপন্যাসে আইনব্যবস্থার জটিলতা ও শ্লথগতি এবং তার সুযোগ নিয়ে উকিলদের অসহায় মক্কেলদের নির্মম শোষণ ও বঞ্চনা, লিটল ডোরিট (১৮৫৫-৫৬) উপন্যাসে সরকারি আমলাতন্ত্রের নির্মম হৃদয়হীনতা ও অবিচার ইত্যাদি চিত্রিত করেছেন। এই সব উপন্যাসের মধ্যে দিয়ে দরিদ্রদের প্রতি লেখকের গভীর সহানুভূতি ব্যক্ত হয়েছে।

বাংলা ভাষায় সামাজিক উপন্যাস ধারার সার্থক রূপকার হলেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তাঁর সামাজিক উপন্যাসগুলোর মধ্যে অরক্ষণীয়া, বামুনের মেয়েপল্লীসমাজ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অরক্ষণীয়া (১৯১৬) উপন্যাসে একটি শাস্ত্রনির্দিষ্ট বয়সে কন্যার বিবাহ দিতে না পারায় কন্যা ও মাতার সামাজিক লাঞ্ছনা ও দুর্গতি এবং বামুনের মেয়ে (১৯২০) উপন্যাসে কৌলিন্যপ্রথার বিষময় ফল, উক্ত প্রথার অসঙ্গতিপূর্ণ ও অন্তঃসারশূন্য গর্ব এবং অসহায় মেয়েদের উপর সমাজপতিদের অত্যাচারের বাস্তবসম্মত চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। শরৎচন্দ্রের সামাজিক উপন্যাসগুলোর মধ্যে পল্লীসমাজ সর্বশ্রেষ্ঠ। শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এই উপন্যাসটি সম্পর্কে বলেছেন,

পল্লীসমাজ-এ আচারনিষ্ঠা ও সমাজরক্ষার অজুহাতে যে কতটা ক্রূরতা, নীচ স্বার্থপরতা ও হেয় কাপুরুষতা আমাদের সমর্থন লাভ করিয়াছে, আমাদের জীবন যে কি পরিমাণ পঙ্গু ও অক্ষম হইয়া পড়িতেছে — ইহাই তিনি চোখে আঙ্গুল দিয়া দেখাইয়া দিয়াছেন।

প্রকারভেদ[সম্পাদনা]

  1. সামাজিক উপন্যাস
  2. ঐতিহাসিক উপন্যাস
  3. মনস্তত্ত্বমূলক উপন্যাস
  4. উদ্দেশ্যমূলক উপন্যাস
  5. কাব্যধর্মী উপন্যাস
  6. রহস্যোপন্যাস
  7. কাহিনী উপন্যাস
  8. আত্মজীবনমূলক উপন্যাস
  9. পত্রোপন্যাস উপন্যাস
  10. হাস্যরসাত্মক উপন্যাস
  11. চেতনাপ্রবাহমূলক উপন্যাস

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

আরো দেখুন[সম্পাদনা]