রবীন মজুমদার

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
রবীন মজুমদার
জন্ম
রবীন্দ্রনাথ মজুমদার

ডিসেম্বর ১৯১৯
মৃত্যু২৮ ডিসেম্বর, ১৯৮৩
কলকাতা
জাতীয়তাভারতীয়
নাগরিকত্বভারতীয়
শিক্ষাস্নাতক (বিজ্ঞান)
মাতৃশিক্ষায়তনস্কটিশ চার্চ কলেজ
পেশাগায়ক এবং অভিনেতা
উল্লেখযোগ্য কর্ম
শাপমুক্তি
এই কি গো শেষ দান
কবি
আদি নিবাসকাটিহার
পিতা-মাতা
  • অমূল্যকুমার মজুমদার (পিতা)

রবীন মজুমদার ছিলেন একজন ভারতীয় গায়ক চলচিত্র অভিনেতা ও নাট্য অভিনেতা। তিনি মূলত বাংলা ভাষায় গান করেছেন। গ্রামোফোনে একক কণ্ঠে তার গান বের হয়েছিল।

শৈশব জীবন[সম্পাদনা]

রবীন মজুমদার ১৯১৯ সালের ডিসেম্বরে হুগলির চোপা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম অমূল্যকুমার মজুমদার। বাবার চাকরির সুবাদে তিনি কাটিহারে বেড়ে উঠেন। ছোটকাল থেকেই তিনি সঙ্গীতের সাথে ছিলেন। বাবা তাঁকে একটি হারমোনিয়াম কিনে দেন। বারো-তেরো বছর বয়সে উত্তরবঙ্গ-রাজশাহী বিভাগ সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছিলেন। পরে পণ্ডিত বীরেন নিয়োগীর কাছে গানের তালিম শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনটে বিষয়ে লেটার মার্কস নিয়ে ম্যাট্রিক পাশ করে, কলকাতায় স্কটিশ চার্চ কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন।

সঙ্গীত জীবন[সম্পাদনা]

১৯৩৯ সালে মেগাফোন রেকর্ডে রবীন মজুমদারে ‘আজি এ বিদায়ক্ষণে’ আর ‘ওগো অনেক দিনের কথা’ গান বের হয়, যার কথা লিখেছিলেন এম সুলতান ও সুর দেন ভবানীচরণ দাস। উদ্যোগটা ছিল সঙ্গীতাচার্য ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের। তাঁর কাছেই তখন গান শিখছিলেন রবীন। তবে ‘শাপমুক্তি’ তাঁকে জনপ্রিয়তা এনে দেয়।

শিল্পী-জীবনের প্রারম্ভ[সম্পাদনা]

১৯৪০ সালে স্কটিশ চার্চ কলেজ সোশ্যালের অনুষ্ঠানে প্রমথেশ বড়ুয়াকে আমন্রণ করে নিয়ে আসা হয়। অনুষ্ঠানের উদ্যোগক্তা ছাত্রদের প্রধান ছিলেন রবীন। তিনি সে দিন মঞ্চে ‘শাওন রাতে যদি...’ গানটি গেয়েছিলেন। প্রমথেশ গান শুনে অভিভূত হন ও বাড়িতে আমন্ত্রণ জানিয়ে চলচ্চিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব দেন।

কলেজ-জীবন শেষ হলে কাটিহারে ফিরে গিয়েই প্রতীক্ষায় ছিলেন। এক দিন ডাক এল কলকাতায় এসে যোগাযোগ করার। আসামাত্র খবর, প্রমথেশ বড়ুয়ার আগামী ছবিতে সে দিনের সেই রবীনই নায়ক-গায়ক হতে যাচ্ছেন। চলচ্চিত্রে প্রমথেশ বড়ুতা তার নাম ‘রবীন্দ্রনাথ’ কেটে শুধু "রবীন" রাখেন।[১]

কর্মজীবন[সম্পাদনা]

৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৪০-এ মুক্তি পেয়েছিল ‘শাপমুক্তি’। ‘উত্তরা’ সিনেমায় ছবি মুক্তি পায়। প্রথম ছবিতেই নবীন নায়ক-গায়ককে বরণ করে নিলেন দর্শক। অনুপম ঘটকের সুরে রবীনের কণ্ঠে ‘বাংলার বধূ’, (সহশিল্পী: সুপ্রভা ঘোষ, শৈল দেবী), ‘এই ধরণীর ধূলির তলে’, ‘বনে নয় মনে রঙের আগুন’(সহশিল্পী: শৈল দেবী) গানগুলো শুরুতেই জনপ্রিয় হয়।

১৯৪৭ সালে ‘মন্দির’ (১৯৪৭) ছবিতে শুধুই নেপথ্যশিল্পী ছিলেন। তিনি হিন্দিতেও ‘অ্যারাবিয়ান নাইটস’ (১৯৪৬), ‘দুখিয়ারি’ (১৯৪৮) ছবিতে অভিনয়-সহ গান করেন, এছাড়া ‘হসপিটাল’ (১৯৪৩), ‘রাণী’ (১৯৪৩), ‘বিন্দিয়া’ (১৯৪৬) ছবিতে নেপথ্যে শিল্পী হিসেবে গান গান।

১৯৪৯ সালের ৫ নভেম্বর মুক্তি পায় দেবকী বসু পরিচালিত ‘কবি’। এটির মূল কাহিনিকার তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন এই ছবির গীতিকার। রবীন মজুমদার ‘নিতাই কবিয়াল’ চরিত্রে অভিনয় করেন, তার সাথে ‘ঠাকুরঝি’ ও ‘বসন’-এর চরিত্রে যথাক্রমে অনুভা গুপ্তা ও নীলিমা দাস অভিনয় করেন। এরপর অনিল বাগচীর সুরে ‘কালো যদি মন্দ তবে, কেশ পাকিলে কান্দ কেনে’, ‘ও আমার মনের মানুষ গো’ বা ‘ও হায় রূপের ছটা’ গানগুলিতে রবীন মজুমদার কণ্ঠ দেন।

চলচ্চিত্রের পাশাপাশি তিনি মঞ্চাভিনয়ও করেছেন— ১৯৫২ সালের ‘সেই তিমিরে’ নাটক থেকে ১৯৮২ সালের ‘প্রজাপতি’ পর্যন্ত। এর মধ্যে ১৯৫৭ সালে মঞ্চেও ‘কবি’ নাটকে ‘নিতাই কবিয়াল’ হয়েছেন। অরুণকুমার সরকারের পরিচালনায় ‘গ্রীণ অ্যামেচার গ্রুপ’-এর হয়ে অনেক নাটকে অপেশাদার মঞ্চেও অভিনয় করেছেন। পাশাপাশি রেকর্ডে গেয়েছেন আধুনিক গান, রবীন্দ্রসঙ্গীত, দ্বিজেন্দ্রগীতি। ১৯৬০ সালে গাওয়া ‘এই যে এলাম শঙ্খনদীর তীরে’ ও ‘নানা রঙের দিনগুলি’-র মতো গানগুলো বেশ জনপ্রিয়তা পায়।[২]

কমল - রবীন জুটি[সম্পাদনা]

রবীন মজুমদার সুরকার কমল দাশগুপ্ত-এর সুর করা অনেক গান গান। প্রেমেন্দ্র মিত্র-র কথায় ‘যোগাযোগ’ (১৯৪৩) ছবিতে ‘নাবিক আমার’, ‘এই জীবনের যত মধুর ভুলগুলি’, ‘নন্দিতা’ (১৯৪৪) ছবিতে প্রণব রায়ের কথায় ‘তুমি এসেছিলে জীবনে আমার’ গানসহ বহু গান। ১৯৪২ সালে কমলেরই সুরে ও প্রণব রায়ের কথায় ‘গরমিল’ ছবিতে নায়ক হয়ে গাওয়া এই কি গো শেষ দান গানটি গান, একই বছর তিনি আধুনিক গান ‘আমার আঁধার ঘরের প্রদীপ’ (কথা হীরেন বসু, সুর রবীন চট্টোপাধ্যায়) গানটি গান।

সত্যজিৎ-এর সঙ্গে[সম্পাদনা]

সত্তর দশকের শেষে শেখর চট্টোপাধ্যায়ের পরিচালনায় দূরদর্শন-নাটক ‘আচার্য’-তে মুখ্য ভূমিকায় তিনি অভিনয় করেন। তার অভিনয় অভিনয় দেখে সত্যজিৎ রায় তার হীরক রাজার দেশে (১৯৮০) ছবিতে চরণদাস চরিত্রের জন্য নির্বাচিত করেন। সত্যজিৎ রায় রবীনকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তিনি গানটি গাইবেন কি না? উত্তরে তিনি বলেন, অনেক দিন ‘প্রফেশনালি’ (পেশাদারি) গান গাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। তখন সত্যজিৎ তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন, যদি অমর পাল গানটি করেন, তাতে তাঁর কোনও আপত্তি আছে কি না। রবীন মজুমদার ‘‘বিন্দুমাত্র না’’ বলে উত্তর দেন। পরে অমর পাল কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায় গানটি গান।

শেষ জীবন[সম্পাদনা]

১৯৫০-এর দশকের গোড়ার দিকে বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েন, সুরকার নচিকেতা ঘোষ দীর্ঘ দিন নিজের কাছে রেখে চিকিৎসা ও সেবাশুশ্রুষা দিয়ে তাঁকে সুস্থ করে তুলেছিলেন। ১৯৭৬ সালে নচিকেতা ঘোষের মৃত্যুর পর ‘উল্টোরথ’ পত্রিকায় (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ১৯৭৬) সে কথা কৃতজ্ঞচিত্তে জানান তিনি। নচিকেতা তাঁকে বলতেন, ‘‘আমি তোমাকে আবার সুস্থ করে ইন্ডাস্ট্রির সামনে দাঁড় করাব, এ আমার প্রতিজ্ঞা।’’

২৮ ডিসেম্বর, ১৯৮৩ তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পর তাঁর শেষ চলচ্চিত্র ‘উৎসর্গ’ মুক্তি পায় একই বছরে।

তথ্যসুত্র[সম্পাদনা]