বিষয়বস্তুতে চলুন

বানৌজা শহীদ দৌলত (২০২২)

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
ইতিহাস
বাংলাদেশ
নাম: বানৌজা শহীদ দৌলত
নির্মাণাদেশ: ৯ মে, ২০১৯
নির্মাতা: খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেড
নির্মাণের সময়: ২ ডিসেম্বর, ২০১৯
অভিষেক: ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২২
কমিশন লাভ: ১২ জুলাই, ২০২৩
শনাক্তকরণ: পি৪১১
অবস্থা: সক্রিয়
সাধারণ বৈশিষ্ট্য
প্রকার ও শ্রেণী: পদ্মা-শ্রেণীর টহল জাহাজ
ওজন: ৩৫০ টন
দৈর্ঘ্য: ৫১.৬৫ মিটার (১৬৯.৫ ফুট)
প্রস্থ: ৭.৫০ মিটার (২৪.৬ ফুট)
ড্রাফট: ২ মিটার (৬.৬ ফুট)
গভীরতা: ৪.২০ মিটার (১৩.৮ ফুট)
প্রচালনশক্তি:
  • ২ × ৩,০৪১ অশ্বশক্তি (২,২৬৮ কিলোওয়াট) বিশিষ্ট এমটিইউ ডিজেল ইঞ্জিন (জার্মানি)
  • ২ × ১২০ কিলোওয়াট বিশিষ্ট সিএটি জেনারেটর (যুক্তরাজ্য)
  • ১ × ৪৯ কিলোওয়াট বিশিষ্ট সিএটি ইমারজেন্সি জেনারেটর (যুক্তরাজ্য)
  • জেডএফ ৭৬০০ ট্রান্সমিশন (জার্মানি)
  • ২ × শ্যাফট
গতিবেগ: ২১ নট (৩৯ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা; ২৪ মাইল প্রতি ঘণ্টা)
সীমা: ১,৫০০ নটিক্যাল মাইল (২,৮০০ কিলোমিটার; ১,৭০০ মাইল)
সহনশীলতা: ৭ দিন
নৌকা ও অবতরণ
নৈপুণ্য বহন করে:
১টি
লোকবল: ৩৩ জন
সেন্সর এবং
কার্যপদ্ধতি:
  • ১ × জেআরসি জেএমএ-৫২১২-৪বিবি এক্স-ব্যান্ড র‍্যাডার (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র)
  • ১ × হাল মাউনন্টেড মাল্টি-বিম ইকো সাউন্ডার (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র)
  • ১ × হাল মাউনন্টেড সিঙ্গেল-বিম ইকো সাউন্ডার (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র)
  • ১ × ডিজিপিএস রিসিভার (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র)
  • ১ × সাউন্ড ভেলোসিটি প্রোফাইলার (যুক্তরাজ্য)
  • ১ × জেআরসি জেএমএ-৩৩০০ মাল্টিরোল ডিসপ্লে সহ নেভিগেশন র‍্যাডার (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র)
  • ১ × ডাইকো টি-১৩০এসএল স্টেইনার নেভিগেটর প্রো ৭×৫০ চৌম্বকীয় কম্পাস (জাপান)
  • ১ × ফুরুনো জিপি-১৭০ জিপিএস রিসিভার
  • ১ × ইকো সাউন্ডার (কোডেন সিভিএস-১২৬)
  • ১ × রাডার অ্যাঙ্গেল ইন্ডিকেটর
  • ১ × আইকম আইসি-এম৫০৬ ভিএইচএফ সেট
  • ১ × আইকম আইসি-এম২৫ পোর্টেবল ভিএইচএফ
  • ১০ × ভিএইচএফ ওয়াকিটকি সেট (আইকম/মটোরোলা)।
রণসজ্জা:
  • ১ × ৩০ মিমি ক্যানিক ভেনম এলআর রিমোট কন্ট্রোলড গান (তুরস্ক)
  • ২ × ১২.৭ মিমি এসটিকে-৫০এমজি বিমান-বিধ্বংসী মেশিনগান (সিঙ্গাপুর)
টীকা: ১ × এফার ২২০এম ডেক ক্রেন (ইতালি)

বাংলাদেশ নৌবাহিনী জাহাজ (সংক্ষেপেঃ বানৌজা) শহীদ দৌলত একটি পদ্মা-শ্রেণীর টহল জাহাজ। এটি গণচীনের চায়না শিপবিল্ডিং ইন্ডাস্ট্রি কর্পোরেশন (সিএসআইসি) এর কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহায়তায় খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেড-এ নির্মিত হয়।

বর্তমানে, বানৌজা শহীদ দৌলত ৪১ প্যাট্রোল ক্রাফট স্কোয়াড্রনের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। এর প্রধান কার্যক্রমগুলো নিম্নরূপ:

  • সামুদ্রিক এবং উপকূলীয় অঞ্চলে টহল প্রদান: দেশের জলসীমার নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে এটি নিয়মিত টহল কার্যক্রমে নিয়োজিত।
  • উদ্ধার ও অনুসন্ধান কার্যক্রম: প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতিতে সমুদ্রপথে উদ্ধার ও অনুসন্ধান কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে।
  • অবৈধ অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান রোধ: দেশের জলসীমা দিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং চোরাচালান প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
  • জলদস্যুতা দমন: জলদস্যুদের কার্যকলাপ দমনে এবং বাণিজ্যিক নৌযানের নিরাপত্তা বিধানে সহায়ক হয়।
  • মৎস্য ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা: দেশের সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় এটি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

বানৌজা শহীদ দৌলত বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা সুরক্ষায় এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিধানে একটি অপরিহার্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত।[][][][][][][][][][১০][১১][১২][১৩][১৪][১৫][১৬][১৭]

ইতিহাস

[সম্পাদনা]

বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জাহাজ বানৌজা শহীদ দৌলত নির্মাণ একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, কারণ এটি খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেড-এ নির্মিত দেশীয় প্রযুক্তির যুদ্ধজাহাজ। এর নির্মাণ ইতিহাস নিম্নরূপ:

বানৌজা শহীদ দৌলত নির্মাণের প্রেক্ষাপট:

  • বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নিজেদের জলসীমা সুরক্ষায় দেশীয় প্রযুক্তির ব্যবহার উৎসাহিত করার লক্ষ্যে সরকার অভ্যন্তরীণভাবে যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে, "পদ্মা" শ্রেণীর প্যাট্রোল ক্রাফট নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এই শ্রেণীর জাহাজগুলো উপকূলীয় এলাকায় টহল প্রদান, চোরাচালান বিরোধী অভিযান, দূর্ঘটনা পরবর্তী উদ্ধার ও অনুসন্ধান কার্যক্রম, মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণ, প্রাকৃতিক দূর্যোগ পরবর্তী উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা পরিচালনা, পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধসহ বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সার্বিক অপারেশনাল সক্ষমতা বৃদ্ধিতে অংশগ্রহণ করবে। পাশাপাশি সরকারের অগ্রাধিকার প্রাপ্ত নীতি সুনীল অর্থনীতি (ব্লু ইকোনমি) বাস্তবায়নে সমুদ্রের মূল্যবান সম্পদ আহরণের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক কল্যাণে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।

নির্মাণ প্রক্রিয়া ও সময়রেখা:

  • নির্মাণাদেশ: ১৯ মে, ২০১৯ সালে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ৫টি প্যাট্রোল ক্রাফট নির্মাণের জন্য প্রতিরক্ষা ক্রয় মহাপরিদপ্তর এবং খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেড এর মধ্যে প্রায় ৫৩২ কোটি টাকার জাহাজ নির্মাণ সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ২৯ মে, ২০১৯ সালে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জন্য ০৫টি প্যাট্রোল ক্রাফট নির্মাণের নিমিত্তে চায়না শিপবিল্ডিং অ্যান্ড অফশোর ইন্টারন্যাশনাল কোং, লিমিটেড (সিএসওসি) এবং খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেড (খুশিলির) মধ্যকার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সম্পাদিত চুক্তির অংশ হিসেবে প্রথম জাহাজ বানৌজা শহীদ দৌলত নির্মিত হয়। এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ নৌবাহিনী চীনা কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহায়তায় জাহাজ নির্মাণ শুরু করে। চায়না ক্ল্যাসিফিকেশন সোসাইটি (সিসিএস) এর নীতিমালা অনুসরণ করে এর নির্মাণ কাজ পরিচালিত হয়।
  • নামকরণ: মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী শহীদ বীর বিক্রম মোহাম্মদ দৌলত হোসেন মোল্লা-এর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন এবং তার আত্মত্যাগকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য জাহাজটির নামকরণ করা হয়েছে শহীদ দৌলত।
  • ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন: ২০১৯ সালের ২ ডিসেম্বর তৎকালীন নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল আওরঙ্গজেব চৌধুরী, এনবিপি, ওএসপি, বিসিজিএম, বিসিজিএমএস, এনডিসি, পিএসসি খুলনা শিপইয়ার্ড প্রাঙ্গণে এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বানৌজা শহীদ দৌলত সহ মোট পাঁচটি প্যাট্রোল ক্র্যাফটের কিল লেয়িং এর মাধ্যমে নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন। উক্ত অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে তৎকালীন সহকারী নৌপ্রধান (ম্যাটেরিয়েল) রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ মঈনুল হক, এনবিপি, এনপিপি, এনএসডব্লিউসি, পিএসসি (পি নং ৫৪৬), মোংলা বন্দরের তৎকালীন চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক (জি), এসইউপি, এনডিসি, পিএসসি, খুলনা নৌঅঞ্চলের তৎকালীন আঞ্চলিক কমান্ডার রিয়ার এডমিরাল মোহাম্মদ মুসা, খুলনা ও যশোর এলাকার উচ্চ পদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাসহ খুলনা শিপইয়ার্ড লিঃ এর সর্বস্তরের কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শ্রমিকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
  • অভিষেক: ২০২২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি নির্মাণকাজ শেষে জাহাজটিকে প্রথম বারের মতো পানিতে ভাসানো হয়। এটি বাংলাদেশের নিজস্ব তত্ত্বাবধানে নির্মিত পদ্মা-শ্রেণীর ষষ্ঠ যুদ্ধজাহাজ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
  • হস্তান্তর: বানৌজা শহীদ দৌলতকে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর নিকট হস্তান্তর করা হয়।
  • কমিশন লাভ: ১২ জুলাই, ২০২৩ সালে পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়ায় নৌবাহিনীর নবীন নাবিকদের প্রশিক্ষণ ও এভিয়েশন সুবিধা সংবলিত ঘাঁটি বানৌজা শের-ই-বাংলা এবং খুলনা শীপইয়ার্ড লিমিটেডে নির্মিত ৪টি পেট্রোল ক্রাফট ও ৪টি ল্যান্ডিং ক্রাফট ইউটিলিটি (এলসিইউ) এর কমিশনিং করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গণভবন হতে ভিডিও টেলিকনফারেন্স (ভিটিসি) এর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর অনুমতিক্রমে তৎকালীন নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ শাহীন ইকবাল, এনবিপি, এনইউপি, এনডিসি, এএফডব্লিউসি, পিএসসি ঘাঁটির তৎকালীন অধিনায়ক কমডোর মোহাম্মদ মহব্বত আলী, (জি), এনজিপি, পিএসসি এর হাতে কমিশনিং ফরমান তুলে দেন এবং নৌবাহিনীর রীতি অনুযায়ী আনুষ্ঠানিকভাবে নামফলক উন্মোচন করেন। একই সাথে নৌবাহিনীর নিজস্ব তত্ত্বাবধানে খুলনা শিপইয়ার্ডে প্যাট্রোল ক্রাফট স্কোয়াড্রন এর ৪টি যুদ্ধজাহাজ বানৌজা শহীদ দৌলত, শহীদ ফরিদ, শহীদ মহিবুল্লাহ ও শহীদ আখতার উদ্দিন এবং ৪টি ল্যান্ডিং ক্রাফট ইউটিলিটি (এলসিইউ) বানৌজা ডলফিন, তিমি, টুনা ও পেঙ্গুইন এর কমিশনিং করা হয়। এর মধ্য দিয়ে ঘাঁটি ও জাহাজসমূহ নৌবাহিনীতে আনুষ্ঠানিকভাবে অপারেশনাল কার্যক্রম শুরু করে। উক্ত অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে তৎকালীন সংসদ সদস্যবৃন্দ, মুক্তিযোদ্ধা নৌ কমান্ডোগণ, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও কূটনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, নৌ দপ্তরের পিএসওগণ, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং ঊর্ধ্বতন সামরিক ও অসামরিক কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।

কর্মজীবন

[সম্পাদনা]

বানৌজা শহীদ দৌলত, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্যাট্রোল ক্র্যাফট, প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশের সামুদ্রিক ও উপকূলীয় নিরাপত্তা রক্ষায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এর কর্মজীবনে অর্জিত সাফল্য এবং বহুমুখী অবদান এটিকে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর একটি অপরিহার্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

  • সামুদ্রিক ও উপকূলীয় অঞ্চলে টহল ও নিরাপত্তা: বানৌজা শহীদ দৌলত নিয়মিতভাবে দেশের বিশাল সামুদ্রিক এলাকা এবং উপকূলীয় অঞ্চলে টহল কার্যক্রমে নিয়োজিত থাকে। এর প্রধান কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের জলসীমায় সার্বভৌমত্ব রক্ষা, সন্দেহজনক গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং সামুদ্রিক সীমান্ত সুরক্ষিত রাখা। এটি দেশের অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং বাণিজ্যিক সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
  • উদ্ধার ও অনুসন্ধান কার্যক্রম: প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতিতে বানৌজা শহীদ দৌলত অসংখ্য উদ্ধার ও অনুসন্ধান কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেছে। সমুদ্রে বিপন্ন জাহাজ বা জেলেদের জীবন রক্ষায় এর দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ বহুবার প্রশংসিত হয়েছে। এটি দুর্যোগ কবলিত এলাকায় ত্রাণ সামগ্রী বিতরণেও সহায়তা প্রদান করে থাকে।
  • অবৈধ অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান রোধ: বাংলাদেশের দীর্ঘ উপকূলীয় অঞ্চল এবং বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত অবস্থানের কারণে অবৈধ অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বানৌজা শহীদ দৌলত এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। এর নিয়মিত টহল এবং নজরদারির ফলে বহু অবৈধ অনুপ্রবেশকারীকে আটক করা সম্ভব হয়েছে এবং বিপুল পরিমাণ চোরাচালানকৃত পণ্য জব্দ করা হয়েছে।
  • জলদস্যুতা দমন ও আটক: জলদস্যুতা বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের জন্য একটি মারাত্মক হুমকি। বাংলাদেশ নৌবাহিনী এই হুমকি মোকাবিলায় বদ্ধপরিকর, এবং বানৌজা শহীদ দৌলত এই প্রচেষ্টার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি বঙ্গোপসাগরে জলদস্যুতার ঘটনা প্রতিরোধ এবং জড়িতদের আটক করার ক্ষেত্রে একাধিক সফল অভিযান চালিয়েছে, যা সমুদ্রপথের নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে।
  • মৎস্য ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা: বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদের গুরুত্ব অপরিসীম। বানৌজা শহীদ দৌলত অবৈধ মৎস্য আহরণ প্রতিরোধে কঠোর নজরদারি করে। এটি সরকার ঘোষিত জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ সহ বিভিন্ন মৎস্য সংরক্ষণ অভিযানে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। এর কার্যক্রমে দেশের মৎস্য সম্পদ সুরক্ষিত থাকে এবং প্রাকৃতিক সামুদ্রিক পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকে। এছাড়াও, দেশের সামুদ্রিক প্রাকৃতিক সম্পদ যেমন তেল ও গ্যাসের অনুসন্ধান এবং সুরক্ষায় এটি সহায়তা প্রদান করে।
  • জাতীয় দিবসসমূহে জাহাজের প্রদর্শন: বানৌজা শহীদ দৌলত জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিবস যেমন স্বাধীনতা দিবস, সশস্ত্র বাহিনী দিবস এবং বিজয় দিবসে জনগণের জন্য প্রদর্শিত হয়। এই প্রদর্শনীগুলো সাধারণ মানুষকে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কার্যক্রম সম্পর্কে ধারণা দেয় এবং দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করে। এটি তরুণ প্রজন্মকে নৌবাহিনীতে যোগদানে উৎসাহিত করতেও সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

বানৌজা শহীদ দৌলত তার কর্মজীবনের প্রতিটি ধাপে দেশের সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা, সম্পদ রক্ষা এবং জনকল্যাণে অসামান্য অবদান রেখেছে। এর নিরলস কর্মতৎপরতা বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সক্ষমতা এবং পেশাদারিত্বের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ভবিষ্যতে এটি দেশের সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা যায়।

বৈশিষ্ট্য ও যান্ত্রিক কাঠামো

[সম্পাদনা]

বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জাহাজ বানৌজা শহীদ দৌলত দেশের সমুদ্রসীমা সুরক্ষায় নিয়োজিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। এর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে উল্লেখ করা হলো:

  • দৈর্ঘ্য: ৫১.৬ মিটার (১৬৯ ফুট)
  • প্রস্থ: ৭.৫ মিটার (২৫ ফুট)
  • গভীরতা: ৪.২ মিটার (১৪ ফুট)
  • ওজন: ৩৫০ টন
  • সদস্য: ৩৩ জন
  • অভিযান পরিচালনা সক্ষমতা: ৭ দিন
  • পরিসীমা: ১,৫০০ নটিক্যাল মাইল (২,৮০০ কিলোমিটার; ১,৭০০ মাইল)
  • সহায়ক নৌযান: ১টি রিজিড হাল ইনফ্লেটেবল বোট

প্রপালশন সিস্টেম:

  • ২টি ৩,০৪১ অশ্বশক্তি (২,২৬৮ কিলোওয়াট) বিশিষ্ট এমটিইউ ডিজেল ইঞ্জিন (জার্মানি)
  • ১টি ১২০ কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সিএটি জেনারেটর (যুক্তরাজ্য)
  • ১টি ৪৯ কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সিএটি ইমারজেন্সি জেনারেটর (যুক্তরাজ্য)
  • জেডএফ ৭৬০০ ট্রান্সমিশন (জার্মানি)
  • ২টি শ্যাফট
  • সর্বোচ্চ গতিবেগ: ২১ নট (৩৯ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা; ২৪ মাইল প্রতি ঘণ্টা)

সেন্সর এবং কার্যপদ্ধতি:

জাহাজটিতে অত্যাধুনিক সেন্সর এবং কার্যপদ্ধতি সংযুক্ত রয়েছে, যা এর কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

  • ১টি জেআরসি জেএমএ-৫২১২-৪বিবি এক্স-ব্যান্ড র‍্যাডার (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র)
  • ১টি হাল মাউনন্টেড মাল্টি-বিম ইকো সাউন্ডার (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র)
  • ১টি হাল মাউনন্টেড সিঙ্গেল-বিম ইকো সাউন্ডার (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র)
  • ১টি ডিজিপিএস রিসিভার (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র)
  • ১টি সাউন্ড ভেলোসিটি প্রোফাইলার (যুক্তরাজ্য)
  • ১টি জেআরসি জেএমএ-৩৩০০ মাল্টিরোল ডিসপ্লে সহ নেভিগেশন র‍্যাডার (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র)
  • ১টি চৌম্বকীয় কম্পাস (জাপান)
  • ১টি জিপিএস রিসিভার (ফুরুনো)
  • ১টি ইকো সাউন্ডার (কোডেন)
  • ১টি রাডার অ্যাঙ্গেল ইন্ডিকেটর
  • ১টি ভিএইচএফ সেট (আইকম)
  • ১০টি ভিএইচএফ ওয়াকিটকি সেট (আইকম/মটোরোলা)।

রণসজ্জা

[সম্পাদনা]

বানৌজা শহীদ দৌলত জাহাজটির আকার আয়তন অপেক্ষাকৃত ছোট হলেও এর সক্ষমতা আধুনিক বিশ্বে ব্যবহৃত সর্বাধুনিক প্রযুক্তিসমৃদ্ধ। শত্রু জাহাজ মোকাবেলা, চোরাচালান রোধ, জলদস্যূতা দমনে জাহাজটিতে রয়েছে:

  • ১টি ৩০ মিমি ক্যানিক ভেনম এলআর রিমোট কন্ট্রোলড গান (তুরস্ক)
  • ২টি ১২.৭ মিমি এসটিকে-৫০এমজি বিমান-বিধ্বংসী মেশিনগান (সিঙ্গাপুর)
  • সামুদ্রিক মাইন
  • ৬টি কিউডব্লিউ-২ ভূমি থেকে আকাশে উৎক্ষেপণ যোগ্য বিমান-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র।

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. "5 x Patrol Craft BN – Khulna Shipyard Ltd" (মার্কিন ইংরেজি ভাষায়)। ৫ জুলাই ২০২১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৩ জুলাই ২০২৩
  2. "বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জন্য ০৫টি প্যাট্রোল ক্রাফট নির্মাণের নিমিত্তে ডিজিডিপি এবং খুশিলির সাথে ১৯ মে ২০১৯ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়"www.Khulna Shipyard Limited Facebook.com। সংগ্রহের তারিখ ১৮ মে ২০২৩
  3. "বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জন্য ০৫টি প্যাট্রোল ক্রাফট নির্মাণের নিমিত্তে সিএসওসি এবং খুশিলির সাথে চুক্তি স্বাক্ষর"www.Khulna Shipyard Limited Facebook.com। সংগ্রহের তারিখ ১৮ মে ২০২৩
  4. "খুলনা শিপইয়ার্ডে পাঁচটি প্যাট্রোল ক্র্যাফটের কিল লেয়িং করলেন নৌবাহিনী প্রধান"আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর। ২ ডিসেম্বর ২০১৯। ৬ ডিসেম্বর ২০২১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২
  5. Channel24। "খুলনা শিপইয়ার্ডে তৈরি অত্যাধুনিক যুদ্ধ জাহাজ 'শহীদ দৌলত' হস্তান্তর"Channel 24 (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ১৭ জুন ২০২৫{{ওয়েব উদ্ধৃতি}}: উদ্ধৃতি শৈলী রক্ষণাবেক্ষণ: সাংখ্যিক নাম: লেখকগণের তালিকা (লিঙ্ক)
  6. প্রতিবেদক, নিজস্ব (১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২)। "'বিদেশি যুদ্ধজাহাজ বানাতে সক্ষম খুলনা শিপইয়ার্ড'"দৈনিক প্রথম আলো। সংগ্রহের তারিখ ১৭ জুন ২০২৫
  7. Diganta, Probashir (১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২)। "খুলনা শিপইয়ার্ডে নৌবাহিনীর যুদ্ধ জাহাজ উদ্বোধন"প্রবাসীর দিগন্ত। সংগ্রহের তারিখ ১৭ জুন ২০২৫
  8. SOMOY TV (১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২)। "বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে নতুন যুদ্ধজাহাজ 'শহীদ দৌলত' | BD Navy | Navy Ship | Somoy TV"
  9. Bangladesh Navy (২০ ডিসেম্বর ২০২২)। "IFR-2022 FLEET REVIEW"
  10. "কমিশনিং অনুষ্ঠান বানৌজা শের-ই-বাংলা, ৪১ পিসিএস এবং এলসিইউ স্কোয়াড্রন"। ১২ জুলাই ২০২৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১২ জুলাই ২০২৩
  11. "খুলনা শীপইয়ার্ড লিমিটেডে নির্মিত ৪টি পেট্রোল ক্রাফট ও ৪টি এলসিইউ এর কমিশনিং"
  12. আইএসপিআর (১২ জুলাই ২০২৩)। "পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় নাবিক প্রশিক্ষণ ও এভিয়েশন সুবিধা সম্বলিত ঘাঁটি বানৌজাশের-ই-বাংলা এবং খুলনা শীপইয়ার্ড লিমিটেডে নির্মিত ৪টি পেট্রোল ক্রাফট ও ৪টি এলসিইউ এর কমিশনিং করলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা - ISPR-আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর, বাংলাদেশ"ISPR---আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর, বাংলাদেশ। ১৩ জুলাই ২০২৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৩ জুলাই ২০২৩
  13. আইএসপিআর (১২ জুলাই ২০২৩)। "পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় নাবিক প্রশিক্ষণ ও এভিয়েশন সুবিধা সম্বলিত ঘাঁটি বানৌজাশের-ই-বাংলা এবং খুলনা শীপইয়ার্ড লিমিটেডে নির্মিত ৪টি পেট্রোল ক্রাফট ও ৪টি এলসিইউ এর কমিশনিং করলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা - ISPR-আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর, বাংলাদেশ" (পিডিএফ)ISPR---আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর, বাংলাদেশ। ১৩ জুলাই ২০২৩ তারিখে মূল থেকে (পিডিএফ) আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৩ জুলাই ২০২৩
  14. "বরিশালে সশস্ত্র বাহিনী দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর যুদ্ধ জাহাজ বানৌজা শহীদ দৌলত প্রদর্শনী"
  15. "কোস্ট গার্ড বোর্ড"
  16. SOMOY TV (১১ জুলাই ২০২৪)। "উত্তাল সাগরে ধাওয়া করে ৮ জলদস্যু আটক | Pirates | Bangladesh Navy | Chattogram News | Somoy TV"
  17. EKHON TV (২৬ মার্চ ২০২৪)। "যুদ্ধাস্ত্র ও জাহাজ দেখতে দর্শনার্থীর ভিড় | Bangladesh Navy | Ekhon TV"