পানি দূষণ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান
মেক্সিকো থেকে নিউ রিভার দ্বারা বাহিত হয়ে শিল্প বর্জ্যের আমেরিকায় প্রবেশ

পানি দূষণ বা জলদূষণ বলতে পানিতে বা জলে কোন বিষাক্ত দ্রব্য অথবা দূষিত বর্জ্য পদার্থ মিশ্রণের ফলে মানব ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ার প্রক্রিয়াকে বোঝায়।

পানি দূষণ বা জলদূষণ হল জলাশয়ের দূষণ (উদ্যান, নদী, মহাসাগর, জলজ এবং ভূগর্ভস্থ জল)। পরিবেশগত অবনতি এই ফর্ম যখন দূষণকারী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে ক্ষতিকারক যৌগ পানিতে বা জলে অপসারণ হয় তখন তা পানি বা জলে মিশ্রণের ফলে মানব ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে উঠে, আর এটাকেই বলে পানি দূষণ বা জলদূষণ

পানি দূষণ পুরো জীববৈচিত্রকে প্রভাবিত করে।এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল জীবিত জীব ও উদ্ভিদ। প্রায় সব ক্ষেত্রেই এই প্রভাবটি কেবলমাত্র পৃথক প্রজাতি এবং জনসংখ্যার জন্যই যে ক্ষতিগ্রস্থ তা নয়, বরং প্রাকৃতিক অন্যান্য উপাদানসমূহ ও প্রভাবিত হচ্ছে।

ভূমিকা[সম্পাদনা]

পানি দূষণ একটি প্রধান বৈশ্বিক সমস্যার কারণ যা চলমান মূল্যায়ন এবং পানি সম্পদের নীতিমালার সমস্ত স্তরের (আন্তর্জাতিক জলাধার এবং আন্তর্জাতিক কুয়োগুলি থেকে নিচে) পর্যায়ক্রমিকতার প্রয়োজন। এটি প্রমাণিত হয়েছে যে পানি দূষণ বিশ্বজুড়ে মৃত্যু এবং রোগের প্রধান কারণ। শুধুমাএ পানি দূষণের কারণেই প্রতিদিনই বিশ্বে প্রায় ১৪০০ এরও বেশি লোকের মৃত্যু হয়।বাংলাদেশে আনুমানিক ৮০ জন মানুষ পানি দূষণ সম্পর্কিত অসুস্থতা প্রতিদিনই মারা যায়।চীন শহরের প্রায় 90 শতাংশ জল দূষিত হয়। ২007 সালের হিসাবে, আধা-বিশ্বে চীনাদের নিরাপদ পানীয় জলের ব্যবহার ছিল না।বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো পানি দূষণ তীব্র সমস্যা ছাড়াও, উন্নত দেশগুলিও দূষণ সমস্যাগুলির সাথে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পানির গুণমানের সবচেয়ে সাম্প্রতিক জাতীয় প্রতিবেদনে 44% মূল্যায়নকৃত স্ট্রিম মাইল, 64% মূল্যায়নকৃত হ্রদ একর এবং 30% মূল্যায়ন ব্যাস এবং এস্তুয়ারাইন বর্গ মাইলগুলি দূষিত হিসাবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়। চীন এর জাতীয় উন্নয়ন সংস্থা প্রধান বলেন যে এক চতুর্থাংশ চীন এর সাত প্রধান নদী দৈর্ঘ্য তাই ত্বকে ক্ষতিগ্রস্ত জল ছিল বিষ।

পানি দূষণের উৎসসমূহ[সম্পাদনা]

পানি দূষণের প্রধান উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয় কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং আবর্জনা প্রক্রিয়াজাতকরণ স্থাপনাসমূহকে, যেহেতু এসব থেকে নির্গত বর্জ্য সাধারণত পাইপের মাধ্যমে নদী, জলাশয় বা স্রোতধারায় অপসারণ করা হয়। পানি দূষণের অপ্রধান উৎসসমূহ বিস্ত্তৃত পর্যায়ে ছড়ানো ছিটানো। শস্যক্ষেত্র, বনাঞ্চল, শহর ও উপশহর এলাকা, সড়কপথ, যানবাহন রাখার স্থান এসবই মূলত পানি দূষণের অপ্রধান উৎস। এসব স্থানের বস্ত্তপুঞ্জ যেমন, ধুলা, কীটনাশক, অ্যাসবেস্টস, সার, ভারি ধাতু, লবণ, তেল, গ্রিজ, জঞ্জাল, এমনকি বায়ুবর্জ্য, যা বৃষ্টির সঙ্গে বায়ুমন্ডল থেকে নিচে পতিত হয়, এসবের দ্বারা পানি দূষিত হয়।

পানি দূষণের উৎসকে প্রাকৃতিক এবং মনুষ্যসৃষ্ট - এই দুটি শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। প্রাকৃতিক উৎসসমূহ মনুষ্যসৃষ্ট নয়, তবে এগুলি মানুষের কর্মকান্ডের দ্বারা আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে। পানির প্রধান তিনটি উৎস হলো বৃষ্টির পানি, ভূ-পৃষ্ঠের উপরের পানিভূগর্ভস্থ পানি। এর সবকটির ক্ষেত্রেই দূষণ ঘটে। ভূ-পৃষ্ঠের উপরের পানি ভূগর্ভস্থ পানির তুলনায় অধিক সংবেদনশীল বা তুলনামূলকভাবে সহজে প্রভাবিত হয়, যেহেতু ভূগর্ভস্থ পানি প্রাকৃতিকভাবেই ভূ-পৃষ্ঠের উপরের ক্রিয়াকান্ড থেকে সুরক্ষিত।

বৃষ্টির পানি[সম্পাদনা]

বৃষ্টির পানি দূষণ  অম্লবৃষ্টি বনাঞ্চলকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং উৎপাদন হ্রাসের কারণ হতে পারে। গবেষকরা এ কারণে শস্যহানির ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

অম্লবৃষ্টি ফসলের কুঁড়িকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। স্বভাবতই বসন্ত মৌসুমে গাছপালায় অম্লপতনে বংশবৃদ্ধি এবং শস্যফলন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। মৃত্তিকায় অম্লায়ন মাটির ব্যাকটেরিয়ার ক্ষতিসাধন করতে পারে, যা পুষ্টিচক্র এবং নাইট্রোজেন ঘনীভবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অম্লবৃষ্টি মানবনির্মিত ভৌত কাঠামোসমূহ ক্ষয় করে। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত অম্লবৃষ্টি ঘটনার কোন প্রমাণ নেই। ব্যাপক বায়ুদূষণের কারণে ঢাকা শহরে পতিত বৃষ্টির পানি গ্রামীণ এলাকায় পতিত বৃষ্টির পানির তুলনায় অধিক অম্লযুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

ভূ-পৃষ্ঠের উপরের পানি[সম্পাদনা]

সাগর, নদী, জলাভূমি, পুকুর এবং প্লাবনভূমির পানিই ভূ-পৃষ্ঠের উপরের পানির প্রধান উৎস। সভ্যতার সূত্রপাত থেকে এগুলো পানি সরবরাহের উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। কিন্তু পানির এসকল সহজলভ্য উৎস মানুষের কর্মকান্ডের ফলে দূষণের শিকারে পরিণত। বাংলাদেশের ভূ-পৃষ্ঠের উপরের পানি যেসকল কারণে ব্যাপকভাবে দূষিত হয়ে পড়ছে, তার মধ্যে রয়েছে শিল্পজাত এবং শহুরে বর্জ্য, কৃষিরাসায়নিক দ্রব্য, নিষ্কাশিত বর্জ্য এবং সমুদ্রপানির অনুপ্রবেশ। ভূ-পৃষ্ঠের উপরের পানির ব্যাপক ব্যবহার হচ্ছে অপ্রক্রিয়াজাত শিল্পবর্জ্য নিষ্কাশনের কাজে এবং এটি দূষণের প্রধান উৎসসমূহের একটি। বুড়িগঙ্গা নদী ভূ-পৃষ্ঠের উপরের পানি দূষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। শিল্পউৎস ছাড়াও ভূ-পৃষ্ঠের উপরের পানি ব্যাপকভাবে দূষিত হয় মানুষের মলের মাধ্যমে, যেহেতু সাধারণভাবে দেশের পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা দুর্বল। ভূ-পৃষ্ঠের পানির আরও দূষণ ঘটাচ্ছে কৃষিকাজে রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যাপক ব্যবহার। গঙ্গার পানি প্রত্যাহারের কারণে সমুদ্রের পানি উপকূলরেখা থেকে অনেকদূর পর্যন্ত ভূ-অভ্যন্তর ভাগে প্রবেশ করছে, যার ফলে নদীর পানি লবণাক্ততা দ্বারা দূষিত হচ্ছে। এছাড়া ব্যাপকভাবে ভূ-পৃষ্ঠের পানি দূষণের ক্ষেত্রে অন্যান্য অপ্রধান কিছু উৎসও রয়েছে।

ভূগর্ভস্থ পানি [সম্পাদনা]

ভূগর্ভস্থ পানি ভূ-পৃষ্ঠের দূষণ কর্মকান্ডের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়। অসংখ্য প্রাকৃতিক এবং মানুষের বিভিন্ন ক্ষতিকর কর্মকান্ড ভূগর্ভস্থ পানির দূষণ ঘটাচ্ছে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পদার্থগত রাসায়নিক এবং প্রাণরাসায়নিক (ও জীবাণু) প্রক্রিয়া ভূগর্ভস্থ পানির ধর্মসমূহ পরিবর্তিত করছে, হয় নতুন উপাদান/আয়ন/যৌগ সংযুক্তির মাধ্যমে, অথবা বর্তমান কেন্দ্রীভবনের মাত্রার- বৃদ্ধির মাধ্যমে। বাংলাদেশে আর্সেনিক দূষণের বিষয়টি আবিষ্কারের পূর্বে ভূগর্ভস্থ পানি নিরাপদ হিসেবে বিবেচিত হতো, কিন্তু আর্সেনিক দূষণকে বর্তমান পৃথিবীর পানি দূষণের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাংলাদেশে ভূগর্ভস্থ পানি কিছু সংখ্যক মানবসৃষ্ট এবং প্রাকৃতিক উৎসের মাধ্যমে দূষিত হয়। মানবসৃষ্ট উল্লেখযোগ্য উৎসগুলি হলো শিল্পজাত এবং শহরের বর্জ্য নিষ্কাশনে নির্বিচারে ভূ-পৃষ্ঠের জলাশয় ব্যবহার করা। অবাঞ্ছিত নোনাপানি চুইয়ে মাটির নিম্নস্তরে গিয়েও ভূগর্ভস্থ পানির দূষণ ঘটায়। সেপটিক ব্যায়ক/কাঁচা পায়খানাও ভূগর্ভস্থ পানি দূষণের অন্যান্য কারণের মধ্যে পড়ে।

পানিবাহিত রোগ[সম্পাদনা]

দূষিত জল পান করার মাধ্যমে অথবা সেই জল রান্না বা অন্যান্য কার্যে ব্যবহার করার ফলে বিভিন্ন ধরনের ব্যাধি সংক্রামিত হয়ে থাকে। এই ধরনের অসুখ সাধারণত জলে বিচরণশীল রোগসৃষ্টিকারী জীবাণুদের দ্বারা সংঘটিত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুসারে প্রত্যেক বছর পৃথিবীতে প্রায় দশ লক্ষ মানুষের মৃত্যুর কারণ হল জলবাহিত রোগ। সমীক্ষায় দেখা গেছে যে এই রোগ সংক্রমণের মূল কারণ হল উন্নয়নশীল দেশগুলিতে অপরিশুদ্ধ জল সরবরাহ এবং পরিচ্ছনতার অভাব। এর ফলে আক্রান্তদের মধ্যে শিশুদের সংখ্যাধিক্য লক্ষ্যণীয়। কেবল তাই নয়, ভারতীয় উপমহাদেশসহ বিশ্বের প্রায় সকল উন্নয়নশীল দেশের গ্রামাঞ্চলে স্বাস্থ্যসচেতনতার প্রভূত অভাব পরিলক্ষিত হয়। সাধারণত উক্ত অঞ্চলসমূহের মানুষ বিভিন্ন জলাশয়ের জল পান করে থাকে এবং রন্ধনকার্যেও তা ব্যবহার করে। আবার স্নান, কাপড় কাচা এবং গবাদি পশুর স্নানাদিও সেই একই জলাশয়ে সম্পন্ন হয়ে থাকে। ফলত জলাশয়ের জল দূষিত হয় এবং সেই জল মানবশরীরে প্রবেশ করার ফলে বিবিধ প্রকার জলবাহিত রোগও দূষিত জলের মাধ্যমে মানবদেহে সংক্রামিত হয়। এইভাবে এইসমস্ত অঞ্চলের মানুষদের মধ্যে আন্ত্রিক, ইত্যাদি রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পায়।বাংলাদেশে পানিবাহিত যে সকল রোগ লক্ষ্যনীয় তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলঃ

  • ডায়রিয়া,
  • আমাশয়,
  • পোলিও,
  • হিপাটাইটিস এ ও ই,
  • টাইপয়েড,
  • প্যারাটাইপয়েড ইত্যাদি