জৈব যৌগ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
মিথেন একটি সরল জৈব যৌগ

জৈব যৌগ হল এক ধরণের যৌগিক পদার্থ যাতে কার্বন থাকে। ঐতিহাসিক কারণে কিছু যৌগ যেমন- কার্বনেট, কার্বনের সাধারণ অক্সাইড, সায়ানাইড এবং কার্বনের রূপভেদকে অজৈব যৌগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ১৮২৮ সালের পূর্ব পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল যে জৈব যৌগ শুধু প্রাণশক্তির প্রভাবে জীব ও প্রাণীদেহে সৃষ্টি হয়, একে পরীক্ষাগারে সংশ্লেষণ করা সম্ভব নয়। ফ্রেডরিখ ভোলার ১৮২৮ সালে অজৈব অ্যামোনিয়াম সায়ানেট হতে পরীক্ষাগারে ইউরিয়া সংশ্লেষণ করেন, যা একটি জৈব যৌগ।[১] এর ফলে শতাব্দীকাল ধরে প্রচলিত ধারণার অবসান ঘটে।

জীব ও প্রাণীদেহ মূলত জৈব যৌগের সমন্বয়ে গঠিত। কার্বনের যৌগসমূহ তথা জৈব যৌগের প্রস্তুতি, ধর্ম, গঠন, বৈশিষ্ট ইত্যাদি সম্বন্ধে আলোচনা করা হয় জৈব রসায়নে

ইতিহাস[সম্পাদনা]

প্রাণশক্তি মতবাদ[সম্পাদনা]

“জৈব” কথাটির উৎপত্তি হয় প্রথম শতাব্দীতে। বিভিন্ন কারণে পশ্চিম বিশ্বের বিজ্ঞানীরা প্রাণশক্তি মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। এই মতবাদ অনুযায়ী কিছু মৌল কেবলমাত্র ভূ-পৃষ্ঠ, পানি, বায়ু ও আগুন থেকে জীব-শক্তির মাধ্যমে পাওয়া সম্ভব। একে বলা হত প্রাণশক্তি যা শুধু প্রাণী বা উদ্ভিদে বিদ্যমান। এসব মৌলই হল জৈব যৌগ। এরা অজৈব যৌগ হতে ভিন্ন প্রকৃতির। অজৈব যৌগসমূহ রাসায়নিক স্নগশ্লেষণের মাধ্যমে পাওয়া সম্ভব। আধুনিক পরমাণুবাদের উদ্ভব হওয়ার পরও বেশ কিছুকাল এই প্রাণশক্তি মতবাদ প্রচলিত ছিল। সর্বপ্রথম ১৮২৪ সালে এই মতবাদ প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এসময় ফ্রেডরিখ ভোলার সায়ানোজেন হতে অক্সালিক এসিড সংশ্লেষণ করে, যা একটি জৈব যৌগ হিসেবে এতকাল পরিচিত ছিল। এর চেয়ে আরও একটি সুস্পষ্ট পরীক্ষা ছিল ১৮২৮ সালে ভোলারের পটাশিয়াম সায়ানেট ও অ্যামোনিয়াম সালফেট হতে ইউরিয়া সংশ্লেষণ। দীর্ঘকাল ধরে জৈব যৌগ হিসেবে প্রাণীর মূত্রে উদ্ভব ঘটত এতকাল জানা ছিল। এরপর আরও অনেক জৈব যৌগ পরীক্ষাগারে অজৈব যৌগ থেকে সংশ্লেষিত হয় কোনরকম উদ্ভিদ বা জীবের প্রভাব ছাড়াই।

আধুনিক শ্রেণীবিন্যাস[সম্পাদনা]

প্রাণশক্তি মতবাদ ভুল প্রমাণিত হলেও জৈব ও অজৈব যৌগের মধ্যে পার্থক্য আজ অবধি অব্যাহত আছে, এর কারণ অসংখ্য জৈব যৌগের সংগঠন ও বিন্যস্তের জন্য।[২] এমনও অনেক জৈব যৌগের সন্ধান পাওয়া গেছে যাদের প্রাণী বা উদ্ভিদের সাথে গঠনগত ও ধর্মের দিক থেকে কোন সম্পর্ক নেই। জৈব জৌগের কোন আনুষ্ঠানিক সংজ্ঞা নেই। কোন কোন পাঠ্যবই কার্বন-হাইড্রোজেন বন্ধন বিশিষ্ট যৌগকে জৈব যৌগ বলে থাকে। আবার কিছু বই যেসব অণুতে কার্বন বিদ্যমান, তাদেরকেই জৈব যৌগ বলে।[৩] কার্বন পরমাণু বিশিষ্ট অণুর বৃহত্তর সংজ্ঞায় তুলনামূলকভাবে সংখ্যায় অল্প পরিমাণ কার্বন বিশিষ্ট যৌগ যেমন- কার্বনেট, সাধারণ অক্সাইড, সায়ানাইড, কার্বনের বহুরূপসমূহ ইত্যাদি বিবেচনা করা হয় না।

প্রচলিত কার্বন-হাইড্রোজেন বন্ধনের সংজ্ঞায় প্রায়োগিক ও ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত জৈব যৌগসমূহ বিবেচনা করা হয় না। এই সংজ্ঞা অনুসারে ইউরিয়া এবং অক্সালিক এসিড জৈব যৌগ নয়। এই যৌগদুইটি প্রাণশক্তি মতবাদে বিতর্কের বিষয় ছিল। IUPAC এর Nomenclature of Organic Chemistry শীর্ষক বইয়ে সুনির্দিষ্টভাবে ইউরিয়া[৪] ও অক্সালিক এসিডকে জৈব যৌগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।[৫] অন্যান্য যৌগ যাতে কার্বন-হাইড্রোজেন বন্ধন নেই তবে ঐতিহাসিকভাবে জৈব যৌগ হিসেবে পরিচিত, তাদের মধ্যে রয়েছে- বেনজিনহেক্সোল, মেসোক্স্যালিক এসিড, কার্বন টেট্রাক্লোরাইড। মেলিটিক এসিডে কোন কার্বন-হাইড্রোজেন বন্ধন না থাকলেও একে জৈব যৌগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।[৬] এই “কার্বন-হাইড্রোজেন বন্ধন নিয়ম” কার্বন-ফ্লোরিন বিশিষ্ট যৌগের ক্ষেত্রে যৌক্তিকতা নির্ধারণে সমস্যার সৃষ্টি করে। যেমন- এই নিয়ম অনুযায়ী টেফলন একটি অজৈব যৌগ কিন্তু টেফজেল জৈব যৌগ। একইভাবে অনেক হ্যালো-অ্যালকেনও এই নিয়ম অনুসারে অজৈব কিন্তু অন্যান্য জৌগসমূহ জৈব। এই কারণে এবং অন্যান্য কিছু কারণে কার্বন-হাইড্রোজেন বন্ধন বিশিষ্ট যৌগসমূহকে জৈব যৌগের একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

শ্রেণীবিভাগ[সম্পাদনা]

জৈব যৌগকে অনেক উপায়ে শ্রেণীবিভাগ করা যায়। একটি বিশেষ পন্থা হল, প্রাকৃতিক এবং সংশ্লেষিত জৈব যৌগ। এছাড়া জৈব যৌগসমূহকে হেটেরো-পরমাণুর উপস্থিতির ভিত্তিতে শ্রেণীবিভাগ করা যেতে পারে, যেমন- অর্গ্যানোমেটালিক যৌগ, যেগুলোতে কার্বন ও ধাতুর মধ্যে বন্ধন থাকে এবং অর্গ্যানোফসফরাস যৌগ, যেগুলোতে কার্বনের সাথে ফসফরাসের বন্ধন থাকে। আকারের ভিত্তিতে জৈব যৌগসমূহকে ক্ষুদ্রাকার অণু এবং পলিমার এই দুই শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়।

প্রাকৃতিক যৌগ[সম্পাদনা]

প্রাকৃতিক যৌগ বলতে সেসব জৌগকে বোঝানো হয় যেগুলো জীব ও প্রাণীদেহে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হয়। এসকল যৌগ সাধারণত প্রকৃতি থেকে আহরণ করা হয়, কারণ কৃত্রিমভাবে এহুলোর উৎপাদন অত্যন্ত ব্যয়ভুল। যেমন- চিনি, অ্যালকালয়েড, টারপিনয়েড, পুষ্টির উপাদান যেমন ভিটামিন B12 এবং বিভিন্ন বিশালাকার ও জটিল প্রকৃতির জৈব যৌগ। এধরণের আরও কিছু যৌগ প্রাণরসায়নে যাদের প্রয়োগ এবং গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি তারা হলঃ অ্যান্টিজেন, কার্বহাইড্রেট, এনজাইম, হরমোন, লিপিড, ফ্যাটি এসিড, নিউক্লিক এসিড, পেপটাইড, অ্যামিনো এসিড, ভিটামিনসমূহ, চর্বি এবং তৈল।

সংশ্লেষিত যৌগ[সম্পাদনা]

যেসব যৌগ অন্য কোন যৌগের রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে প্রস্তুত করা হয়, তাদেরকে বলা হয় সংশ্লেষিত যৌগ। এসব যৌগ প্রাণী বা উদ্ভিদে পাওয়া যেতে পারে কিংবা প্রাকৃতিকভাবে নাও পাওয়া যেতে পারে। অনেক পলিমার যেমন- প্লাস্টিক ইত্যাদি হল জৈব যৌগ।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. ফ্রেডরিখ ভোলার (১৮২৮)। "Ueber künstliche Bildung des Harnstoffs"Annalen der Physik und Chemie 88 (2): 253–256। ডিওআই:10.1002/andp.18280880206 
  2. Spencer L. Seager, Michael R. Slabaugh. Chemistry for Today: general, organic, and biochemistry. Thomson Brooks/Cole, 2004, p. 342. ISBN 0-534-39969-X
  3. Robert T. Morrison, Robert N. Boyd, and Robert K. Boyd, Organic Chemistry, 6th edition (Benjamin Cummings, 1992, ISBN 0-13-643669-2
  4. "IUPAC Blue Book, Urea and Its Derivatives Rule C-971"  |access date= প্যারামিটার অজানা, উপেক্ষা করুন (|accessdate= পরামর্শকৃত) (সাহায্য)
  5. "IUPAC Blue Book, Table 28(a) Carboxylic acids and related groups.Unsubstituted parent structures"  |access date= প্যারামিটার অজানা, উপেক্ষা করুন (|accessdate= পরামর্শকৃত) (সাহায্য)
  6. S. A. Benner, K. G. Devine, L. N. Matveeva, D. H. Powell (2000)। "The missing organic molecules on Mars"। Proceedings of the National Academy of Sciences 97 (6): 2425–2430। ডিওআই:10.1073/pnas.040539497পিএমআইডি 10706606পিএমসি 15945 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]