জান্নাতুল বাকি ধ্বংসযজ্ঞ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
জান্নাতুল বাকিতে ধ্বংসযজ্ঞ
Jannatul-Baqi before Demolition.jpg
ধ্বংসযজ্ঞের আগে জান্নাতুল বাকি (১৯১০ এর দশক)
তারিখ১৮০৬ এবং ১৯২৫ (অথবা ১৯২৬)
অবস্থানমদিনা, সৌদি আরব
ফলাফলজান্নাতুল বাকির গম্বুজ, ভবনগুলোর ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ
সংগঠকআল সৌদ

জান্নাতুল বাকি, বর্তমান সৌদি আরবের মদিনায় অবস্থিত প্রাচীনতম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি ইসলামী কবরস্থানের মধ্যে একটি[১], যা ১৮০৬ সালে ভেঙে ফেলা হয়েছিল[২] এবং ১৯ শতকের মাঝামাঝিতে পুনর্নির্মাণের পরে, ১৯২৫ বা ১৯২৬ সালে আবার ধ্বংস করা হয়েছিল।[৩][৪] আল সৌদের একটি জোট এবং দিরিয়া আমিরাত নামে পরিচিত ওয়াহাবি আন্দোলনের অনুসারীরা প্রথম ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। নজদ সালতানাত, আল সৌদ দ্বারা শাসিত এবং ওয়াহাবি আন্দোলনের অনুসারীরা, দ্বিতীয় ধ্বংসযজ্ঞ পরিচালনা করেছিল। উভয় ক্ষেত্রেই, ধ্বংসযজ্ঞ যারা চালিয়েছিল তারা ইসলামের ওয়াহাবি ব্যাখ্যা দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিল, যা কবরের উপর স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ নিষিদ্ধ করে।

পটভূমি[সম্পাদনা]

আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব সহ জান্নাতুল বাকিতে চার ইমাম (হাসান, জয়নুল আবিদীন, আল-বাকির, আস-সাদিক) এর মাজার। এটি ধ্বংস হওয়ার পূর্বের ছবি।

বাকি আল-গারকাদ (আরবি: بقیع الغرقد‎‎, "the field of thorny trees"), যা জান্নাত আল-বাকি (আরবি: جنة البقیع‎‎, "garden of tree stumps") নামেও পরিচিত।[৩] মুহাম্মদ (সাঃ) এর জীবদ্দশায় আল-বাকিতে দাফন করা সবচেয়ে বিখ্যাত ব্যক্তি ছিলেন তাঁর শিশু পুত্র ইব্রাহিম। অনেক বর্ণনা প্রমাণ করে যে মুহাম্মদ (সাঃ) নিয়মিত এই কবরস্থান পরিদর্শন করতেন এবং সেখানে সমাহিতদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতেন।[৪]

মুহাম্মদ (সাঃ) এর প্রথম সাহাবী উসমান ইবনে মাজউন (বা আসাদ ইবনে জুররাহ) কে সেখানে ৬২৫ সালে সমাহিত করার পর স্থানটি আরও গুরত্ব পায়। চার ইমাম: হাসান ইবনে আলী, আলী ইবনে হোসাইন জয়নুল আবিদীন, মুহম্মদ আল-বাকির এবং জাফর আস-সাদিককেও সেখানে সমাহিত করা হয়েছে।[৫] ঐতিহাসিক নথিগুলিতে দেখায় যে বিংশ শতাব্দীর আগে জান্নাতুল বাকিতে গম্বুজ, কপোলা এবং মাজার ছিল; যেটি আজ কোনো ভবন ছাড়া একটি খালি জমি।[৩]

ধ্বংসযজ্ঞ[সম্পাদনা]

ওয়াহাবিদের দ্বারা ধ্বংসের আগে আল-বাকিতে ইমামদের মাজার।
ধ্বংসযজ্ঞের পরে ২০০৮ সালে জান্নাতুল বাকি।

প্রথম ধ্বংসযজ্ঞ[সম্পাদনা]

ঊনবিংশ শতাব্দীতে (১৮০৬) আল সৌদ মক্কা ও মদিনা তাদের নিয়ন্ত্রণে নেয়ার শুরুতে, তারা তাদের মতবাদ অনুসারে জান্নাতুল বাকির ভিতরে বা বাইরে, সমাধি ও মসজিদ সহ অনেক ধর্মীয় ভবন ভেঙে ফেলে।[২][৬] এগুলোকে মাটিতে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল[৭] এবং সমাধির সাজসজ্জা ও জিনিসপত্র লুটপাট করা হয়েছিল।[৪]

পবিত্র শহরগুলির নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর, সৌদিরা ওয়াহাবি নয় এমন মুসলমানদের হজ্জ পালন না করতে দেওয়ার বাধা সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছিল।[৬][৮] পরের কয়েক বছরে তারা ধীরে ধীরে হজের শুল্ক বাড়ায়।[৮] তারা হজ্জ যাত্রীদের বাদ্যযন্ত্র এবং মহমাল (সমৃদ্ধভাবে সজ্জিত পালকি) আনতেও নিষেধ করেছিল, যেগুলো প্রায়শই হজ্জ যাত্রীদের দ্বারা আনা হত কিন্তু ওয়াহাবি ধর্মীয় মানদণ্ডের সাথে যা ছিল বেমানান, এবং পরে করা হয় "ছেলে বা অন্যান্য দাড়িবিহীন ব্যক্তি"।[৮] ১৮০৫ সালে, ধ্বংসযজ্ঞের এক বছর আগে, ইরাকি এবং ইরানি মুসলমানদের হজ্জ করার অনুমতি দেওয়া হয়নি। সিরীয় ও মিশরীয়দের ১৮০৬ এবং ১৮০৭ সালে হজ্জ করার অনুমতি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল।[৬] মাগরেবি মুসলমানদের হজ্জ পালনে বাধা দেওয়া হয়নি।[৮]

ইউরোপীয় পর্যটক জোহান লুডউইগ বার্কহার্ট প্রথম ধ্বংসযজ্ঞের পরে ১৮১৫ সালে জান্নাতুল বাকি পরিদর্শন করেছিলেন। জান্নাতুল বাকির চারপাশে গম্বুজগুলির ধ্বংসাবশেষ দেখে তিনি বলেছিলেন যে মদিনার লোকেরা "কিপটে" ছিল, "তাদের খ্যাতিমান দেশবাসীদের" সম্মান করার দিকে তারা খুব কম মনোযোগ দেয়। যদিও, ধ্বংসযজ্ঞ সেখানকার বাসিন্দাদের তাদের আচার পালন থেকে বাধা দেয়নি।[৩]

উসমানীয় সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদ, মিশরের গভর্নর মুহাম্মদ আলি পাশাকে ওয়াহাবি বিদ্রোহীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলি পুনরুদ্ধার করার আদেশ দেন, শুরু হয় উসমানীয়-সৌদি যুদ্ধ। মুহাম্মদ আলি পাশার পুত্র ইবরাহিম পাশা, ১৮১৮ সালে দিরিয়াহ যুদ্ধে বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে পরাজিত করেন। সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদের[৪] আদেশে উসমানীয়রা ১৮৪৮ থেকে ১৮৬০ সাল পর্যন্ত "অপূর্ব নান্দনিক শৈলীতে" ভবন, গম্বুজ এবং মসজিদ নির্মাণ ও সংস্কার করে। স্যার রিচার্ড ফ্রান্সিস বার্টন, যিনি ১৮৫৩ সালে "আব্দুল্লাহ" নামে একজন আফগান মুসলিমের ছদ্মবেশে মদিনায় গিয়েছিলেন, তিনি বলেছিলেন যে উসমানীয়দের দ্বারা পুনর্গঠনের পর সেখানে ৫৫টি মসজিদ এবং মাজার ছিল। ১৮৭৭-১৮৭৮ সালে মদিনা পরিদর্শনকারী আরেক ইংরেজ অভিযাত্রী শহরটিকে "ইস্তাম্বুলের মতো একটি ছোট সুন্দর শহর" হিসাবে বর্ণনা করেছিলেন। তিনি এর "সাদা দেয়াল, সোনালী সরু মিনার এবং সবুজ মাঠ" উল্লেখ করেছেন।[৭] এছাড়াও, ইব্রাহিম রিফাত পাশা, যিনি একজন মিশরীয় কর্মকর্তা, তিনি ১৯০১ এবং ১৯০৮ সালের মধ্যে ভ্রমণ করেছিলেন, ষোলটি গম্বুজকে চিহ্নিত করেছেন এবং মাজারের একটি সংগ্রহ বর্ণনা করেছেন।[৩]

দ্বিতীয় ধ্বংসযজ্ঞ[সম্পাদনা]

আল সৌদ ১৯২৪[৪] (বা ১৯২৫) সালে হেজাজের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করে।[২] পরের বছর ইবনে সৌদ কাজী আবদুল্লাহ ইবনে বুলাইহিদের প্রদত্ত ধর্মীয় অনুমোদনের সাথে স্থানটি ধ্বংস করার অনুমতি দেন। ২১ এপ্রিল ১৯২৬[৪] (বা ১৯২৫)[৯] সালে ওয়াহাবি ধর্মীয় মিলিশিয়া ইখওয়ান ("ব্রাদার্স") এর দ্বারা ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়।[১০] এমনকি সহজতম সমাধির পাথরগুলিও ধ্বংস করা অন্তর্ভুক্ত ছিল। ব্রিটিশ রূপান্তরিত এলডন রাটার ধ্বংসযজ্ঞকে একটি ভূমিকম্পের সাথে তুলনা করেছিলেন: "সমস্ত কবরস্থান জুড়ে ছড়িয়ে পড়া মাটি এবং পাথরের সামান্য অনির্দিষ্ট ঢিবি, কাঠের টুকরো, লোহার টুকরো, পাথরের খণ্ড এবং সিমেন্ট ও ইটগুলির একটি ভাঙা ধ্বংসস্তুপ ছাড়া কিছুই দেখা যায়নি।"[৪]

ভবনগুলো ধ্বংসকারী শ্রমিকরা ১,০০০ মাজিদি রিয়াল পেয়েছিল,[১১] যা ছিল সেই সময়ের মুদ্রার একক।[১২] ধ্বংস হওয়া মাজারগুলির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল: আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল মুত্তালিব এবং মা আমিনা, মুহাম্মদ (সাঃ) এর পিতা ও মাতা; জাফর আস-সাদিকের বড় ছেলে ইসমাইল ইবনে জাফর; মুহাম্মদ (সাঃ) এর উভয় চাচা আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব এবং হামজা ইবনে আবদুল-মুত্তালিব; মুহাম্মদ (সাঃ) এর ছেলে ইব্রাহিম ইবনে মুহাম্মাদ; মালিক ইবনে আনাস; উসমান ইবন আফফান; চার ইমাম; এবং ৭,০০০ ব্যাক্তিদের মাজার, যাদের নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর সাথে সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করা হয় হয়।[১৩]

প্রতিক্রিয়া[সম্পাদনা]

দ্বিতীয় ধ্বংসের বিষয়টি মজলেস-ই শোরা-ই মেলি (ইরানের ন্যাশনাল কনসালটেটিভ অ্যাসেম্বলি)-তে আলোচনা করা হয়েছিল এবং তদন্তের জন্য প্রতিনিধিদের একটি দল হিজাজে পাঠানো হয়েছিল। ইসলামিক এনসাইক্লোপিডিয়া অনুসারে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে, কবরস্থান এবং এর মাজারগুলি পুনরুদ্ধার করার জন্য ইরানের ধর্মীয় পণ্ডিত এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের দ্বারা প্রচেষ্টা করা হয়েছিল।[৪] সুন্নি এবং শিয়া উভয় মুসলিমই ধ্বংসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিল[২][৯] এবং ভারত, পাকিস্তান,[১৪] ইরান[১৫] এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর সমাবেশ[২][১৬][১৭] অনুষ্ঠিত হয়েছিল। দিনটিকে অনেক শিয়ারা ইয়াউম-ই ঘাম ("দুঃখের দিন") হিসাবে গণ্য করে। ইসলামিক এনসাইক্লোপিডিয়ার মতে, বিশিষ্ট সুন্নি ধর্মতাত্ত্বিক এবং বুদ্ধিজীবীরা আল-বাকির "অযোগ্য" পরিস্থিতির নিন্দা করেছেন কিন্তু সৌদি কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত সমস্ত সমালোচনা উপেক্ষা করেছে এবং সমাধি ও মাজারগুলো পুনরুদ্ধারের জন্য সব ধরণের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছে।[৪]

পরিদৃশ্য চিত্র[সম্পাদনা]

ধ্বংসযজ্ঞের আগে জান্নাতুল বাকির পরিদৃশ্য চিত্র (১৯১০ এর দশক)।
২০১১ সালে ধ্বংসযজ্ঞের পরে জান্নাতুল বাকির চিত্র।

ঐতিহাসিক

  1. দুঃখের ঘর (بیت‌الاحزان)
  2. চার ইমামের মাজার
  3. নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর কন্যারা
  4. নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর স্ত্রীগণ
  5. আকিল ও আবুল্লাহ ইবনে জাফর
  6. মালিক ও নাফি
  7. নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর শিশু পুত্র ইব্রাহিম
  8. হালিমা আল-সাদিয়া
  9. ফাতিমা বিনতে আসাদ
  10. তৃতীয় খলিফা উসমান

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Danforth, Loring M. (২০১৬-০৩-২৯)। Crossing the Kingdom: Portraits of Saudi Arabia (ইংরেজি ভাষায়)। Univ of California Press। আইএসবিএন 978-0-520-29028-0 
  2. Ende, Werner (২০১০-০৬-০১)। "Baqīʿ al-Gharqad"Encyclopaedia of Islam, THREE (ইংরেজি ভাষায়)। Brill। ডিওআই:10.1163/1573-3912_ei3_com_23494 
  3. "The destruction of Jannat al-Baqi': A case of Wahhabi Iconoclasm" (PDF)। ২ আগস্ট ২০১৯ তারিখে মূল (PDF) থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ৮ নভেম্বর ২০২১ 
  4. Bahramian, Ali; Gholami, Rahim (২০১৩-১২-০৪)। "al-Baqīʿ"Encyclopaedia Islamica (ইংরেজি ভাষায়)। Brill। 
  5. Shomali, Mohammad A. (২০০৩)। Shi'i Islam: Origins, Faith and Practices (ইংরেজি ভাষায়)। ICAS Press। আইএসবিএন 978-1-904063-11-7 
  6. "Islamica Magazine » Blog Archive » THE DESTRUCTION OF THE HOLY SITES IN MECCA AND MEDINA"web.archive.org। ২০১১-০৭-১৩। Archived from the original on ২০১১-০৭-১৩। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-১১-০৮ 
  7. "History of the Cemetery Of Jannat Al-Baqi"www.al-islam.org (ইংরেজি ভাষায়)। ২০১৩-১২-২৩। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-১১-০৮ 
  8. Vassiliev, Alexei (২০১৩-০৯-০১)। The History of Saudi Arabia (ইংরেজি ভাষায়)। Saqi। আইএসবিএন 978-0-86356-779-7 
  9. Shahi, Afshin (২০১৩-১২-০৪)। The Politics of Truth Management in Saudi Arabia (ইংরেজি ভাষায়)। Routledge। আইএসবিএন 978-1-134-65319-5 
  10. "The Destruction Heritage in Saudi Arabia" (PDF) 
  11. "Destruction of Baqi from the viewpoint of the documents" 
  12. "The Historical Framework of the Currency of Saudi Arabia"www.sama.gov.sa। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-১১-০৮ 
  13. "Mapping the Saudi State, Chapter 7: The Destruction of Religious and Cultural Sites" (PDF) 
  14. قرآن, iqna ir | خبرگزاری بین المللی। "راهپیمایی محکومیت سالروز تخریب بقیع در پاکستان"fa (ফার্সি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-১১-০৮ 
  15. "صفحه اصلی - صدا و سیمای کرمان"kerman.irib.ir। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-১১-০৮ 
  16. "Protests at Saudi Embassy in Washington"america.aljazeera.com। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-১১-০৮ 
  17. "Gale - Institution Finder"galeapps.gale.com। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-১১-০৮ 

গ্রন্থপঞ্জি[সম্পাদনা]