ছাপাঙ্কিত মুদ্রা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
ছাপাঙ্কিত মুদ্রার একটি ভান্ডার

ছাপাঙ্কিত মুদ্রা বা পাঞ্চকার্ড মুদ্রা হচ্ছে ভারতের এক প্রকার প্রাচীন মুদ্রা, যা খ্রীস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ এবং ২য় শতাব্দীর মধ্য সময়কার। এগুলো অসমতল আকারের ছিলো।[১]

আখেমেনীয় সাম্রাজ্যের অধীনে ছাপ দেওয়া "বাঁকানো পাত[১]", গান্ধার, খ্রীস্টপূর্ব প্রায় ৩৫০[২][৩]

ইতিহাস[সম্পাদনা]

মগধ রাজ্যের মুদ্রা, খ্রীস্টপূর্ব প্রায় ৪৩০–৩২০, কর্ষপণ
মগধ রাজ্যের মুদ্রা, খ্রীস্টপূর্ব প্রায় ৩৫০, কর্ষপণ

ছাপাঙ্কিত মুদ্রা ভারতের এক প্রকার প্রাচীন মুদ্রা, যা খ্রীস্টপূর্ব ষষ্ঠ এবং দ্বিতীয় শতাব্দীর মধ্য সময়কার।[১] এই মুদ্রাগুলির তাত্ত্বিক কালনিরূপণবিদ্যার অধ্যয়নটি সফলভাবে উপস্থাপিত করেছে যে, প্রথম ছাপাঙ্কিত মুদ্রাগুলোয় প্রাথমিকভাবে কেবল এক বা দুইটি ছাপ ছিল, পরবর্তীতে সময়ের সাথে সাথে ছাপের সংখ্যাও বৃদ্ধি পায়।[৪][৫]

ভারতবর্ষের প্রথম মুদ্রাগুলি সম্ভবত সিন্ধু-গাঙ্গেয় সমভূমির মহাজনপদ কর্তৃক খ্রীস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীর আশেপাশে ছাপাঙ্কিত হয়েছিল। এগুলি অবশ্যই খ্রীস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে উৎপাদিত হয়েছিল, যা খ্রীস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে গ্রেট আলেকজান্ডারের আক্রমণের কিছু আগে। জো ক্রিবের মতে, ভারতীয় ছাপাঙ্কিত মুদ্রাগুলি খ্রীস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীর মাঝামাঝি বা কিছুটা আগের, এবং বস্তুত কাবুল/গান্ধার অঞ্চলে আখেমেনীয় ছাপাঙ্কিত মুদ্রা তৈরি করার সময়ে শুরু হয়েছিল।[৪] ১৯শ শতকে কেউ কেউ এই অনুমানটি প্রস্তাব করেন যে, মুদ্রাগুলি সম্ভবত ১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ বা তার পরে প্রথম তৈরি করা হয়েছিল এবং আনাতোলিয়া উপদ্বীপে মুদ্রার প্রচলনের ঘটনার সাথে এর কোনও সম্পর্ক ছিল না। তবে এই অনুমানটি বর্তমানে "আর বিশ্বাসযোগ্য নয়"।[৪]

এই সময়ের ছাপাঙ্কিত মুদ্রাগুলিকে পুরাণ, কর্ষপণ বা পণ নামে বলা হত।[৫] এই মুদ্রাগুলির বেশ কয়েকটিতে একটি একক চিহ্ন ছিল, উদাহরণস্বরূপ: সৌরাষ্ট্রে একটি কুঁজওয়ালা ষাঁড় ছিল, দক্ষিণ পাঞ্চালে ছিলো স্বস্তিকা এবং মগধের মতো অন্যদেরও বেশ কয়েকটি চিহ্ন ছিল। এই মুদ্রাগুলি ছিল গড়মান ওজনের রূপা দিয়ে তৈরি, তবে এগুলো আকারে ছিল অসমতল। রূপার খণ্ড কেটে মুদ্রা তৈরির পর মুদ্রার কিনারাগুলি কেটে এর সঠিক ওজন দেওয়া হত।[৫][৬][১]

মনু, পাণিনি এবং বৌদ্ধ জাতকের গল্পগুলিতে এগুলোর উল্লেখ ছিল এবং উত্তরের চেয়ে দক্ষিণে তিন শতাব্দী দীর্ঘ স্থায়ী (খ্রীস্টপূর্ব ৬০০ - ৩০০ খ্রীস্টাব্দ) ছিল।[৭]

  • সুরাসেনা
  • সৌরাষ্ট্র[৮]
    • ভারতের প্রাচীন মুদ্রাগুলি (খ্রীস্টপূর্ব ৪০০ - ১০০ খ্রীস্টাব্দ) রূপাতামা দিয়ে তৈরি ছিল এবং সেগুলির উপরে প্রাণী এবং উদ্ভিদের চিহ্ন ছিল।[৯][১][৫]

মৌর্য্য সময়কাল (খ্রীস্টপূর্ব ৩২২-১৮৫)[সম্পাদনা]

মগধ রাজ্যের নন্দ রাজবংশের শাসনামলের ছাপাঙ্কিত মুদ্রা। মুদ্রার উপরে অঙ্কিত পাঁচটি প্রতীক হল: সূর্যপ্রতীক, ষড়বাহু (মগধ) প্রতীক, পাহাড়ের উপরে দণ্ডায়মান বৃষ (ষাঁড়), ইন্দ্রধ্বজ ও তার দুপাশে চারটি বৃষকল্প এবং হাতি। এছাড়া মুদ্রার অপর পিঠে একটি অনানুষ্ঠানিক (বা অননুমোদিত বা অপ্রাতিষ্ঠানিক) অতিরিক্ত মার্কা আছে।

মৌর্য্য সময়কালের পর প্রচুর পরিমাণে ছাপাঙ্কিত মুদ্রা উদগত হতে থাকে।[১] একইভাবে, মৌর্য্য সাম্রাজ্যের মুদ্রা তৈরি করার কাজ মগধের ছাপাঙ্কিত মুদ্রার উদাহরণ ছিল। প্রতিটি মুদ্রা রৌপ্যের পরিধানের উপর নির্ভর করে তৌলরীতি অনুযায়ী গড় ৩২ রতি বা ৫০-৫৫ গ্রেণ ওজনে প্রস্তুত[১][১০], এবং আগের মুদ্রাগুলি পরের মুদ্রাগুলির চেয়ে সমতল। এই মুদ্রাগুলিতে ৪৫০ প্রকারের ভিন্ন ছাপ রয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সর্বাধিক প্রচলিত সূর্য এবং ষড়ভুজ প্রতীক এবং বিভিন্ন ধরণের জ্যামিতিক নিদর্শন, বৃত্ত, চাকা, মানব চরিত্র, বিভিন্ন প্রাণী, ধনুক এবং তীর, পাহাড় এবং গাছ ইত্যাদি রয়েছে।

মনু, পাণিনি এবং বৌদ্ধ জাতকের গল্পগুলিতে ছাপাঙ্কিত মুদ্রার উল্লেখ ছিলো। তারা খ্রীস্টাব্দ প্রথম শতাব্দী শুরুর কাছাকাছি পর্যন্ত উত্তরে এগুলোর প্রচার চালিয়ে যায়, তবে দক্ষিণে প্রায় তিন শতাব্দী বেশি সময় ধরে এগুলো স্থায়ী ছিল, অর্থাৎ প্রায় ৩০০ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত।[১১]

উত্তরে মৌর্য্য সাম্রাজ্যের পতনের পর গ্রিক-ব্যাক্ট্রিয় এবং ইন্দো-গ্রীকদের প্রভাব বৃদ্ধি পেলে ছাপাঙ্কিত মুদ্রাগুলি ছাঁচে-ঢালা মুদ্রা[১] দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়েছিল, যেমন: গান্ধার-এর মৌর্য্য-পরবর্তী মুদ্রায় দৃশ্যমান।[১]

আরোও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "মুদ্রা"বাংলাপিডিয়া। সংগ্রহের তারিখ ৬ এপ্রিল ২০২০ 
  2. Errington, Elizabeth; Trust, Ancient India and Iran; Museum, Fitzwilliam (১৯৯২)। The Crossroads of Asia: transformation in image and symbol in the art of ancient Afghanistan and Pakistan (ইংরেজি ভাষায়)। Ancient India and Iran Trust। পৃষ্ঠা 57–59। আইএসবিএন 9780951839911 
  3. CNG Coins
  4. Cribb, Joe। Investigating the introduction of coinage in India- a review of recent research, Journal of the Numismatic Society of India xlv (Varanasi 1983), pp.95-101 (ইংরেজি ভাষায়)। পৃষ্ঠা 85–86। 
  5. "পাঞ্চমার্কড মুদ্রা"। ৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৫। 
  6. Śrīrāma Goyala (১৯৯৪)। The Coinage of Ancient India। Kusumanjali Prakashan। 
  7. "Puranas or Punch-Marked Coins (circa 600 BC – circa 300 AD)"। Government Museum Chennai। সংগ্রহের তারিখ ২০০৭-০৯-০৬ 
  8. http://coinindia.com/galleries-surashtra.html Accessed 06/03/2007
  9. Allan & Stern (2008)
  10. "Archived copy"। ২০০৫-০৬-১৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০০৫-০৬-১৮  accessed 15/2/2007
  11. "Puranas or Punch-Marked Coins (circa 600 BCE – circa 300 CE)"। Government Museum Chhennai। সংগ্রহের তারিখ ২০০৭-০৯-০৬