উত্তুরে ল্যাঞ্জাহাঁস

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
উত্তুরে ল্যাঞ্জাহাঁস
Northern Pintails (Male & Female) I IMG 0911.jpg
পুরুষ ও স্ত্রী হাঁস (বামে ও ডানে)
এই শব্দ সম্পর্কে ডাক 
সংরক্ষণ অবস্থা
বৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস
জগৎ/রাজ্য: Animalia
পর্ব: Chordata
শ্রেণী: Aves
বর্গ: Anseriformes
পরিবার: Anatidae
উপপরিবার: Anatinae
গণ: Anas
প্রজাতি: A. acuta
দ্বিপদী নাম
Anas acuta
Linnaeus, 1758
Anas acuta dis w2.PNG
হালকা সবুজ — প্রজনন অঞ্চল
নীল — শীতকালীন পরিযান অঞ্চল
গাঢ় সবুজ — সারা বছর অবস্থান
লাল ক্রস — অনিয়মিত
প্রতিশব্দ

Dafila acuta

উত্তুরে ল্যাঞ্জাহাঁস (বৈজ্ঞানিক নাম: Anas acuta) বা লেঞ্জাহাঁস Anatidae (অ্যানাটিডি) গোত্র বা পরিবারের অন্তর্গত Anas (আনুস) গণের অন্তর্ভূক্ত এক প্রজাতির বড় হাঁস।[২][৩] পাখিটি একটি বিশ্বজনীন প্রজাতি; বাংলাদেশ, ভারত ছাড়াও পৃথিবীর বহু বিভিন্ন দেশে এদের দেখা যায়। ইউরোপ, এশিয়াউত্তর আমেরিকার উত্তরাঞ্চলে এরা প্রজনন করে। প্রজাতিটি স্বভাবে পরিযায়ী এবং শীতকালে এর প্রজননস্থলের দক্ষিণে বিষুবীয় অঞ্চলের দিকে চলে আসে। সারা পৃথিবীতে এক বিশাল এলাকা জুড়ে এরা বিস্তৃত; কেবল দুই আমেরিকাতেই এরা প্রায় ৬৫ লক্ষ ৮০ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বসবাস করে।[৪] বিশাল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই এর একাধিক ভৌগোলিক উপপ্রজাতি থাকার কথা। কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্য, উত্তুরে ল্যাঞ্জাহাঁসের কোন উপপ্রজাতি নেই। ইটনের ল্যাঞ্জাহাঁসকে একসময় এর সহপ্রজাতিক মনে করা হলেও এরা আসলে ভিন্ন একটি প্রজাতি।

উত্তুরে ল্যাঞ্জাহাঁস বড় আকারের হাঁস। স্ত্রী-পুরুষ দুই হাঁসেরই নীলচে-ধূসর ঠোঁট এবং ধূসর পা ও পায়ের পাতা থাকে। পুরুষ হাঁস দেখতে চমৎকার, চকলেট রঙা মাথার পেছন থেকে একটি সরু সাদা রেখা ঘাড় হয়ে সাদা দেহতল পর্যন্ত নেমে গিয়েছে। এছাড়া পিঠ দর্শনীয় ধূসর, বাদামি ও কালো রঙে চিত্রিত থাকে। স্ত্রী হাঁসের দেহে রঙের বৈচিত্র্য কম। দেহ আনুস গণের অন্যান্য স্ত্রী হাঁসের মত মেটে রঙের। স্ত্রী হাঁস প্যাঁক-প্যাঁক করে ডাকে; পুরুষ হাঁসের ডাক বাঁশির শিষের মত।

উত্তুরে ল্যাঞ্জাহাঁস বিস্তৃত খোলা জলাশয় বা জলাভূমিতে বসবাস করে। সাধারণত পানি থেকে কিছু দূরে মাটিতে বাসা করে। পানিতে ভাসমান উদ্ভিদ এদের প্রধান খাদ্য। তবে প্রজনন মৌসুমে ছোট অমেরুদণ্ডী প্রাণীও খায়। অপ্রজননকালীন সময়ে এরা দলবদ্ধভাবে বসবাস করে, দলে অন্য প্রজাতির হাঁসও ঘুরে বেড়ায়।

শিকারী প্রাণী, পরজীবী ও বিভিন্ন রোগজীবাণুর কারণে এদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এছাড়া কৃষিকাজ, শিকার, মৎস্যনিধন প্রভৃতি মনুষ্যসৃষ্ট কারণেও এরা ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। বিগত কয়েক দশক ধরে এদের সংখ্যা কমছে তবে এখনও আশঙ্কাজনক পর্যায়ে যেয়ে পৌঁছেনি। সেকারণে আই. ইউ. সি. এন. এই প্রজাতিটিকে ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত বলে ঘোষণা করেছে।[১] বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী আইনে এ প্রজাতিটি সংরক্ষিত।[৩]

শ্রেণীবিন্যাস[সম্পাদনা]

ক্যারোলাস লিনিয়াস ১৭৫৮ সালে প্রকাশিত তার সিস্তেমা নাতুরি (Systema naturae) গ্রন্থে সর্বপ্রথম যেসব প্রজাতির নামকরণ করেন তার মধ্যে Anas acuta একটি।[৫] উত্তুরে ল্যাঞ্জাহাঁস বৈজ্ঞানিক নামের অর্থ চোখালেজ হাঁস (লাতিন: anas = হাঁস, acutas = সূঁচালো)।[৩] এর ইংরেজি নাম ও দ্বিপদ নামের উদ্ভব হয়েছে পুরুষ হাঁসের লেজের প্রজননকালীন লম্বা মধ্যপালক অনুসারে।[৬]

বড় হাঁসদের গণ Anas-এর[৫] অন্তর্ভূক্ত হলদেপেট ল্যাঞ্জাহাঁস (A. georgica) ও ইটনের ল্যাঞ্জাহাঁস (A. eatoni) উত্তুরে ল্যাঞ্জাহাঁসের নিকটতম আত্মীয়। কোষীয় গঠন, দৈহিক গঠন ও আচরণগত ভিন্নতার ভিত্তিতে এ তিনটি প্রজাতিকে কখনো কখনো আলাদা একটি গণ Dafila-এর (১৮২৪ সালে স্টিফেন্স কর্তৃক বর্ণিত) অন্তর্ভূক্ত বলে বিবেচনা করা হয়।[৭][৮][৯] প্রখ্যাত ব্রিটিশ পক্ষীবিদ স্যার পিটার স্কট এ গণের নামানুসারে তার কন্যার নাম রাখেন ডাফ্লিয়া স্কট।[১০]

ইটনের ল্যাঞ্জাহাঁস প্রজাতিটির দু'টি উপপ্রজাতি রয়েছে। উপপ্রজাতি দু'টি হল কার্গেলেন দ্বীপের A. e. eatoni (কার্গেলেন ল্যাঞ্জাহাঁস) ও ক্রোজেট দ্বীপের A. e. drygalskyi (ক্রোজেট ল্যাঞ্জাহাঁস)। এদের পূর্বে উত্তর গোলার্ধের উত্তুরে ল্যাঞ্জাহাঁসের সহপ্রজাতিক বলে মনে করা হত। ইটনের ল্যাঞ্জাহাঁসের যৌন দ্বিরূপতা প্রায় নেই বললেই চলে। প্রজনন মৌসুমে পুরুষ হাঁসকে স্ত্রী হাঁস থেকে সহজে আলাদা করা যায় না। ইটনের ল্যাঞ্জাহাঁসকে আলাদা প্রজাতি হিসেবে বিবেচনা করা হলে বিশাল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত থাকলেও উত্তুরে ল্যাঞ্জাহাঁসের কোন উপপ্রজাতি নেই।[১১] মান্‌রা দ্বীপের বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া ট্রিস্ট্রামের ল্যাঞ্জাহাঁসকে কখনো কখনো একটি উপপ্রজাতি A. a. modesta হিসেবে বিবেচনা করা হলেও মনোনিত উপপ্রজাতির সাথে এর কোন পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যায় নি।[১২]

বিবরণ[সম্পাদনা]

পুরুষ হাঁস, স্লোভেনিয়া

উত্তুরে ল্যাঞ্জাহাঁস বেশ বড় আকারের হাঁস। এর ডানার দৈর্ঘ্য ২৩.৬–২৮.২ সেমি (৯.৩–১১.১ ইঞ্চি) এবং ডানার বিস্তার ৮০–৯৫ সেমি (৩১–৩৭ ইঞ্চি).[১৩] পুরুষ হাঁসের দৈর্ঘ্য ৫৯–৭৬ সেমি (২৩–৩০ ইঞ্চি) ও ওজন ৪৫০–১৩৬০ গ্রাম (১–৩ পাউন্ড), এবং স্ত্রী হাঁসের তুলনায় যথেষ্ট বড়। স্ত্রী হাঁসের দৈর্ঘ্য ৫১–৬৪ সেমি (২০–২৫ ইঞ্চি) ও ওজন ৪৫৪–১,১৩৫ গ্রাম (১–২.৫ পাউন্ড)।[১৪] আকারে উত্তুরে ল্যাঞ্জাহাঁস প্রায় নীলশিরের মতো, তবে নীলশিরের তুলনায় এটি খানিকটা লম্বাটে। নীলশিরের তুলনায় এর গলা ও লেজ বেশ খানিকটা লম্বা। প্রজননকালীন পুরুষ হাঁস দেখতে চমৎকার, চকলেট রঙা মাথার পেছন থেকে একটি সরু সাদা রেখা ঘাড় হয়ে সাদা দেহতল পর্যন্ত নেমে গিয়েছে। পিঠ ও ডানা ধূসর। ডানার নিচ তামাটে। ডানা-ঢাকনি কালো। ডানায় কিছু কালচে অনিয়মিত ডোরা থাকে। অবসারনী অঞ্চল হলদে যা কালো লেজতল-ঢাকনীর বিপরীত।[১১] লেজের লম্বা মধ্য পালকটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১০ সেমি (৪ ইঞ্চি)।ঠোঁট নীলচে-ধূসর।[১৫]

স্ত্রী হাঁসের মাথা, ঘাড় ও লেজ পুরুষ হাঁসের তুলনায় ছোট ও দেহে রঙের বৈচিত্র্য কম। দেহ আনুস গণের অন্যান্য স্ত্রী হাঁসের মত মেটে রঙের। মাথা ধূসর-বাদামী ও পিঠের বাদামি প্রান্ত ফ্যাকাসে। ঠোঁট চোখা ও ধূসর।[১১] উভয়েরই চোখ ঘন লালচে বাদামি। ঠোঁটের গোড়া কালচে। পা ও পায়ের তল কালচে; পায়ের পর্দা, অস্থিসন্ধি ও নখর কালো। অপ্রজননকালীন পুরুষ হাঁস দেখতে স্ত্রী হাঁসের মত, তবে ঘাড়ে ধূসর পালক বিদ্যমান। অপ্রাপ্তবয়স্ক হাঁসের দেহ স্ত্রী হাঁসের মত, কিন্তু ডানার পালক পুরুষ হাঁসের মত।[৩][১৬]

ল্যাঞ্জাহাঁস মাটিতে স্বচ্ছন্দে চলাফেরা করতে পারে, আর সাঁতারে অসম্ভব পটু।[১১] এরা খুব দ্রুত উড়তে পারে। ওড়ার সময় ডানা ঈষৎ পশ্চাৎমুখী থাকে, সম্পূর্ণ মেলে ধরে না। উড়ন্ত অবস্থায় এদের ডানার তলে সাদা প্রান্ত প্রায় ১ মাইল দূর থেকে দেখা যায়।[১৬]

স্ত্রী হাঁস প্যাঁক-প্যাঁক করে ডাকে; পুরুষ হাঁসের ডাক বাঁশির শিষের মত, অনেকটা প্রুপ-প্রুপ[১১]

বিস্তৃতি ও আবাসস্থল[সম্পাদনা]

অপ্রজননকালীন পুরুষ হাঁস, ভারত

উত্তুরে ল্যাঞ্জাহাঁস সমগ্র ইউরেশিয়ার উত্তর থেকে দক্ষিণে পোল্যান্ডমঙ্গোলিয়া পর্যন্ত বিশাল এলাকা জুড়ে প্রজনন করে।[১৪] কানাডা, আলাস্কাযুক্তরাষ্ট্রের মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলেও এরা প্রজনন করে। শীতকালে এটি দক্ষিণে বিষুব রেখার কাছাকাছি পানামা, উত্তর সাব-সাহারান আফ্রিকা ও ক্রান্তীয় দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত পরিযান করে। অল্প কিছু সংখ্যক হাঁস হাওয়াই ও অন্যান্য প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপসমূহে পরিযান করে এবং সেখানকার আবাদি জমি ও অগভীর জলাশয়ে চরে বেড়ায়।[১১] আন্তঃমহাসাগরীয় পরিযানের খবরও জানা গেছে। কানাডার ল্যাব্রাডরে রিং পরানো একটি হাঁস নয় দিন পর ইংল্যান্ডের এক শিকারীর হাতে গুলিবিদ্ধ হয়।[১৪]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. ১.০ ১.১ "Anas acuta"The IUCN Red List of Threatened Species। সংগৃহীত ১৯ Septemberer, ২০১৩ 
  2. রেজা খান (২০০৮)। বাংলাদেশের পাখি। ঢাকা: বাংলা একাডেমী। পৃ: ১১৫। আইএসবিএন 9840746901 
  3. ৩.০ ৩.১ ৩.২ ৩.৩ জিয়া উদ্দিন আহমেদ (সম্পা.) (২০০৯)। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ: পাখি, খণ্ড: ২৬। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। পৃ: ২২–৩। 
  4. "Northern Pintail Anas acuta"BirdLife International। সংগৃহীত ২০১৩-০৯-১৯ 
  5. ৫.০ ৫.১ (লাতিন) Linnaeus, Carolus (১৭৫৮)। Systema naturae per regna tria naturae, secundum classes, ordines, genera, species, cum characteribus, differentiis, synonymis, locis. Tomus I. Editio decima, reformata.। Holmiae. (Laurentii Salvii).। পৃ: ১২৬। "A. cauda acuminata elongata subtus nigra, occipite utrinque linea alba" 
  6. uk.rec.birdwatching, scientific bird names explained. Retrieved 13 January 2008
  7. Johnson, Kevin P.; Sorenson, Michael D. (১৯৯৯)। "Phylogeny and biogeography of dabbling ducks (genus Anas): a comparison of molecular and morphological evidence"The Auk 116 (3): 792–805। ডিওআই:10.2307/4089339  |coauthors= প্যারামিটার অজানা, উপেক্ষা করুন (সাহায্য)
  8. Johnson, Kevin P.; McKinney, Frank; Wilson, Robert; Sorenson, Michael D. (২০০০)। "The evolution of postcopulatory displays in dabbling ducks (Anatini): a phylogenetic perspective"Animal Behaviour 59 (5): 953–963। ডিওআই:10.1006/anbe.1999.1399পিএমআইডি 10860522  |coauthors= প্যারামিটার অজানা, উপেক্ষা করুন (সাহায্য)
  9. Livezey, B. C. (১৯৯১)। "A phylogenetic analysis and classification of recent dabbling ducks (Tribe Anatini) based on comparative morphology"The Auk 108 (3): 471–507। ডিওআই:10.2307/4088089 
  10. "Dafila Scott"। Society of Wildlife Artists। আসল থেকে ১৯ জুলাই ২০০১-এ আর্কাইভ করা। সংগৃহীত ১৬ জানুয়ারি ২০০৮ 
  11. ১১.০ ১১.১ ১১.২ ১১.৩ ১১.৪ ১১.৫ Madge, Steve; Burn, Hilary (১৯৮৮)। Wildfowl: An Identification Guide to the Ducks, Geese and Swans of the World (Helm Identification Guides)। Christopher Helm। পৃ: 222–224। আইএসবিএন 0-7470-2201-1  |coauthors= প্যারামিটার অজানা, উপেক্ষা করুন (সাহায্য)
  12. Hume, Julian P; Walters, Michael (২০১২)। Extinct Birds। London: Poyser। পৃ: ৫০। আইএসবিএন 1-4081-5725-X  |coauthors= প্যারামিটার অজানা, উপেক্ষা করুন (সাহায্য)
  13. del Hoyo, J., Elliott, A. and Sargatal, J. (1992) Handbook of the Birds of the World. Volume 1: Ostrich to Ducks. Lynx Edicions, Barcelona.
  14. ১৪.০ ১৪.১ ১৪.২ Robinson, Jerry; Johansson, Carl (editor) (২০০২)। "Anas acuta"Animal Diversity Web। University of Michigan Museum of Zoology। সংগৃহীত ১৩ জানুয়ারি ২০০৮  |coauthors= প্যারামিটার অজানা, উপেক্ষা করুন (সাহায্য)
  15. Gooders, John; Boyer, Trevor (১৯৯৭)। Ducks of Britain and the Northern Hemisphere। Collins & Brown। পৃ: 58–61। আইএসবিএন 1-85585-570-4  |coauthors= প্যারামিটার অজানা, উপেক্ষা করুন (সাহায্য)
  16. ১৬.০ ১৬.১ Mullarney, Killian; Svensson, Lars, Zetterstrom, Dan; Grant, Peter. (2001). Birds of Europe. Princeton University Press. pp 48–9 ISBN 0-691-05054-6

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

  • ARKive, ল্যাঞ্জাহাঁস বিষয়ক আরও তথ্য, ভিডিও ও আলোকচিত্র।