আলাউদ্দিন আহমেদ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

টেমপ্লেট:ততথ্যসূত্র আবশ্যক

Alauddin Ahmed.jpg

কৃষক নেতা আলাউদ্দিন আহমেদ

আলাউদ্দিন আহমেদ (ডিসেম্বর ১৯৩০ - ১২ মার্চ ২০০৩) ছিলেন কৃষক-শ্রমিক নেতা। তিনি মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর অনুসারী ছিলেন। কমরেড আলাউদ্দিন আহমেদের আসল নাম মুহাম্মদ আলাউদ্দীন। ১৯৩০ সালে ঈশ্বরদী থানার সাহাপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তাঁর জন্ম। এখানেই বড় হয়েছেন তিনি। ভাল ছাত্র ছিলেন স্কুলে, সবসময় ক্লাসে প্রথম স্থান অধিকার করেছেন। ইংরেজি, বাংলা ভাল জানতেন। কোরান মুখস্থ বলতে পারতেন। চন্দ্রপ্রভা বিদ্যাপীঠ থেকে ম্যাট্রিক ও পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ থেকে বি.এ. পাশ করেছেন কৃতিত্বের সঙ্গে। ১৯৫১ সালে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সঙ্গে দেখা হওয়ার পর তাঁর অনুসারী হন। ১৯৫২-১৯৫৪ পর্যন্ত পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন আলাউদ্দিন আহমেদ। তখন ভাষা আন্দোলনে পালন করেছেন কার্যকর ভূমিকা। ছাত্রজীবন শেষে তিনি রূপপুর বয়েজ জুনিয়র স্কুলে প্রধান শিক্ষকের পদে যোগ দেন। কিন্তু রাজনীতি করার অপরাধে সে চাকরি হারান। তারপর তিনি ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু রাজনীতি করার জন্য প্রেসিডেন্ট পদটিও থাকেনি। গ্রামের উন্নয়ন ও তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য বিকাশের জন্য তিনি ‘যুবক সমিতি’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সাহাপুরে স্থাপন করেছিলেন ‘গিরিজাপ্রসন্ন স্মৃতি পাঠাগার’। ১৯৭১ সালে এই পাঠাগার ও তাঁর পারিবারিক পাঠাগার ও বাড়ি পুড়িয়ে দেয় পাকিস্তানি বাহিনী।

আলাউদ্দিন আহমেদের উদ্যোগে তাঁর স্বগ্রাম সাহাপুরে ১৯৫৬ সালে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের এক সম্মেলন হয়। ১৯৫৭ সালে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-ন্যাপে যোগ দেন তিনি। এরপর কৃষক সমিতিতে যোগ দিয়ে  পরিচিতি লাভ করেন কৃষক নেতা হিসেবে। তাঁর উদ্যোগে ১৯৬৯ সালের শেষ দিকে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাবেশ হয়েছিল সাহাপুরে। যা ‘লালটুপি’ সম্মেলন নামে খ্যাত। ১৯৭১ সালে তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।  

আলাউদ্দিন আহমেদ যে কাজ করতেন আন্তরিকতার সঙ্গে করতেন। যা মুখে বলতেন তা-ই করতেন। কখনও প্রাপ্য সম্মান থেকে কাউকে বঞ্চিত করেন নি। তিনি ছিলেন একজন সৎ একনিষ্ঠ আদর্শিক মানুষ ও রাজনীতিবিদ। পাকিস্তান আমল থেকেই তিনি বেশ কয়েকবার ক্ষমতার অফার পেয়েছেন কিন্তু গ্রহণ করেন নি। খুব সহজে ক্ষমতার লোভ ত্যাগ করতে পেরেছেন। চাকরি চলে যাওয়ার পরে বিড়ি শ্রমিক হিসেবে কাজ করেছেন। রাস্তা মেরামতের জন্য নিজ হাতে শ্রমিকদের সঙ্গে মাটি কেটেছেন। কৃষকদের হুকুমদখল হওয়া জমির ক্ষতিপূরণ আদায় করেছেন। খাদ্যমূল্য বৃদ্ধির বিরুদ্ধে মিছিল করেছেন। ঘেরাও করেছেন সরকারি অফিস-দপ্তর। পরবর্তী জীবনে রাজনীতির বিপ্লবী লাইন গ্রহণ করলেও এক সময় তা পরিত্যাগ করে গণআন্দোলনের লক্ষ্যে গণসংগঠন গড়ে তুলতে চেষ্টা করেছিলেন।

আলাউদ্দিন আহমেদ ছিলেন কবি, কথাসাহিত্যিক, অনুবাদক। তিনি কার্ল মার্কসের ‘দ্য পোভার্টি অব ফিলোসফি’র অনুবাদ করেছেন ‘দর্শনের দারিদ্র্য’ নামে। ইমানুয়েল কান্ট-এর ‘দ্য ট্রিটিক অব পিওর রিজন’-এর অনুবাদ করেছেন। অনুবাদ করেছেন ‘অ্যান্টি ডুরিং’-এর। তাঁর রাজনৈতিক প্রবন্ধের বই ‘বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও তার সমস্যা’ এবং কবিতার বই ‘নাম ছিল তার পাখি’ ও ‘এই বাংলার ঘরে ঘরে’। এ ছাড়াও তাঁর অনেক প্রবন্ধ-নিবন্ধ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পত্রিকার পাতায়। তিনি মাঝে মাঝে নাটকও লিখেছেন।

২০০৩ সালের ১২ই মার্চ তিনি না ফেরার দেশে চলে গিয়েছেন। এর আগে তাঁর এক মেয়ে বিনা চিকিৎসায় ক্যানসারে মারা যায়। মারা যায় এক ছেলে। এই দু’টি মৃত্যু, রাজনৈতিক সহকর্মীদের আচরণ এবং দেশের অবস্থা তাঁর শেষ জীবনকে ব্যথাভারাক্রান্ত রেখেছে সারাক্ষণ।

শিক্ষা ও রাজনৈতিক জীবন

আলাউদ্দিন আহমেদ ১৯৩০ সালের ডিসেম্বরে সাহাপুর গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। তাঁর পিতা রিয়াজউদ্দিন সরদার প্রথমে চাকরি করলেও পরে তা ছেড়ে দিয়ে স্কুলে মাস্টারি করা শুরু করেন এবং শিক্ষকতার পাশাপাশি মসজিদে ইমামতি করতেন। তিনি মসজিদে মুসুল্লীদের ওজুর করার জন্য নদী থেকে পানি তুলে ড্রাম ভরে রেখেছেন। আলাউদ্দিন আহমেদ শৈশবে খুব দুরন্ত ছিলেন। বই নিয়ে বসার চেয়ে বন্ধুদের নিয়ে মাছ ধরতে, কলার ভেলায় নদী এপার-ওপার করতে আর ফুটবল খেলতে ভালোবাসতেন। কখনও কখনও বন্ধুদের সঙ্গে বাজী ধরে সারারাত কবরস্থানে কাটিয়েছেন। তাঁর বাবা খুব রাগী ছিলেন; তিনি ভয়ও করতেন বাবাকে। তার বাবা তাকে লেখাপড়ার জন্য বকাবকি করেন নি কারণ লেখাপড়ায় খুব ভালো ছিলেন, ক্লাসের প্রথম হতেন। স্কুল জীবনে তিনি ‘লড়কে লেংগে পাকিস্তান’-এর কর্মী ছিলেন। সেই সময় মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী আসাম মুসলিম লীগের সভাপতি ছিলেন। ‘লড়ক লেংগে পাকিস্তান’-এর কর্মী হলেও সেই সময় থেকেই মওলানার বক্তৃতা-বিবৃতিতে আকৃষ্ট ছিলেন। মওলানা ভাসানীর সঙ্গে প্রথম দেখা হয় ১৯৫১ সালে পাবনাতে; পাবনা টাউন হলে মওলানা ভাসানীর বক্তৃতা শুনেই তিনি তাঁর অনুসারী হয়েছিলেন। মওলানা ভাসানীকে নেতা মেনেই তিনি আওয়ামী মুসলিম লীগে যোগ দিয়েছিলেন। ১৯৫৭ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ বিভক্ত হয়ে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির জন্ম হয়।  ন্যাপ-এর প্রস্তুতি পর্বে ১৯৫৬ সালে তার বাড়ি সাহাপুরেই আওয়ামী মুসলিম লীগের এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় কিন্তু এই সম্মেলনে মরহুম শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শেখ মুজিবর রহমানের নেতৃত্বের আওয়ামী লীগের এক অংশ এই সম্মেলনে অংশগ্রহন করেন নি। কারণ তারা জোট নিরপেক্ষ নীতি পরিহার করেছিলেন। ১৯৫৬ সালের ঐ সম্মেলনের পরেই ১৯৫৭ সালে ন্যাপ-এর জন্ম হয়। তিনি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে (ন্যাপ) যোগ দেন এবং ন্যাপ গঠিত হওয়ার পরেই কৃষক সমিতির জন্ম হয়; এবং তিনি কৃষক নেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

তিনি পাকশী চন্দ্র্রপ্রভা বিদ্যাপীঠ থেকে ম্যাট্রিক পাশ করে এডওয়ার্ড মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৫২-১৯৫৪ সালে তিনি ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তিনি ভালো সংগঠক ছিলেন। কৃষক শ্রমিকের জন্য কাজ করেছেন। তিনি তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য বিকাশের জন্য ‘গিরিজা প্রসন্ন স্মৃতি পাঠাগার’ নামে একটি পাঠাগার প্রতিষ্ঠিা করেছিলেন। যুদ্ধের সময় পকিস্তানী সৈন্যরা ঐ পাঠাগার এবং তার বাড়ি পুড়িয়ে দেয়; দুইবার বাড়িতে আগুন দেওয়ার ফলে তার পারিবারিক পাঠাগারসহ রাজনৈতিক নথিপত্র সব পুড়ে যায়। তিনি ‘সাহাপুর যুবক সমিতি’ নামে একটি ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ক্লাবের উদ্যোগে রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্ত জয়ন্তি উদ্যাপিত হতো। নাটক মঞ্চস্থ হতো। তিনি মাঝেমধ্যে নাটক লিখতেন। তিনি গ্রামে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। স্বাধীনতা পরবর্তী সেখানে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন এবং সেটি সরকারী করেন। কিন্তু নিজের জমিতে স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় স্কুলটিতে তার কোন নাম নেই। এছাড়াও ঈশ্বরদী কলেজ সরকারী করার ব্যবস্থা করেছিলেন সেখানেও তার কোন নাম নেই।

পড়া শেষে তিনি রূপপুর জুুনিয়র হাইস্কুলে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নেন। প্রায় পাঁচ/ছয় বছর চাকরি করার পর পাকিস্তান সরকারের মার্শাল ল’এর সময় তার চাকরি চলে যায়। রাজনীতি করার কারণে ঐ চাকরি হারান। এরপর তিনি গ্রামের কৃষক শ্রমিকের অনুরোধে ইউনিয়ন বোর্ডের নির্বাচন করতে রাজী হন এবং ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট (চেয়ারম্যান) নির্বাচিত হন। কিন্তু রাজনীতির কারণেই তার প্রেসিডেন্ট পদটিও চলে যায়। তদানিন্তন পাকিস্তান সরকার তাঁকে রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার জন্য বাড়ি-গাড়ি-ব্যাংকব্যালন্সসহ রাষ্ট্রদূতের অফার দিয়েছিলেন কিন্তু তিনি তা গ্রহন করেন নি ফলে চলে যায় তার প্রেসিডেন্ট পদটি। এরপর তিনি আর চাকরির জন্য চেষ্টা না করে সর্বক্ষণিক রাজনীতিতে যোগ দেন।

এ ছাড়াও যখন পাকিস্তান প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ঘোষণা দিয়েছিলেন রূপপুর পারমানবিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করার; সেই জন্য ঈশ্বরদীর চর সাহাপুরের দুইশত বিঘা জমির হুকুমদখল করে এবং অর্ধেক টাকা পরিশোধ করে বাঁকি অর্ধেক পরে পরিশোধ করবে বলে আর পরিশোধ করছিল না। তখন আলাউদ্দিন আহমেদ জমির মালিকদের মাঠে আসতে বলে আনবিক কেন্দ্রের অফিসে তালা ঝুলিয়ে দেন এবং সেই তালা বাঁকি টাকা পরিশোধ না করা পর্যন্ত খোলেন নি।

তিনি সবসময় সব কাজে মওলানার সঙ্গে থেকেছেন; ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন। ১৯৫৫ সালে সন্তোষে কৃষক-মজদুর কর্মী সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। যোগ দিয়েছিলেন ১৯৫৭ সালে ফুলছড়ি ঘাটের বিন্নাফৈর-এ। সেখানেই মওলানা ভাসানীর কথাতেই এবং মওলানার নেতৃত্বেই কৃষক সমিতি গঠিত হয়। কৃষক সমিতির বার্ষিক সম্মেলন হয়েছে রংপুরের পীরগাছা, পাবনার লাহিড়ী মোহনপুর, ঢাকার রায়পুরা ও সিলেটের কুলাউড়াতে। সব সম্মেলনেই মওলানা ভাসানীর সঙ্গে ছিলেন তিনি। শুধু কৃষক সম্মেলন নয় ১৯৬৫-তে ভারত সম্প্রসারণবাদ প্রতিবাদ আন্দোলনে মওলানার সঙ্গে তিনিও ছিলেন। আইয়ুব খানের পতনের যে ভূমিকা রেখেছিলেন মওলানা ভাসানী তার সঙ্গেও ছিলেন তিনি। এক কথায় সব সময় সব কাজে মওলানার সঙ্গে ছিলেন তিনি।   

১৯৬৯ এর শেষের দিকে অক্টোবর মাসে সাহাপুর গ্রামে কৃষক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। জনসমাগম ছিল লক্ষধিক। সকলে লালটুপি পরেছিল। ঐ সম্মেলন ‘লালটুপি’ সম্মেলন নামে খ্যাত। ঐ সম্মেলনের আহ্বায়ক ছিলেন তিনি। তিনি একজন ভালো সংগঠক ছিলেন এবং যে কাজ করতেন আন্তরিকতা ও সততার সঙ্গে করতেন সেই কারণে মওলানা ভাসানী ‘লালটুপি’ সম্মেলনের আহ্বায়কের দায়িত্ব তাকেই দিয়েছিলেন। তখন মার্শাল’ল চলছিল; পাকিস্তান সরকার ঐ সম্মেলন করতে দিতে চায় নি। মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলন সুষ্ঠভাবে সম্পন্ন করতে পেরেছিলেন তিনি। তার সমর্থকদের সহায়তা ছাড়াও মহিলাদের দিকটি দেখেছিলেন তার স্ত্রী কমরেড আম্বিয়া বেগম সঙ্গে ছিলেন কমরেড মনিকা মতিন। তিনি নারী স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ছিলেন।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। ঠিক তখন থেকেই ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্মুখীন হতে হয়েছে তাকে; পার্টির সিদ্ধান্তের কারণে চারু মজুমদারের খতমের পার্টি গ্রহন করলেও স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি; তাঁর বক্তব্য ছিল সারা জীবন কৃষক শ্রমিক মেহনতি মানুষের জন্য আন্দোলন করেছেন, তাদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র চেয়েছেন; সম-অধিকার চেয়েছেন; স্বাধীনতা চেয়েছেন। এখন ডাক এসেছে স্বাধীনতা যুদ্ধের তাই তিনি যুদ্ধের পক্ষে; তিনি স্বাধীনতা চান এবং স্বাধীনতা যুদ্ধ করেছেন। আর সেই জন্যই পাকিস্তান সেনাবাহিনীসহ নানা দলের সঙ্গে নানা রকম লড়াই তাঁকে লড়তে হয়েছে। ১৯৭৫ সালের মার্চ মাসে তিনি তদানিন্তন সরকারের হাতে ধরা পড়েন। পার্টির ভেতরের লোকই তাঁকে ধরিয়ে দেয়। তিনি পার্টি থেকে পদত্যাগ করেছিলেন কিন্তু তাঁকে নানান বদনামে ভাগীদার হতে হয়েছে এবং জেলে যেতে হয়েছে। মওলানা ভাসানী না থাকলে হয়তো বা তাঁকে জীবনও দিতে হতো। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে মন্ত্রিত্বের অফার পেয়েছেন কিন্তু নেন নি। কারন হিসেবে বলেছেন যে দেশে কৃষক শ্রমিকের কোন সম-অধিকার নেই সেখানে তিনি মন্ত্রিত্বি গ্রহন করতে পারবেন না। তাছাড়াও কখনও তিনি কাজ করে খ্যাত হবেন সেই ধারণার বশবর্তী হয়ে কখনও কাজ করেন নি। আজীবন তিনি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে শ্রদ্ধা করে এসেছেন, তাঁর অনুসারী হয়েই থেকেছেন। ১৯৭৬ সালে তিনি জেল থেকে মুক্তি পান।  

পরিবার       

আলাউদ্দিন আহমেদের পরিবার গোঁড়া ধর্মীয় পরিবার। তাঁর দাদা কছিমউদ্দিন সরদার হাজী ছিলেন। কছিমউদ্দিন সরদারের চার ছেলে দুই মেয়ে। আলাউদ্দিন আহমেদের বাবা ভাইবোনদের মধ্যে বড় এবং কছিমউদ্দিন সরদারের পরিবার ছিল যৌথ ব্যবসায়িক পরিবার। তাঁর দাদা সব ছেলেদের পৃথক করে দিয়ে ছোট ছেলের সঙ্গে বসবাস করতেন। রিয়াজউদ্দিন সরদারের দুই ছেলে দুই মেয়ে। বড় ছেলে জয়নাল আবেদীন রেলওয়েতে চাকরি করতেন। দুই মেয়ে জন্মের সময়ই মারা যায়। তাঁর মায়ের নাম জরিমন নেছা (জরিনা খাতুন)। তাঁর নিজের মা ছাড়াও মফিজন নেছা ও আনিসা বেগম নামে আরও দুই মা ছিলেন। তাঁর নিজের মা চির রুগ্ন থাকায় তাঁর দ্বিতীয় মা সন্তান স্নেহে লালন-পালন করেন। এবং তাঁর পিতার রোষানল থেকে সবসময় রক্ষা করেছেন তিনিই।  

১৯৪৭ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন এবং এডওয়ার্ড মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৫০ সালে তাঁর পড়াকালীন সময়ে  বিয়ে হয়। তাঁর স্ত্রী আম্বিয়া বেগম সম্পর্কে তার ফুফাতো বোন। তাঁর স্ত্রীর বাবার নাম ময়েনউদ্দিন প্রামানিক তখনকার সময়ে ধনাঢ্য ব্যক্তি ছিলেন। বিয়ের পর কয়েক বছর শ্বশুরবাড়িতেই ছিলেন। ওখানে থেকেই পড়ালেখা করতেন তিনি। লেখাপড়া শেষ না করে তার স্ত্রীকে শ্বশুরবাড়ি আসতে দেন নি স্ত্রীর মা। আলাউদ্দিন আহমেদ ধর্মনিষ্ঠ পরিবারের সন্তান ছিলেন এবং রাজনীতি করার কারণে সবসময় কর্মীরা তার বাড়িতে আসতেন, তাঁর স্ত্রী কথাবার্তা বলতে হতো সেটি তাঁর বাবা পছন্দ করতেন না; তাছাড়া পরবর্তী সময়ে তাঁর স্ত্রী আম্বিয়া বেগম রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন সেই কারণে তিনি পৃথকান্ন গ্রহণ করেছিলেন। এবং অনেকদিন পর্যন্ত ছেলের সঙ্গে কথা বলা তো দূরের কথা মুখ-ও দেখতেন না।       

তিনি নারী স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ছিলেন বলেই তাঁর যোগ্য সহধর্মিনী হয়ে উঠতে পেরেছিলেন তাঁর স্ত্রী; সব কাজে সহয়োগীতা করা ছাড়াও সংসার চালানো এবং সন্তানদের বড় করে তোলার জন্য তিনিও বিড়ি বাঁধার কাজ করেছেন, গরু ছাগল পুষেছেন। বাড়ির আঙিনায় সব্জি চাষ করেছেন। চাকরি হারানোর পরে আলাউদ্দিন আহমেদও বিড়ি শ্রমিকের কাজ করেছেন।  

আলাউদ্দিন আহমেদ-এর রাজনৈতিক জীবন শুরুর পর থেকে বেশিরভাগ সময় হুলিয়া মাথায় নিয়ে কেটেছে। শুধু ১৯৭৫ সালের মার্চ মাস ঐ একবার ছাড়া কখনও ধরা পড়েন নি। রটনা ছিল তার বাড়িতে সুড়ঙ্গ তৈরি করা আছে পুলিশ আসার সংবাদ পাওয়ার পরেই সেখান দিয়ে তিনি পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। তার দুই মেয়ে দুই ছেলে; তাঁর জীবদ্দশাতেই এক মেয়ে এক ছেলে মারা যায়। তিনি রাজনীতি করলেও সন্তানদের প্রতি তাঁর ভালোবাসার কমতি ছিল না;সন্তানের মৃত্যুশোকে মনের দিক থেকে খুব দূর্বল হয়ে পড়েন। তিনি ভাবছেন তাঁর সন্তানেরা জীবনে অনেকদূর এগিয়ে যেতে পারতো শুধু মাত্র তাঁর জন্যই তারা কিছুই করতে পারলো না।

তিনি শিশুদের খুব ভালোবাসতেন; সবসময় শিশুদের মানসিক বিকাশের জন্য চেষ্টা করেছেন। তিনি কখনও নৈতিকতা বিসর্জন দেন নি আর আদর্শ থেকেও বিচ্যুত হন নি। যা করেছেন দেশের মেহনতি মানুষকে ভালোবেসে তাদের ভালোর জন্যে করেছেন।  তিনি মনে করতেন মানুষ মাত্রেই ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই রাজনীতি ক্ষেত্রে কেউ ভুল করলে তাকে অপাঙ্তেয় মনে করা চরমভাবে ভুল। তিনি সব সময়েই মনে করতেন মানুষের মনে রাখা প্রয়োজন "to err is human"  

প্রকাশিত গ্রন্থ

১.পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি ও রণনীতি ও রণকৌশল (১৯৬৯)

২.আমার কথা (১৯৭৪)

৩.নাম ছিল তার পাখি (কাব্যগ্রন্থ,১৯৮১)

৪.এই বাংলার ঘরে ঘরে (কাব্যগ্রন্থ ১৯৮৭)  ”

৫.বাংলাদেশের অভ্যূদয় ও সমস্যা (১৯৯৩)

৬.কার্ল মার্কসের পোভার্টি অব ফিলোসফি-এর বঙ্গানুবাদ দর্শনের দারিদ্র (প্রথম প্রকাশ ১৯৮৭, দ্বিতীয় প্রকাশ ২০০৫)

৭. ফ্রেডারিক এঙ্গেলসের অ্যান্টি ডুরিং-এর বঙ্গানুবাদ

৮. আমাদের অর্থনীতির চরিত্র ধনতান্ত্রিক (সংকলিত গ্রন্থ)

৯. আজিজ মেহেরের নিষিদ্ধ কথকতা ইংরেজী অনুবাদ Prohibited Verses (অপ্রকাশিত)

এ ছাড়াও অগ্রন্থিত কবিতা প্রবন্ধ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।