আব্দুল আজিজ ইবনে বায

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
ওলামা
আব্দুল আজিজ বিন বায
উপাধিসৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি
জন্ম২১ নভেম্বর ১৯১০
রিয়াদ, সৌদি আরব
মৃত্যু১৩ মে ১৯৯৯ (৮৮ বছর বয়স)
মক্কা, সৌদি আরব
সমাধি স্থানআল আদল গোরস্থান, মক্কা, সৌদি আরব
জাতীয়তাসৌদি আরবিয়ান
যুগআধুনিক যুগ
অঞ্চলমধ্য প্রাচ্য
সম্প্রদায়সুন্নী ইসলাম
মাজহাবহাম্বলী
শাখাআছারি
আন্দোলনওয়াহাবী আন্দোলন[১]
পুরষ্কারমৌরিতানিয়ার জাতীয় মেধাক্রম পদক  বাদশাহ ফয়সাল আন্তর্জাতিক পুরস্কার (ইসলামে খিদমতের জন্য)

আব্দুল আজিজ বিন আব্দুল্লাহ ইবনে বায (আরবি: عبد العزيز بن عبد الله بن باز‎‎) (২১ নভেম্বর ১৯১০– ১৩ মে ১৯৯৯) ছিলেন সৌদি আরবের বিখ্যাত ইসলামী পণ্ডিত এবং সালাফি মতাদর্শের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। ১৯৯৩ সাল থেকে তার মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি সৌদি আরবের প্রধান মুফতির পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

বিন বায সোভিয়েত বিরোধী জিহাদের সময় একটি ফতোয়া প্রদান করেছিলেন। সেই ফতোয়ায় বলা হয় প্রত্যেকের সম্পদের কর যুদ্ধক্ষেত্রে মুজাহিদিনদের সমর্থনের জন্য দিতে হবে।[২] আব্দুল্লাহ আযযামের "মুসলিম ভূমির প্রতিরক্ষা" নামক ফতোয়ায় বিন বাযের অনুমোদন সোভিয়েত বিরোধী জিহাদে অংশগ্রহণ করার আহবানকে প্রচন্ড প্রভাবিত করেছিলো। তখন এটা বলা হত যে, আধুনিক যুগে একটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপর কোন রাষ্ট্রের এটাই প্রথম অফিসিয়ালি যুদ্ধের আহবান।[৩]

ইবনে বায এর অনেক মতামত ও বিধি-বিধান সৌদি আরবের ভেতর এবং বাহিরে বিতর্কিত হয়েছলো। বিশেষ করে সৃষ্টিতত্ত্ব, নারী অধিকার, অসলো চুক্তিতে সৌদি আরবের সমর্থন এবং মক্কা ও মদীনার দুই পবিত্র মসজিদে অমুসলিম সৈন্যদের অবস্থান ( গালফ যুদ্ধের আগে ও পরে) ইত্যাদি সম্পর্কিত তার ফতোয়া প্রচন্ড বিতর্কের জন্ম দেয়। সৌদি আরবের পররাষ্ট্র নীতি এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে সৌদি জোটে সমর্থনের জন্য  ওসামা বিন লাদেন বিন বাযের প্রচন্ড নিন্দা করতেন।

প্রাথমিক জীবন ও যৌবনকাল[সম্পাদনা]

ইবন বায ১৯১০ সালে হিজরী জ্বিলহজ্জ মাসে সৌদি আরবের রিয়াদ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পরিবার ইসলাম ধর্ম পালনের জন্য বিখ্যাত ছিলো। তিন বছর বয়সে বিন বায তার বাবাকে হারান। তেরো বছর বয়সে তিনি তার ভাইদের সাথে বাজারে গিয়ে কাপড় বিক্রি করতেন। একই সাথে তিনি কুরআন, হাদিস, ফিকহ এবং তাফসীরের ওপর জ্ঞানার্জন শুরু করেন।[৪] তার শিক্ষক ছিলেন মুহাম্মদ ইবনে ইবরাহীম আল আশ-শেখ। [৫] ১৯২৭ সালে যখন তার বয়স মাত্র ষোল বছর, তখন তার চোখে একটি গুরুতর সংক্রমণ হয় এবং তিনি তার দৃষ্টিশক্তি হারানো শুরু করেন। বিশ বছর বয়সে তিনি সম্পূর্ণ দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে একদম অন্ধ হয়ে যান।[৬][৭]

শিক্ষা[সম্পাদনা]

সে সময়ে সৌদি আরবে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় বলতে গেলে ছিলো না। বিন বায বিভিন্ন ইসলামী পণ্ডিতদের কাছে কোরান, হাদিস, ফিকহ, তাফসীর এবং  ইসলামি সাহিত্যের ওপর জ্ঞানার্জন করেন।[৮][৯]

কর্মজীবন[সম্পাদনা]

তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদ এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। যেমন:[১০]

  • ১৯৩৮ সাল থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত তিনি আল খারজ জেলার বিচারক হিসেবে কাজ করেছেন। মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল লতিফ আশ শেখ তার জন্য উক্ত পদের সুপারিশ করেছিলেন।[৪][৫]
  • ১৯৯২ সালে তিনি সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি হিসেবে নিযুক্ত হন। একই সাথে তিনি 'কাউঞ্চিল অফ সিনিয়র স্কলার' এর প্রধান হন।
  • মুসলিম ওয়ার্ল্ড লীগ এর সংবিধান পরিষদের প্রেসিডেন্ট ও সদস্য।[৪][৫]

১৯৮১ সালে তিনি বাদশাহ ফয়সাল আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেন। ইসলাম ধর্মে বিশেষ অবদান রাখার জন্য তাকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়।[১১][১২] সৌদি আরবের তিনিই একমাত্র গ্র্যান্ড মুফতি যিনি আল আশ-শেখ পরিবারের সদস্য নন।[১৩]

কাজ[সম্পাদনা]

ইবনে বায বিভিন্ন অনেক দাতব্য এবং অন্যান্য কার্যক্রমের সাথে যুক্ত ছিলেন। যেমন:[১১]

  • বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইসলাম প্রচারকারী সংগঠন এবং ইসলামিক সেন্টার তৈরীতে তার সমর্থন ছিলো। 
  • জনপ্রিয় রেডিও প্রোগ্রাম নুরুন আলা দার্ব ("আলোর পথ"), যেখানে তিনি বর্তমান বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন এবং শেওতাদের বিভিন্ন প্রশ্নের  উত্তর দিতেন।
  • বিন বায আফগান তালেবানদের অর্থ দেওয়ার আহ্বান জানান, যারা বিংশ শতাব্দীর শেষ দশকে আফগানিস্থানে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিলো। সেই যুদ্ধে অনেক সৌদি নাগরিককে 'শুদ্ধ,তরুন সালাফি যোদ্ধা' হিসেবে দেখা গিয়েছিলো।

ইবনে বায একজন সুবক্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি তার মসজিদে নিয়মিত বক্তব্য দিতেন। তার বক্তব্য শোনার জন্য অনেক মানুষ ভীড় জমাতো। মাঝে মাঝে তিনি লোকজনদের এশার নামাযের পর তার সাথে খাওয়ার নিমন্ত্রণ দিতেন।.[১১] ইবনে বায সেই সমস্ত মুসলিম পণ্ডিতদের একজন ছিলেন, যারা বিশ্বাস করতেন যে সহিংসতার মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন করা ইসলাম সমর্থন করেনা।[১৪] সে জন্য তিনি জনগণকে সরকারের আনুগত্য করার আহবান জানান, যতক্ষণ না সরকার অনৈসলামিক কাজ করতে বাধ্য করে।[১৫]

লেখা[সম্পাদনা]

ইবনে বাযের লেখা বইয়ের সংখ্যা প্রায় ৬০টি। তার বইয়ের বিষয়বস্তু হলো কুরআন, হাদিস, ফিকহ, ফারযিয়াত, নামায, জাকাত, দাওয়াত, হজ্জ্ব, ওমরাহ্‌ ইত্যাদি।[১১] এছাড়াও তিনি জাতীয়তাবাদের সমালোচনা করে বই লিখেছেন।[৪][৫]

ব্যক্তিগত জীবন[সম্পাদনা]

বিন বাযের সকল স্ত্রী এবং সন্তানেরা রিয়াদের অদূরে শুমায়ছিতে আধুনিক দুই তলা ভবন এ বসবাস করতেন। অন্যান্য সৌদি অভিজ্ঞ পণ্ডিতদের মত তার বাসাও ধনী ব্যক্তি বা ধর্মীয় ফাউন্ডেশন এর উপহার ছিলো।

মৃত্যু[সম্পাদনা]

বৃহস্পতিবার সকালে, ১৩ মে ১৯৯৯, ইবনে বায ৮৮ বছর বয়সে মারা যান। মক্কার আল আদিল কবরস্থানে তাকে কবর দেওয়া হয়।[১৬]

বাদশাহ ফাহাদ একটি ডিক্রি জারির মাধ্যমে বিন বাযের স্থলে নতুন গ্র্যান্ড মুফতি হিসেবে আব্দুল আজিজ ইবনে আব্দুল্লাহ আল আশ শেখ কে নিয়োগ প্রদান করেন।[১৭]

সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি হিসেবে তার কর্মজীবনে সৌদি ক্ষমতাসীন পরিবারের শাসনকে বৈধতা দিতে এবং সালাফি আদর্শের আলোকে মুসলিমদের সংস্কারের জন্য চেষ্টা করেছেন। রাজবংশকে সমর্থন করার জন্য অনেকে তার সমালোচনাও করেছে। সালাফি আন্দোলনে তার প্রভাব ছিল অনেক। বর্তমানে সৌদি আরবের বিভিন্ন এলাকার বিশিষ্ট বিচারক ও ধর্মীয় পণ্ডিতরা ইবনে বাযের সাবেক ছাত্র।

বিতর্ক[সম্পাদনা]

দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট পত্রিকায় বলা হয় "তার মতামত এবং ফতোয়া (ধর্মীয় বিধি-বিধান) ছিল বিতর্কিত, যা একই সাথে জঙ্গি, উদারপন্থী এবং প্রগতিশীলদের নিন্দা করে।"[১৮] এছাড়াও ১৯৯১ সালে সৌদি আরবে মার্কিন সৈন্যদের অবস্থান করতে সমর্থন করায় কট্টরপন্থীরা তার বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় তুলেছিলো।[১৯]

সৃষ্টিতত্ব[সম্পাদনা]

১৯৬৬ সালে যখন বিন বায ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মদিনার উপাচার্য ছিলেন, তখন তিনি রিয়াদ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিন্দামূলক একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন। সেই নিবন্ধে তিনি বলেন যে রিয়াদ বিশ্ববিদ্যালয় 'পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে' এইরূপ মিথ্যা তথ্য শিক্ষা দিচ্ছে।[২০][২১]

লেখক রবার্ট লেসি বিন বাযের একটি ফতোয়া উল্লেখ করে বলেন,আমেরিকানরা চাঁদে অবতরণ করেছে এই তথ্যের ওপর তিনি মুসলিমদের আহবান জানিয়ে বলেন, "আমরা অবশ্যই সতর্কতা অবলম্বন করব যখন কাফের এবং ফাসেকরা আমাদের কোন তথ্য জানাবে। আমরা তাদের বিশ্বাস বা অবিশ্বাস কোন কিছুই করব না যতক্ষন না মুসলিমরা নির্ভর করতে পারে এমন তথ্যসূত্র পাই।"

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Kepel (2004), p. 186.
  2. Saudi Arabia: Background and U.S. Relations, Christopher Blanchard, Congressional Research Service, 2010, p. 27.
  3. Ibn Baaz's fatwa in support of the war against the soviets ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২০ এপ্রিল ২০১৫ তারিখে.
  4. Who's Who in Saudi Arabia 1978-1979, pg. 53.
  5. Who's Who in the Arab World 1990-1991, pg. 123.
  6. "সংরক্ষণাগারভুক্ত অনুলিপি"। ২৮ আগস্ট ২০০৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২ জানুয়ারি ২০১৭ 
  7. "Ad-Da'wah Ilallah wa Akhlaaqud-Du'aat" (pp. 37–43)
  8. "Main Page"। ২৮ আগস্ট ২০০৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২ জানুয়ারি ২০১৭ 
  9. "Words of Advice Regarding Da'wah" by 'Abdul 'Azeez ibn 'Abdullaah ibn Baaz (translated by Bint Feroz Deen and Bint Abd al-Ghafoor), Al-Hidaayah Publishing and Distribution, Birmingham: 1998, Page 9–10
  10. "Words of Advice Regarding Da'wah" by 'Abdul 'Azeez ibn 'Abdullaah ibn Baaz (translated by Bint Feroz Deen and Bint 'Abd al-Ghafoor), Al-Hidaayah Publishing and Distribution, Birmingham: 1998, Pages 10–11
  11. Saudi Gazette 14 May 1999
  12. "Saudi Gazette"। ২৮ আগস্ট ২০০৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২ জানুয়ারি ২০১৭ 
  13. Abukhalil, As'Ad (৪ জানুয়ারি ২০১১)। The Battle for Saudi Arabia: Royalty, Fundamentalism, and Global Power। Seven Stories Press। পৃষ্ঠা 66। আইএসবিএন 978-1-60980-173-1 
  14. "العنف يضر بالدعوة"। ৪ জুন ২০০৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২ জানুয়ারি ২০১৭ 
  15. "حقوق ولاة الأمور على الأمة"। ১৬ অক্টোবর ২০০৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২ জানুয়ারি ২০১৭ 
  16. "Al Adl: One of Makkah's oldest cemeteries"Saudi Gazette। ১৮ জুন ২০১২। ২৮ জুলাই ২০১৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১৫ আগস্ট ২০১২ 
  17. "New Saudi Grand Mufti", BBC News, May 16, 1999.
  18. "Obituary: Sheikh 'Abdul 'Aziz bin Baz"The Independent। ১৪ মে ১৯৯৯। সংগ্রহের তারিখ ৮ আগস্ট ২০১১ 
  19. Brachman, Jarret M. (২০০৮)। Global Jihadism: Theory and Practice। Taylor & Francis। পৃষ্ঠা 27। আইএসবিএন 978-0-203-89505-4 
  20. Weston, Mark (২০০৮)। Prophets and Princes: Saudi Arabia from Muhammad to the Present। John Wiley & Sons। পৃষ্ঠা 196। আইএসবিএন 978-0-470-18257-4 
  21. "Sheikh Bin Baz"The Economist। মে ২০, ১৯৯৯। 

গ্রন্থপঞ্জী[সম্পাদনা]

বহিসংযোগ[সম্পাদনা]