অভ্র কী-বোর্ড

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
অভ্র কী-বোর্ড
অভ্র কী-বোর্ডের লোগো.png
মূল উদ্ভাবক ডা. মেহদী হাসান খান, রিফাত নবী, তানবিন ইসলাম সিয়াম
উন্নয়নকারী ওমিক্রন ল্যাব
প্রাথমিক সংস্করণ ২৬ মার্চ ২০০৩
সর্বশেষ সংস্করণ ৫.৫.০ / ২০১৪
উন্নয়ন অবস্থা সচল
অপারেটিং সিস্টেম উইন্ডোজ ২০০০, এক্স পি, ভিস্তা, ৭, ৮, ৮.১, লিনাক্স, উবুন্টু, ম্যাক ওএস এক্স
উপলব্ধ ইংরেজি
ধরণ কী-বোর্ড ইন্টারফেস
লাইসেন্স ওপেন সোর্স, মোজিলা পাবলিক লাইসেন্স
ওয়েবসাইট www.omicronlab.com

অভ্র কী-বোর্ড (ইংরেজি: Avro Keyboard) হল মাইক্রোসফট উইন্ডোজ, ম্যাক ওএস, উবুন্টু এবং লিনাক্স-এ গ্রাফিক্যাল লেআউট পরিবর্তক এবং ইউনিকোডএএনএসআই সমর্থিত বাংলা লেখার বিনামূল্যের ও মুক্ত সফটওয়্যার। এই সফটওয়্যারটির অনন্য বৈশিষ্ট্য হল এতে ফোনেটিক (ইংরেজিতে উচ্চারণ করে বাংলা লেখা) পদ্ধতিতে বাংলা লেখা যায়।

Avrologo1.png

ইতিহাস[সম্পাদনা]

উইন্ডোজে ইউনিকোড ভিত্তিক বাংলা লেখার জন্য ২০০৩ সালের ২৬শে মার্চ অভ্র কীবোর্ড সফটওয়্যারটি আবির্ভূত হয়[১]। এটা সাহায্যে বাংলা লিপি ব্যবহার করে এমন সব ভাষাতেই টাইপ করা যায়। এ ধরনের ভাষার মধ্যে অসমীয়া ভাষা অন্যতম। মেহদী হাসান খান নামে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের একজন ছাত্র ২০০৩ সালে অভ্র কীবোর্ড তৈরির কাজ শুরু করেন। তিনি এটি সর্বপ্রথম তৈরি করেছিলেন ভিজুয়াল বেসিক প্রোগ্রামিং ভাষা দিয়ে, পরবর্তীতে তিনি তা ডেলফিতে ভাষান্তর করেন। এই সফটওয়্যারটির লিনাক্স সংস্করণ লেখা হয়েছে সি++ প্রোগ্রামিং ভাষায়। পরবর্তীতে রিফাত-উন-নবী, তানবিন ইসলাম সিয়াম, রাইয়ান কামাল, শাবাব মুস্তফা এবং নিপুন হক এই সফটওয়্যারের উন্নয়নের সাথে যুক্ত হন।[২] ২০০৭ সালে 'অভ্র কীবোর্ড পোর্টেবল এডিশন' বিনামূল্যে ব্যবহারের জন্যে উন্মুক্ত করা হয়। অভ্র কীবোর্ডের সাম্প্রতিকতম সংস্করণ ৫.৫.০ গত ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ এ প্রকাশিত হয়। সফটওয়্যারটির আগের সংস্করণের লিনাক্স অপারেটিং সিস্টেম সমর্থিত সোর্সকোড[৩] আগে থেকেই মুক্ত ছিল এবং ২০১০ সালে উইন্ডোজে অভ্র কীবোর্ডের ৫ ভার্সনের সাথে এর সোর্স কোড মোজিলা পাবলিক লাইসেন্স এর আওতায় উন্মুক্ত করা হয়।[৪][৫]

বৈশিষ্ট্যসমূহ[সম্পাদনা]

'bangla' টাইপ করলে লেখে 'বাংলা'

অভ্র সফটওয়্যারে বাংলা লেখার জন্য প্রয়োজনীয় সব কিছু ইচ্ছামত সাজিয়ে নেওয়া যায়। এতে বাংলা লেখার জনপ্রিয় সকল পদ্ধতিই যুক্ত করা হয়েছে। এর নিম্নরুপ বৈশিষ্ট্যসমূহ বিদ্যমান।

অভ্র ফোনেটিক কীবোর্ড লেআউট

  • বাংলা ইউনিকোডএএনএসআই ফন্ট সমর্থন ও সরবরাহ করে।
  • উচ্চারণভিত্তিক (ফোনেটিক) বাংলা টাইপিং ব্যবস্থা: যদি "ami banglay gan gai" টাইপ করা হয় তবে লেখা হবে "আমি বাংলায় গান গাই"।
  • একাধিক কিবোর্ড লেআউট থেকে পছন্দের ব্যবস্থা রয়েছে, এমনকি ব্যবহারকারীর পছন্দনুযায়ী বিদ্যমান কিবোর্ড লেআউটকে সাজানো ও নতুন লেআউট সৃষ্টি করে যুক্ত করার ব্যবস্থা রয়েছে।
  • মাউস ক্লিকে অক্ষর চেপে বাংলা লেখার ব্যবস্থা রয়েছে।
  • ভাসমান বানান পরামর্শক: অভ্র ফনেটিক লেআউইটে, টাইপ করার সময় অভিধান থেকে শুদ্ধ বানানের একটি ভাসমান তালিকা দেখায়।
  • বানান শুদ্ধ করার জন্যে অভ্র'র সাথে 'Avro Spell Checker' নামে একটি স্বতন্ত্র প্রোগ্রাম রয়েছে। প্লাগ-ইন এর মাধ্যমে এমএস ওয়ার্ডে বানান যাচাই করা যায়।
  • কীবোর্ডের অনেকগুলো কী সমন্বয় করে ম্যাক্রো তৈরি করে একটি কমান্ড হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
  • "Unicode to Bijoy Text Converter" নামক একটি প্রোগ্রাম দিয়ে ইউনিকোডের বাংলা লেখাকে আনসিতে রূপান্তর করা যায়।
  • "Avro Converter"[৬] নামক একটি প্রোগ্রাম দিয়ে আনসি বাংলা লেখাকে ইউনিকোডে রূপান্তর করা যায়।
  • বাংলা লিপি ব্যবহার করে এমন সকল ভাষার জন্য ব্যবহারযোগ্য।
  • আইকমপ্লেক্স স্ক্রিপ্ট অন্তর্ভুক্ত ফলে, শুধুমাত্র অভ্র ইন্সটল করলেই কম্পিউটারকে বাংলা ভাষার জন্য ব্যবহারযোগ্য করা সম্ভব।

বহনযোগ্য সংস্করণ[সম্পাদনা]

২০০৭ সালে অভ্র কীবোর্ডের বহনযোগ্য সংস্করণ প্রকাশ করা হয়। এতে অভ্র কীবোর্ড পূর্ণ সংস্করণের সমস্ত সুবিধা রয়েছে। এছাড়া কম্পিউটারে অ্যাডমিন অ্যাক্সেস নেই এমন কম্পিউটারে অভ্র কীবোর্ড চলাকালীন অবস্থায় অস্থায়ীভাবে বাংলা ফন্ট ইন্সটল করার জন্য রয়েছে "ভার্চুয়াল বাংলা ফন্ট ইন্সটলার" নামে একটি প্রোগ্রাম। পূর্ণ সংস্করণ থেকে এটি আকারেও অনেক ছোট।

অভ্রতে অন্তর্ভুক্ত বাংলা লেআউট সমূহ[সম্পাদনা]

অভ্রতে সাম্প্রতিকতম সংস্করণে যেসব বাংলা লেআউট পাওয়া যাবে,[৭]

স্বীকৃতি[সম্পাদনা]

  • সফটপিডিয়া তে ১০০% স্পাইওয়্যার/অ্যাডওয়্যার/ভাইরাস মুক্ত সফটওয়্যার বলে স্বীকৃত।[৮]
  • মাইক্রোসফটের অনলাইন সংগ্রহশালায় ইন্ডিক ভাষাসমূহের সমাধানের তালিকায় অভ্র কী-বোর্ডকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।[৯]
  • জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরির কাজে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন অভ্র ব্যবহার করে।[১০][১১]
  • অভ্রকে বাংলা কীবোর্ড রিসোর্স হিসেবে ইউনিকোড সংস্থার ওয়েব সাইটে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে।[১২]
  • বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার এনড ইনফরেমশন সার্ভিস - বেসিস বাংলা তথ্য প্রযুক্তিতে বিশেষ অবদানের জন্য 'বিশেষ অবদান পুরস্কার ২০১১' প্রদান করে। [১৩][১৪][১৫][১৬]

অভ্র-বিজয় বিতর্ক[সম্পাদনা]

বিতর্কের শুরু[সম্পাদনা]

কম্পিউটারে বাংলা লেখার বাণিজ্যিক ক্লোজ সোর্স সফটওয়্যার ‘বিজয়’ এর স্বত্বাধিকারী এবং ‘আনন্দ কম্পিউকার্স’ এর প্রধান নির্বাহী মোস্তাফা জব্বার ৪ঠা এপ্রিল ২০১০ তারিখে দৈনিক জনকন্ঠের একটি নিবন্ধে অভ্রর দিকে ইঙ্গিত করে দাবী করেন যে- হ্যাকাররা তার ‘বিজয়’ সফটওয়্যারটি চুরি করে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিচ্ছে। তিনি অভ্র কীবোর্ডকে পাইরেটেড সফটওয়্যার হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি অভিযোগ করেন যে ইউএনডিপি হ্যাকারদের সহযোগিতা করেছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন যে ইউএনডিপি-র প্ররোচনাতেই জাতীয় তথ্যভান্ডার তৈরির কাজে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন অভ্র কীবোর্ড ব্যবহার করা হয়েছে। মেহেদী হাসান খান জানান যে ক্লোজড সোর্স প্রোগ্রাম হ্যাক করা সম্ভব নয় বিধায় বিজয়ের সিস্টেম হ্যাক করা সম্ভব নয়।[১৭] অপরদিকে, অভ্র'র পক্ষ থেকে মেহদী হাসান খান সকল নালিশ অস্বীকার করেন এবং অভিযোগ করেন যে, জব্বার বিভিন্ন পর্যায়ে ও গণমাধ্যমে তাদেরকে চোর বলেন এবং তাদের প্রতিবাদ সেখানে উপেক্ষিত হয়। কম্পিউটারে বাংলা নিয়ে যারা কাজ করছেন তাদের জন্য উকিল নোটিশ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা দিয়ে আক্রমণের হুমকি উপেক্ষা করে কাজ করা স্বাভাবিক অভিজ্ঞতা। তিনি আরো বলেন যে নির্বাচন কমিশনে জাতীয় পরিচয় পত্র প্রকল্পে বাণিজ্যিক বিজয় এর পরিবর্তে বিনামূল্যের অভ্র ব্যবহার করাতে প্রায় ৫ কোটি টাকা লোকসান হওয়ায় জব্বার এমন অভিযোগ করেছেন। [১৮][১৯]

কপিরাইট অফিসে অভিযোগ[সম্পাদনা]

অভ্র ৪.৫.১ সফটওয়্যারের সাথে ইউনিবিজয় নামে একটি কীবোর্ড লেয়াউট সরবরাহ করা হয়। এই ইউনিবজয় কীবোর্ড লেয়াউট প্যাটেন্টকৃত বিজয় কীবোর্ড লেয়াউটের নকল দাবী করে মোস্তফা জব্বার কপিরাইট অফিসে কপিরাইট আইন ভঙ্গের জন্য মেহেদী হাসান খানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। এর ভিত্তিতে কপিরাইট অফিস খানকে কারণ দর্শাও নোটিশ পাঠায়।[২০] পরবর্তিতে মেহেদী হাসান খানের আবেদনের প্রেক্ষিতে এর সময়সীমা ২৩ মে ২০১০ পর্যন্ত বাড়ানো হয়।[২১]

সমঝোতা[সম্পাদনা]

১৬ জুন ২০১০ তারিখে ঢাকার আগারগাঁও এ অবস্থিত বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল অফিসে অনেক তথ্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞের উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিক বৈঠকে মেহদী হাসান খান ও মোস্তফা জব্বারের মধ্যে একটি সমঝোতা হয় এই মর্মে, ২০ আগস্ট, ২০১০ এর মধ্যে, অভ্র কীবোর্ড সফটওয়্যার থেকে ইউনিবিজয় লেআউট সরিয়ে নেওয়া হবে এবং কপিরাইট অফিস থেকে মেহদী হাসান খানের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত কপিরাইট লংঘনের অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে।[২২] সেই চুক্তি অনুযায়ী, অভ্রর ৪.৫.৩ সংস্করণ থেকে ইউনিবিজয় কীবোর্ড বাদ দেওয়া হয়। তিনি অভ্র কর্তৃপক্ষের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানান।[২৩]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. আহমেদ, কাজী ফাহিম (২০০৬-০৩-১০)। "ইউনিকোড ভিত্তিক অভ্র কি-বোর্ড"। দৈনিক প্রথম আলো 
  2. ওমিক্রন ল্যাব
  3. খান, মেহদী হাসান। "scim-avro: Avro Phonetic for Linux"। Google Code। সংগৃহীত ২০১০-১২-১৬ 
  4. খান, মেহদী হাসান (২০১০-০৯-১০)। "Avro Keyboard 5 (beta) will be released soon"OmicronLab। OmicronLab। সংগৃহীত ২০১০-০৯-১৪ 
  5. খান, মেহদী হাসান (২০১০-০৯-৩০)। "Avro Keyboard 5.0.8 Public Beta 4"OmicronLab। OmicronLab। সংগৃহীত ২০১০-০৯-৩০ 
  6. "Avro Converter"। OmicronLab। সংগৃহীত ২০১০-১২-১৪ 
  7. "Avro Keyboard Standard Edition"। OmicronLab। সংগৃহীত ২০১০-১২-১৬ 
  8. "Avro Keyboard Bangla Software 4.5.1 - 100% Clean"। SoftPedia। সংগৃহীত ২০১০-১২-১৬ 
  9. Chowdhury, Syed Tashfin (২০১০ ফেব্রুয়ারি ২৫)। "ICT turns more Bangla savvy"The Daily Star (Dhaka)। সংগৃহীত ২৭ মে ২০১০ 
  10. "Bangladesh Election Commission using Avro Keyboard"। OmicronLab। সংগৃহীত ২০১০-১২-১৬ 
  11. "An amazing journey from Shahid Lipi to Avro"thedailystar.net। সংগৃহীত ২৮ এপ্রিল ২০১০ 
  12. "Unicode Resources"। The Unicode Consortium। সংগৃহীত ২০১০-১২-১৬ 
  13. "জমকালো অনুষ্ঠানে বাংলা সফটওয়্যারের স্বীকৃতি"। দৈনিক প্রথম আলো। সংগৃহীত ২০১১-০২-০৬ 
  14. "“BASIS Special Contribution Award” পেল অভ্র কিবোর্ড!"। Omicronlab। সংগৃহীত ২০১১-০২-০৬ 
  15. "শেষ হলো বেসিস সফটওয়্যার মেলা"। সমকাল। ২০১১-০২-০৬। সংগৃহীত ২০১১-০২-০৮ 
  16. "সফটএক্সপোতে কর্পোরেট অ্যাওয়ার্ড নাইট অনুষ্ঠিত"। আমার দেশ। ২০১১-০২-০৬। সংগৃহীত ২০১১-০২-০৮ 
  17. জব্বার, মোস্তফা (২০১০-০৪-০৪)। "সাইবার যুদ্ধের যুগে প্রথম পা ॥ একুশ শতক"। দৈনিক জনকন্ঠ। সংগৃহীত ২০১০-১২-১৬ 
  18. খান, মেহদী হাসান (২০১০-০৫-০১)। "প্রতিক্রিয়া-ভাষা উন্মুক্ত হবেই"দৈনিক জনকন্ঠ (ঢাকা)। সংগৃহীত ২০১০-০৫-২৬ 
  19. খান, মেহদী হাসান (২০১০-০৪-২০)। "ভাষা উন্মুক্ত হবেই"। সচলায়তন। সংগৃহীত ২০১০-১২-১৬ 
  20. "কপিরাইট অফিস নোটিশ পাঠালো মেহদী হাসান খানের কাছে"sachalayatan.com। সংগৃহীত ৭ মে ২০১০ 
  21. "কারণ দর্শানোর সময় বাড়াল কাপিরাইট অফিস"Prothom-Alo.com। সংগৃহীত ১০ মে ২০১০ 
  22. "সমঝোতার পথে অভ্র ও বিজয়"Prothom Alo (Dhaka)। ১৭ জুন ২০১০। সংগৃহীত ১৭ জুন ২০১০ 
  23. "অভ্র থেকে ইউনিবিজয় প্রত্যাহার"Prothom Alo (Dhaka)। ২২ আগস্ট ২০১০। সংগৃহীত ২৩ আগস্ট ২০১০ 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]