মোস্তাফা জব্বার

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
মোস্তাফা জব্বার
Mustafa Jabbar in Dhaka (35).jpg
২০১৮ সালে মোস্তাফা জব্বার
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী
দায়িত্বাধীন
অধিকৃত কার্যালয়
৩ জানুয়ারি ২০১৮
ব্যক্তিগত বিবরণ
জন্ম (1949-08-12) ১২ আগস্ট ১৯৪৯ (বয়স ৭০)
নেত্রকোণা, বাংলাদেশ
জাতীয়তাবাংলাদেশী
সন্তান
শিক্ষাএমএ (সাংবাদিকতা)
প্রাক্তন শিক্ষার্থীঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
পেশাপ্রযুক্তি উদ্যোক্তা
ধর্মইসলাম
পুরস্কারবেসিস আজীবন সম্মাননা পুরষ্কার
পিআইবির সোহেল সামাদ পুরষ্কার
বাংলা উইকিপিডিয়ার ১৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সম্মেলনে (২০১৭) মোস্তাফা জব্বারকে উইকিমিডিয়া বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সম্মানসূচক ক্রেস্ট প্রদান করা হচ্ছে।

মোস্তাফা জব্বার (জন্ম: ১২ই আগস্ট, ১৯৪৯) একজন বাংলাদেশি প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও চলমান শেখ হাসিনার চতুর্থ মন্ত্রিসভার ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী।[১] তিনি বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সাবেক সভাপতি। তিনি বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির (বিসিএস) সাবেক সভাপতি।[২] তার প্রতিষ্ঠানের বিজয় বাংলা কিবোর্ড ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত হয় যা ইউনিকোড ভিত্তিক অভ্র কী-বোর্ড আসার পূর্বপর্যন্ত বহুল ব্যবহৃত হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি ও সাধারণ বিষয়ের ওপর অনেকগুলো বইয়ের লেখক তিনি। তথ্যপ্রযুক্তি জগতে বাংলা ভাষা জনপ্রিয়করণে জব্বার একজন পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচিত হন।[৩]

পরিবার[সম্পাদনা]

মোস্তাফা জব্বারের পৈতৃক নিবাস নেত্রকোনা জেলাখালিয়াজুড়ি উপজেলার কৃষ্ণপুর গ্রামে। ১৯৪৯ সালের ১২ আগষ্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আশুগঞ্জ উপজেলার চর চারতলা গ্রামের নানার বাড়ীতে তার জন্ম। মোস্তাফা জব্বারের বাবা আব্দুল জব্বার তালুকদার পাটের ব্যবসায়ী ও সম্পন্ন কৃষক ছিলেন। তার দাদা আলিমুদ্দিন মুন্সি ছিলেন বিশাল ভূ সম্পত্তির মালিক যার উপাধি ছিলো তালুকদার। তার মা রাবেয়া খাতুন সমগ্র জীবন গৃহিনী হিসেবেই জীবন যাপন করেছেন। [৪]

শিক্ষাজীবন[সম্পাদনা]

১৯৬০ সালে প্রাথমিক পড়াশোনা শেষ করে তৎকালীন সিলেট জেলার (বর্তমান হবিগঞ্জ জেলার আজমিরীগঞ্জ উপজেলার অধীনস্থ) আজমিরীগঞ্জ এমালগামেটেড বীরচরণ(এ.বি.সি.) সরকারী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়,বিরাট নামক একটি উচ্চবিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে ১৯৬৬ সালে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে হবিগঞ্জ কেন্দ্র থেকে মানবিক শাখায় মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা দিয়ে দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করেন এবং মানবিক শাখায় উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ঢাকা কলেজে পড়াশোনা করেন। ১৯৬৮ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৭২ সালে তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে স্নাতক সম্মান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এই পরীক্ষাটি ১৯৭১ সালে হবার কথা ছিলো তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি পরীক্ষা হলেও মুক্তিযুদ্ধের কারণে পরে সেটি বাতিল হয়ে যায়। এরপর তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭২ সালের পরীক্ষা ১৯৭৪ সালে সম্পন্ন করে দ্বিতীয় শ্রেণীতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করেন।[৫]

মুক্তিযুদ্ধ[সম্পাদনা]

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালে মোস্তাফা জব্বার একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি মুজিব বাহিনীর খালিয়াজুরি থানার সহ অধিনায়ক ছিলেন। তার বাড়ীর পাশের সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার ১৬১ জন রাজাকার যুদ্ধোত্তরকালে তার কাছে আত্মসমর্পণ করে যার মধ্যে ১০৮ জনকে মুক্তিযোদ্ধারা হত্যা করে।[৫]

কর্মজীবন[সম্পাদনা]

ছাত্র থাকাকালেই মোস্তাফা জব্বারের কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৭২ সালের ১৬ জানুয়ারি সাংবাদিকতার মধ্য দিয়ে। সেই সময়ে তিনি সাপ্তাহিক গণকণ্ঠ পত্রিকায় রিপোর্টার হিসেবে কাজে যোগ দেন। ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ পত্রিকাটি দৈনিকে পরিণত হয়। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত গণকণ্ঠ পত্রিকাটি নিয়মিত প্রকাশিত হতো এবং সেই সময়ে প্রকাশিত পত্রিকাটির শেষ সংখ্যা পর্যন্ত তিনি তাতে কর্মরত ছিলেন। ১৯৭৩ সালে তিনি ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক নির্বাচিত হন। গণকণ্ঠ বন্ধ হয়ে যাবার পর তিনি ট্রাভেল এজেন্সি, মুদ্রণালয়, সংবাদপত্র ইত্যাদি ব্যবসায় যুক্ত হন। তিনি ট্রাভেল এজেন্টদের সংগঠন আটাব (এসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশ)- এর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তিনি ১৯৮৭ সালের ২৮শে এপ্রিল ব্যবসায় প্রবেশ করেন। সেই বছরের ১৬ মে তিনি কম্পিউটারে কম্পোজ করা বাংলা সাপ্তাহিক পত্রিকা আনন্দপত্র প্রকাশ করেন। ১৯৮৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর তিনি প্রকাশ করেন বিজয় বাংলা কীবোর্ড ও সফটওয়্যার। সেটি প্রথমে মেকিন্টোস কম্পিউটারের জন্য প্রণয়ন করেন। পরে ১৯৯৩ সালের ২৬ মার্চ তিনি উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমের জন্যও বিজয় বাংলা কীবোর্ড ও সফটওয়্যার প্রকাশ করেন। তিনি আনন্দ প্রিন্টার্স এবং আনন্দ মুদ্রায়ণের প্রতিষ্ঠাতা। [৫] তিনি ইতিপূর্বে বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির নির্বাহী পরিষদের সদস্য, কোষাধ্যক্ষ ও সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার এন্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস ( বেসিস ) এর প্রতিষ্ঠাতা সহ-সভাপতি ও পরিচালক এবং বাংলাদেশ কম্পিউটার ক্লাবের সভাপতি ছিলেন। ২০০৮-০৯ সময়কালে তিনি দ্বিতীয় বারের মতো বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ২০১০-১১ সালে তিনি তৃতীয় বারের মতো বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১২-মে-১৩ সময়কালে তিনি এই সমিতির পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১ জুন ২০১৩ থেকে ৩১ মার্চ ২০১৪ পর্যন্ত তিনি আবার চতুর্থবারের মতো বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে (২০১৪-১৫-১৬) তিনি বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির উপদেষ্টা। তিনি প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন ডিজিটাল বাংলাদেশ টাস্কফোর্সসহ বিভিন্ন সংস্থায় যুক্ত আছেন। তিনি ২০১৪-১৫-১৬ সময়কালে বৃহত্তর ময়মনসিংহ সাংস্কৃতিক ফোরামের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি নেত্রকোণা জেলা সমিতির উপদেষ্টা। তিনি নেত্রকোণা যুব সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।[৬] দেশে কম্পিউটারের শুল্ক ও ভ্যাট মুক্ত আন্দোলন ও শিক্ষায় কম্পিউটার প্রচলনের জন্য মোস্তাফা জব্বার এখন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক অনেক কমিটির সদস্য। তিনি কপিরাইট বোর্ড এবং বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক অথরিটির সদস্য। ২০০৭ সালের ২৬ মার্চ তিনি ডিজিটাল বাংলাদেশ ধারণা সম্পর্কে প্রথম নিবন্ধ লেখেন এবং তার দ্বারাই ২০০৮ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার লিপিবদ্ধ হয়।

বাংলা ভাষা চর্চায় অবদান[সম্পাদনা]

বাংলায় কম্পিউটার ব্যবহার জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে মোস্তাফা জব্বারের ভূমিকা ঐতিহাসিক।[৩][৭] কম্পিউটারে বাংলা ব্যবহার, হরফের উৎকর্ষশৈলী, প্রকাশনা শিল্পের যুগোপযোগী আধুনিকীকরণ, কম্পিউটার উপকরণের যুতসই ব্যবহারের প্রণোদনা দানে মোস্তাফা জব্বারের সুদীর্ঘ কর্মজীবনের অবদানের সঙ্গে বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি আন্দোলনের ও ব্যবহারে জনসম্পৃক্তির মৌলিক আলোচনার এক গভীর যোগসূত্র আছে।[৩] বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সরকারি ও বেসরকারি দাপ্তরিক কাজে ইংরেজি ব্যবহারের তীব্র সমালোচক জব্বার।[৮] ইংরেজি হরফে বাংলা লেখারও সমালোচনা করেন তিনি।[৯] বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাংলা ভাষায় জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা তথা গবেষণাপত্র প্রকাশের গুরুত্বারোপ করেন তিনি।[৯] জব্বারের মতে, উচ্চ আদালতে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলার ব্যবহার প্রতিষ্ঠিত না হলে বাংলার বিজয় সম্পন্ন হবে না এবং একুশের চেতনা রক্ষা করা যাবে না।[৯][১০][১১][১২]

বাংলা ভাষা প্রচলন আইন, ১৯৮৭-এর বাস্তবায়নে পদক্ষেপ[সম্পাদনা]

  • সরকারি-বেসরকারি কোন প্রতিষ্ঠানে বাংলা ছাড়া অন্য কোন ভাষা ব্যবহার করা যাবে না।[১৩][১৪]
  • সকল প্রকার সাইনবোর্ড, ব্যানার, পোস্টার বাংলা ভাষায় হবে। ঐচ্ছিক বিদেশি ভাষা বাংলার পরে থাকতে পারে ছোট হরফে।
  • বিশেষ প্রয়োজন ব্যতীত কোথাও বাংলা হরফ ছাড়া অন্য কোন হরফে বাংলা লেখা যাবে না।
  • উচ্চশিক্ষাসহ শিক্ষার সব স্তরে শিক্ষার বাহন হিসেবে বাংলা অবশ্যই ব্যবহার করতে হবে। বিভিন্ন বিদেশি ভাষায় কোর্স থাকতে পারবে কিন্তু অন্যান্য বিষয়ের মাধ্যম হবে বাংলা।
  • বাংলাদেশের সব দূতাবাসে বিদেশিদের বাংলা শেখার জন্য প্রশিক্ষণকেন্দ্র খুলতে হবে।
  • ডিজিটাল যন্ত্রে ও ডিজিটাল রূপান্তরের নামে বাংলার বদলে অন্য কোন ভাষা ব্যবহার করা যাবে না।
  • সব বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগ খুলতে হবে। বস্তুত বাংলা বিভাগ ছাড়া কোন বিশ্ববিদ্যালয় থাকা উচিত নয়।
  • বাংলা লেখার সময় ইংরেজি হরফকে বাংলায় রূপান্তর করার পদ্ধতি নিষিদ্ধ করতে হবে এবং বাংলা ভাষার জন্য সরকারের প্রমিত মান সম্পূর্ণভাবে মেনে চলতে হবে।
  • উচ্চ আদালতের রায় তথা অন্যান্য কার্যক্রম বাংলায় লিখতে হবে।
  • বাংলাদেশে পরিচালিত আন্তর্জাতিক কার্যক্রমে বিদেশি দলিলের অনুবাদকৃত বাংলা সংস্করণ থাকতে হবে।
  • অবিলম্বে বিশিষ্ট বাংলা ভাষাবিদদের নিয়ে জাতীয় ভাষানীতি প্রণয়ন করতে হবে।[১৩][১৪]

বাংলায় কম্পিউটার বিজ্ঞান চর্চা[সম্পাদনা]

বাংলা ভাষায় তিনি কম্পিউটার বিষয়ে অনেকগুলো বই লিখেছেন এবং তিনি নবম ও দশম শ্রেণীর কম্পিউটার বিষয়ক পাঠ্যপুস্তক মাধ্যমিক কম্পিউটার শিক্ষা বইটির লেখক। উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের “তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি” বই-এর লেখক তিনি। এছাড়াও উচ্চ মাধ্যমিক কম্পিউটার শিক্ষা, প্রাথমিক কম্পিউটার শিক্ষা, মাল্টিমিডিয়া ও অন্যান্য প্রসঙ্গ ছাড়াও তার লেখা কম্পিউটারে প্রকাশনা, মাইক্রোসফট ওয়ার্ড, মাইক্রোসফট এক্সেল ও তার সম্পাদিত কম্পিউটার অভিধান বিষয়ক বই ও রয়েছে। তার প্রথম উপন্যাস নক্ষত্রের অঙ্গার ২০০৫ সালে প্রকাশিত হয়েছে। সুবর্ণে শেকড় নামে আরেকটি উপন্যাস তিনি লিখছেন। এছাড়াও কম্পিউটার কথকতা, ডিজিটাল বাংলা, একুশ শতকের বাংলা, বাঙ্গালী ও বাংলাদেশ, ডিজিটাল বাংলাদেশ এবং একাত্তর ও আমার যুদ্ধ তার লেখা বইগুলোর অন্যতম। বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘ব্যবসায় তথ্যপ্রযুক্তি’, ‘কম্পিউটার’ ও ডিজিটাল বাংলাদেশ টক শো-এর মাধ্যমে এবং এটিএন বাংলার ‘কম্পিউটার প্রযুক্তি’ এবং চ্যানেল আই এর ‘একুশ শতক’ অনুষ্ঠানের সহায়তায় ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমেও তিনি কম্পিউটারকে সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় করে তুলেন।[৫]

রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড[সম্পাদনা]

মোস্তফা জব্বার বাংলা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী। ছাত্রজীবনে মোস্তাফা জব্বার রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধ, সাহিত্য চর্চা, সাংবাদিকতা, নাট্য আন্দোলনের সাথে ব্যাপকভাবে জড়িত ছিলেন। ১৯৭১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি তার লেখা বাংলাদেশের প্রথম গণনাট্য ‘এক নদী রক্ত’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রশিক্ষক কেন্দ্রে মঞ্চস্থ হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠকালে তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার অন্যতম নেতা ছিলেন। ১৯৭৩ সালে তিনি ছাত্রলীগের পক্ষে নির্বাচন করে সূর্যসেন হলের নাট্য ও প্রমোদ সম্পাদক নির্বাচিত হন। স্বাধীনতার আগে তিনি সাপ্তাহিক জনতা পত্রিকায় লেখালেখির সাথে যুক্ত ছিলেন।[৫]

সামাজিক কর্মকান্ড[সম্পাদনা]

মোস্তাফা জব্বার তার নিজ গ্রামে বাবা প্রতিষ্ঠিত হাইস্কুলের সম্প্রসারণ করেছেন, বাবা-মার নামে বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং গ্রামের হাজী আলী আকবর পাবলিক ডিগ্রী কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে কম্পিউটার শিক্ষা কেন্দ্র স্থাপন ও কম্পিউটার স্বাক্ষরতা প্রসারে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করে চলেছেন। দেশজুড়ে মাল্টিমিডিয়া প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা ছাড়াও তিনি বিজয় ডিজিটাল স্কুল এবং আনন্দ মাল্টিমিডিয়া স্কুলের সাহায্যে শিক্ষাব্যবস্থার নতুন পদ্ধতি প্রবর্তন করেছেন।

পুরষ্কার[সম্পাদনা]

তথ্যপ্রযুক্তিতে বিশেষ অবদান রাখা এবং বিজয় বাংলা কীবোর্ড তৈরীর জন্য দৈনিক উত্তরবাংলা পুরষ্কার, পিআইবির সোহেল সামাদ পুরষ্কার, সিটিআইটি আজীবন সম্মাননা ও আইটি এ্যাওয়ার্ড, বেসিস আজীবন সম্মাননা পুরষ্কার, বেস্টওয়ে ভাষা-সংস্কৃতি পুরষ্কার, বৃহত্তর ময়মনসিংহ সমন্বয় পরিষদ সম্মাননা, বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটি ও সিলেট শাখার সম্মাননা বিশ্বমেধাসম্পদ সংস্থার আবিষ্কারক-উদ্যোক্তার স্বীকৃতি এবং অর্থনৈতিক ও মানবিক উন্নয়ন সংস্থার নেত্রকোণার গুনীজন সম্মাননা (প্রযুক্তিবিদ হিসেবে)[১৫][১৬][১৭] এবং এসোসিও ৩০ বছর পূর্তি সম্মাননাসহ ২০টি পুরষ্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। এছাড়াও তার রয়েছে অসংখ্য শুভেচ্ছা সম্মাননা।[৫][১৮]

অভ্র-বিজয় বিতর্ক[সম্পাদনা]

কম্পিউটারে বাংলা লেখার বাণিজ্যিক অন্মুক্ত উৎসের সফটওয়্যার ‘বিজয়’-এর স্বত্বাধিকারী এবং ‘আনন্দ কম্পিউটার্স’-এর প্রধান নির্বাহী মোস্তাফা জব্বার ৪ এপ্রিল ২০১০ তারিখে দৈনিক জনকন্ঠের একটি নিবন্ধে অভ্রর দিকে ইঙ্গিত করে দাবী করেন যে- হ্যাকাররা তার ‘বিজয়’ সফটওয়্যারটি চুরি করে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিচ্ছে। তিনি অভ্র কীবোর্ডকে পাইরেটেড সফটওয়্যার হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি অভিযোগ করেন যে ইউএনডিপি হ্যাকারদের সহযোগিতা করেছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন যে ইউএনডিপি-র প্ররোচনাতেই জাতীয় তথ্যভান্ডার তৈরির কাজে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন অভ্র কীবোর্ড ব্যবহার করা হয়েছে। মেহেদী হাসান খান জানান যে অন্মুক্ত উৎসের প্রোগ্রাম হ্যাক করা সম্ভব নয় বিধায় বিজয়ের সিস্টেম হ্যাক করা সম্ভব নয়।[১৯] অপরদিকে, অভ্র'র পক্ষ থেকে মেহদী হাসান খান সকল নালিশ অস্বীকার করেন এবং অভিযোগ করেন যে, জব্বার বিভিন্ন পর্যায়ে ও গণমাধ্যমে তাদেরকে চোর বলেন এবং তাদের প্রতিবাদ সেখানে উপেক্ষিত হয়। কম্পিউটারে বাংলা নিয়ে যারা কাজ করছেন তাদের জন্য উকিল নোটিশ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা দিয়ে আক্রমণের হুমকি উপেক্ষা করে কাজ করা স্বাভাবিক অভিজ্ঞতা। তিনি আরো বলেন যে নির্বাচন কমিশনে জাতীয় পরিচয় পত্র প্রকল্পে বাণিজ্যিক বিজয় এর পরিবর্তে বিনামূল্যের অভ্র ব্যবহার করাতে প্রায় ৫ কোটি টাকা লোকসান হওয়ায় জব্বার এমন অভিযোগ করেছেন। [২০]

অভ্র ৪.৫.১ সফটওয়্যারের সাথে ইউনিবিজয় নামে একটি কীবোর্ড লেয়াউট সরবরাহ করা হয়। এই ইউনিবজয় কীবোর্ড লেয়াউট প্যাটেন্টকৃত বিজয় কীবোর্ড লেয়াউটের নকল দাবী করে মোস্তফা জব্বার কপিরাইট অফিসে কপিরাইট আইন ভঙ্গের জন্য মেহেদী হাসান খানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। এর ভিত্তিতে কপিরাইট অফিস খানকে কারণ দর্শাও নোটিশ পাঠায়। পরবর্তিতে মেহেদী হাসান খানের আবেদনের প্রেক্ষিতে এর সময়সীমা ২৩ মে ২০১০ পর্যন্ত বাড়ানো হয়।[২১]

১৬ জুন ২০১০ তারিখে ঢাকার আগারগাঁও এ অবস্থিত বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল অফিসে অনেক তথ্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞের উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিক বৈঠকে মেহদী হাসান খান ও মোস্তফা জব্বারের মধ্যে একটি সমঝোতা হয় এই মর্মে, ২০ আগস্ট, ২০১০ এর মধ্যে, অভ্র কীবোর্ড সফটওয়্যার থেকে ইউনিবিজয় লেআউট সরিয়ে নেওয়া হবে এবং কপিরাইট অফিস থেকে মেহদী হাসান খানের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত কপিরাইট লংঘনের অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে।[২২] সেই চুক্তি অনুযায়ী, অভ্রর ৪.৫.৩ সংস্করণ থেকে ইউনিবিজয় কীবোর্ড বাদ দেওয়া হয়। তিনি অভ্র কর্তৃপক্ষের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানান।[২৩]

বিজয়-রিদ্মিক বিতর্ক[সম্পাদনা]

২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ১৯ তারিখে গুগল প্লে স্টোরে উন্মুক্ত করা হয় বিজয় বাংলা সফটওয়্যারের অ্যান্ড্রয়েড সংস্করণ। এরপর এই অ্যাপটি নিয়ে তার ফেসবুক দেয়ালে একটি স্ট্যাটাস দেন মোস্তাফা জব্বার। সেই স্ট্যাটাসে এই জাতীয় অ্যাপগুলোর বিরুদ্ধে বিজয় বাংলা কি-বোর্ড লেআউট অবৈধভাবে ব্যবহারের অভিযোগ করেন।[২৪]

পরবর্তীতে গুগলের পক্ষ থেকে রিদ্মিক এবং ইউনিবিজয় কীবোর্ডের ডেভেলপারের কাছে পৃথকভাবে ইমেইল নোটিশ পাঠানো হয়। সেখানে বলা হয়, মোস্তাফা জব্বার অ্যাপ দুটির বিরুদ্ধে কপিরাইট লঙ্ঘনের অভিযোগ জানিয়েছেন গুগলের কাছে। আর এই অভিযোগের প্রেক্ষিতেই গুগল যুক্তরাষ্ট্রের DMCA আইন অনুসারে অ্যাপ দুটি অপসারণ করেছে।[২৪]

পরে নতুন লে আউট করে প্লেস্টোরে আবারও রিদ্মিক কিবোর্ড প্রকাশ করা হয়। [২৫]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "৮ মন্ত্রীর দফতর পুনর্বণ্টন"বাংলা ট্রিবিউন। সংগ্রহের তারিখ ২০১৮-০১-০৩ 
  2. http://www.bcs.org.bd/ec_members.htm
  3. সেলিম, রেজা। "কম্পিউটারে ও মাতৃভাষায় মোস্তাফা জব্বার (উপ-সম্পাদকীয়)"জনকন্ঠ। ২০১৯-০৩-২৫ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০৩-২৫ 
  4. "মোস্তফা জব্বারের মায়ের সংগ্রামী জীবনের গল্প"MTnews24। সংগ্রহের তারিখ ২৫ জুলাই ২০১৫ 
  5. "Bijoy Ekushe"www.bijoyekushe.net 
  6. "সংরক্ষণাগারভুক্ত অনুলিপি"। ৭ অক্টোবর ২০১৫ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৫ জুলাই ২০১৫ 
  7. "মোস্তাফা জব্বারের সামনে ৩ চ্যালেঞ্জ"যুগান্তর। ২০১৯-০৩-২৫ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০৩-২৫ 
  8. জব্বার, মোস্তাফা। "বাংলার চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা || ১ম পর্ব"জনকন্ঠ। ২০১৯-০৩-২৫ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০৩-২৫ 
  9. জব্বার, মোস্তাফা। "বাংলার চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা ।। ২য় পর্ব"জনকন্ঠ। ২০১৯-০৩-২৫ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০৩-২৫ 
  10. জব্বার, মোস্তাফা। "বাংলার চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা || ৩য় পর্ব"জনকন্ঠ (ইংরেজি ভাষায়)। ২০১৯-০৩-২৫ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০৩-২৫ 
  11. জব্বার, মোস্তাফা। "রাষ্ট্রভাষার জন্য সত্তর বছরের লড়াই"দৈনিক ভোরের কাগজ। ২০১৯-০২-১৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০৩-২৬ 
  12. জব্বার, মোস্তাফা। "মুজিব ॥ ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্রের পিতা"জনকন্ঠ। ২০১৯-০৩-২৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০৩-২৬ 
  13. "রাষ্ট্রভাষার প্রয়োগ হচ্ছে না"দৈনিক ভোরের কাগজ। ২০১৯-০৩-০২। ২০১৯-০৩-০৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০৩-২৬ 
  14. "উপ সম্পাদকীয়: রাষ্ট্রভাষার প্রয়োগ হচ্ছে না"দৈনিক সংবাদ। ২০১৯-০৩-২৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০৩-২৬ 
  15. "13th Universal Sufi Fest held"Staff Correspondent (Engllish ভাষায়)। Dhaka। The Daily Observer। পৃষ্ঠা 11। 
  16. "রাহে ভান্ডারের ১৩ তম মহাত্মা সম্মেলনে বক্তারা"। Daily Azadi। ২০১৭-০৫-১০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১৬-০৩-২৭ 
  17. "সম্মাননা"। Daily Prothom Alo। ২০১৭-০৫-১০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২২ মার্চ ২০১৬ 
  18. "অ্যাসোসিও সম্মাননায় মোস্তফা জব্বার"dailypresswatch.com। সংগ্রহের তারিখ ২৫ জুলাই ২০১৫ 
  19. জব্বার, মোস্তফা (২০১০-০৪-০৪)। "সাইবার যুদ্ধের যুগে প্রথম পা ॥ একুশ শতক"। দৈনিক জনকন্ঠ। সংগ্রহের তারিখ ২০১০-১২-১৬ 
  20. খান, মেহদী হাসান (২০১০-০৫-০১)। "প্রতিক্রিয়া-ভাষা উন্মুক্ত হবেই"দৈনিক জনকন্ঠ। ঢাকা। সংগ্রহের তারিখ ২০১০-০৫-২৬ 
  21. "কারণ দর্শানোর সময় বাড়াল কাপিরাইট অফিস"Prothom-Alo.com। সংগ্রহের তারিখ ১০ মে ২০১০ 
  22. "সমঝোতার পথে অভ্র ও বিজয়"প্রথম আলো। ঢাকা। ১৭ জুন ২০১০। সংগ্রহের তারিখ ১৭ জুন ২০১০ 
  23. "অভ্র থেকে ইউনিবিজয় প্রত্যাহার"প্রথম আলো। ঢাকা। ২২ আগস্ট ২০১০। সংগ্রহের তারিখ ২৩ আগস্ট ২০১০ 
  24. "প্লে স্টোর থেকে রিদ্মিক এবং ইউনিবিজয় কীবোর্ড অপসারণ করলো গুগল"প্রিয়। সংগ্রহের তারিখ ২৫ জুলাই ২০১৫ 
  25. junnu rain। "নতুন রুপে আবারও রিদ্মিক কিবোর্ড"ড্রয়েড বিডি। ২১ জুলাই ২০১৫ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৫ জুলাই ২০১৫