স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র একটি অস্থায়ী বেতার সম্প্রচার কেন্দ্র যা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকালে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ৬ ডিসেম্বর ভারত বাংলাদেশকে সার্বভৌম স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেবার পর এর নাম বদলে বাংলাদেশ বেতার করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ২২ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশে ঢাকা থেকে সম্প্রচার শুরু করে বাংলাদেশ বেতার যা এতকাল রেডিও পাকিস্তানের ঢাকা কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল।। মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধা ও দেশবাসীর মনোবলকে উদ্দীপ্ত করতে "স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র" অবিস্মরণীয় ভূমিকা রেখেছিল। যুদ্ধের সময়ে প্রতিদিন মানুষ অধীর আগ্রহে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান শোনার জন্য অপেক্ষা করত। “জয় বাংলা, বাংলার জয়” গানটি এ বেতার কেন্দ্রের সূচনা সঙ্গীত হিসাবে প্রচারিত হতো। [১]

প্রতিষ্ঠা[সম্পাদনা]

১৯৭১ এর ২৫ মার্চ মধ্য রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে ঢাকা শহরের কয়েক হাজার নিরস্ত্র বাঙালি নিধন করে এবং একই সাথে শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের পূর্বে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা এবং একটি সংক্ষিপ্ত বার্তা প্রদান করে যান। বার্তাটি ঢাকা ইপিআর ওয়ারলেস স্টেশান থেকে সিলিমপুর ওয়ারলেস স্টেশানের ইঞ্জিনিয়ার গোলাম রব্বানী ডাকুয়ার হাত দিয়ে চট্টগ্রামে পৌঁছে ২৫ শে মার্চ মধ্যরাতেই। তার পরেই পাকিস্তানীরা ইপিআর ওয়ারলেস ধ্বংস করে দেয়। বিস্তারিত বিবরণ লেখা আছে সাহিত্যিক মাহবুব উল আলমের "বাঙ্গালীর মুক্তিযুদ্ধের ইতিবৃত্ত" বইটিতে। ভোর হবার আগেই বার্তাটির শত শত কপি তৈরী হয়ে যায় একটা সাইক্লোষ্টাইল মেশিনের সাহায্যে। চট্টগ্রামের অনেক জায়গায় মধ্য রাত থেকেই মাইকে বার্তাটি প্রচার করা হয়। এরই প্রেক্ষিতে ২৬ মার্চ দুপুর বেলা চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নান চট্টগ্রামের কালুরঘাট ট্রান্সমিশান কেন্দ্র হতে প্রথমবারের মত স্বাধীনতার ঘোষণা হিসেবে বঙ্গবন্ধুর ঐ বার্তা পাঠ করেন।[৫]

এর মধ্যেই বেলাল মোহাম্মদ এবং আবুল কাশেম সন্দীপসহ তৎকালীন চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রের কয়েকজন বেতারকর্মী সিদ্ধান্ত নেন যে বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনগণকে সচেতন ও উদ্বুদ্ধ করতে তারা বেতারের মাধ্যমে কিছু প্রচার করবেন। এ সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে তারা চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রকে কাজে লাগানোর চিন্তা করেন এবং তার নতুন নাম দেন স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র। তবে তারাও নিরাপত্তার কারণে আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকায় অবস্থিত চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রকে কাজে না-লাগিয়ে শহর থেকে কিছু দূরে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে চলে যান এবং ২৬ মার্চ সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে প্রথম প্রচার করেন স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র থেকে বলছি। সে সময়েই এম এ হান্নান বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাটি আবার পাঠ করেন। প্রায় ১ ঘণ্টা অনুষ্ঠান করার পর তারা পরদিন সকাল ৭টায় পরবর্তী অনুষ্ঠান প্রচারের ঘোষণা দিয়ে সেদিনের পর্ব শেষ করেন।[৬]

এরপর তারা ২৭ মার্চ সকালে বেতার কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য পাহারা বসানোর উদ্দেশ্যে পটিয়ায় অবস্থানরত মেজর জিয়ার কাছে এ ব্যাপারে সাহায্য চাইতে যান। সেখান থেকে তারা জিয়াউর রহমানকে সাথে করে কালুরঘাট ফেরত আসেন। সেদিন অর্থাৎ ২৭ মার্চ রাত ৮টায় এক নতুন লিখিত ও সম্প্রসারিত বক্তব্যের মাধ্যমে হঠাৎ এক সিদ্ধান্তে মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।[৭][৮] এর পরদিন ২৮ মার্চ মেজর জিয়ার অনুরোধে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র এই নাম হতে বিপ্লবী অংশটি বাদ দেয়া হয় এবং নতুন নামকরণ করা হয় 'স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র'। ২৮ মার্চ প্রথম অধিবেশনে বিমান হামলায় করণীয় সম্পর্কে নির্দেশমালা প্রচারিত হয় এবং দ্বিতীয় অধিবেশনে প্রথম একটি কথিকা পাঠ করা হয়। ৩০ মার্চ প্রভাতী অধিবেশনে প্রথম বারের মত জয় বাংলা, বাংলার জয় গানটি প্রচারিত হয়। ৩০ মার্চ দুপুরের অধিবেশন শেষ হবার পর প্রায় ২টা ১০ মিনিটের দিকে বেতার কেন্দ্রে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী বিমান হামলা করে যার ফলে এ বেতার কেন্দ্রটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।[৯] এ বিমান হামলায় কেউ হতাহত না হলেও বেতার কেন্দ্র এবং সম্প্রচার যন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে সেখান থেকে সম্প্রচার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ে।[৫] প্রতিষ্ঠাতা দশজন সদস্য দুটি দলে বিভক্ত হয়ে আগরতলাত্রিপুরার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েন।

৩১ মার্চ সকালে কয়েকজন বেতারকর্মী বেতার কেন্দ্রে অবস্থিত একটি এক কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ছোট সম্প্রচার যন্ত্র উদ্ধার করেন। এই সম্প্রচার যন্ত্র সাথে করে নিয়ে তারা ঐদিনই পটিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দেন এবং ১ এপ্রিল পটিয়ায় পৌঁছেন। এরপর মূল দলটি ৩ এপ্রিল সম্প্রচার যন্ত্রটি পটিয়ায় রেখে তারা রামগড়ের দিকে রওনা হয়। রামগড়ে পৌঁছে তারা ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স তত্ত্বাবধানে ভারতীয় সীমান্তে অবস্থিত ভারত প্রদত্ত একটি শর্ট ওয়েভ (২০০ ওয়াট শর্টওয়েভ) ট্রান্সমিটার থেকে আবার অনুষ্ঠান সম্প্রচার করেন।[১০] তারপর ৪ এপ্রিল তাদের একটি দল এক কিলোওয়াট সম্প্রচার যন্ত্রটি আনার জন্য পটিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দেন এবং অপর দল বাগফায় চলে যান। তারা বাগফা হতে ৪-৮ এপ্রিল পর্যন্ত একটি ৪০০ ওয়াট সম্প্রচার যন্ত্র দিয়ে সম্প্রচার চালাতে থাকেন। এরপর ৮ এপ্রিল আবার তারা আগরতলার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন এবং বিভিন্ন স্থান হয়ে ১১ এপ্রিল আগরতলায় পৌঁছান।[৬] অন্যদিকে দ্বিতীয় দলটি তখন ১ কিলোওয়াট ট্রান্সমিটারটি নিয়ে ১০ এপ্রিলে বাগফা-বেলোনিয়া সড়কের পাশে বাংলাদেশ সীমান্ত হতে ১০ মাইল দূরে স্থাপন করেন এবং ১২ এপ্রিল তারা সেখান থেকে অনুষ্ঠানও সম্প্রচার করেছিলেন।[৬] এ সময় অনুষ্ঠান রেকর্ড করে সম্প্রচার কেন্দ্র থেকে শর্ট ওয়েভে প্রচার করা হতো।[১১]

এর মধ্যে ১০ এপ্রিল অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয় এবং প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ১১ এপ্রিল অল ইন্ডিয়া রেডিও'র শিলিগুড়ি কেন্দ্রকে "স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র" হিসাবে উল্লেখ করে সেখান থেকে ভাষণ প্রদান করেন এবং এরপরেও বেশ কিছুদিন ঐ কেন্দ্র হতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ভাষণসহ আরো নানাবিধ অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়।[৬]

এরপর ১৬ এপ্রিল জনগণের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নির্দেশিত ঘোষণা ও আদেশপত্র পাঠ করা হয়। এরপর সেখানে কয়েকদিন অনিয়মিতভাবে সম্প্রচার চলেছে।

আনুষ্ঠানিক যাত্রা[সম্পাদনা]

১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠনের পর মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশ সরকার ও বেতারকেন্দ্রের কর্মীদের আবেদনের প্রেক্ষিতে ভারত সরকার বাংলাদেশ সরকারকে একটি শক্তিশালী ট্রান্সমিটার (৫০ কিলোওয়াট মিডিয়াম ওয়েভ) প্রদান করে। এসময় সকল বেতারকর্মীদের ধীরে ধীরে মুজিবনগরে নিয়ে আসা হতে থাকে। ঢাকা থেকেও ঢাকা বেতারের শিল্পী-কুশলীরাও আসতে থাকেন। প্রথম অধিবেশনের দিন ধার্য করা হয় কবি নজরুল ইসলামের জন্মবার্ষিকী ১১ জ্যৈষ্ঠ তথা ২৫ মে তারিখ।[১২] কলকাতার বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের ৫৭/৮নং দোতলা বাড়িটিতে রাষ্ট্রপতি ও অন্যান্য মন্ত্রীদের আবাসের কক্ষের সাথের একটি কক্ষে উক্ত ট্রান্সমিটার দিয়ে সম্প্রচার শুরু হয়েছিল। রাষ্ট্রপতি ও মন্ত্রীরা অন্য বাড়িতে উঠে যাওয়ার পর সেই ৫৭/৮ নম্বর বাড়িটিই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের স্থায়ী কার্যালয়রূপে গড়ে ওঠে। এরপর থেকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান নিয়মিতভাবে সম্প্রচারিত হতে থাকে।[৬] এই কেন্দ্র দুটি ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে পরিচালিত হতো।[১৩]

বেতার কেন্দ্রের প্রশাসনিক গঠন[সম্পাদনা]

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রতিটি কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন অসংখ্য নিয়মিত ও অনিয়মিত শিল্পী এবং কলাকুশলী। এখানে তাদের একটি তালিকা দেয়া হলো[১৪]

বিভিন্ন পদে নিয়োজিত কর্মকর্তা ও কুশলীগণঃ

অনুষ্ঠান বিভাগীয়
নং ব্যক্তির নাম পদের নাম
শামসুল হুদা চৌধুরী সিনিয়ার প্রোগ্রাম অর্গানাইজার
আশফাকুর রহমান খান প্রোগ্রাম অর্গানাইজার
মেজবাহ উদ্দীন আহমদ
বেলাল মোহাম্মদ
টি এইচ শিকদার প্রোগ্রাম প্রডিউসার
তাহের সুলতান
মুস্তফা আনোয়ার
আব্দুল্লাহ আল ফারুক
মাহমুদ ফারুক
১০ আশরাফুল আলম প্রোগ্রাম প্রডিউসার(চুক্তিবদ্ধ)
১১ আলী যাকের ইংলিশ প্রোগ্রাম প্রডিউসার
১২ নজরুল ইসলাম অনু প্রোগ্রাম প্রডিউসার(জয়বাংলা পত্রিকায় কর্মরত)
১৩ কাজী হাবিব উদ্দীন আহমদ সাব এডিটার(সঙ্গীত বিভাগ)
১৪ শহীদুল ইসলাম নিউজ রিডার, এনাউন্সার
১৫ আলী রেজা চৌধুরী
১৬ মনজুর কাদের
১৭ আবু ইউনুস এনাউন্সার
১৮ মোতাহের হোসেন
১৯ মোহাম্মদ মোহসিন রেজা
২০ এ কে শামসুদ্দীন প্রেজেন্টেশন সুপারভাইজার
২১ সমর দাশ মিউজিক ডাইরেক্টর
২২ সৈয়দ হাসান ইমাম প্রডিউসার(ড্রামা)
২৩ রণেশ কুশারী
২৪ সাদেকীন স্ক্রিপ্ট রাইটার
২৫ আবদুল তোয়াব খান
২৬ মোস্তাফিজুর রহমান
২৭ নাসীম চৌধুরী
২৮ ফয়েজ আহমেদ
২৯ বদরুল হাসান
৩০ সাইফুর রহমান রেকর্ডিং সুপারভাইজার(মিউজিক)
৩১ মনতোষ দে প্রযোজক
৩২ রঙ্গলাল দেব চৌধুরী শিল্পী
প্রকৌশল বিভাগীয়
নং ব্যক্তির নাম পদের নাম
সৈয়দ আবদুস শাকের রেডিও ইঞ্জিনিয়ার
রাশেদুল হোসেন টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট
আমিনুর রহমান
মোমিনুল হক চৌধুরী
প্রণব দে টেকনিক্যাল অপারেটর
রেজাউল করিম চৌধুরী
এম শারফুজ্জামান
হাবিবউল্লাহ চৌধুরী
বার্তা বিভাগীয়
নং ব্যক্তির নাম পদের নাম
কামাল লোহানী ইন-চার্জ-নিউজ
মনসুর মামুন সাব এডিটর
আবুল কাসেম সন্দ্বীপ
সুব্রত বড়ুয়া
মৃণাল কুমার রায়
রণজিত পাল চৌধুরী
পারভীন হোসেন ইংলিশ নিউজ রিডার
এজাজ হোসেন মনিটর
রসূল আশরাফ চৌধুরী
১০ জাহিদ সিদ্দিকী উর্দূ নিউজ সাব-এডিটর
১১ শহীদুর রহমান
১২ নুরুল ইসলাম সরকার নিউজ রিডার
প্রশাসন বিভাগীয়
নং ব্যক্তির নাম পদের নাম
অনিল কুমার মিত্র একাউন্ট্যান্ট
আশরাফ উদ্দীন স্টেনোগ্রাফার
কালীপদ রায় স্টেনোটাইপিস্ট
মহীউদ্দীন আহমদ অফিস অ্যাসিস্ট্যান্ট
আনোয়ারুল আবেদীন
এস এস সাজ্জাদ স্টুডিও এক্সিকিউটিভ-কাম-রিসেপশনিস্ট
দুলাল রায় কপিস্ট
নওয়াব জামান চৌধুরী
বরকত উল্লাহ
১০ একরামুল হক চৌধুরী

এছাড়া আরো ছিলেন[৪][১৫]

  • গীতিকারঃ- সিকান্দার আবু জাফর, আবদুল গাফফার চৌধুরী, নির্মলেন্দু গুণ, আসাদ চৌধুরী, টি এইচ শিকদার প্রমুখ।
  • শিল্পীঃ- সমর দাস, আবদুল জব্বার, আপেল মাহমুদ, রথীন্দ্রনাথ রায়, অরুন গোস্বামী, মান্না হক, মাধুরী চ্যটার্জী, এম চান্দ, ইয়ার মোহাম্মদ, প্রবাল চৌধুরী, কল্যানী ঘোষ, উমা খান, নমিতা ঘোষ, স্বপ্না রায়, জয়ন্তী লালা, অজিত রায়, সুবল দাশ, কাদেরী কিবরিয়া, লাকি আখন্দ, ইন্দ্রমোহন রাজবংশী, বুলবুল মহালনবীশ,ফকির আলমগীর, মকসুদ আলী সাই, তিমির নন্দী, মিতালী মূখার্জী, মলয় গাঙ্গুলী, রফিকুল আলম প্রমুখ।
  • সঙ্গীত কম্পোজঃ- প্রনোদিত বড়ুয়া।
  • যন্ত্র সঙ্গীতঃ- শেখ সাদী, সুজেয় শ্যাম, কালাচাঁদ ঘোষ, গোপী বল্লভ বিশ্বাস, হরেন্দ্র চন্দ্র লাহিড়ী, সুবল দত্ত, বাবুল দত্ত, অবীনাশ শীল, সুনীল গোস্বামী, তড়িৎ হোসেন খান, দিলীপ দাশ গুপ্ত, দিলীপ ঘোষ, জুলু খান, রুমু খান, বাসুদেব দাশ, সমীর চন্দ, শতদল সেন প্রমুখ।
  • ঘোষকঃ- শেখ সাদী, শহিদুল ইসলাম, মোতাহের হোসেন, আশরাফুল আলম, অনিল কুমার, আবু ইউনুছ, জাহেদ সিদ্দিকী, মনজুর কাদের।
  • লাইব্রেরিয়ানঃ- রঙ্গলাল দেব চৌধুরী।
  • স্টুডিও কর্মকর্তাঃ- এস এম সাজ্জাদ।

নিয়মিত সম্প্রচারসমূহ[সম্পাদনা]

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কিছু নিয়মিত অনুষ্ঠান হলো পবিত্র কোরআনের বাণী, চরমপত্র, মুক্তিযুদ্ধের গান, যুদ্ধক্ষেত্রের খবরাখবর, রণাঙ্গনের সাফল্যকাহিনী, সংবাদ বুলেটিন, ধর্মীয় কথিকা, বজ্রকণ্ঠ, নাটক, সাহিত্য আসর এবং রক্তের আখরে লিখি। সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল অনুষ্ঠান এম আর আখতার মুকুল উপস্থাপিত চরমপত্র। এখানে তিনি পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর অসংলগ্ন অবস্থানকে পুরনো ঢাকার আঞ্চলিক ভাষার সংলাপে তুলে ধরতেন। চরমপত্রের পরিকল্পনা করেন আবদুল মান্নান। আরেকটি জনপ্রিয় অনুষ্ঠান জল্লাদের দরবার পরিচালনা করতেন কল্যাণ মিত্র। অনুষ্ঠানটিতে ইয়াহিয়া খানকে “কেল্লা ফতে খান হিসেবে” ব্যঙ্গাত্মকভাবে ফুটিয়ে তোলা হত। “বজ্র কণ্ঠ” অনুষ্ঠানে শেখ মুজিবর রহমানের ভাষণের অংশবিশেষ সম্প্রচার করা হত। বেতার কেন্দ্রে তরুণ শিল্পীরা দেশাত্মবোধক ও অনুপ্রেরণাদায়ক গান করতেন। সম্প্রচারের জন্য এসময় অনেক গান ও কবিতা লেখা হয়। কেন্দ্রের গায়কেরা পশ্চিম বঙ্গের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গেয়ে যুদ্ধকালীন সময়ে তহবিল সংগ্রহ করেন। এছাড়াও বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলা, ইংরেজি ও উর্দুতে সংবাদ সম্প্রচার করা হত। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র আহ্বায়ক কমিটির সভাপতি কামাল লোহানী বলেন[তথ্যসূত্র প্রয়োজন], "আমাদের জন্য বেতার ছিল মনস্ত্বাত্বিক যুদ্ধক্ষেত্র, যার মাধ্যমে আমরা জনগণের সাহস বাড়াতে সহায়তা করি"।

জনপ্রিয় কিছু অনুষ্ঠান ও তাদের নেপথ্যের কুশলীরা[৬][সম্পাদনা]

অনুষ্ঠানের নাম অনুষ্ঠানের বিষয় বস্তু নেপথ্যের কুশলীবৃন্দ
চরমপত্র রম্যকথিকা পরিকল্পনাঃ আবদুল মান্নান কথকঃ এম আর আখতার মুকুল
ইসলামের দৃষ্টিতে ধর্মীয় কথিকা কথকঃ সৈয়দ আলি আহসান
জল্লাদের দরবার জীবন্তিকা (নাটিকা) লেখকঃ কল্যাণ মিত্র ভয়েসঃ রাজু আহমেদ এবং নারায়ণ ঘোষ
বজ্রকন্ঠ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের অংশবিশেষ
দৃষ্টিপাত কথিকা কথকঃ ডঃ মাজহারুল ইসলাম
বিশ্বজনমত সংবাদ ভিত্তিক কথিকা কথকঃ সাদেকীন
বাংলার মুখ জীবন্তিকা
প্রতিনিধির কন্ঠ অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিদের ভাষণ
পিন্ডির প্রলাপ রম্যকথিকা কথকঃ আবু তোয়াব খান
দর্পণ কথিকা কথকঃ আশরাফুল আলম
প্রতিধ্বনী কথিকা কথকঃ শহীদুল ইসলাম
কাঠগড়ার আসামী কথিকা কথকঃ মুস্তাফিজুর রহমান

জনপ্রিয় কয়েকটি গান[সম্পাদনা]

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনেক গান বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে।এখানে জনপ্রিয় গানগুলোর গীতিকার ও শিল্পিদের নাম উল্লেখ করা হল[১০]

নং গানের প্রথম কলি গীতিকার সুরকার শিল্পী
জয় বাংলা,বাংলার জয় গাজী মাজহারুল আনোয়ার আনোয়ার পারভেজ শাহনাজ বেগম ( রহমতুল্লাহ )
আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কোরাস (সমবেত)
কারার ঐ লৌহকপাট কাজী নজরুল ইসলাম কাজী নজরুল ইসলাম কোরাস
কেঁদোনা কেঁদোনা মাগো
সোনা সোনা সোনা লোকে বলে সোনা আবদুল লতিফ আবদুল লতিফ শাহনাজ বেগম
শোন একটি মুজিবরের থেকে গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার আংশুমান রায়
মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে গোবিন্দ হালদার আপেল মাহমুদ আপেল মাহমুদ
ঐ বগিলারে কেন বা আরু হরলাল রায় রথীন্দ্রনাথ রায়
অনেক রক্ত দিয়েছি আমরা টি এইচ শিকদার কোরাস
১০ অত্যাচারের পাষাণ জ্বালিয়ে দাও আল মুজাহিদী কোরাস
১১ তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর কোরাস
১২ পূর্ব দিগন্তে, সূর্য উঠেছে গোবিন্দ হালদার সমর দাস কোরাস
১৩ এক সাগর রক্তের বিনিময়ে গোবিন্দ হালদার স্বপ্না রায়
১৪ আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে প্রেব্রুয়ারী আবদুল গাফফার চৌধুরী আলতাফ মাহমুদ কোরাস
১৫ আমি এক বাংলার মুক্তি সেনা নেওয়াজিস হোসেন কোরাস
১৬ সালাম সালাম হাজার সালাম ফজল-এ-খোদা মোহাম্মদ আবদুল জব্বার
১৭ জগৎবাসী বাংলাদেশকে যাও দেখিয়া সরদার আলাউদ্দীন
১৮ সাত কোটি আজ প্রহরী প্রদীপ সারওয়ার জাহান
১৯ মুক্তির একই পথ সংগ্রাম শহীদুল ইসলাম কোরাস
২০ জনতার সংগ্রাম চলবেই সিকান্দার আবু জাফর কোরাস
২১ বিচারপতি তোমার বিচার সলিল চৌধুরী কোরাস
২২ আমি শুনেছি আমার মায়ের কান্না ফজল-এ-খোদা মান্না হক
২৩ নোঙ্গর তোল তোল নঈম গহর সমর দাস কোরাস
২৪ ব্যারিকেড,বেয়নেট, বেড়াজাল আবু বকর সিদ্দিক কোরাস
২৫ ছোটদের বড়দের সকলের রথীন্দ্রনাথ রায়

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. মুহাম্মদ নূরুল কাদির, দুশো ছেষট্টি দিনে স্বাধীনতা, ১৯৯৭, ৩য় সংস্করণ, সিটি পাবলিশিং হাউস লি:, ঢাকা। ISBN 984-30-0299-6 পৃ: ৭৩।
  2. http://bangladesh1971.net/node/81 বাংলাদেশ১৯৭১ ডট নেট
  3. www.swadhinbangla-betar.org
  4. ৪.০ ৪.১ শামসুল হুদা চৌধুরী। একাত্তরের রণাঙ্গন। আহমদ পাবলিশিং। আইএসবিএন 984-11-0505-0 |isbn= মান পরীক্ষা করুন (সাহায্য) 
  5. ৫.০ ৫.১ বেগম মুশতারী শফি। স্বাধীনতা আমার রক্ত ঝরা দিন। অনুপম প্রকাশনী। আইএসবিএন 984-404-006-X 
  6. ৬.০ ৬.১ ৬.২ ৬.৩ ৬.৪ ৬.৫ বেলাল মোহাম্মদস্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। অনুপম প্রকাশনী। আইএসবিএন 984-404-023-3 |isbn= মান পরীক্ষা করুন (সাহায্য) 
  7. রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে। অনন্যা প্রকাশনী। আইএসবিএন 984-412-033-0 
  8. www.thedailystar.net
  9. স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র-একটি দুর্জ্জয় ফ্রন্ট
  10. ১০.০ ১০.১ হোসেন তওফিক ইমাম। বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১। আগামী প্রকাশনী। আইএসবিএন 984-401-783-1 
  11. স্বাধীন বাংলা বেতারের স্মৃতি
  12. www.banglapedia.org
  13. মুহাম্মদ নূরুল কাদির, দুশো ছেষট্টি দিনে স্বাধীনতা, ১৯৯৭, ৩য় সংস্করণ, সিটি পাবলিশিং হাউস লি:, ঢাকা। ISBN 984-30-0299-6 পৃ: ৭১।
  14. swadhinbangla-betar.org
  15. ডাঃ মাহফুজুর রহমান। বাঙালির জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম। বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্র,চট্টগ্রাম। আইএসবিএন 984-8105-01-8 

গ্রন্থসূত্র[সম্পাদনা]

  • বেলাল মোহাম্মদস্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। অনুপম প্রকাশনী। আইএসবিএন 984-404-023-3 |isbn= মান পরীক্ষা করুন (সাহায্য) 
  • স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ইতিহাস, সম্পাদকঃ ডঃ জাহিদ হোসেন প্রধান, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ২০০৫, ঢাকা। isbn=৯৮৪ ৮৫১ ৭৭২৩

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]