সেলিম আল দীন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সেলিম আল দীন

সেলিম আল দীন
জীবিকা শিক্ষকতা, লেখক
জাতীয়তা বাংলাদেশী
ধরণ নাটক
উল্লেখযোগ্য লেখনী মুনতাসির, শকুন্তলা, কিত্তনখোলা (১৯৮৬), কেরামতমঙ্গল (১৯৮৮), চাকা (১৯৯১), হরগজ (১৯৯২), যৈবতী কন্যার মন (১৯৯৩), হাতহদাই (১৯৯৭), প্রাচ্য (২০০০), নিমজ্জন (২০০২)
উল্লেখযোগ্য পুরস্কার বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৪), একুশে পদক (২০০৭), জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (১৯৯৩), নান্দিকার পুরস্কার (আকাদেমি মঞ্চ কলকাতা) ১৯৯৪, শ্রেষ্ঠ টেলিভিশন নাট্যকার (১৯৯৪), জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (একাত্তরের যীশু, শ্রেষ্ঠ সংলাপ) ১৯৯৪, মুনীর চৌধুরী সম্মাননা (২০০৫)
সঙ্গী বেগমজাদী মেহেরুন্নেসা সেলিম

সেলিম আল দীন (১৮ই আগস্ট, ১৯৪৯১৪ই জানুয়ারি, ২০০৮[১]) একজন প্রখ্যাত বাংলাদেশী নাট্যকার ও গবেষক। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের নাট্য আন্দোলনে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তিনি নাটকের আঙ্গিক ও ভাষার উপর গবেষণা করেছেন। বাংলা নাটকের শিকড় সন্ধানী এ নাট্যকার ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্যের বিষয় ও আঙ্গিক নিজ নাট্যে প্রয়োগের মাধ্যমে বাংলা নাটকের আপন বৈশিষ্টকে তুলে ধরেছেন।

পরিচ্ছেদসমূহ

জন্ম ও শিক্ষা [সম্পাদনা]

নাট্যকার সেলিম আল দীন জন্মেছিলেন ১৯৪৯ সালের ১৮ই আগস্ট ফেনীর সোনাগাজী থানার সেনেরখিল গ্রামে৷ মফিজউদ্দিন আহমেদ ও ফিরোজা খাতুনের তৃতীয় সন্তান তিনি৷ শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ফেনী, চট্টগ্রাম, সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও রংপুরের বিভিন্ন স্থানে৷ বাবার চাকরির সূত্রে এসব জায়গার বিভিন্ন স্কুলে পড়াশোনা করেছেন তিনি৷ সেলিম আল দীন ১৯৬৪ সালে ফেনীর সেনেরখিলের মঙ্গলকান্দি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন৷ ১৯৬৬ সালে ফেনী কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন৷ ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হন৷ দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে গিয়ে ভর্তি হন টাঙ্গাইলের করোটিয়ায় সাদত কলেজে৷ সেখান থেকে স্নাতক পাসের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন৷ ১৯৯৫ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন সেলিম আল দীন৷

জীবনী [সম্পাদনা]

সেলিম আল দীনের বাবা ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা। সেই সূত্রে ঘুরেছেন বহু জায়গা। ছোটবেলা থেকেই বই পড়ার প্রতি ছিল তাঁর চরম ঝোঁক। তাই দূরে কাছে নতুন বই দেখলেই পড়ে ফেলতেন এক নিমেষে। ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর লেখক হওয়ার বিষয়ে পাকাপোক্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন তিনি। লেখক হিসাবে তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটে ১৯৬৮ সালে, কবি আহসান হাবিব সম্পাদিত দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকার মাধ্যমে। আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের নিয়ে লেখা তাঁর বাংলা প্রবন্ধ নিগ্রো সাহিত্য ছাপা হয় ওই পত্রিকায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়েই নাটকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন সেলিম আল দীন, যুক্ত হন ঢাকা থিয়েটারে। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা শেষে যোগ দেন বিজ্ঞাপনী সংস্থা বিটপীতে, কপি রাইটার হিসাবে। ১৯৭৪ সালে তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসাবে যোগ দেন। ওই বছরই বেগমজাদী মেহেরুন্নেসার সঙ্গে বিয়ে হয় তাঁর। তাঁদের একমাত্র সন্তান মইনুল হাসানের অকালমৃত্যু হয়।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের প্রতিষ্ঠা সেলিম আল দীনের হাত ধরেই। ঢাকা থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সেলিম আল দীন ১৯৮১-৮২ সালে নাট্য নির্দেশক নাসির উদ্দিন ইউসুফকে সাথী করে গড়ে তোলেন গ্রাম থিয়েটার।

তাঁর প্রথম রেডিও নাটক বিপরীত তমসায় ১৯৬৯ সালে এবং টেলিভিশন নাটক আতিকুল হক চৌধুরীর প্রযোজনায় লিব্রিয়াম (পরিবর্তিত নাম ঘুম নেই) প্রচারিত হয় ১৯৭০ সালে। আমিরুল হক চৌধুরী নির্দেশিত এবং বহুবচন প্রযোজিত প্রথম মঞ্চনাটক সর্প বিষয়ক গল্প মঞ্চায়ন করা হয় ১৯৭২ সালে। তিনি শুধু নাটক রচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি, বাংলা ভাষার একমাত্র নাট্য বিষয়ক কোষগ্রন্থ বাংলা নাট্যকোষ সংগ্রহ, সংকলন, প্রণয়ন ও সম্পাদনা করেছেন। তার রচিত হরগজ নাটকটি সুয়েডীয় ভাষায় অনূদিত হয় এবং এ নাটকটি ভারতের রঙ্গকর্মী নাট্যদল হিন্দি ভাষায় মঞ্চায়ন করেছে।

সেলিম আল দীনের প্রথমদিককার নাটকের মধ্যে সর্প বিষয়ক গল্প, জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন, মূল সমস্যা, এগুলোর নাম ঘুরে ফিরে আসে। সেই সঙ্গে প্রাচ্য, কীত্তনখোলা, বাসন, আততায়ী, সয়ফুল মূলক বদিউজ্জামান, কেরামত মঙ্গল, হাত হদাই, যৈবতি কন্যার মন, মুনতাসির ফ্যান্টাসিচাকা তাকে ব্যতিক্রমধর্মী নাট্যকার হিসেবে পরিচিত করে তোলে। জীবনের শেষ ভাগে নিমজ্জন নামে মহাকাব্যিক এক উপাখ্যান বেরিয়ে আসে সেলিম আল দীনের কলম থেকে।

সম্মাননা [সম্পাদনা]

১৯৮৪ সালে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। ২০০২ সালে পান কথাসাহিত্য পুরস্কার১৯৯৪ সালে তিনি নান্দিকার পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৯৪ সালে শ্রেষ্ঠ টেলিভিশন নাটক রচয়িতার পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৯৪ সালে তিনি পান শ্রেষ্ঠ সংলাপ রচয়িতার জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারখালেকদাদ চৌধুরী সাহিত্য পুরস্কার পান ২০০১সালে। সেলিম আল দীন বাংলাদেশের সবচেয়ে সম্মানীয় পুরস্কার একুশে পদক লাভ করেন ২০০৭ সালে। ১৯৯৫ সালে তিনি মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে নাটক এর উপর গবেষণা করে ডক্টরেট ডিগ্রী অর্জন করেন।[১]

তিনি ২০০৮ সালের ১৪ জানুয়ারী মৃত্যুবরণ করেন।

উল্লেখযোগ্য নাটকসমূহ [সম্পাদনা]

  • জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন' (১৯৭৫)
  • 'বাসন' (১৯৮৫)
  • 'মুনতাসির'
  • 'শকুন্তলা'
  • 'কীত্তনখোলা' (১৯৮৬)
  • 'কেরামতমঙ্গল' (১৯৮৮)
  • 'যৈবতী কন্যার মন' (১৯৯৩)
  • 'চাকা' (১৯৯১)
  • 'হরগজ' (১৯৯২)
  • 'প্রাচ্য' (২০০০)
  • 'হাতহদাই' (১৯৯৭)
  • 'নিমজ্জন' (২০০২)
  • 'ধাবমান'
  • 'স্বর্ণবোয়াল' (২০০৭)
  • 'পুত্র'

গীতিনৃত্যনাট্য [সম্পাদনা]

  • 'স্বপ্ন রজনীগণ'
  • 'ঊষা উত্সব'

রেডিও-টেলিভিশনে প্রযোজিত নাটক [সম্পাদনা]

Salim-al-deen-dinlipi.JPG
  • 'বিপরীত তমসায়' (রেডিও পাকিস্তান, ১৯৬৯)
  • 'ঘুম নেই' (পাকিস্তান টেলিভিশন, ১৯৭০)
  • 'রক্তের আঙ্গুরলতা' (রেডিও বাংলাদেশ ও বিটিভি)
  • 'অশ্রুত গান্ধার' (বিটিভি, ১৯৭৫)
  • 'শেকড় কাঁদে জলকণার জন্য' (বিটিভি, ১৯৭৭)
  • 'ভাঙনের শব্দ শুনি' (আয়না সিরিজ, বিটিভি, ১৯৮২-৮৩)
  • 'গ্রন্থিকগণ কহে' (বিটিভি, ১৯৯০-৯১)
  • 'ছায়া শিকারী' (বিটিভি, ১৯৯৪-৯৫)
  • 'রঙের মানুষ' (এনটিভি, ২০০০-২০০৩)
  • 'নকশীপাড়ের মানুষেরা' (এনটিভি, ২০০০)
  • 'কীত্তনখোলা' (আকাশবাণী কোলকাতা, ১৯৮৫)

গবেষণাধর্মী নির্দেশনা [সম্পাদনা]

  • 'মহুয়া' (ময়মনসিংহ গীতিকা অবলম্বনে, ১৯৯০)
  • 'দেওয়ানা মদিনা' (ময়মনসিংহ গীতিকা অবলম্বনে, ১৯৯২)
  • 'একটি মারমা রূপকথা' (১৯৯৩)
  • 'কাঁদো নদী কাঁদো',
  • 'মেঘনাদ বধ' (অভিষেক নামপর্ব)

চিত্রনাট্য [সম্পাদনা]

  • 'চাকা' নাটক অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মিত হয় ১৯৯৪
  • 'কীত্তনখোলা' নাটক থেকে চলচ্চিত্র নির্মিত হয় ২০০০ সালে
  • 'একাত্তরের যীশু' চলচ্চিত্রের সংলাপ রচনা করেন ১৯৯৪ সালে

অন্যান্য রচনা [সম্পাদনা]

  • দিনলিপি
  • ভাঙা প্রেম অশেষ বিশেষ

রচনাসমগ্র [সম্পাদনা]

  • সেলিম আল দীন রচনাসমগ্র ১ম, ২য়, ৩য়, ৪র্থ, ৫ম ও ৬ষ্ঠ খণ্ড সাইমন জাকারিয়া'র সংকলন-গ্রন্থন ও সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে।

পুরস্কার ও স্বীকৃতি [সম্পাদনা]

  • বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৪)
  • ঋষিজ কর্তৃক প্রদত্ত সংবর্ধনা (১৯৮৫)
  • কথক সাহিত্য পুরস্কার (১৩৯০ বঙ্গাব্দ)
  • একুশে পদক (২০০৭)
  • জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (১৯৯৩)
  • অন্য থিয়েটার, কলকাতা কর্তৃক প্রদত্ত সংবর্ধনা
  • নান্দিকার পুরস্কার, আকাদেমি মঞ্চ কলকাতা, ১৯৯৪
  • শ্রেষ্ঠ টেলিভিশন নাট্যকার (১৯৯৪)
  • খালেকদাদ সাহিত্য পুরস্কার
  • জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (একাত্তরের যীশু, শ্রেষ্ঠ সংলাপ) ১৯৯৪
  • মুনীর চৌধুরী সম্মাননা (২০০৫)

তথ্যসূত্র [সম্পাদনা]

  1. ১.০ ১.১ http://nation.ittefaq.com/issues/2008/01/15/news0266.htm দ্য নিউ নেশন

বহি:সংযোগ [সম্পাদনা]