স্বামী শ্রদ্ধানন্দ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
স্বামী শ্রদ্ধানন্দ
Mahatma Munshi Ram or Swami Shraddhanand Arya Samaj.jpg
জন্ম(১৮৫৬-০২-২২)২২ ফেব্রুয়ারি ১৮৫৬
মৃত্যু২৩ ডিসেম্বর ১৯২৬(1926-12-23) (বয়স ৭০)
মৃত্যুর কারণহত্যা আবদুল রশিদ বন্দুকের গুলিতে
পেশাসমাজকর্মী, মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক।

স্বামী শ্রদ্ধানন্দ (২২ ফেব্রুয়ারি ১৮৫৬ – ২৩ ডিসেম্বর ১৯২৬), যিনি মহাত্মা মুন্সী রাম বিজ নামেও পরিচিত[১]। তিনি ভারতীয় স্বাধীনতা কর্মী এবং একজন আর্য সমাজ সন্ন্যাসী যিনি দয়ানন্দ সরস্বতীর শিক্ষা প্রচার করেছিলেন। তাঁর কাজের মধ্যে রয়েছে গুরুকুল কাংরি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন, এবং ১৯২০ -এর দশকে হিন্দু সংস্কার আন্দোলন, সংগঠন এবং শুদ্ধি আন্দোলন -এ মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন।

প্রাথমিক জীবন এবং শিক্ষা[সম্পাদনা]

তিনি ১৮৫৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের জলন্ধর জেলার তালওয়ান গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি লালা নানক চাঁদের পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান ছিলেন, যিনি ছিলেন যুক্ত প্রদেশে (বর্তমানে উত্তর প্রদেশ) পুলিশ পরিদর্শক। তখন তা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দ্বারা পরিচালিত ছিল। শ্রদ্ধানন্দের প্রদত্ত নাম ছিল বৃহস্পতি বিজ, কিন্তু পরবর্তীতে তাকে তার বাবা মুন্সী রাম বিজ নামে অভিহিত করেছিলেন। ১৯১৭ সালে সানাস গ্রহণ করা পর্যন্ত তার এই নামটি ছিল।

স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীর সাথে সাক্ষাৎ[সম্পাদনা]

তিনি স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীর সাথে প্রথম দেখা করেন যখন দয়ানন্দ সরস্বতী বক্তৃতা দিতে বেরেলিতে যান। তার বাবা কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব এবং ব্রিটিশ অফিসারদের উপস্থিতির কারণে অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা পরিচালনা করছিলেন। বাবার অনুরোধে মুন্সিরাম বক্তৃতায় যোগ দেন। তিনি মূলত আয়োজন নষ্ট করার অভিপ্রায় নিয়ে গিয়েছিলেন, তারপর দয়ানন্দ সরস্বতীর সাহস, দক্ষতা এবং দৃঢ় ব্যক্তিত্ব দ্বারা প্রবলভাবে প্রভাবিত হন। এরপর পড়াশোনা শেষে মুন্সিরাম আইনজীবী হিসেবে অনুশীলন শুরু করেন।[২][৩]

জীবনী[সম্পাদনা]

স্কুল[সম্পাদনা]

১৮৯২ সালে লাহোরের DAV কলেজে বৈদিক শিক্ষাকে মূল পাঠ্যসূচী করা উচিত কিনা তা নিয়ে বিতর্কের পর আর্য সমাজ দুটি উপদলে বিভক্ত হয়েছিল। তিনি সংগঠন ছেড়ে পাঞ্জাব আর্য সমাজ গঠন করেন। আর্য সমাজ গুরুকুল বিভাগ এবং DAV বিভাগের মধ্যে বিভক্ত ছিল। শ্রদ্ধানন্দ গুরুকুলের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। ১৮৯৭ সালে, যখন লালা লেখ রামকে হত্যা করা হয়, তখন শ্রদ্ধানন্দ তার স্থলাভিষিক্ত হন। তিনি 'পাঞ্জাব আর্য প্রতিনিধি সভা' -এর নেতৃত্ব দেন এবং এর মাসিক পত্রিকা আর্য মুসাফির শুরু করেন। ১৯০২ সালে তিনি হরিদ্বারের কাছে ভারতের কাংড়িতে একটি গুরুকুল প্রতিষ্ঠা করেন। এই স্কুলটি এখন গুরুকুল কাংরি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃত।

১৯৯৭ সালে মহাত্মা মুন্সি রাম সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। তখন তিনি "স্বামী শ্রদ্ধানন্দ সরস্বতী" নাম গ্রহণ করেছিলেন।

শ্রদ্ধানন্দ হরিয়ানার ফরিদাবাদের কাছে আরাওয়ালিতে গুরুকুল ইন্দ্রপ্রস্থ প্রতিষ্ঠা করেন।

সক্রিয়তা[সম্পাদনা]

১৯১৭ সালে, শ্রদ্ধানন্দ হিন্দু সংস্কার আন্দোলন এবং ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের সক্রিয় সদস্য হওয়ার জন্য গুরুকুল ত্যাগ করেন। তিনি কংগ্রেসের সাথে কাজ শুরু করেন, যা তিনি ১৯১৯ সালে অমৃতসরে তার অধিবেশন আয়োজনের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। এর কারণ ছিল জলিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড, এবং কংগ্রেস কমিটির কেউই অমৃতসরে অধিবেশন করতে রাজি হয়নি। শ্রদ্ধানন্দ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।

তিনি রাওলাট আইনের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী বিক্ষোভে যোগ দিয়েছিলেন। একই বছর তিনি চাঁদনী চকের ক্লক টাওয়ারে গোর্খা সৈন্যদের একটি পোসের সামনে প্রতিবাদ করেছিলেন, তারপর তাকে এগিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। ১৯২০ এর দশকের গোড়ার দিকে তিনি হিন্দু সংগঠন আন্দোলনে একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হন, যা এখন পুনরুজ্জীবিত হিন্দু মহা সভার একটি ফল।

স্বামী শ্রদ্ধানন্দ একমাত্র হিন্দু সন্ন্যাসী যিনি জাতীয় সংহতি এবং বৈদিক ধর্মের জন্য প্রধান জামে মসজিদের মিনার থেকে বিশাল জনসভায় ভাষণ দেন, বেদমন্ত্র পাঠের মাধ্যমে তাঁর বক্তৃতা শুরু করেন।

তিনি হিন্দী এবং উর্দু উভয় ভাষায় ধর্মীয় বিষয়ে লিখেছেন। তিনি দুটি ভাষায় সংবাদপত্রও প্রকাশ করেছিলেন। তিনি দেবনাগরী লিপিতে হিন্দি প্রচার করেন, দরিদ্রদের সাহায্য এবং নারী শিক্ষার উন্নতি করেন। ১৯২৩ সালের মধ্যে, তিনি সামাজিক অঙ্গন ত্যাগ করেন এবং পূর্ববর্তী শুদ্ধি আন্দোলনের (হিন্দু ধর্মে পুনরায় ধর্মান্তরন) কাজে নিবিষ্ট হন, যার কারণে তিনি হিন্দুধর্মের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত হন। ১৯২২ সালে, ড. আম্বেদকর শ্রদ্ধানন্দকে "অস্পৃশ্যদের মাঝে শ্রেষ্ঠ এবং সবচেয়ে আন্তরিক বীরপুরুষ" বলে অভিহিত করেছিলেন।

১৯২৩ এর শেষের দিকে, তিনি ভারতীয় হিন্দু শুদ্ধি সভার সভাপতি হন, যা মুসলমানদের, বিশেষ করে পশ্চিম যুক্ত প্রদেশের 'মালকানা রাজপুতদের' পুনর্মিলনের লক্ষ্যে তৈরি হয়েছিল। এটি তাকে মুসলিম আলেমগণ এবং তৎকালীন নেতাদের সাথে সরাসরি সংঘর্ষে নিয়ে আসে। এই আন্দোলনের কারণে ১,৬৩,০০০ জন মালকানা রাজপুত হিন্দু ধর্মাবলম্বী হয়েছিলেন।

হত্যা[সম্পাদনা]

১৯৭০ সালের ভারতের ডাকটিকিটের উপর স্বামী শ্রদ্ধানন্দ

১৯২৬ সালের ২৩ ডিসেম্বর তিনি আব্দুল রশিদ নামে একজন মুসলিমের হাতে নিহত হন। তাঁর মৃত্যুতে গান্ধী ১৯২৬ সালের ২৫ ডিসেম্বর কংগ্রেসের গুয়াহাটি অধিবেশনে একটি শোক প্রস্তাব উত্থাপন করেন। প্রাসঙ্গিক অংশে বক্তৃতার একটি অংশে লেখা আছে,

"If you hold dear the memory of Swami Shraddhanandji, you would help in purging the atmosphere of mutual hatred and calumny. You would help in boycotting papers which foment hatred and spread misrepresentation. I am sure that India would lose nothing if 90 per cent of the papers were to cease today. . . Now you will perhaps understand why I have called Abdul Rashid a brother and I repeat it. I do not even regard him as guilty of Swamiji's murder. Guilty indeed are all those who excited feelings of hatred against one another. For us Hindus the Gita enjoins on us the lesson of equi-mindedness; we are to cherish the same feelings towards a learned Brahman as towards a chandala, a dog, a cow or an elephant."[৪]

হিন্দু কারণে শহীদ হওয়া ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে, সাভারকারের ভাই নারায়ণরাও ১৯২৭ সালের ১০ জানুয়ারি থেকে বোম্বে থেকে শ্রদ্ধানন্দ নামে একটি সাপ্তাহিক শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন।

আজ, হরিদ্বারের গুরুকুল কাংরি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতাত্ত্বিক যাদুঘরে 'স্বামী শ্রদ্ধানন্দ কক্ষ' তাঁর জীবনের একটি আলোকচিত্র উপস্থাপন করে।

দিল্লি টাউন হলের সামনে স্বামী শ্রদ্ধানন্দের মূর্তি

স্বাধীনতার পর দিল্লি টাউন হলের সামনে তার একটি মূর্তি স্থাপন করা হয়েছিল, যা রানী ভিক্টোরিয়ার মূর্তি প্রতিস্থাপন করেছিল। পুরাতন দিল্লির এই স্থানটিকে ঘন্টাঘর বলা হয় কারণ পুরনো ক্লক টাওয়ার ১৯৫০ সাল পর্যন্ত এখানে দাঁড়িয়ে ছিল।

ব্যক্তিগত জীবন[সম্পাদনা]

শ্রদ্ধানাদ এবং তার স্ত্রী শিবা দেবীর দুই ছেলে ও দুই মেয়ে ছিল। শ্রদ্ধানাদের মাত্র ৩৬ বছর বয়সে তাঁর স্ত্রী মারা যান। তাঁর নাতনি সত্যবতী ভারতে ব্রিটিশ শাসনের বিশিষ্ট প্রতিপক্ষ ছিলেন।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "Swami Shraddhanand"www.aryasamajhouston.org। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০১-১৬ 
  2. Autobiography http://www.vedpedia.com ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২ ফেব্রুয়ারি ২০১১ তারিখে
  3. G.S. Chhatra (2007). Some Indian Personalities of the Time: Swami Shraddhanand Advanced Study in the History of Modern India Lotus Press. আইএসবিএন ৮১-৮৯০৯৩-০৮-৮ p. 227.
  4. The Official Mahatma Gandhi eArchive[স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]. Mahatma.org.in. Retrieved on 17 December 2018.