লোকপ্রশাসন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে লোক প্রশাসন । লোকপ্রশাসন সামাজিক বিজ্ঞানের বহুল প্রচলিত ও গুরুত্বপূর্ণ শাখা।

সংজ্ঞা[সম্পাদনা]

লোকপ্রশাসন স্বতন্ত্র একটি বিভাগ বা অধ্যয়নের বিষয় হিসেবে পরিচিত হয়ে আসছে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিক হতে। এ বিষয়টি এখনও সমাজ বিজ্ঞান অথবা গণমুখী বিষয়রূপে বিকাশমান।

১। লোকপ্রশাসন বিজ্ঞানী পল এইচ এপলবি বলেন,“লোকপ্রশাসন হচ্ছে নীতি প্রণয়ন। তবে এ নীতি প্রণয়ন স্ব-ইচ্ছায় প্রণীত কিংবা একান্তভাবে নিরবিচ্ছিন্ন নীতি প্রণয়ন নয়।” ২। এলডি হোয়াইটের মতে ‘‘সরকারি নীতি প্রয়োগের ক্ষেত্রে সব কাজই হচ্ছে প্রশাসন।” ৩। উড্রো উইলসনের মতে “ প্রশাসন একটি সুবিন্যস্ত ও বিস্তারিত আইনের প্রয়োগ। প্রতিটি নির্দিষ্ট আইনকে কাজে পরিণত করাই হচ্ছে এক কথায় প্রশাসন।’; ৪। ডিমকের মতে “প্রশাসন সরকার কী এবং কীরূপ তা নিয়ে আলোচনা করে।” ৫। সাইমন বলেছেন, “সাধারণ অর্থে প্রশাসন বলতে জাতীয়, কেন্দ্রীয় এবং স্থানীয় সরকারের কার্যনির্বাহী বিভাগের কাজকে বুঝায়।” উপরোক্ত সংজ্ঞাসমূহের আলোকে আমরা বলতে পারি যে, সরকার প্রণীত নীতি ও আইনসমূহের জনকল্যাণার্থে বাস্তবায়ন এবং প্রয়োগের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই হলো লোকপ্রশাসন। অন্য কথায়, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সেবা জনগণের জন্য নিশ্চিত করতে রাজনীতিবিদগণের গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াই হলো লোকপ্রশাসন।

জনক[সম্পাদনা]

আমেরিকার ২৮তম রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসন হলেন লোকপ্রশাসনের জনক।উনি রাষ্ট্রবিজ্ঞান থেকে লোকপ্রশাসনকে স্বতন্ত্র বিবেচ্য বিষয় হিসেবে পৃথক করেন।এ জন্য তাকে লোকপ্রশাসনের জনক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

উড্রো উইলসন

ইতিহাস[সম্পাদনা]

উড্রো উইলসনকে লোকপ্রশাসনের জনক হিসাবে বিবেচনা করা হয়। ১৮৮৭ সালের "প্রশাসনের অধ্যয়ন" শিরোনামের একটি নিবন্ধে তিনি প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে লোকপ্রশাসনকে স্বীকৃতি দেন।

প্রকৃতি[সম্পাদনা]

লুথার গুলিক মনে করেন যে, লোকপ্রশাসন হলো সংগঠন ও ব্যবস্থাপনার একটি সাধারণ বিজ্ঞান। লোক প্রশাসনের আওতা ব্যবস্থাপনার কলাকৌশলের মধ্যেই সীমিত। লুথার গুলিক সকল প্রশাসনিক সংগঠনের কর্মকান্ড বিশেষ করে তাদের ব্যবস্থাপনা কর্মকান্ডের বর্ণনা ও ব্যখ্যা করার জন্য "পস্ডকর্ব" কথাটির ব্যবহার করেছেন।

প্রশাসনের মধ্যকার পার্থক্য[সম্পাদনা]

হারবার্ট আলেকজান্ডার সাইমন মনে করেন, সাধারণ মানুষের কল্পনাতেই লোকপ্রশাসন ও বেসরকারি প্রশাসনের মধ্যে পার্থক্য তীব্রতর ভাবে প্রকাশ পায়। সাধারণ মানুষ ধারণা করে যে, লোক প্রশাসন রাজনৈতিক, আমলাতান্ত্রিক এবং দীর্ঘ সূত্রি আর বেসরকারি প্রশাসন অরাজনৈতিক, অবাধ এবং ব্যবসায়িক মনোভাব পূর্ণ।

মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা[সম্পাদনা]

মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা ( এইচআরএম বা এইচআর ) হল সংগঠনের কর্মীদের কার্যকরী ব্যবস্থাপনার কৌশলগত পদক্ষেপ, যাতে তারা ব্যবসায়িকভাবে একটি প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা লাভ করতে সাহায্য করে, সাধারণতঃ এইচআর ডিপার্টমেন্ট হিসাবে উল্লেখ করা হয়, এটি একটি নিয়োগকর্তার চাকরির চাকরির কর্মচারী কর্মক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ডিজাইন করা হয়েছে কৌশলগত উদ্দেশ্য এইচআর প্রধানত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মানুষের পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, নীতি এবং সিস্টেমের উপর মনোযোগ নিবদ্ধ। এইচআর ডিপার্টমেন্ট কর্মচারী-বেনিফিট ডিজাইন, কর্মচারী নিয়োগ, প্রশিক্ষণ এবং উন্নয়ন, কর্মক্ষমতা মূল্যায়ন, এবং পুরষ্কারসম্পন্ন (যেমন, বেতন এবং সুবিধা ব্যবস্থার ব্যবস্থাপনা) তত্ত্বাবধানের জন্য দায়ী। এইচআর এছাড়াও সাংগঠনিক পরিবর্তন এবং শিল্প সম্পর্কের সাথে নিজেকে উদ্বেগের, যা, যৌথ দরকষাকষি এবং সরকারি আইন থেকে উদ্ভূত প্রয়োজনীয়তা সঙ্গে সাংগঠনিক চর্চা সামঞ্জস্য।

আমলাতন্ত্র[সম্পাদনা]

আমলাতন্ত্রের জনক ম্যাক্স ওয়েবার

ইংরেজি 'ব্যুরোক্রেসি' শব্দটি ফরাসি শব্দ 'ব্যুরাে’ এবং গ্রিক শব্দ ক্রেটিন-এর সমাহার।

লেখার টেবিল বা ডেস্ক অর্থে ব্যুরাে এবং শাসন অর্থে ক্লেটিন শব্দটি ব্যবহৃত হয়। তাই ব্যুৎপত্তিগত অর্থে আমলাতন্ত্র বলতে বােঝায় 'টেবিলে বসে পরিচালিত সরকার বা শাসন ব্যবস্থাকে'I

প্রতিটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আধুনিক শাসন ব্যবস্থায় সরকারের রাজনৈতিক অংশ বা স্থায়ী অংশ, মূলত অভিজ্ঞ, বেতনভুক কর্মচারীবৃন্দ অর্থাৎ আমলাদের দ্বারা পরিচালিত হয়। এই পরিচালিত শাসন ব্যবস্থা আমলাতন্ত্র নামে পরিচিত। এককথায় বলা যায়, সরকারি কর্মচারীদের নিয়ে গড়ে ওঠা একটি সংগঠন বা গােষ্ঠীবিশেষ হল আমলাতন্ত্র।

অধ্যাপক ম্যাক্স ওয়েবার আমলাতন্ত্র সম্পর্কে বলেছেন, 'আমলাতন্ত্র হল প্রশাসনের একটি ব্যবস্থা, যার বৈশিষ্ট্য দক্ষতা, অপক্ষপাতিত্ব এবং মানবিকতার অনুপস্থিতি।' অ্যালমন্ড ও পাওয়েলের অভিমত হলো, 'আমলাতন্ত্র সরকারের অরাজনৈতিক অংশ, যা স্থায়ী।'

আমলাতন্ত্রের রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক কিংবা পক্ষ-নিরপেক্ষ বিতর্কের পটভূমিতে তাদের মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলোর দিকে নজর দেওয়া যেতে পারে। তাহলে এদের প্রকৃত স্বরূপ এবং সঠিক অবস্থান সম্পর্কে অনুধাবন করা সহজ হবে।

প্রশাসনিক পদসোপান[সম্পাদনা]

বাংলাদেশে বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের পদগুলোকে মোটাদাগে দুইভাগে ভাগ করা যায়। একটা হল মাঠ প্রশাসন এবং অন্যটি সচিবালয়। সর্ব উপরের পদকে উপরে রেখে অধোক্রমে সাজালে সচিবালয়ের পদসোপান নিম্নরূপ-

সচিব

অতিরিক্ত সচিব

যুগ্ম সচিব

উপ সচিব

সিনিয়র সহকারী সচিব

সহকারী সচিব

একইভাবে সাজালে মাঠপ্রশাসনের পদগুলো নিম্নরূপ-

বিভাগীয় কমিশনার

ডেপুটি কমিশনার

সিনিয়র সহকারী কমিশনার

সহকারী কমিশনার

বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের কাউকে এখন প্রথমেই সচিবালয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়না। সবাইকেই মাঠপ্রশাসনে সহকারী কমিশনার পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। সেখান থেকে প্রমোশন/ট্রান্সফারের মাধ্যমে সচিবালয়ে নিয়ে আসা হয়।

পঠিত বিষয়সমূহ[সম্পাদনা]

মূলত প্রশাসন সংক্রান্ত বিষয়াবলী মেজর কোর্স এর অন্তর্ভূক্ত। এর ফলে দেশ, দেশের শাসন ব্যবস্থা, সচিবালয়, মন্ত্রণালয়, আইন সবই পাঠদানের অন্তর্ভূক্ত। এছাড়াও সাংবিধান, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, মানবসম্পদ উন্নয়ন, ব্যাংকিং, হিসাব বিজ্ঞান, বিচারিক আইন, গবেষণা পদ্ধতি, নৃবিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয় পড়ানো হয়।[১]

অধ্যয়নের পদ্ধতি[সম্পাদনা]

লোকপ্রশাসনের সাধারণত যে সকল পদ্ধতি অধ্যায়ন করা হয় সেগুলো নিচে দেওয়া হলঃ ১. ঐতিহাসিক পদ্ধতিঃ সাম্প্রতিককালে লোকপ্রশাসনের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক পদ্ধতির ব্যবহার বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ পদ্ধতি অনুসারে আদি থেকে বর্তমান যুগ পর্যন্ত প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান উৎপত্তি বৃদ্ধি ও অগ্রগতির ইতিহাস জানার পরে এর বর্তমান উপলব্ধির নির্দেশ দেয়। অবশ্য অতীতকে জানার মধ্যে প্রতিষ্ঠানকে সমভাবে বুঝে উঠা নির্ভর করে না। তবুও প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন দিক সম্পর্কে অতিত যে জ্ঞানের সন্ধান দেয় তা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিককালে ইউরোপ ও আমেরিকার প্রখ্যাত প্রশাসকগণ প্রশাসন ক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের জন্য ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর উপর বহুল পরিমাণে নির্ভর করতেছেন। ২. বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি ঃলোক প্রশাসন অধ্যায়নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি হচ্ছে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি। বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার পদ্ধতি অনুযায়ী লোকপ্রশাসন অধ্যায়নের লক্ষ্য হলো, প্রশাসনিক সমস্যার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি ও কৌশল প্রয়োগ করা। বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে ব্যবস্থাপনা কার্য পরিচালনার প্রচেষ্টার ফলে সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা আয় ব্যয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে কার্যকর কলা-কৌশলের বিকাশ ঘটে। বর্তমান সময়ে অফিসের ব্যবস্থাপনা হিসাব-নিকাশ ইত্যাদি বৈজ্ঞানিক নীতির ভিত্তিতে নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। ৩. আইনগত পদ্ধতি ঃ লোক প্রশাসনকে আইনগত দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে অধ্যায়ন করার নীতি বহুলাংশে প্রচলিত রয়েছে। সকল দেশে প্রশাসনিক আইন রাষ্ট্রীয় আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ স্বরূপ এবং সরকারি কর্তৃপক্ষ সমূহের সংগঠন ও কার্যাবলী তাদের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক তাদের ক্ষমতা ও দায়িত্ব ইত্যাদি প্রশাসনিক আইন এর আওতাভুক্ত বলে ধারণা করা হয়। এরূেপ সেখানে যেহেতু প্রশাসনের প্রশাসনিক আইন এরই অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং সেহেতু প্রশাসনকে আইনগত দৃষ্টিকোণ হতে অধ্যায়ন করা হয়। ৪. পরীক্ষামূলক পদ্ধতি ঃলোক প্রশাসন অধ্যায়নে পরীক্ষামূলক পদ্ধতি ব্যাপক পরিমাণে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রতিটি প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান এবং সংস্থাকে এক একটি পরীক্ষাগার গলে বলে মনে করা যেতে পারে। এ পরীক্ষাগারে বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সংস্কার আইন ও নীতিমালা প্রবর্তন করার মানসে নতুন নতুন কৌশল বাস্তবায়নের কাজ গৃহীত হয়।উন্নত এবং সমৃদ্ধিশালী জীবন গঠনের তাগিদে এসমস্ত নীতিমালা প্রায় পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়। ৫. রাজনীতি ভিত্তিক পদ্ধতি ঃ প্রশাসনকে রাজনৈতিক তত্ত্ব ও প্রচলিত রাজনৈতিক মূল্যবোধের উপাদান হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।প্রশাসনকে এর সামাজিক ও রাজনৈতিক পটভূমি হতে বিচ্ছিন্ন ভাবে অধ্যায়ন করা যেতে পারে এ মত রাজনীতি ভিত্তিক পদ্ধতির অনুসারীগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়। রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ হতে লোক প্রশাসনকে অধ্যায়ন করা হলে সংগঠন ব্যবস্থাপনায় ইত্যাদি সংক্রান্ত সমস্যাগুলিকে গণতান্ত্রিক আদর্শ লক্ষ্যের পটভূমিতে অনুশীলন করা যাবে। এ পথে সকল সমস্যা সমাধান করা সম্ভব। উপরুক্ত আলোচনা শেষে বলা যায় যে লোক প্রশাসনের উপরিউক্ত পদ্ধতি গুলোর মধ্যে কোনটি সঠিক পদ্ধতি তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। বস্তুত কোন একটি পদ্ধতি স্বয়ংসম্পূর্ণ নয় তবে লোকপ্রশাসন অধ্যায়নের জন্য কয়েকটি পদ্ধতির একত্র প্রয়োগই লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক। এগুলো নির্দিষ্ট করে দেয়া কোনো উপায় নেই এগুলো নির্ভর করে সম্পূর্ণভাবে প্রশাসনের সংস্কৃতির উপর।

প্রয়োজনীয়তা[সম্পাদনা]

লোকপ্রশাসন এমন একটি বিষয় যা নিজের কর্মগন্ডি সমৃদ্ধ করে ব্যবসায়ে প্রশাসনেও নিজের বিস্তৃতি ঘটিয়েছে। কলাতেও নিজের কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে। পৃথিবীর প্রত্যেকটা ছোট থেকে বড় বিষয়েই লোকপ্রশাসনের ভূমিকা রয়েছে। প্রশাসনিক ব্যবস্থার সাহায্যেই প্রত্যেকটা সংগঠন চলছে, সেটা পরিবার থেকে শুরু করে ব্যবসা কর্পোরেশন থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "কেন পড়ব লোকপ্রশাসন"প্রথম আলো। সংগ্রহের তারিখ ২৯ ডিসেম্বর ২০২১ 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]