লুকাস মারান্ডী

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
লুকাস মারান্ডী
ব্যক্তিগত
জন্ম(১৯২২-০৮-০৪)৪ আগস্ট ১৯২২
মৃত্যু২১ এপ্রিল ১৯৭১(1971-04-21) (বয়স ৪৮)
ধর্মখ্রিষ্ট

লুকাস মারান্ডী (৪ আগস্ট ১৯২২ – ২১ এপ্রিল ১৯৭১) একজন খ্রিষ্ট ধর্ম প্রচারক ছিলেন। তিনি দিনাজপুর অঞ্চলের প্রথম স্থানীয় বিশপ ছিলেন। তাকে বাংলাদেশে শহিদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে।

জীবনী[সম্পাদনা]

লুকাস মারান্ডী ১৯২২ সালের ৪ জুলাই দিনাজপুরের এক সাঁওতালি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।[১] তার বাবার নাম মাথিয়াস মারান্ডী ও মায়ের নাম মারিয়া কিস্কু। জন্মের নয়দিন পর তাকে ধর্মরীতি অনুযায়ী খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষা দেয়া হয়।

লুকাস মারান্ডী বেনীদুয়ার মিশন প্রাইমারি স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন।[১] এরপর, তিনি ১৯৩৪ সালে দিনাজপুর সাঁওতাল মিডল স্কুলে (বর্তমানে সেন্ট ফিলিপস্ বোর্ডিং স্কুল) ভর্তি হন ও সেখান থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীতে, তিনি ঐশীতত্ত্ব অধ্যয়নের উদ্দেশ্যে ইতালি গমন করেন।[১] সেখানে পড়াশোনা শেষ হলে তিনি নিজ দেশে ফিরে আসেন।

লুকাস মারান্ডী ১৯৫৩ সালের ১ ডিসেম্বর দিনাজপুর ক্যাথিড্রালের বিশপ হিসেবে নিযুক্ত হন।[১] তিনি তার সম্প্রদায়ের ধর্মীয় শিক্ষক ও নেতা হিসেবেও নিযুক্ত হয়েছিলেন। প্রথমে তাকে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটের মরিয়মপুর মিশনে পাঠানো হয়েছিল।[১] পরবর্তীতে, তাকে সেন্ট ফিলিপস্ বোর্ডিংয়ে পাঠানো হয়।

১৯৬৫ সালে লুকাস মারান্ডী দিনাজপুর ধর্মপ্রদেশের অন্তবর্তীকালীন পরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু, ভারত পাকিস্তান যুদ্ধের কারণে সেখানে মিশনারি কার্যক্রম চালাতে অসুবিধার মুখে পড়তে হয়।[১] তখন রাকে ঠাকুরগাঁওয়ের রুহিয়ায় অস্থায়ী বিশপ হিসেবে নিযুক্ত করা হয়।

মিশনারি কার্যক্রম চালানোর পাশাপাশি লুকাস মারান্ডী কৃষির উন্নতির জন্য নেতৃত্বের বিকাশের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করেছেন।[১] তিনি ঠাকুরগাঁওয়ের রুহিয়ায় একটি বোর্ডিং স্কুল চালু করেছিলেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে রুহিয়া মিশনারিতে শরণার্থীরা আশ্রয় গ্রহণ করে।[১] লুকাস মারান্ডী এসব লোকদের খাদ্য ও আশ্রয় প্রদান করেন। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য যুবকদের অনুপ্রাণিত করতেন।[১] তিনি আহত মুক্তিযোদ্ধাদের গোপনে ওষুধ ও চিকিৎসাসেবাও প্রদান করেছেন।

১৯৭১ সালের ১২ এপ্রিল লুকাস মারান্ডী মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ওষুধ সংগ্রহ করতে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারত গমন করেন।[১] ফিরে আসার পর তিন দেখেন যে রুহিয়ার মানুষেরা ভারতের শরণার্থী শিবিরগুলোতে যাওয়া শুরু করেছে। এমন সময়ে তাকে রুহিয়া মিশন ছাড়তে বলা হয়।[১] তখন তিনি তার মিশনারির লোকদের সাথে দেশত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি সীমানা অতিক্রম করলেও তিনি পরে রুহিয়ায় ফিরে এসেছিলেন।[১]

১৯৭১ সালের ২১ এপ্রিল একটি জিপে করে চারজন পাকিস্তানি সৈন্য রুহিয়া মিশনে আসে। লুকাস মারান্ডী তাদের স্বাগত জানান এবং তাদের চা ও বিস্কুট দিয়ে আপ্যায়ন করেন।[২] তাদের সন্দেহ ছিল যে, মুক্তিযোদ্ধারা মিশনের অভ্যন্তরে আশ্রয় নিয়েছে। তারা অনুসন্ধান করে কিছু না পেয়ে চলে যায়।

তিন ঘণ্টা পর গাড়িটি পুনরায় ফিরে আসে।[২] তারা লুকাস মারান্ডীকে মিশনের বাইরে নিয়ে যায়। তারা তাকে বেয়নেটের দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে।[১] তার মৃতদেহ ভারতের ইসলামপুর মিশনে নিয়ে যাওয়া হয় ও সেখানে তাকে সমাহিত করা হয়।[২]

স্মৃতি[সম্পাদনা]

লুকাস মারান্ডীর স্মরণে রুহিয়া মিশনে একটি স্মৃতিসৌধ স্থাপন করা হয়েছে।[১] রুহিয়ায় "শহীদ ফাদার লুকাস উচ্চ বিদ্যালয়" নামে একটি বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। প্রতি বছরের ২১ এপ্রিল বেনীদুয়ার মিশনে তার স্মরণে ফুটবল প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়ে থাকে। দিনাজপুরের দক্ষিণাংশে তার নামে একটি সড়কের নামকরণ করা হয়েছে।[১]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. হোসেন, ঊর্মি (২০১২)। "মারান্ডী, ফাদার লুকাস"। ইসলাম, সিরাজুল; মিয়া, সাজাহান; খানম, মাহফুজা; আহমেদ, সাব্বীর। বাংলাপিডিয়া: বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্বকোষ (২য় সংস্করণ)। ঢাকা, বাংলাদেশ: বাংলাপিডিয়া ট্রাস্ট, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটিআইএসবিএন 9843205901ওএল 30677644Mওসিএলসি 883871743 
  2. Tanveer Ahmed, S. M. (৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮)। Christian Missions in East Bengal: The Life and Times of Archbishop Theotonius Amal Ganguly, CSC (1920-1977)। Wipf and Stock Publishers। পৃষ্ঠা ১০৭। আইএসবিএন 978-1-5326-1642-6