হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান (রাঃ) (মৃত্যু-৬৫৮ খ্রিষ্টাব্দ/৩৬ হিজরী) রাসুল সঃ একজন বিশিষ্ট সাহাবা ছিলেন ।যিনি ছিলেন একজন খ্যাতনামা সেনাপতি ও দেশ বিজেতা এবং প্রখর জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন ।[১][২][৩]

নাম ও বংশ পরিচয়[সম্পাদনা]

হুজাইফা ইবন ইয়ামানের ডাকনাম ছিলো আবু আবদিল্লাহ এবং লকব । এবং তার জ্ঞানের গভীরতার কারণে উপাধি ছিলো ‘সাহিবুস শীর’।[৪] তিনি গাতফান গোত্রের "আবস" শাখার সন্তান । এজন্য তাকে আল-আবসীও বলা হয়। পিতার নাম হাসাল মতান্তরে হুসাইল ইবনে জাবির এবং মাতার নাম রাবাহ বিনতু কা’ব ইবন আদী ইবন আবদিল আশহাল । তাঁর মা মদীনার আনসার গোত্রের আবদুল আশহাল শাখার কন্যা।[৫][৬] হুজাইফা ইবনু ইয়ামানের সহোদর সমূহ ১. হুজাইফা, ২. সা’দ, ৩. সাফওয়ান, ৪. মুদলিজ, ৫. লাইলা। এঁরা ইতিহাসে ইয়ামানে বংশধর নামে খ্যাত। তাঁর চেহারা ছিলো মধ্যমাকৃতির একহারা গড়ন এবং সামনের দাঁতগুলি ছিল সুন্দর এবং প্রখর দৃষ্টিশক্তির অধিকারী ছিলো ।

নাম করণের ইতিহাস[সম্পাদনা]

হুজাইফার পিতা হুসাইল ছিলেন মূলতঃ মক্কার বনী "আবস" গোত্রের লোক। ইসলামপূর্ব যুগে তিনি নিজ গোত্রের এক ব্যক্তিকে হত্যা করে মক্কা থেকে পালিয়ে ইয়াসরিবে আশ্রয় নেন ।এবং সেখানে বনী আবদুল আশহাল গোত্রের এক কন্যা রাবাহ বিনতু কাব কে বিয়ে করেন ।বনি আবদুল আশহাল গোত্রের আদি সম্পর্ক মূলত ইয়ামানের সাথে তাই তার পুত্রের নামকরণ হয় হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান ।[৫][৭][৮]

বাল্যকাল[সম্পাদনা]

তার পিতা হুসাইল ইবনে জাবির রাসুল(সঃ) মক্কায় থাকতেই ইসলাম গ্রহণ করেন । হুসাইল ইবন জাবির মদিনায় হিজরত করলে সেখানে তার পুত্র হুজাইফা ইবনু ইয়ামান জন্মগ্রহণ করেন ।[৯] এবং ইসলামী পরিবেশে হুজাইফা বেড়ে উঠতে থাকেন । আম্মার ইবনে ইয়াসির এর সাথে তার দিনই ভ্রাতৃত্ব হয়েছিলো ।[১০]

যুদ্ধে অংশগ্রহন[সম্পাদনা]

বদরের যুদ্ধ[সম্পাদনা]

হুজাইফা ও তার পিতা রাইরে থেকে মদিনার ফেরার পথে কুরাইশরা তাদের পথ আগলে দাড়ায় ।এবং এই অঙ্গীকারনামায় তাদের পথ ছেড়ে দেয় যে তারা মদিনায় পৌঁছে যুদ্ধে মুহাম্মদকে কোন সহযোগিতা করবে না ।এই ওয়াদা পালনার্থে তারা দুজন বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি ।[৫][৮][১১][১২][১৩]

উহুদের যুদ্ধ[সম্পাদনা]

হুজাইফা উহুদ যুদ্ধে তার পিতার সাথে যোগদান করেন। তিনি দারুণ সাহসের সাথে যুদ্ধ করেন এবং নিরাপদে মদীনায় ফিরে আসেন। তবে তার বৃদ্ধ পিতা শাহাদাত বরণ করেন। উহুদ যুদ্ধের সময় বার্ধক্যে জনিত কারণে তার পিতা আল-ইয়ামান ও সাবিত ইবন ওয়াকশ দুর্গ পাহারার জন্য রেখে যাওয়া হয় । যুদ্ধ যখন তীব্র আকার ধারণ করে তখন তারা দুজনও যুদ্ধের জন্য বের হয়ে যায় । সাবিত ইবনে ওয়াকশ কুরাইশ বাহিনীরহাতে নিহত হন এবং হুজাইফার পিতা যুদ্ধের ভিড়ের মধ্যে না চেনার কারণে মুসলমান বাহিনীর হাতে নিহত হন । হুজাইফা তখন তার পিতাকে চিনতে পেরে চিৎকার করলেও কেও তার ডাক শুনেনি ।[১৪] পরবর্তীতে রাসূল(সা.) তার পিতার রক্তমূল্য দিতে চাইলে তিনি রাসুলের প্রতি ভালোবাসা দেখিয়ে তা গ্রহণ করেননি ।[১৫][১৬][১৭]

খন্দকের যুদ্ধ[সম্পাদনা]

হুজাইফা ইবন ইয়ামান খন্দক যুদ্ধে এক গুরুত্বপূর্ণ গুপ্তচরের ভূমিকা পালন করেন। খন্দকের যুদ্ধের সময় পরিবেশের ব্যপক বিপর্যয় দেখা দিলো ।কুরাইশ ও মুসলিম উভয় দল থেকেই বহু মানুষ প্রস্থান করতে লাগলো কেননা তখন প্রচণ্ড শীত পরছিল,বাতাস হচ্ছিলো যে রান্না করা সম্ভব ছিলনা ।চারিদিকে ছিলো ঘোর অন্ধকার ।[১৮] এমন পরিস্থিতিতে কেওই তাবুর বাইরে বের হয়ে কুরাইশদের খবর আনতে রাজি হচ্ছিলো না । তখন রাসুল এই দায়িত্ব হুজাইফা ইবনুল ইয়ামানকে দিলেন । হুজাইফা সেই দায়িত্ব নিস্থার সাথে পালন করেন,কুরাইশ ও আবু সুফিয়ান বাহিনীর সমস্ত খবর তিনি নিয়ে আসেন ।রাসুল(সঃ) তার প্রতি খুশি হন ।[১৯][২০][২১][২২][২৩] । খন্দক পরবর্তী রাসূলুল্লাহর সা. জীবদ্দশায় বা তার পরের সকল অভিযানে অংশগ্রহণ করেন।

হযরত রাসুলে কারীমের সা. ওফাতের পর তিনি ইরাকে বসতি স্থাপন করেন। তারপর বিভিন্ন সময় কূফা, নিস্সীবীন ও মাদায়েনে বসবাস করেন। নিস্সীবীনের ‘আল-জাযীরা’ শহরে একটি বিয়েও করেন।[২৪] হযরত হুজাইফা পারস্যের নিহাওয়ান্দ, দাইনাওয়ার, হামজান, মাহ্ রায় প্রভৃতি অঞ্চল জয় করেন এবং গোটা ইরাক ও পারস্যবাসীকে কুরআনের এক পাঠের ওপর সমবেত করেন ।[৮][২৫]

উমর রাঃ এর যুগে[সম্পাদনা]

ইরাকের বিভিন্ন অঞ্চল বিজিত হওয়ার পর হযরত উমার রা. সেখানকার ভূমি বন্দোবস্ত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এ কাজের জন্য তিনি দু’জন তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগ করেন। ফুরাত নদীর তীরবর্তী অঞ্চলসমূহে হযরত ’উসমান ইবন হুনাইফ এবং দিজলা নদীর তীরবর্তী অঞ্চলসমূহে হযরত হুজাইফাকে নিয়োগ করেন। দিজলা তীরবর্তী অঞ্চলের অধিবাসীরা ছিল ভীষণ দুষ্ট প্রকৃতির। তারা হযরত হুজাইফাকে তার কাজে কোন রকম সাহায্য তো দূরের কথা বরং নানা রকম বাধার সৃষ্টি করলো। তা সত্ত্বেও তিনি বন্দোবস্ত দিলেন। এর ফলে সরকারী আয় অনেকটা বেড়ে গেল। এরপর তিনি মদীনায় এসে খলীফা ’উমারের রা সাথে সাক্ষাৎ করলেন।[২৬] হযরত হুজাইফা ইয়ারমুক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ইয়ারমুক যুদ্ধের বিজয়ের খবর সর্বপ্রথম তিনিই মদীনায় খলীফা ’উমারের নিকট নিয়ে আসেন।[২৭]

নিহাওয়ান্দের যুদ্ধ[সম্পাদনা]

১৮ হিজরী মতান্তরে ২২ হিজরীতে নিহাওয়ান্দের ওপর সেনা অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয় ।[২৮] নিহাওয়ান্দে ছিল মূলত একটি অগ্নি উপাসনা কেন্দ্র । এই নিহাওয়ান্দের যুদ্ধে পারসিক সৈন্যসংখ্যা ছিল ১ লক্ষ ৫০ হাজার ও মুসলিম সৈন্য ছিলো ৩০ হাজার । খলীফা উমার রা. মুসলিম বাহিনীর অধিনায়ক নিয়োগ করেন হযরত [[নুমান ইবনে মুকাররিন]]কে। তারপর তিনি কূফায় অবস্থানরত হযরত হুজাইফাকে একটি চিঠিতে সেখান থেকে একটি বাহিনী নিয়ে নিহাওয়ান্দের দিকে যাত্রা করার জন্য নির্দেশ দেন। এদিকে খলীফা মুসলিম মুজাহিদদের প্রতি জারি করা এক ফরমানে বললেন, চারিদিক থেকে মুসলিম সৈন্যরা যখন এক স্থানে সমবেত হবে তখন প্রত্যেক স্থান থেকে আগত বাহিনীর একজন করে আমীর থাকবে। আর গোটা বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হবেন, নু’মান ইবন মুকরিন। নু’মান যদি শাহাদাত বরণ করেন, হুজাইফা হবেন পরবর্তী আমীর। আর তিনি শহীদ হলে আমীর হবেন জারীর ইবন আবদিল্লাহ আল-বাজালী। এভাবে খলীফা একের পর এক সাতজন সেনাপতির নাম ঘোষণা করেন। হযরত নু’মান নিহাওয়ান্দের অদূরে শিবির স্থাপন করে বাহিনীর দায়িত্ব বন্টন করেন। সেখানে হযরত হুজাইফাকে দক্ষিণ ভাগের সেনাপতি নিয়োগ করা হয় ।[২৯]

প্রচন্ড যুদ্ধের এক পর্যায়ে নুমান ইবনে মুকাররিন শাহাদত বরন করেন,সেনাপতি নির্বাচিত হন হুজাইফা । তিনি পার্শ্ববর্তী লোকদেরকে নু’মানের শাহাদাতের খবর প্রচার করতে নিষেধ করে দিলেন। আর সাথে সাথে নু’মানের স্থলে ভাই নু’য়াঈমকে দাঁড় করিয়ে দিলেন। যাতে নু’মানের শাহাদাতে যুদ্ধের ওপর কোন রকম প্রভাব না পড়ে। হুজাইফা বিজ্ঞতা ও রণ কৌশলীতে মুসলমান বিজয় লাভ করলো ।[৩০]

ইবন আসাকির বলেন,নিহাওয়ান্দের শাসক বাৎসরিক ৮ লক্ষ দিরহাম কর দানের অঙ্গীকার করে হযরত হুজাইফা(রাঃ) এর সাথে সন্ধি করেন। নিহাওয়ান্দের পর তিনি বিনা বাধায় "দায়নাওয়ার" এর বিদ্রোহী বাহিনীকে দমন করতে সক্ষম হন । তারপর হযরত হুজাইফা বিনা যুদ্ধে একে একে মাহ্, হামাজান, ও রায় জয় করেন।[৩১]

নিহাওয়ান্দের প্রধান ধর্মগুরু হতে প্রাপ্ত পারস্য সম্রাটের অতিমূল্যবান মনি-মুক্তা বিক্রি করে ৪ কোটি দিরহামে মুদ্রা অর্জন করেন । এবং এর সমস্ত অর্থ সৈন্যদের মধ্যে বিলিয়ে দেন ।[৩২]

মাহ অধিবাসীদের চুক্তি[সম্পাদনা]

মাহ্- এর অধিবাসীদের সাথে হযরত হুজাইফা রা. যে চুক্তি স্বাক্ষর করেন। তা হলঃ

‘‘হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান মাহবাসীদের জান, মাল ও বিষয়- সম্পত্তির এ নিরাপত্তা দান করছেন যে, তাদের ধর্মের ব্যাপারে কোন রকম হস্তক্ষেপ করা হবেনা। এবং ধর্ম ত্যাগের জন্য কোনরূপ জোর-জবরদস্তি করা হবে না। তাদের প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি যতদিন বাৎসরিক জিযিয়া আদায় করবে, পথিকদের পথের সন্ধান দেবে, পথ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, এখানে অবস্থানরত মুসলিম সৈনিকদের একদিন এক রাত আহার করাবে এবং মুসলমানদের শুভাকাংখী থাকবে, ততদিন তাদের এ নিরাপত্তা বলবৎ থাকবে। আর যদি তারা এ অঙ্গীকার ভঙ্গ করে বা তাদের আচরণে পরিবর্তন দেখা দেয়, তাহলে তাদের কোন দায়-দায়িত্ব মুসলমানদের ওপর থাকবে না।’’ হিজরী ১৯ সনের মুহাররাম মাসে এ চুক্তিপত্রটি লেখা হয় এবং তাতে কা’কা’, নু’য়াইম ইবন মুকাররিন ও মুয়ায়িদ ইবন মুকাররিন সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর দান করেন ।[৩৩]

উল্লেখিত অভিযানসমূহ শেষ করে হযরত হুজাইফা তাঁর পূর্বের ভূমি বন্দোবস্তদানকারী অফিসার পদে ফিরে যান।[৩৪]

আজারবাইজান অভিযান[সম্পাদনা]

বালাজুরীর বর্ণনা মতে হিজরী ২২ সনে আজারবাইজান অভিযানে হযরত হুজাইফা গোটা বাহিনীর পতাকাবাহী ছিলেন। তিনি নিহাওয়ান্দ থেকে আজারবাইজানের রাজধানী আরদাবীলে পৌঁছেন। এখানকার শাসক মাজেরওয়ান, মায়মন্দ, সুরাত, সাব্জ, মিয়াঞ্চ প্রভৃতি অঞ্চল থেকে বাহিনী সংগ্রহ করে প্রতিরোধের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। অতঃপর বাৎসরিক ৮ লাখ দিরহাম জিযিয়া দানের শর্তে সন্ধি করে। হযরত হুজাইফা সেখান থেকে মুকাম ও রুজাইলার দিকে অগ্রসর হন এবং বিজয় লাভ করেন। ইত্যবসরে মদীনার খলীফা উমার(রাঃ) থেকে তাঁর কাছে চিঠি পৌঁছে,তাঁর স্থলে উতবা ইবন ফারকাদকে নিয়োগ করা হয়েছে।[৩৫]

মাদায়েনের গভর্নর[সম্পাদনা]

হযরত সা’দ ইবন আবী ওয়াক্কাসের নেতৃত্বে মাদায়েন বিজিত হওয়ার পর উমর(রাঃ) কিছু সৈন্য মাদায়েনে রেখে গিয়ে তাকে মাদায়েনের প্রতিনিধি নিযুক্ত করেন । হুজাইফা তাঁদের বসবাসের জন্য পরিবেশ উপযোগি একটি জায়গা নির্বাচন করেন সেই স্থানই আজকে কুফা শহর নামে পরিচিত ।[৩৬]

হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলবী(রহ.) থেকে একটি বর্ণনা পাওয়া যায়,হুজাইফা ইবনুল ইয়ামন রা. মাদায়েনের প্রতিনিধি থাকাকালে এক রূপবতী এক জিম্মি ইহুদী নারীকে বিয়ে করেন । উমার(রা.) তাঁকে উক্ত মহিলা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার নির্দেশ দেন। [৩৭]

মাদায়েনে ওয়ালী থাকাকালে একবার জনতার উদ্দেশ্যে প্রদত্ত এক ভাষয়ে তিনি বলেনঃ ‘হে জনমন্ডলী! তোমরা তোমাদের দাসদের ব্যাপারে খোঁজ-খবর রাখ। দেখ, তারা কোথা থেকে কিভাবে উপার্জন করে তোমাদের নির্ধারিত মজুরী পরিশোধ করছে। কারণ, হারাম উপার্জন খেয়ে দেহে যে গোস্ত তৈরী হয় তা কক্ষনো জান্নাতে প্রবেশ করবে না। আর এটাও জেনে রাখ, মদ বিক্রেতা, ক্রেতা ও তাঁর প্রস্তুতকারক, সকলেই তা পানকারীর সমান।[৩৮]

উসমান(রাঃ) যুগে[সম্পাদনা]

হযরত উসমানের রা. খিলাফতকালের পুরো সময়টা এবং হযরত আলীর রা. খিলাফতের কিছু দিন একটানা এ দীর্ঘ সময় তিনি মাদায়েনের প্রতিনিধি পদে আসীন ছিলেন।[৫] হযরত ’উসমানের খিলাফতকালে ৩০ হিজরীতে হযরত সা’ঈদ ইবন ’আসের সাথে কূফা থেকে খুরাসানের উদ্দেশ্যে বের হন। ‘তুমাইস নামক বন্দরে শত্রু বাহিনীর সাথে প্রচন্ড সংঘর্ষ হয়। এরপর তিনি ‘রায়’ নামক স্থানে যান এবং সেখান থেকে সালমান ইবনে রাবিয়াহাবীব ইবন মাসলামার সাথে আরমেনিয়ার দিকে অগ্রসর হন। এ অভিযানে তিনি কুফী বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন।[৩৯]

হিজরী ৩১ সনে ‘খাকানে খাযার’- এর বাহিনীর সাথে বড় ধরনের একটি সংঘর্ষ হয়। এতে সালমানসহ প্রায় চার হাজার মুসলিম শহীদ হন। সালমানের শাহাদাতের পর হযরত হুজাইফা গোটা বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হন। কিন্তু অল্প কিছুদিন পর তাকে অন্যত্র বদলী করা হয় এবং তার স্তলে হযরত মুগীরা ইবন শু’বাকে নিয়োগ করা হয। হযরত হুজাইফা রা. ‘বাব’- এর ওপর তিনবার অভিযান চালান।[৪০] তৃতীয় হামলাটি ছিল হিজরী ৩৪ সনে।[৪১] এ অভিযান ছিল হযরত ’উসমানের রা. খিলাফতের শেষ দিকে। এ সকল অভিযান শেষ করে তিনি মাদায়েনে নিজ পদে ফিরে আসেন।

সন্তান সন্তানাদি[সম্পাদনা]

মৃত্যুর পূর্বে তিনি আলীর রা. নিকট বাই’য়াত করার জন্য দুই ছেলেকে অসীয়াত করে যান। তাঁরা দু’জনই ’আলীর রা. বাই’য়াত করেন এবং সিফ্ফীন যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন।[৪২]

আবু ’উবাইদাহ, বিলাল, সাফওয়ান ও সা’ঈদ নামে তাঁর চার ছেলে ছিল। ‘তাবাকাত’ গ্রন্থকার ইবন সা’দের সময় মাদায়েনে তার বংশধরগণ জীবিত ছিলেন। হযরত হুজাইফার দুই স্ত্রী ছিল বলে প্রসিদ্ধি আছে।[৪৩]

উল্লেখযোগ্য ছাত্রসমূহ[সম্পাদনা]

তাবেঈদের একটি বিরাট দল তার থেকে হাদীস বর্ণনা ও জ্ঞান অর্জন করেছেন ।[৮] তাদের কয়েকজনের নাম এখানে উল্লেখ করা হলোঃ

কায়স ইবন আবী-হাযেম

আবু ওয়ায়িল

যায়িদ ইবন ওয়াহাব

রিব’ঈ ইবন খিরাশ

যার ইবন হুবাইশ

আবু জাবইয়ান

[[হুসাইন ইবন জুনদুব]]

সিলা ইবন যুফার

আবু ইদরীস আল-খাওলানী

আবদুল্লাহ ইবন উকাইম

সুওয়াইদ ইবন ইয়াযীদ নাখ’ঈ

আবদুর রহমান ইবন ইয়াযীদ

আবদুর রহমান ইবন আবী লাইলা

হাম্মাম ইবন আল-হারিস

ইয়াযীদ ইবন শুরাইত আত-তাঈমী

বিলাল ইবন হুজাইফা প্রমুখ।[৪৪][৪৫]

চরিত্র ও আল্লাহ্‌ ভীতি[সম্পাদনা]

রাষ্ট্রীয় গুরুত্বদায়িত্ব পালনের পর তিনি সময় খুব কম পেতেন। তা সত্ত্বেও যখনই সুযোগ হতো হাদীসের দারস দিতে বসে যেতেন। কূফার মসজিদে দারসের হালকা বসতো এবং তিনি সেখানে হাদীস বর্ণনা করতেন।[৪৬] হযরত হুজাইফা ছিলেন ক্ষমা ও সহনশীলতার মূর্ত প্রতীক।[৪৭] তিনি পার্থিব ভোগ-বিলাসের প্রতি ছিলেন দারুণ উদাসীন। এ ব্যাপারে তার অবস্থা এমন ছিল যে, মাদায়েনের ওয়ালী থাকাকালেও তার জীবন যাপন অতি সাধারণ ছিলো ।[৪৮] তবে তিনি দুনিয়া ও আখিরাত সমানভাবে গ্রহণের পক্ষপাতী ছিলেন।[৪৯][৫০]

হুজাইফার একটি হাদিস[সম্পাদনা]

একবার হযরত হুজাইফা বললেনঃ রাসূল সা. আমাদেরকে দু’টি কথা বলেছিলেন। যার একটি আমি দেখেছি, আর অন্যটির প্রতীক্ষায় আছি। এমন এক সময় ছিল যখন আমি যে আমীরের হাতেই বাই’য়াত করতাম, তার ব্যাপারে আমার মধ্যে কোন রকম দ্বিধা-সংকোচ দেখা দিতনা। আমি বিশ্বাস করতাম, তার ব্যাপারে আমার মধ্যে কোন রকম দ্বিধা-সংকোচ দেখা দিতনা। আমি বিশ্বাস করতাম, সে মুসলিম হলে ইসলামের দ্বারা, আর খ্রীস্টান হলে মুসলিম কর্মচারী দ্বারা আমাদেরকে শাসন করবে। কিন্তু এখন আমি বাই’য়াতের ব্যাপারে দ্বিধাবোধ করি। আমার দৃষ্টিতে বাই’য়াতের জন্য যোগ্য ব্যক্তি মাত্র মুষ্টিমেয় কয়েকজন আছে। আমি কেবল তাদের হাতে বাই’য়াত করতে পারি।[৫১]

মৃত্যু[সম্পাদনা]

মাদায়েনে পৌঁছার পর তিনি হযরত উসমানের রা. শাহাদাতের ঘটনা অবগত হন। খলীফা ’উসমানের রা. শাহাদাতের মাত্র ৪০ দিন পর তিনিও ইনতিকাল করেন। এটা হিজরী ৩৬ সন বা ৬৫৮ খ্রীস্টাব্দের ঘটনা। ওয়াকিদী ও আল-হায়সাম ইবন আদী এ ব্যাপারে ঐক্যমত পোষণ করেছেন।[১১][৫২][৫৩][৫৪]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. তাহজীবুত তাহজীব - (২/১৯৩) 
  2. তারীখু ইবন ’আসাকির - (৪/৯৭) 
  3. হায়াতুস সাহাবা - (৩/২৫৭) 
  4. তারীখু ইবন ’আসাকির - (৪/৯৬) 
  5. আল-ইসাবা - (১/৩১৭) 
  6. আল-ইসতী’য়াবঃ আল-ইসাবার পার্শ্বটীকা - (১/২৭৭) 
  7. দ্রঃ শাজারাতুয্ যাহাব - (১/৪৪) 
  8. তাহজীবুত তাহজীব - (২/১৯৩) 
  9. সুওয়ারুন মিন হায়াতিস সাহাবা - (৪/১২২) 
  10. সীরাতু ইবন হিশাম - (১/৫০৬) 
  11. তারীখু ইবন ’আসাকির - (১/৯৪) 
  12. তারীখুল ইসলামঃ যাহাবী - (২/১৫৩) 
  13. সহীহ মুসলিম - (২/৮৯) 
  14. দ্রঃ সহীহ বুখারী - (২/৫৮১) 
  15. সীরাতু ইবন হিশাম - (২/৮৭) 
  16. হায়াতুস সাহাবা - (১/৫১৯) 
  17. সুওয়ারুন মিন হায়াতিস সাহাবা - (৪/১২৫-১২৭) 
  18. তাবাকাত - (২/৫০) 
  19. দ্রঃ সহীহ মুসলিম - (২/৮৯) 
  20. তারীখু ইবন আসাকির - (১/৯৮) 
  21. সীরাতু ইবন হিশাম - (২/২৩১ 
  22. হায়াতুস সাহাবা - (১/৩২৮-৩৩০) 
  23. সুওয়ারুন মিন হায়াতিস সাহাবা - (৪/১২৯-১৩৬) 
  24. উসুদুল গাবা - (১/৩৯৪) 
  25. আল-ইসতী’য়াব - আল-ইসাবার টীকা- (১/২৭৮) 
  26. কিতাবুজ খিরাজ। পৃষ্ঠা ২১। 
  27. তারীখু ইবন ’আসাকির - (৪/৯৩,৯৪) 
  28. তারীখু ইবন আসাকির - (১/১০০) 
  29. দ্রঃ তাবারী- (৫/২৬০১, ২৬০৫, ২৬৩২) যাহাবীঃ তারীখ- ২/৩৯-৪১  line feed character in |শিরোনাম= at position 35 (সাহায্য)
  30. রিজালুন হাওলার রাসূল। পৃষ্ঠা ১৯৯। 
  31. তারীখু ইবন ’আসাকির - (১/১০০) 
  32. তাবারী - (৫/২৬২৭, ২৬৩০) 
  33. তাবারী- (৫/২৬৩৩) 
  34. তাবারী- (৫/২৬৩৮) 
  35. বিস্তারিত বর্ণনা তারীখে বালাজুরীতে এসেছে।)। তাবারী- (৫/২৮০৬) 
  36. রিজালুন হাওলার রাসুল। পৃষ্ঠা ২০০। 
  37. (ফিক্হে ’উমারঃ শাহ ওয়ালী উল্লাহ দিহলবী, উর্দু অনুবাদ)
  38. হায়াতুস সাহাবা - (৩/৪৮২) 
  39. তাবারী - ( ৫/২৮৯৩) 
  40. তাবারী - (৫/২৮৯৪) 
  41. তাবারী - (৫/২৯৩৬) 
  42. আল-ইসতীয়াবঃ আল-ইসাবার টীকা - (১/২৭৮) 
  43. তাবাকাত - (৬/৮) 
  44. আল-ইসাবা - (১/৩১৮) 
  45. আয্-যাহাবী, তারীখ - (২/১৫২) 
  46. মুসনাদ - (৫/৪০৩) 
  47. বুখারী - (২/৫৮১) 
  48. উসুদুল গাবা - (১/৩৯২) 
  49. রিজালুন হাওলার রাসূল। পৃষ্ঠা ২০০। 
  50. হায়াতুস সাহাবা - (৩/৫১৭) 
  51. বুখারী শরীফ 
  52. দ্রঃ আল-ইসাবা - (১/৩১৮) 
  53. শাজারাতুয্ যাহাব - (১/৪৪) 
  54. আল-আ’রাম - (২/১৭১)