ব্যাডমিন্টন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
ব্যাডমিন্টন
Olympics 2012 Mixed Doubles Final.jpg
২০১২ অলিম্পিকের মিশ্র দ্বৈত স্বর্ণপদক ম্যাচে দুই চীনা‌ দ্বৈত খেলোয়াড় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।
সর্বোচ্চ ক্রীড়া পরিচালনা সংস্থাব্যাডমিন্টন ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন
প্রথম খেলা হয়েছে১৯ শতকে
বৈশিষ্ট্যসমূহ
শারীরিক সংস্পর্শনেই
দলের সদস্যএকক বা দ্বৈত
মিশ্রিত লিঙ্গহ্যাঁ
ধরণর‌্যাকেট ক্রীড়া
খেলার সরঞ্জামশাটল কক, র‌্যাকেট
ভেন্যুর‌্যাকেট কোর্ট
প্রচলন
অলিম্পিক১৯৯২ থেকে বর্তমান

ব্যাডমিন্টন হলো একটি র‌্যাকেট ক্রীড়া যা একটি জালের সম্মুখে র‌্যাকেট দিয়ে শাটল কককে আঘাত করার মাধ্যমে খেলা হয়। এটি একক (উভয় দলের একজন খেলোয়াড়ের সাথে) কিংবা দ্বৈতভাবে (উভয় দলের দুইজন খেলোয়াড়ের সাথে) দুটি দলের খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হয়। জালের দুই প্রান্তে দুইটি দল অবস্থান করার ভিত্তিতে একটি আয়তক্ষেত্রাকার কোর্টে আনুষ্ঠানিকভাবে দুই দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়। ব্যাডমিন্টন প্রায় সময়ই উঠোন বা সমুদ্রসৈকতে নৈমিত্তিক বহিরঙ্গন কার্যকলাপ হিসেবে খেলা হয়। একটি দলের খেলোয়াড় র‌্যাকেট দিয়ে শাটল কককে আঘাত করে জাল অতিক্রম করিয়ে অপরপ্রান্তের মাটি স্পর্শ করাতে পারলে পয়েন্ট হিসেবে বিবেচিত হয়।

উভয় পক্ষের খেলোয়ারগণ জালের উপর দিয়ে শাটল কককে একবার আঘাত করার সুযোগ পায়। খেলা চলাকালীন শাটল কক যদি মাটিতে পড়ে যায় কিংবা আম্পায়ার, সার্ভিস বিচারক বা কোন বিপক্ষ দলের খেলোয়াড় (বিচারকদের অনুপস্থিতিতে) কর্তৃক অপর পক্ষের দোষ বা ত্রুটি পরিলক্ষিত হয় তবে একতরফা খেলা শেষ বলে বিবেচিত হয়।[১]

শাটলকক হলো একটি পালকযুক্ত বা প্লাস্টিকের (অনানুষ্ঠানিক ম্যাচে) শঙ্কুযুক্ত আকৃতির বস্তু যা অন্যান্য খেলায় ব্যবহৃত বলগুলোর চেয়ে ভিন্নভাবে উড়ে। বিশেষ করে এর পালকগুলি এমন ভাবে তৈরি করা হয় যেন শাটল কক আরও দ্রুত গতিতে শূন্যে চলতে পারে। অন্যান্য র‌্যাকেট খেলার বলের তুলনায় শাটল ককের উড়ার গতি সবচেয়ে বেশি। শাটলককের এমন দ্রুতগতির উড্ডয়ন বৈশিষ্ট্যের কারণে এটি ব্যাডমিন্টনকে স্বতন্ত্র প্রকৃতি দিয়েছে।

ব্যাটলডোর ও শাটলককের পূর্ববর্তী খেলা থেকে ব্রিটিশ ভারতে খেলাটির বিকাশ হয়েছিল। ইউরোপীয়দের মধ্যে ডেনমার্ক খেলাটিতে আধিপত্য বিস্তার করেছিল কিন্তু খেলাটিতে সম্প্রতি চীনের আধিপত্যে রয়েছে এবং পাশাপাশি এটি এশিয়ার মধ্যে খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ১৯৯২ সাল থেকে, ব্যাডমিন্টন চারটি ইভেন্ট সহ গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে খেলা হয়। এগুলো হলো: পুরুষ একক, মহিলা একক, পুরুষ দ্বৈত এবং মহিলা দ্বৈত[২] তবে চার বছর পরে মিশ্র দ্বৈতও যোগ করা হয়। উচ্চ স্তরে খেলার জন্য খেলোয়াড়দের দৈহিক সামর্থ্য যেমন: খেলোয়াড়দের অ্যারোবিক স্ট্যামিনা, ক্ষিপ্রতা, শক্তি, গতি এবং নির্ভুলতা প্রয়োজন। এটি একটি প্রযুক্তিগত খেলাও, এটি প্রতিনিয়ত খেলার জন্য প্রয়োজন ভালো যান্ত্রিক সরঞ্জাম সমন্বয় এবং আধুনিক র‌্যাকেটের বিকাশ।[৩]

ইতিহাস[সম্পাদনা]

১৮০৪ সালের একটি চিত্রে ব্যাটলডোর ও শাটলকক খেলা
১৯৫৪ সালে জন লিচের ব্যাটলডোর ও শাটলকক খেলার চিত্র

শত শত বছর ধরে ইউরেশিয়াতে ক্রীড়া কর্মকর্তাদের মধ্যে শাটল কক দিয়ে খেলার প্রচলন ছিল,[ক] কিন্তু ব্যাটমিন্টনের আধুনিক সংস্করণটি ১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটিশ ভারতের প্রবাসী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ব্যাটলডোর এবং শাটলকক খেলার একটি রূপ হিসাবে বিকাশ লাভ করে।("র‌্যাকেট" এর পুরাতন নাম ছিল "ব্যাটলডোর"।)[৪] তবে নামটির সঠিক উৎপত্তি এখনো অস্পষ্ট। গ্লুচেস্টারশায়ারে অবস্থিত ডিউক অব বিউফোর্ট এর ব্যাডমিন্টন হাউস থেকে নামটি এসেছে,[৫] কিন্তু কেন এবং কোথা থেকে এসেছে তা অস্পষ্ট রয়ে গেছে। ১৮৬০ সালের প্রথম দিকে, আইজ্যাক স্প্র্যাট নামে লন্ডনের একজন খেলনা ব্যবসায়ী ব্যাডমিন্টন ব্যাটলডোর - এ নিউ গেম নামের একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু পুস্তিকাটির কোন অনুলিপি টিকে আছে কিনা তা জানা যায়নি।[৬] ১৮৬৩ সালে দ্য কর্নহিল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে ব্যাডমিন্টনকে "ব্যাটলডোর ও শাটলকক দুইটি পক্ষে খেলা হয়, মাটি থেকে প্রায় পাঁচ ফুট উপর পর্যন্ত একটি জাল দেওয়া হয়" হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে।[৭]

খেলাটির উন্নয়ন মূলত ভারতে ব্রিটিশ প্রবাসীদের মাধ্যমে ঘটেছে[৮] এবং ভারতে এটি ১৮৭০-এর দশকে খুব জনপ্রিয় ছিল।[৬] বল ব্যাডমিন্টন হলো এক ধরনের খেলা যা শাটলককের পরিবর্তে পশমের বল দিয়ে খেলা হতো, ১৮৫০-এর দশকের প্রথম দিকে খেলাটি ভারতের তানজাবুরে শুরু হয়েছিল।[৯] এবং প্রথমে ব্রিটিশদের দ্বারা ব্যাডমিন্টনের সাথে বিনিময়যোগ্যভাবে খেলা হত, পশমী বল দিয়ে বাতাস বা ভেজা আবহাওয়ায় এটি খেলাটি জন্য উপযুক্ত।

প্রথম দিকে, খেলাটি পুনে শহরের নাম অনুযায়ী পুনে বা পুনেহ নামে পরিচিত ছিল,[৮][১০] পরবর্তীতে এটি পুনের গ্যারিসন শহরে বিশেষভাবে জনপ্রিয় ছিল এবং সেখানে ১৮৭৩ সালে প্রথম খেলার নিয়ম তৈরি করা হয়।[৬][৭][খ] ১৮৭৫ সালে ব্রিটিশ কর্মকর্তারা বাড়ি ফিরে ফোকস্টোনে একটি ব্যাডমিন্টন ক্লাব তৈরি করেছিল। প্রাথমিকভাবে, খেলাটিতে উভয় পক্ষে ১ থেকে ৪ জন খেলোয়াড়ের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় খেলা অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তবে পরবর্তীতে উভয়পক্ষে দুইজন বা চারজন খেলোয়াড় নিয়ে খেলার প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়।[৪] শাটলককগুলিতে রবার ব্যবহার করা হয় এবং খেলার জন্য উপযুক্ত কিনা যাচাই করতে সীসার সাথে ওজন মাপা হয়।[৪] এবং এটি এমন ভাবে তৈরি করা যে, খেলার সময় শাটলকক যেন জালের সাথে আঘাত লেগে মাটিতে পড়ে যায়।[৪]

১৮৮৭ সাল পর্যন্ত পুনে নিয়ম অনুসরণ করে খেলাটি পরিচালিত হতো। পরবর্তীতে বাথ ব্যাডমিন্টন ক্লাবের জে.এইচ.ই. হার্ট সংশোধিত প্রবিধান তৈরি করেন। এরপর ১৮৯০ সালে পুনরায় হার্ট এবং ব্যাগনেল ওয়াইল্ড নিয়ম সংশোধন করেন।[৬] ইংল্যান্ডের ব্যাডমিন্টন অ্যাসোসিয়েশন ১৮৯৪ সালে এই নিয়মগুলি প্রকাশ করে এবং ১৩ সেপ্টেম্বর পোর্টসমাউথের "ডানবার"[গ] নামের একটি বাড়িতে আনুষ্ঠানিকভাবে খেলাটি চালু করে।[১২] ১৮৯৯ সালে ব্যাডমিন্টন অ্যাসোসিয়েশন অব ইংল্যান্ড প্রথম অল ইংল্যান্ড ওপেন ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়নশিপ নামের ব্যাডমিন্টন প্রতিযোগিতা শুরু করে। প্রতিযোগিতাটি ছিল পুরুষ দ্বৈত, মহিলা দ্বৈত এবং মিশ্র দ্বৈত এর জন্য তবে পরবর্তীতে ১৯০০ সালে একক প্রতিযোগিতা যোগ করা হয়। ১৯০৪ সালে একক প্রতিযোগিতা হিসেবে ইংল্যান্ড-আয়ারল্যান্ড চ্যাম্পিয়নশিপ ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছিল।[৫]

১৯৩৪ সালে প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ব্যাডমিন্টন ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিল ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েল্‌স্‌, কানাডা, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস এবং নিউজিল্যান্ড। বর্তমানে ফেডারেশনটির নাম হলো ব্যাডমিন্টন ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন। ১৯৩৬ সালে ভারত সদস্য হিসেবে অধিভুক্ত হয়। ব্যাডমিন্টন ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন এখন আন্তর্জাতিক ব্যাডমিন্টন পরিচালনা করে। যদিও ব্যাডমিন্টন এর সূচনা ইংল্যান্ডে হয়েছিল তবে প্রতিযোগিতামূলক পুরুষদের ব্যাডমিন্টন ঐতিহ্যগতভাবে ডেনমার্কের দ্বারা ইউরোপে প্রাধান্য পেয়েছিল কিন্তু বর্তমানে বিশ্বব্যাপী এশিয়ার দেশগুলো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। চীন, ডেনমার্ক, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ('চীনা তাইপেই' হিসেবে খেলছে) এবং জাপান হলো সেই দেশগুলি যারা বিগত কয়েক দশকে ধারাবাহিকভাবে বিশ্বমানের খেলোয়াড় তৈরি করেছে, সম্প্রতি পুরুষ ও মহিলাদের প্রতিযোগিতায় চীন পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছে ।

সম্প্রতি সময়ে খেলাটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি জনপ্রিয় বাড়ির উঠোন খেলায় পরিণত হয়েছে।

নিয়ম-কানুন[সম্পাদনা]

নিম্নলিখিত তথ্যগুলি ব্যাডমিন্টন ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন কর্তৃক প্রকাশিত ব্যাডমিন্টন আইনের উপর ভিত্তি করে ব্যাডমিন্টন খেলার নিয়মগুলির একটি সরলীকৃত সারসংক্ষেপ।[১৩]

কোর্ট[সম্পাদনা]

ব্যাডমিন্টন কোর্ট, আইসোমেট্রিক অভিক্ষেপ

কোর্ট সাধারণত আয়তক্ষেত্রাকার এবং একটি জাল দ্বারা অর্ধেক বিভক্ত। কোর্টগুলি সাধারণত একক এবং দ্বৈত খেলার জন্য রেখা দিয়ে চিহ্নিত করা হয়, যদিও ব্যাডমিন্টন নিয়মগুলি শুধুমাত্র একক খেলার জন্য কোর্টকে চিহ্নিত করার অনুমতি দেয়।[১৩] দ্বৈত কোর্ট সাধারণত একক কোর্টের চেয়ে প্রশস্ত কিন্তু উভয় কোর্টের দৈর্ঘ্য একই। তবে ব্যতিক্রম হলো দ্বৈত কোর্টে একটি ছোট সার্ভ-দৈর্ঘ্যের মাত্রা থাকে যা প্রায়ই নতুন খেলোয়াড়দের বিভ্রান্তির কারণ হয়।

কোর্টের সম্পূর্ণ প্রস্থ হলো ৬.১ মিটার (২০ ফুট), এবং একক কোর্টের ক্ষেত্রে এই প্রস্থ হলো ৫.১৮ মিটার (১৭.০ ফুট)। কোর্টের সম্পূর্ণ দৈর্ঘ্য হলো ১৩.৪ মিটার (৪৪ ফুট)। সার্ভিস কোর্টগুলিকে জাল থেকে ১.৯৮ মিটার (৬ ফুট ৬ ইঞ্চি) দূরত্বে একটি সংক্ষিপ্ত সার্ভিস লাইন দ্বারা কোর্টের প্রস্থকে বিভক্ত কেন্দ্র রেখা দ্বারা চিহ্নিত করা হয় এবং বাইরের দিক ও পিছনের দিক সীমানা দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। দ্বৈত কোর্টে সার্ভিস কোর্ট একটি দীর্ঘ সার্ভিস লাইন দ্বারা চিহ্নিত করা হয়, যা পিছনের সীমানা থেকে ০.৭৬ মিটার (২ ফুট ৬ ইঞ্চি) সামনে।

জালটি দুই প্রান্তে ১.৫৫ মিটার (৫ ফুট ১ ইঞ্চি) উঁচু এবং কেন্দ্রে ১.৫২৪ মিটার (৫.০০ ফুট) উঁচু। জালের দন্ড দ্বৈত সাইডলাইনে রাখা হয়, এমনকি যখন একক ভাবে খেলা হয়।

ব্যাডমিন্টনের আইনে কোর্টের উপরে ছাদের ন্যূনতম উচ্চতা উল্লেখ নেই। যাইহোক, একটি ব্যাডমিন্টন কোর্ট উপযুক্ত হবে না যদি উচ্চ পরিবেশনে ছাদে আঘাত করার সম্ভাবনা থাকে।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Boga 2008
  2. "Badminton – the Olympic Journey | BWF Olympics"olympics.bwfbadminton.com। সংগ্রহের তারিখ ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২২ 
  3. Grice 2008
  4. EB (1878).
  5. EB (1911).
  6. Adams (1980).
  7. "badminton, n.", Oxford English Dictionary 
  8. Guillain (2004), p. 47.
  9. "Ball Badminton Federation of India"ballbadmintonfederationofindia.com। ৭ জুলাই ২০১১। ৭ জুলাই ২০১১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২ 
  10. Connors, et al. (1991), p. 195.
  11. Downey (1982), p. 13.
  12. "The History of Badminton: Foundation of the BAE and Codification of the Rules", World Badminton 
  13. "Laws of Badminton"। Badminton World Federation। ৮ জানুয়ারি ২০১৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২ 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]



উদ্ধৃতি ত্রুটি: "lower-alpha" নামক গ্রুপের জন্য <ref> ট্যাগ রয়েছে, কিন্তু এর জন্য কোন সঙ্গতিপূর্ণ <references group="lower-alpha"/> ট্যাগ পাওয়া যায়নি