ব্যবহারকারী:DelwarHossain/উইঘুর মুসলিম নির্যাতন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
Uyghur people - women

উইঘুর মুসলিম সম্প্রদায় বা উইঘুর জাতি হচ্ছে মধ্য এশিয়ায় বসবাসরত তুর্কি বংশোদ্ভূত একটি জাতিগোষ্ঠী। এ সম্প্রদায় চীনের জিনজিয়াং অঞ্চলে বসবাস করে। অভিযোগ আছে চীনের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষাভাবে এ সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন করা হচ্ছে। বিশ্ব এটিকে সংখ্যালঘু নির্যাতন হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। এ বিষয়ে চীনা সরকারের তীব্র সমালোচনা হয়েছে। [১] চীনের রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত ৫৬টি নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘু সম্প্রদায় রয়েছে এর মধ্যে উইঘুর মুসলিম সম্প্রদায় অন্যতম। এ সম্প্রদায়ের ৮০ ভাগ মানুষ চীনের পশ্চিমাঞ্চলীয় শিনজিয়াং অঞ্চলের তারিম বেসিনে বসবাস করে। এদের সংখ্যা অন্তত ১ কোটি ১০ লাখ। [২] উইঘুরদের সবচেয়ে বড় সম্প্রদায় দক্ষিণ মধ্য হুনান প্রদেশে প্রাচীনকাল থেকে বসবাস করে। [৩]

সংবাদ মাধ্যম নিষিদ্ধ[সম্পাদনা]

উইঘুর সম্প্রদায়ের ওপর যেসব নির্যাতন হচ্ছে তা যেনো দেশি-বিদেশী কোনো সংবাদমাধ্যম সংগ্রহ করতে না পারে তাই শিনজিয়াং প্রদেশে প্রবেশে সাংবাদিকদের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত বিবিসির সাংবাদিকগণ দাবি করেছেন বিভিন্ন কৌশলে তারা কয়েকবার ওই এলাকায় যেতে পেরেছেন। বিবিসি সেখানে বেশ কিছু বন্দী শিবির ও বিভিন্ন স্তরে পুলিশের উপস্থিতি দেখতে পেয়েছে। পুলিশ সদস্যরা সবার মোবাইল ফোন পরীক্ষা করে দেখছেন। এছাড়া শিবির থেকে পালিয়ে অন্য দেশে চলে যেতে সক্ষম হয়েছেন এরকম কয়েকজন উইঘুরের সাথেও কথা বলেছে বিবিসি।[১]

নির্যাতনের ধরন[সম্পাদনা]

বিবিসি সংবাদমাধ্যমের কাছে ওমির নামে একজন মুসলিম বলেছেন বন্দিশিবিরে কাউকে ঠিকমতো ঘুমাতে দেয়া হয় না। কয়েক ঘণ্টা ধরে উপরে ঝুলিয়ে রেখে পেটানো হয়। কাঠ ও রবারের লাঠি দিয়ে বেধম প্রহার করা হয়। শক্ত তার দিয়ে বানানো চাবুক দিয়ে প্রহার করা হয়। সুই দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ফুটানো হয়। যন্ত্রের সাহায্যে হাতে-পায়ের নখ উপড়ে ফেলা হয়। নখ উপড়ে ফেলার পূর্ টেবিলের ওপর অস্ত্র জাতীয় যন্ত্রপাতি রেখে ভয় দেখানো হয়। এসময় বন্ধীরা ভয়ে ও আতঙ্কে চিৎকার ছেঁছামেছি করতে থাকে। ওমির কাছে বলেছে সে এসব চিৎকার অনেক শুনতে পেয়েছে। [১]


পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন শিশুরা[সম্পাদনা]

বিবিসির গবেষণায় উঠে এসেছে চীনের পশ্চিমাঞ্চলের জিনজিয়াং প্রদেশে উইঘুর মুসলিম শিশুদেরকে তাদের পরিবার থেকে আলাদা করে নেয়া হয়। এক্ষেত্রে জোরপূর্বক কোমলতি শিশুদেরকে তাদের মায়েদের কোল থেকে কেড়ে নিয়ে তাদের পরিবার থেকে দূরে রাখা হয়। এসব শিশুদেরকে মাতৃভাষার বিপরীতে আলাদা ভাষা শেখানো হচ্ছে। তাদের পিতার ধর্ম-বিশ্বাস শিশুদেরকে আলাদা ধর্মের দীক্ষা দেয়া হয়। বিবিসির প্রতিবেদন বলছে জিনজিয়াংয়ের প্রাপ্তবয়স্ক উইঘুর মুসলিমদের মধ্য থেকে সহস্রাধিক ব্যক্তিকে ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়েছে। অনেকটা দ্রুততার সাথে বোর্ডিং স্কুল তৈরির কার্যক্রম চালানো হয় সেখানে। এরমধ্যে উইঘুর অধ্যুষিত একটি শহরের ৪ শতাধিককেরও বেশি শিশুর বাবা-মাকে বিভিন্ন ক্যাম্পে বন্দি করা হয়। নির্যাতিত নারী ও শিশুদের একটি অংশ তুরস্কে আশ্রয় নেয়। এরা তুরস্কের রাজধানী ইস্তাম্বুলের বড় একটি হলরুমে রয়েছেন। তাদের সাথে বিবিসির সাংবাদিক প্রতিনিধিদল কথা বলেছে। যাদের মধ্যে অনেকের সন্তান পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে চীনে বন্দি হয়ে গেছে। এদের একজন নারী তার সন্তানের ছবি দেখিয়ে বলেন, ‘সেখানে (চীনে) তাদের দেখাশোনা কে করছে জানি না। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।’ তিন ছেলে ও এক মেয়ের ছবি দেখিয়ে আরেক মা বলেন, ‘আমি শুনেছি তাদের এক এতিমখানায় রাখা হয়েছে।’ পৃথক প্রশ্নে ৬০টির মতো আলাদা সাক্ষাতকারে শতাধিক শিশুর উধাও হওয়ার তথ্য ইস্তাম্বুলে আশ্রয় নেয়া নারীরা জানিয়েছেন। নিখোঁজ শিশুদের সবাই উইঘুর মুসলিম পরিবারের সন্তান ছিলো। [৪] [৫]

বিশ্ব প্রতিক্রিয়া[সম্পাদনা]

জাতিসংঘ নিয়ন্ত্রিত মানবধিকার কমিটি জানিয়েছে ১০ লাখ উইঘুর মুসলিমকে চীনের পশ্চিমাঞ্চলীয় শিনজিয়াং অঞ্চলে একাধিক শিবিরে বন্দী করে রাখা হয়েছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ২০১৮ সালের অগাস্ট মাস পর্যন্ত চীন সরকার উইঘর সম্প্রদায়ের বসবাসের অঞ্চলকে বন্দী শিবিরে পরিণত করা হয়েছে। সেখানে ১০ লাখ মুসলমানকে বন্দী করে রাখা হয়েছে। তবে অক্টোবর ২০১৮ তারিখে জেনেভা কনভেনশনে জাতিসংঘের এক অধিবেশনে চীনা কর্মকর্তা এ তথ্যটি অস্বীকার করেছেন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, উইঘুর সম্প্রদায়ের যেসব মুসলিমদের বিভিন্ন মুসলিম দেশে আত্মীয় স্বজন আছেন তাদেরকে এসব ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়েছে। এসব দেশের তালিকায় ইন্দোনেশিয়া, কাজাখস্তান এবং তুরস্কসহ আরো অন্তত ২৬টি মুসলিম দেশ রয়েছে। যারা মেসেজিং করছে বা হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন মাধ্যমে বিদেশের কারো সাথে যোগাযোগ করেছে তাদেরকেই টার্গেট করা হচ্ছে। ক্যাম্পে আটককৃতদেরকে জোরপূর্বক চীনা ম্যান্ডারিন ভাষা শেখানো হচ্ছে এবং প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর অনুগত করতে নির্যাতন করা হচ্ছে। পাশাপাশি আটককৃতদের নিজেদের ধর্ম বিশ্বাস তথা ইসলামের সমালোচনা করতে এবং ইসলাম পরিত্যাগে বাধ্য করা হচ্ছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আরো জানিয়েছে উইঘুর মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর কড়া নজরদারি করা হচ্ছে। বসতবাড়িগুলোর দরজায় বিশেষ নাম্বার/কোড বসিয়ে দেয়া হচ্ছে। চেহারা কিংবা মুখমন্ডল দেখে সনাক্ত করা যায় এমন ধরনের ক্যামেরা প্রযুক্তিও ব্যবহার করা হচ্ছে। যাত করে প্রতিটি বাড়িতে কারা আসা-যাওয়া করে তাদের তথ্য সরকারিভাবে বের করা সম্ভব হয়। এছাড়া উইঘুর মুসলিমদের বিভিন্ন শ্রেণি ও পদ্ধতিতে বায়োমেট্রিক সংরক্ষণ করা হচ্ছে। যাতে করে দ্রুত সনাক্ত করা হয়। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে ২০১৮ সালে চীন সফরে যাওয়ার আগে উইঘুর মুসলিম নির্যাতনের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। শিনজিয়াং-এ যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান মুসলিমদের ওপর নির্যাতন তথা মানবাধিকার লঙ্ঘনের সাথে জড়িত তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্যে যুক্তরাষ্ট্রে চীন বিষয়ক কংগ্রেস কমিটির পক্ষ থেকে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি আহবান জানানো হয়েছে । জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান মিশেল ব্যাশেলেটও শিনজিয়াংয়ে উইঘুরদের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে জাতিসংঘ পর্যবেক্ষকদের সেখানে যাওয়ার অনুমতি চেয়েছেন। [১]

যান্ত্রিক নজরদারি[সম্পাদনা]

উইঘুর মুসলিমরা তাদের প্রতিবেশীদের সাথে কি বলছে, প্রবাসে থাকা তাদের আত্মীয়-স্বজনদের যেসব কথা বলছে তার সবাটাই অ্যাপসের মাধ্যমে সংগ্রহ করে নিচ্ছে চীন সরকার। এ যান্ত্রিক অ্যাপসটির মাধ্যমে উইঘুরদের নিত্যদিনের আচরণ এবং গতিবিধিও পর্যবেক্ষণ করার বিষয়টি জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে সংক্ষেপে বলঅ হয় এইচআরডব্লিউ। এদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীন সরকার উইঘুর সম্প্রদায়সহ '৩৬ ধরণের লোকের ওপর' নজর রাখছে এবং তাদের যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করছে। বিষয়টি মানবধিকার লঙ্গন হচ্ছে বলে মানবধিকার সংগঠনগুলো তাদের প্রতিবেদনের প্রকাশ করেছে। তবে প্রতিবেদনে বিশেষ জাতিগোষ্ঠীর কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা না হলে কিছু শ্রেণির কথা বলা হয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছে উইঘুর মুসলিম বংশোদ্ভুত ‘বেসরকারি ইমামওয়াহাবি ইসলাম অনুসরণকারী মুসলিম পরিবার। [৬]

স্বাধীনতা[সম্পাদনা]

চীনের বাইরে মধ্য এশিয়ার অন্যান্য রাষ্ট্র যেমন কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক উইঘুর বাস করে। এছাড়া আফগানিস্তান, পাকিস্তান, জার্মানি, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ড, নরওয়ে, সুইডেন, রাশিয়া, সৌদি আরব, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্রতুরস্কে অল্পসংখ্যক উইঘুর রয়েছে। এরা চীনা সরারের নিয়ন্ত্রণে নয়, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে স্বাধীনভাবে বসবাস করতে পারছে। [৭]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "চীনে উইগর মুসলিম নির্যাতনের ব্যাপারে যা জানা গেছে"বিবিসি বাংলা। ১ অক্টোবর ২০১৮। সংগ্রহের তারিখ ১ জুলাই ২০১৯ 
  2. Dillon, Michael (2004). Xinjiang: China's Muslim far northwest. Routledge. আইএসবিএন ৯৭৮-০-৪১৫-৩২০৫১-১. p.24
  3. "Ethnic Uygurs in Hunan Live in Harmony with Han Chinese"People's Daily। ২৯ ডিসেম্বর ২০০০। 
  4. "মুসলিম শিশুদেরকে বাবা-মা থেকে বিছিন্ন করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে চীন"বিবিসি বাংলা। ৯ জুলাই ২০১৯। সংগ্রহের তারিখ ১০ জুলাই ২০১৯ 
  5. "চীনে মুসলিম শিশুদের আলাদা করা হচ্ছে"প্রথম আলো। ৫ জুলাই ২০১৯। সংগ্রহের তারিখ ১০ জুলাই ২০১৯ 
  6. "মোবাইল অ্যাপ দিয়ে উইগর মুসলিমদের ওপর নজরদারি করছে চীন"বিবিসি বাংলা। ২ মে ২০১৯। সংগ্রহের তারিখ ১০ জুলাই ২০১৯ 
  7. "Ethno-Diplomacy: The Uyghur Hitch in Sino-Turkish Relations" (PDF)। সংগ্রহের তারিখ ২০১১-০৮-২৮