প্রেতাত্মা

প্রেতাত্মা (ইংরেজি: Demon; ইংরেজি উচ্চারণ: [ডিমন]) হলো একটি অশুভ বা বিদ্বেষপূর্ণ অতিপ্রাকৃত সত্তা।[১] ঐতিহাসিকভাবে লোকজ্ঞান, পৌরাণিক কাহিনী, ধর্ম, গুপ্তবিদ্যা এবং সাহিত্যে প্রেতাত্মার প্রতি বিশ্বাস বা এদের নিয়ে প্রচলিত গল্পের উপস্থিতি দেখা যায়; আর এই বিশ্বাসগুলো কল্পকাহিনী, কমিক্স, চলচ্চিত্র, টেলিভিশন এবং ভিডিও গেমের মতো মাধ্যমগুলোতেও প্রতিফলিত হয়। অজানা, অদ্ভুত এবং ভয়ঙ্কর কিছুর প্রতি মানুষের ভয় থেকে উদ্ভূত হয়ে প্রেতাত্মার প্রতি এই বিশ্বাস সম্ভবত আদিম প্রস্তর যুগ থেকে চলে আসছে।[২] প্রাচীন নিকট-প্রাচ্যের ধর্মগুলোতে এবং আদি ইহুদি ধর্ম[৩] ও প্রাচীন-মধ্যযুগীয় খ্রিস্টান প্রেতাত্মাবিদ্যাসহ ইব্রাহিমীয় ধর্মগুলোতে, প্রেতাত্মাকে একটি ক্ষতিকারক আধ্যাত্মিক সত্তা হিসাবে বিবেচনা করা হয় যা মানুষের ওপর ভর করতে পারে এবং এর থেকে মুক্তির জন্য ভূত তাড়ানোর প্রয়োজন পড়ে। ইহুদি প্রেতাত্মাবিদ্যার একটি বিশাল অংশ, যা খ্রিস্টধর্ম এবং ইসলামের উপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করেছিল, সে সম্পর্কে ধারণা করা হয় যে এটি জরাথুস্ট্রবাদের একটি পরবর্তী রূপ থেকে উদ্ভূত হয়েছে এবং পারস্য যুগে ইহুদি ধর্মে স্থানান্তরিত হয়েছে।[৪]
প্রেতাত্মাদের শয়তানের অনুচর বা শয়তান হিসেবে গণ্য করা হতেও পারে, আবার না-ও হতে পারে।[২] অনেক ঐতিহ্যে প্রেতাত্মারা স্বাধীনভাবে কাজ করে, যেখানে ভিন্ন ভিন্ন প্রেতাত্মা সাধারণত ভিন্ন ভিন্ন ধরনের অশুভ (যেমন: ধ্বংসাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নির্দিষ্ট রোগব্যাধি ইত্যাদি) ঘটায়। অন্যদিকে, একটি ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামোর অধীনে প্রেতাত্মারা যখন সরাসরি ঐশ্বরিক নীতির বিরোধিতা করে, তখন তাদের প্রায়শই শয়তান হিসেবে অভিহিত করা হয়।[৫] শয়তানের কাজ সম্পাদনকারী অপেক্ষাকৃত নিম্নস্তরের আত্মা হিসেবে তাদের আরও কিছু অতিরিক্ত দায়িত্ব থাকে— যেমন মানুষের মনে পাপচিন্তা জাগানো এবং মানুষকে পাপকাজে লিপ্ত হতে প্ররোচিত করা।[৬]
মূল প্রাচীন গ্রিক শব্দ (daimōn; δαίμων; ডাইমন) কোনো নেতিবাচক অর্থ বহন করত না, কারণ এটি মূলত আত্মা বা দৈব শক্তিকে নির্দেশ করত।[৭] ডাইমন সম্পর্কিত গ্রিক ধারণাটি প্লেটোর দার্শনিক রচনাসমূহে বিশেষভাবে লক্ষণীয়, যেখানে এটি সক্রেটিসের ঐশ্বরিক অনুপ্রেরণাকে বর্ণনা করার জন্য ব্যবহৃত হয়। খ্রিস্টধর্মে, নৈতিকভাবে নিরপেক্ষ ডাইমন-এর স্থান দখল করে নেয় ডিমনস বা প্রেতাত্মারা, যারা কেবল কলুষতা সাধনে লিপ্ত অশুভ শক্তি।[৮] এই প্রেতাত্মারা গ্রিকদের সেই মধ্যস্থতাকারী আত্মা ছিল না, বরং তারা ছিল একপ্রকার বৈরী সত্তা, যার ধারণা ইতিমধ্যে ইরানি বিশ্বাসে বিদ্যমান ছিল।[৯] পাশ্চাত্য গূঢ়বাদ এবং রেনেসাঁ যুগের জাদুতে—যা গ্রিকো-রোমান জাদু, ইহুদি আগাদাহ এবং খ্রিস্টীয় প্রেতাত্মাবিদার সংমিশ্রণে উদ্ভূত হয়েছিল—প্রেতাত্মাকে এমন এক আধ্যাত্মিক সত্তা হিসেবে বিশ্বাস করা হয় যাকে আবাহন এবং নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
অনেক আধুনিক ধর্ম এবং গূঢ় ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে প্রেতাত্মাদের প্রতি বিশ্বাস আজও বিদ্যমান। জীবিত প্রাণীদের ওপর ভর করার কথিত ক্ষমতার কারণে প্রেতাত্মারা আজও ব্যাপকভাবে ভয়ের কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।[১০] সমসাময়িক পশ্চিমা রহস্যবাদী ঐতিহ্যে, প্রেতাত্মাকে অনেক সময় মানুষের অভ্যন্তরীণ মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার রূপক (যাকে "অভ্যন্তরীণ প্রেতাত্মা" বলা হয়) হিসেবেও ব্যবহার করা হয়।
ব্যুৎপত্তি
[সম্পাদনা]

প্রাচীন গ্রিক শব্দ δαίμων (daimōn) বলতে কোনো আত্মা বা ঐশ্বরিক শক্তিকে বোঝায়, যা অনেকটা লাতিন শব্দ জিনিয়াস বা নুমেন-এর মতো। Daimōn শব্দটি সম্ভবত গ্রিক ক্রিয়া daiesthai ('বিভাজন করা' বা 'বণ্টন করা') থেকে এসেছে।[১১] প্লেটোর দার্শনিক রচনায় গ্রিক ডাইমন-এর ধারণাটি বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয়, যেখানে এটি সক্রেটিসের ঐশ্বরিক অনুপ্রেরণাকে বর্ণনা করে। মূল গ্রিক শব্দ daimōn-এর মধ্যে সেই নেতিবাচক ভাবার্থ ছিল না যা প্রাথমিকভাবে কোইনে শব্দ δαιμόνιον (daimonion)-এর ব্যবহারের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল,[৭] এবং পরবর্তীতে একই মূল থেকে উদ্ভূত অন্যান্য সমজাতীয় শব্দগুলোর ওপর আরোপিত হয়েছিল।
গ্রিক শব্দগুলোর মধ্যে অশুভ বা প্রতিহিংসাপরায়ণতার কোনো অর্থ নিহিত ছিল না। রোমান সাম্রাজ্যের শুরুর শতাব্দীগুলোতে, পূজ্য প্রতিমূর্তিকে পৌত্তলিক এবং তাদের প্রতিবেশী খ্রিস্টান—উভয় পক্ষই গ্রিক-রোমান দেবতাদের ঐশ্বরিক উপস্থিতির আধার হিসেবে দেখত: "প্যাগানদের মতোই খ্রিস্টানরাও ঈশ্বরের অস্তিত্ব ও তাদের ক্ষমতা অনুভব করত এবং দেখত; আর যেহেতু তাদের ধরে নিতে হয়েছিল যে এর পেছনে কোনো শক্তি বিদ্যমান, তাই দৃষ্টিভঙ্গির এক সহজ প্রথাগত পরিবর্তনের মাধ্যমে তারা এই প্যাগান প্রেতাত্মাদের অশুভ দানব বা সাতানের অনুচরে রূপান্তরিত করে। বাইজেন্টাইন আমলের অনেক পরেও, খ্রিস্টানরা তাদের শহরের পুরনো প্যাগান ভাস্কর্যগুলোকে প্রেতাত্মাদের আস্তানা হিসেবে দেখত। সেগুলো আর সুন্দর ছিল না, বরং ছিল 'উপদ্রুত'।"[১২] গ্রিক ভাষায় হিব্রু বাইবেলের সপ্ততি অনুবাদে শব্দটি প্রথম নেতিবাচক অর্থ লাভ করে, যা প্রাচীন সেমিটিক ধর্মের পৌরাণিক কাহিনীর ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীতে এটি নূতন নিয়মের কোইনে গ্রিক পাঠ্যেও অন্তর্ভুক্ত হয়।
শয়তানের সমার্থক শব্দ হিসেবে ইংরেজি ডিমন (প্রেতাত্মা) শব্দের ব্যবহার অন্তত ৮২৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত পুরোনো। তবে জার্মান শব্দ (Dämon), শয়তান (Teufel) এবং অশুভ আত্মা হিসেবে পরিচিত প্রেতাত্মা থেকে আলাদা; বরং এটি মূল গ্রিক daimōn শব্দের আদি অর্থের সঙ্গেই বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ।[১৩] আর্স গোয়েশিয়াতে প্রদর্শিত পশ্চিমা আধুনিক ইতিহাসের প্রেতাত্মা সংক্রান্ত যে ধারণা, তা মূলত প্রান্তন প্রাচীনত্বের তৎকালীন জনপ্রিয় সংস্কৃতি থেকেই নিরবচ্ছিন্নভাবে উদ্ভূত হয়েছে।
আরও দেখুন
[সম্পাদনা]তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ Martin, Dale Basil. "When Did Angels Become Demons?" Journal of Biblical Literature, vol. 129, no. 4, 2010, pp. 657–58. ডিওআই:10.2307/25765960. Accessed 5 January 2025.
- 1 2 Brandon 1970.
- ↑ Angelini 2021।
- ↑ Boyce 1987; Duchesne-Guillemin 1988.
- ↑ Erdağı, D.; Evil in Turkish Muslim horror film: the demonic in “Semum”. SN Soc Sci 4, 27 (2024). https://doi.org/10.1007/s43545-024-00832-w
- ↑ Nixey 2018, Chapter 2, "The Battleground of Demons"।
- 1 2 Liddell ও Scott n.d.
- ↑ Rees 2012, পৃ. 81।
- ↑ Brown 1970, পৃ. 28।
- ↑ Van Eyghen, Hans (১৪ এপ্রিল ২০২৩)। The Epistemology of Spirit Beliefs। Routledge। ডিওআই:10.4324/9781003281139। আইএসবিএন ৯৭৮১০০৩২৮১১৩৯।
- ↑ "Demon"। Merriam-Webster Dictionary। ৭ মে ২০১২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১২ এপ্রিল ২০১২।
- ↑ Lane Fox 1988, পৃ. 137।
- ↑ Russell 1986, পৃ. 37।
বহিঃসংযোগ
[সম্পাদনা]- ক্যাথলিক চার্চের প্রশ্নোত্তর (Catechism of the Catholic Church): অনলাইন ক্যাথলিক চার্চের প্রশ্নোত্তরে প্রেতাত্মা সংক্রান্ত হাইপারলিঙ্কযুক্ত তথ্যসূত্র
- ডিকশনারি অব দ্য হিস্ট্রি অব আইডিয়াস: প্রেতাত্মাবিদ্যা