প্রত্যয়পত্র

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

প্রত্যয়পত্র (ইংরেজি: Letter of credit) সংক্ষেপে এলসি হল আমদানিকারকের পক্ষে এবং রপ্তানিকারকের অনুকূলে আমদানিকৃত পণ্যের মূল্য পরিশোধের নিশ্চয়তা। অর্থাৎ, আমদানিকারকের পক্ষে এবং রপ্তানিকারকের অনুকূলে আমদানিকৃত পণ্যের মূল্য পরিশোধের নিশ্চয়তা প্রদান করে আমদানিকারকের ব্যাংক যে পত্র ইস্যু করে তাকে প্রত্যয়পত্র বা এলসি বলে।[১]

আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে রপ্তানিকারক কর্তৃক রপ্তানিকৃত পণ্যের মূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে আমদানিকারকের পক্ষে ব্যাংকের মাধ্যমে প্রত্যয়পত্র বা লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) খোলার প্রচলন হয়। প্রত্যয়পত্র বা লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) কে কখনো কখনো ঋণপত্রও বলা হয়।[২] প্রত্যয়পত্র/লেটার অব ক্রেডিট বা ঋণপত্র হচ্ছে এমন একটি ব্যবস্থা যার মাধ্যমে প্রত্যয়পত্র ইস্যুকারি ব্যাংক রপ্তানিকারকের প্রতি এই মর্মে অপ্রত্যাহারযোগ্য নিশ্চয়তা প্রদান করে যে, যদি রপ্তানিকারক বা ঋণপত্রের বেনিফিশিয়ারি ঋণপত্রে বর্ণিত শর্তপূরণ সাপেক্ষে ঋণপত্রে নির্দিষ্ট মূল্যের ভিত্তিতে ঋণপত্রে উল্লেখিত পরিমাণ পণ্য বা সেবা রপ্তানি করে ঋণপত্রে বর্ণিত শর্ত পূরণ এর পক্ষে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট (যেমন: ইনভয়েস, প্যাকিংলিষ্ট, পরিবহন দলিল, বিল অব এক্সচেঞ্জ, কান্ট্রি অব অরিজিন ইত্যাদি) ঋণপত্র ইস্যুকারি ব্যাংক বা তার মনোনীত কোন ব্যাংকে যথাযথভাবে উপস্থাপন করে তাহলে প্রত্যয়পত্র ইস্যুকারি ব্যাংক প্রত্যয়পত্রে বেনিফিশিয়ারকে মূল্য পরিশোধ করতে বাধ্য থাকবে। তাই রপ্তানিকারক প্রত্যয়পত্রে-এর মাধ্যমে তার পণ্যের মূল্য প্রাপ্তি সম্পর্কে যেমন নিশ্চিন্ত হতে পারে তেমনি আমদানিকারকও প্রত্যয়পত্রে-এর বিপরীতে পণ্য প্রাপ্তির পর রপ্তানিকারককে পণ্য মূল্য পরিশোধ করতে পারে।[৩]

প্রত্যয়পত্রের প্রক্রিয়া

প্রত্যয়পত্র বা লেটার অব ক্রেডিট ক্রেডিট-এর পক্ষসমূহ[সম্পাদনা]

প্রত্যয়পত্রের মূল পক্ষ ৩টি। যথা :

  • আমদানিকারক/ইম্পোর্টার/বায়ার - যিনি বা যার অনুরোধে ব্যাংক প্রত্যয়পত্র খোলেন;
  • রপ্তানিকারক/বিক্রেতা/বেনিফিশিয়ারি - যার অনুকুলে প্রত্যয়পত্র খোলা হয়;
  • ব্যাংক- যে বা যে প্রতিষ্ঠান প্রত্যয়পত্র প্রদান করেন।

উপরোক্ত পক্ষসমূহ ছাড়াও আরও কয়েকটি ব্যাংক প্রত্যয়পত্রের সাথে জড়িত থাকে। যেমন- ·

  • পরামর্শক/এডভাইজিং ব্যাংক: রপ্তানিকারকের দেশে অবস্থিত যে ব্যাংকের মাধ্যমে এল সি এডভাইস পাঠানো হয় তাকে এডভাইজিং ব্যাংক বলে।
  • নিশ্চিতকারী/ কনফার্মিং ব্যাংক: যে ব্যাংক ইস্যুকারী ব্যাংকের অনুরোধে প্রত্যয়পত্রে তার নিশ্চয়তা (কনফার্মেশন) প্রদান করে তাকে কনফার্মিং ব্যাংক বলে। এটা এডভাইজিং ব্যাংকও হতে পারে।
  • মধ্যস্থতাকারী/ নেগোশিয়েটিং ব্যাংক: এটা এমন এক ব্যাংক (প্রত্যয়পত্রে উল্লেখিত ব্যাংক বা প্রত্যয়পত্রে উল্লেখ না থাকলেও যেকোন ব্যাংক) যেখানে প্রত্যয়পত্রের বেনিফিশিয়ারি উক্ত প্রত্যয়পত্রের/ঋণপত্রে নিদিষ্ট মূল্যের ভিত্তিতে ঋণপত্রে উল্লেখিত পরিমাণ পণ্য বা সেবা রপ্তানির স্বপক্ষে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস-এর বিপক্ষে ঋণ নিতে সক্ষম।
  • পরিশোধকারী/রিইমবার্সিং ব্যাংক: যে ব্যাংকের উপর বিল এর মূল্য দেওয়া হয় তাকেই পরিশোধকারী/রিইমবার্সিং ব্যাংক বলে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ইস্যুয়িং ব্যাংকই পরিশোধকারী/রিইমবার্সিং ব্যাংক ব্যাংক হিসেবে কাজ করে।

প্রত্যয়পত্র বা লেটার অব ক্রেডিটের ধরন[সম্পাদনা]

অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রত্যয়পত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। প্রত্যয়পত্র বা লেটার অব ক্রেডিটের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে একটি বিশেষ ঋণের দলিল বা হাতিয়ার। সাধারণত প্রত্যয়পত্র বা লেটার অব ক্রেডিট (ইররিভোকেবল) অপ্রত্যাহারযোগ্য প্রকৃতির হয়ে থাকে। তাছাড়া কাজের প্রকৃতি ও চাহিদার উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন প্রকার প্রত্যয়পত্র দেখা যায়।[৪] যথা-

  • স্থির বা অপ্রত্যাহারযোগ্য প্রত্যয়পত্র (Irrevocable LC)
  • খোলা বা প্রত্যাহারযোগ্য প্রত্যয়পত্র (Revocable LC)
  • নিশ্চিত প্রত্যয়পত্র (Confirmed LC)
  • অনিশ্চিত প্রত্যয়পত্র (Unconfirmed LC)
  • ঘূর্ণায়ন বা আবর্তিতমান প্রত্যয়পত্র (Revolving LC)
  • ব্যাক টু ব্যাক প্রত্যয়পত্র
  • নির্দিষ্ট প্রত্যয়পত্র (Fixed LC)

উপরোক্ত প্রত্যয়পত্র ছাড়াও ক্ষেত্র বিশেষ আর কয়েক ধরনের প্রত্যয়পত্র দেখা যায়।

প্রত্যয়পত্র বা লেটার অব ক্রেডিট খুলতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসমূহ[সম্পাদনা]

প্রত্যয়পত্র খুলতে আগ্রহী আমদানিকারক/ ইম্পোর্টার এর প্রত্যয়পত্র ইস্যুকারী ব্যাংক-এ অবশ্যই ব্যাংক একাউন্ট বা ব্যাংক হিসাব থাকতে হবে। এছাড়া এল সি খোলার জন্য যেসব কাগজপত্র প্রয়োজন তা হচ্ছে:

  • আমদানি নিবন্ধন সনদপত্র (আই আর সি)[৫]
  • কোন স্বীকৃত চেম্বার বা এসোসিয়েশনের সদস্য সনদ পত্র
  • বীমা/ইন্স্যুরেন্স কভার নোট এবং ইন্স্যুরেন্স প্রিমিয়াম পরিশোধ রশিদ
  • প্রোফর্মা ইনভয়েস (পি আই) বা ইনডেন্ট এর কপি
  • টিন সার্টিফিকেট
  • ট্রেড লাইসেন্স
  • ভ্যাট সার্টিফিকেট
  • জাতীয় পরিচয় পত্র কপি

এছাড়া ব্যাংক-এর সরবরাহ করা নিন্মক্ত কাগজপত্রাদি পূরণ ও স্বাক্ষর করে জমা দিতে হয়।

  • এল সি এপ্লিকেশন ফরম (এলসিএএফ)
  • আই এম পি ফরম
  • ব্যাংক চুক্তি সংক্রান্ত ডকুমেন্ট
  • গ্যারান্টি ফরম

যদি এল সি খোলার সময় জামানত বা সিকিউরিটি প্রদান করতে হয় তাহ’লে উক্ত জামানত বা সিকিউরিটির সঙ্গে সম্পৃক্ত সকল কাগজপত্র ব্যাংকে জমা দিতে হবে।

প্রত্যয়পত্র বা লেটার অব ক্রেডিট গুরুত্ব ও সুবিধা[সম্পাদনা]

আমদানি-রপ্তানির প্রতি পদে পদে ঝুঁকি বিরাজমান। রপ্তানিকারকের ভয় থাকে যদি ক্রেতা পণ্যের মূল্য পরিশোধে ব্যর্থ হয়। আবার আমদানিকারকের ভয় থাকে অর্থ পেয়ে যদি বিক্রেতা মালামাল না পাঠায়। এক দেশ থেকে আরেক দেশে দূরত্বের কারণে বিরোধ নিষ্পত্তি করা সহজ হয়না। এসব ঝুঁকি এড়াতে পণ্যের ক্রয় বিক্রয়ে লেটার অব ক্রেডিট বা ডকুমেন্টরি ক্রেডিটের ব্যবহার জনপ্রিয় হয়ে উঠে। এর মাধ্যমে বিক্রেতাকে এক ধরনের গ্যারান্টি প্রদান করা হয় যে, বিক্রেতা তার পণ্যের মূল্য নিশ্চিতভাবে বুঝে পাবে এবং ক্রেতা এই মর্মে নিশ্চিত হবেন যে, পণ্য তার জিম্মায় না পৌঁছানো পর্যন্ত কোন আর্থিক লেন-দেন সম্পন্ন হবে না। লেটার অব ক্রেডিট হচ্ছে মুলত: ব্যাংকের দেওয়া এক ধরনের গ্যারান্টি যে নির্দিষ্ট বিক্রেতা কোন পণ্য বা সেবা বিক্রয়ের জন্য তার প্রাপ্য সে ক্রেতার কাছ থেকে পাবে। ব্যাংক নিশ্চিত ক’রে বলে দেয়, ক্রেতা ঠিক কোন্ সময়ে কোন্ কোন্ কাগজ পত্রের ভিত্তিতে প্রাপ্য অর্থ পাবে।[৬] এর বিনিময়ে বিক্রেতার কাছ থেকে অর্থ পাবার জন্য কঠোর শর্ত পালনের অঙ্গীকার গ্রহণ করে থাকে। এর মধ্যে থাকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট- যেমন শিপিং-এর প্রমাণ পত্র-বিল অব লেডিং।[৭]

প্রত্যয়পত্র ব্যবহারে বিক্রেতার সুবিধা[সম্পাদনা]

ক্রয়-বিক্রয়ে লেটার অব ক্রেডিট ব্যবহারের ফলে ক্রেতা এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারেন যে, সে কত টাকা পাবে বা কোন্ সময়ে পাবে। রপ্তানিকারকের কাছে লেটার অব ক্রেডিট অর্থ প্রাপ্তির নিরাপদ মাধ্যম। অবশ্য এজন্য তাকেও এল সি-তে বর্ণিত শর্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পালন করতে হয়। অর্থ না পাবার ঝুঁকি এল সি-র ক্ষেত্রে ব্যক্তির থেকে ব্যাংকের কাছে হস্তান্তরিত হয়।

প্রত্যয়পত্র ব্যবহারে ক্রেতার সুবিধা[সম্পাদনা]

প্রত্যয়পত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে ক্রেতা নিশ্চিত হয় যে, বিক্রেতা তার শর্ত যথাযথভাবে পূরণ করেছে কারণ প্রতিটি পদক্ষেপে তাকে ডকুমেন্টরি এভিডেন্স ব্যাংকে জমা দিতে হয়। যেমন পণ্যের শিপমেন্ট হয়েছে কিনা তা বিল অব লেডিংস-এর মাধ্যমে প্রমাণ মেলে। যেহেতু বিল অব লেডিংস শিপিং কোম্পানি অর্থাৎ একটি তৃতীয় পক্ষ প্রদান করে, এখানে ক্রেতা শিপমেন্টের তারিখ নিয়ে ছল-চাতুরি করতে পারে না। তেমনি পণ্যের মানের ক্ষেত্রেও তৃতীয় পক্ষ ইন্সপেকশন কোম্পানি সনদপত্র প্রদান করলে তা ব্যাংকে জমা দিতে হয়। কারণ অনেক সময় এল সি-তে এই সনদ পত্র জমা দেওয়ার বিধান থাকে এবং ব্যাংক এই সনদ পত্র ব্যতিত ক্রেতার প্রাপ্য অর্থ ছাড় করণের পদক্ষেপ গ্রহণ করে না। প্রত্যয়পত্র বা লেটার অব ক্রেডিট ব্যবহারের ফলে ক্রেতা বা বিক্রেতা উভয়কেই বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হয়। প্রত্যয়পত্র প্রতিপালনের জন্য ব্যাংক নির্দিষ্ট হারে চার্জ আদায় করে। রপ্তারিকারক হলে তাকে মনে রাখতে হবে প্রত্যয়পত্রে বর্ণিত সকল কার্যক্রম যথাযথভাবে পালন করলেই কেবল সে তার প্রাপ্য দাবি করতে পারে, অন্যথায় তার পাওনা আটকে যেতে পারে। প্রত্যয়পত্র ব্যবহারের ফলে পণ্য সরবরাহে দেরি হতে পারে। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ি সকল আমদানি কেবল প্রত্যয়পত্র মাধ্যমে সম্পন্ন হতে হবে। উন্নয়নশীল দেশগুলো অর্থ যাতে সহজে পাচার হয়ে যেতে না পারে সেজন্য প্রত্যয়পত্র এর মত পদ্ধতি বাধ্যতামুলক করে থাকে। লেটার অব ক্রেডিট সঠিক ডকুমেন্ট নিয়ে কাজ করে তবে সঠিক পণ্যের নিশ্চয়তা দেয়না।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "ফিন্যান্স, ব্যাংকিং ও বীমা দ্বিতীয় পত্র | কালের কণ্ঠ"Kalerkantho। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৩-১৩ 
  2. Garcia, RLF (২০০৯)। "Autonomy principle of the letter of credit"। Mexican Law Review 
  3. "Bangladesh Customs, National Board of Revenue (NBR)"www.bangladeshcustoms.gov.bd। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৩-১৩ 
  4. Express, The Financial। "Standby L/C — An alternative to commercial L/C for Bangladesh"The Financial Express (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৩-১৩ 
  5. "The Bangladesh Trade Portal - View1 SearchProcedure"www.bangladeshtradeportal.gov.bd। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৩-১৩ 
  6. Trimble, R.F. (১৯৪৮)। "The Law Merchant and the Letter of Credit"। Harvard Law Review 
  7. "When a non-bank issues a letter of credit"ICC - International Chamber of Commerce। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৩-১৩