কেন্দ্র (জ্যামিতি)

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
যেকোন বৃত্তের ব্যাস বৃত্তটির কেন্দ্র দিয়ে অতিক্রম করে। অর্থাৎ ব্যাস হল কেন্দ্রগামী জ্যা

জ্যামিতিতে কোন বস্তুর কেন্দ্র বলতে এর মধ্যবর্তী বিন্দুকে বোঝানো হয়। কেন্দ্রের বিস্তৃত সংজ্ঞাটিকে বিবেচনায় নিলে এর আলোকে বলা যায়, কোন বস্তুর কেন্দ্র থাকবে না যদি জ্যামিতিকে আইসোমেট্রি সম্পর্কিত জ্ঞান হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বৃত্ত, গোলক ও রেখাংশের কেন্দ্র[সম্পাদনা]

বৃত্তের ক্ষেত্রে এর প্রান্তবিন্দুগুলো অর্থাৎ পরিধিস্থ বিন্দুগুলো বৃত্তটির অন্তস্থ যে নির্দিষ্ট বিন্দুটি থেকে সমদূরবর্তী সেই বিন্দুটিকে ঐ বৃত্তের কেন্দ্র বলা হয়। অর্থাৎ যে নির্দিষ্ট বিন্দু থেকে বৃত্তের পরিধির সকল বিন্দুর দুরত্ব সমান সেই নির্দিষ্ট বিন্দুটিই বৃত্তের কেন্দ্র।[১] অনুরূপভাবে, কোন গোলকের অভ্যন্তরীণ যে বিন্দুটি গোলকের পৃষ্ঠের সকল বিন্দু থেকে সমদূরবর্তী সেটাই গোলকের কেন্দ্র। কোন গোলককে সুষম পুরুত্বের অসংখ্য চাকতিতে কর্তন করা হলে গোলকের কেন্দ্রগামী চাকতিটির ব্যাসার্ধ সর্বাধিক হবে। আবার কোন রেখাংশের কেন্দ্র হল এর প্রান্তদ্বয়ের মধ্যবিন্দু। কোন রেখাংশের কেন্দ্রবিন্দু এবং রেখাংশটির প্রান্তদ্বয় থেকে সমদূরবর্তী অন্য কোন বিন্দুর সংযোজক সরল রেখা ঐ রেখাংশের উপর লম্ব।

সিমেট্রিক বা প্রতিসাম্যিক বস্তুর কেন্দ্র[সম্পাদনা]

প্রতিসাম্যের বৈশিষ্ট্যযুক্ত বস্তুতে প্রতিসাম্যিক ক্রিয়া সত্ত্বেও যে বিন্দুটি (অর্থাৎ বিন্দুটির অবস্থান) অপরিবর্তিত থাকে তাই প্রতিসাম্যের কেন্দ্র। ফলে বর্গ, আয়তক্ষেত্র, রম্বস অথবা সামান্তরিকের কেন্দ্র এদের কর্ণদ্বয়ের ছেদবিন্দুতে অবস্থিত। কর্ণদ্বয়ের ছেদবিন্দুই এসব ক্ষেত্রের ঘূর্ণন প্রতিসাম্যের বিন্দু। অনুরূপভাবে উপবৃত্তঅধিবৃত্তের কেন্দ্র এদের অক্ষসমূহের ছেদবিন্দুতে অবস্থিত।

ত্রিভুজের কেন্দ্র[সম্পাদনা]

সমবাহু ত্রিভুজের পরিকেন্দ্র, ভরকেন্দ্র, অন্তঃকেন্দ্র, লম্বকেন্দ্র এবং নয়-বিন্দুর কেন্দ্র একই। সমবাহু ত্রিভুজে বিন্দুটির অবস্থান ত্রিভুজের শীর্ষ থেকে ভূমির দিকে দুই-তৃতীয়াংশ লম্ব দূরত্বে।

নিচের বিশেষ কয়েকটি বিন্দুকে প্রায়ই ত্রিভুজের কেন্দ্র হিসেবে আলোচনা করা হয়ে থাকে। তবে ত্রিভুজের কেন্দ্রের সংখ্যা আদতে এত বেশি যে এটা নিয়ে বিশালাকার গ্রন্থ রচনা করা যাবে।

  • পরিকেন্দ্র (circumcentre): ত্রিভুজের বাহুত্রয়ের লম্ব-সমদ্বিখন্ডকত্রয় সমবিন্দু। এই বিন্দুই ত্রিভুজের পরিকেন্দ্র। অন্যভাবে কোন বৃত্তের অভ্যন্তরে বৃত্তের পরিধি ঘেষে একটি ত্রিভুজ অঙ্কন করা হলে এই বৃত্তের কেন্দ্রই হবে উল্লেখিত ত্রিভুজের পরিকেন্দ্র। উল্লেখিত বৃত্তটিকে পরিবৃত্ত বলে। সংক্ষেপে কোন কোন ত্রিভুজের শীর্ষত্রয় দিয়ে গমনকারী বৃত্তের কেন্দ্রই ত্রিভুজের পরিকেন্দ্র।
  • ভরকেন্দ্র (centroid): ত্রিভুজের যে কোন শীর্ষবিন্দু এবং তার বিপরীত বাহুর মধ্যবিন্দুর সংযোজক সরলরেখাকে মধ্যমা বলে। ত্রিভুজের মধ্যমাত্রয় সমবিন্দু। এ বিন্দুটিই ত্রিভুজের ভরকেন্দ্র। ত্রিভুজটি সুসম ঘনত্বের হলে ভরকেন্দ্র হবে এর ভারসাম্যের বিন্দু। ত্রিভুজের ভরকেন্দ্র প্রত্যেক মধ্যমা কি ২:১ অনুপাতে অন্তর্বিভক্ত করে।
  • অন্তঃকেন্দ্র (incentre): ত্রিভুজের কোণত্রয়ের সমদ্বিখণ্ডক রেখা তিনটি যে বিন্দুতে মিলিত হয় সেই বিন্দুটিই ত্রিভুজটির অন্তঃকেন্দ্র। ত্রিভুজের অভ্যন্তরে অঙ্কিত বৃত্তকে অন্তঃবৃত্ত বলা হয়। অন্তঃবৃত্তের কেন্দ্রই উল্লেখিত ত্রিভুজের অন্তঃকেন্দ্র। অন্যভাবে কোন ত্রিভুজের বাহুত্রয় কোন বৃত্তের (অন্তঃস্থ) স্পর্শক হলে এই বৃত্তের কেন্দ্রই উল্লেখিত ত্রিভুজের অন্তঃকেন্দ্র।
  • লম্ববিন্দু বা লম্বকেন্দ্র (orthocentre): ত্রিভুজের শীর্ষ হতে বিপরীত বাহুর উপর অঙ্কিত লম্ব তিনটি যে বিন্দুতে মিলিত হয় সেই বিন্দুকে ত্রিভুজের লম্ববিন্দু বলা হয়। অন্যভাবে ত্রিভুজের উচ্চতা রেখাগুলোর ছেদবিন্দুই হল লম্ববিন্দু।
  • বহিঃকেন্দ্র: ত্রিভুজের একটি কোণের অন্ত-সমদ্বিখণ্ডক এবং অপর দুই কোণের বহি-সমদ্বিখণ্ডক যে বিন্দুতে মিলিত হয় তাকে বহিঃকেন্দ্র বলে। আবার কোন ত্রিভুজের যেকোনো এক বাহু এবং অপর দুই বাহুর বর্ধিত অংশ যে বৃত্তের স্পর্শক সেই বৃত্তের কেন্দ্রই উল্লেখিত ত্রিভুজের বহিঃকেন্দ্র। সংক্ষেপে কোন ত্রিভুজের বহিঃবৃত্তের কেন্দ্রই ত্রিভুজটির বহিঃকেন্দ্র।
  • নব-বিন্দুর কেন্দ্র (nine-point centre): ত্রিভুজের নয়টি মূল বিন্দুগামী বৃত্তের কেন্দ্র হল নয়-বিন্দুর কেন্দ্র বা নববিন্দু কেন্দ্র

কোন সমবাহু ত্রিভুজের ক্ষেত্রে পরিকেন্দ্র, ভরকেন্দ্র, অন্তঃকেন্দ্র, লম্বকেন্দ্র এবং নয়-বিন্দুর কেন্দ্র একই যা ত্রিভুজটির প্রতিসাম্য-অক্ষত্রয়ের ছেদবিন্দুতে অবস্থিত। এক্ষেত্রে বিন্দুটি ত্রিভুজের শীর্ষ থেকে ভূমির দিকে দুই-তৃতীয়াংশ লম্ব দূরত্বে অবস্থান করে।

ত্রিভুজের কেন্দ্রের যথাযথ সংজ্ঞাটি হবে: a, bc বাহু বিশিষ্ট ত্রিভুজের দৈর্ঘ্যেত্রয়ের f(a,b,c), f(b,c,a) ও f(c,a,b) ফাংশন তিনটি যে বিন্দুর ত্রিরৈখিক স্থানাঙ্ক নির্দেশ করে সেই বিন্দুটিই ত্রিভুজের কেন্দ্র যেখানে:

  1. f ফাংশনটি a, b ও c এ সমসত্ব অর্থাৎ কেন্দ্রের অবস্থানের স্কেল অনির্ভরতার শর্তে বাস্তব ঘাত h এর জন্য f(ta,tb,tc)=thf(a,b,c);
  2. f ফাংশনটি শেষ দুটি আর্গুমেন্টে সিমেট্রিক অর্থাৎ f(a,b,c)= f(a,c,b)।[২]

এই যথাযথ সংজ্ঞায় দ্বিকেন্দ্রিক ব্রোকার্ড বিন্দু যুগলকে বাদ দেওয়া হয়েছে (দর্পণ-চিত্র প্রতিফলনে ব্রোকার্ড বিন্দুযুগলের অদল-বদল বা আন্তঃপরিবর্তন ঘটে)। গণিতবিদ ক্লার্ক কিম্বার্লিং ত্রিভুজ কেন্দ্রের বিশ্বকোষ নামে একটি সুদীর্ঘ অনলাইন তালিকা তৈরি করেছেন যেখানে এ পর্যন্ত ৩৪১৯৬ টি ত্রিভুজ-কেন্দ্রের বিবরণ রয়েছে এবং তালিকাটি ক্রমশ বর্ধমান।[৩]

স্পর্শীয় বহুভুজ ও চক্রীয় বহুভুজের কেন্দ্র[সম্পাদনা]

স্পর্শীয় বহুভুজের ক্ষেত্রে এর প্রতিটি বাহুই একটি নির্দিষ্ট বৃত্তের স্পর্শক। এই বৃত্তটিকে অন্তঃবৃত্ত বলা হয় যার কেন্দ্রকে বহুভুজটির একটি কেন্দ্র বিবেচনা করা যায়।

কোন চক্রীয় বহুভুজের বাহুগুলোর লম্ব-সমদ্বিখন্ডক রেখাগুলো যে বিন্দুতে ছেদ করে তাকে চক্রীয় বহুভুজটির কেন্দ্র বলা হয়। অন্যভাবে চক্রীয় বহুভুজের শীর্ষগুলো দিয়ে গমনকারী বৃত্তের কেন্দ্রই চক্রীয় বহুভুজের কেন্দ্র। উল্লেখিত বৃত্তটিকে পরিবৃত্ত এবং এর কেন্দ্রকে পরিকেন্দ্র বলা হয়।

যদি কোন বহুভুজ একই সঙ্গে স্পর্শীয় ও চক্রীয় হয় তবে একে দ্বিকেন্দ্রিক বহুভুজ বলা হয়। যেমন— সকল ত্রিভুজই দ্বিকেন্দিক। দ্বিকেন্দ্রিক বহুভুজের অন্তকেন্দ্র ও পরিকেন্দ্র সাধারণ অন্তকেন্দ্র ও পরিকেন্দ্র বিন্দুর মত নয়।

সাধারণ বহুভুজের কেন্দ্র[সম্পাদনা]

সাধারণ বহুভুজের কেন্দ্রকে বেশ কয়েকভাবে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে। ফাঁকা বহুভুজের শীর্ষবিন্দুগুলোতে সম পরিমাণ ভরের বিবেচনা থেকে "শীর্ষবিন্দু ভরকেন্দ্র" ধারণাটি এসেছে। বহুভুজের প্রতিটি বাহুতে প্রতি একক দৈর্ঘ্য নির্দিষ্ট ভরের বিবেচনা থেকে "বাহু ভরকেন্দ্র" ধারণাটি এসেছে। আর সাধারণ কেন্দ্রের (যাকে শুধুমাত্র ভরকেন্দ্র বা ক্ষেত্র কেন্দ্র বলা হয়) ধারণাটি এসেছে সুষম ঘনত্বের বহুভুজাকার পৃষ্ঠতলের ধারণা থেকে।

আরও পড়ুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Circle
  2. "Algebraic Highways in Triangle Geometry"। জানুয়ারি ১৯, ২০০৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ সেপ্টেম্বর ১, ২০১৯ 
  3. faculty.evansville.edu