এ. জে. এয়ার

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান
এ. জে. এয়ার
এ. জে. এয়ার.jpg
আলফ্রেদ জুলস এয়ার
জন্ম আলফ্রেদ জুলস এয়ার
(১৯১০-১০-২৯)অক্টোবর ২৯, ১৯১০
লন্ডন, ইংল্যান্ড
মৃত্যু জুন ২৭, ১৯৮৯(১৯৮৯-০৬-২৭) (৭৮ বছর)
লন্ডন, ইংল্যান্ড
জাতীয়তা ব্রিটিশ
যুগ বিংশ শতাব্দীর দর্শন
ধর্ম পাশ্চাত্য দর্শন
ধারা বিশ্লেষণী
আগ্রহ ভাষা · জ্ঞানতত্ত্ব
নীতিশাস্ত্র · অর্থ · বিজ্ঞান
অবদান যৌক্তিক ইতিবাদ
যাচাইকরণ নীতি
Emotivist ethics

স্যার আলফ্রেদ জুলস "ফ্রেদি" এয়ার বা এ. জে. এয়ার (ইংরেজি: Alfred Jules "Freddie" Ayer) (অক্টোবর ২৯, ১৯১০ – জুন ২৭, ১৯৮৯) ছিলেন ব্রিটিশ দার্শনিক। যৌক্তিক ইতিবাদের একজন প্রখ্যাত প্রবক্তা ও ব্যাখ্যাকার। তিনি তার দার্শনিক গ্রন্থ, বিশেষ করে ভাষা, সত্য ও যুক্তিবিদ্যা (Language, Truth, and Logic, 1936) এবং জ্ঞানের সমস্যা (The Problem of Knowledge, 1956)-এ যৌক্তিক ইতিবাদকে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করার কারণে জগৎজোড়া খ্যাতি অর্জন করেন। এয়ার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে একজন বিশেষ কার্যনির্বাহী (Special Operation s Executive) ও এমসিক্সটিন (M16) প্রতিনিধি ছিলেন। তিনি ১৯৪৬ থেকে ১৯৫৯ পর্যন্ত ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনে মনোদর্শন ও যুক্তিবিদ্যার গ্রোতে প্রফেসর (Grote Professor)ছিলেন। এ-সময়েই তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে যুক্তিবিদ্যার ভেকহাম প্রফেসর (Wykeham Professor) হিসেবে নিযুক্তি পান। ১৯৫১ থেকে ১৯৫২ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ান সোসাইটির প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি ১৯৭০ সালে নাইট উপাধিতে ভূষিত হন।

জীবন[সম্পাদনা]

লন্ডনের সেন্ট জনসে এয়ারের জন্ম। এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে।তিনি শিক্ষিত হয়েছেন এসচাম সেন্ট ভিনসেন্ট’স প্রিপ্যাটরি স্কুল ও এটনে। এয়ার যে বৈশিষ্ট্যগতভাবে সাহসী ও অকালপক্ক ছিলেন, তা এটনেই প্রথম ধরা পড়ে। এটনে চূড়ান্ত পরীক্ষায় তিনি দ্বিতীয় হয়েছেন এবং ক্লাসিকে হয়েছেন প্রথম। তার শেষ বছরে এটনের সিনিয়র কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে বিদ্যালয়ে দৈহিক শাস্তি বিলুপ্তির অভিযানে অসফল হন। তিনি অক্সফোর্ডের ক্রাইস্ট চার্চ থেকে ক্লাসিক বৃত্তি পেয়েছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ওয়েল্শ গার্ডে কর্মকর্তা ছিলেন, তখন তিনি বিশেষ কার্যনির্বাহীর ভূমিকা পালন করেছেন (Special Operation s Executive) ও এমসিক্সটিনের (M16) পক্ষে গুপ্তচর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

ব্যক্তিগত জীবন[সম্পাদনা]

এয়ার তিন নারীকে চারবার বিয়ে করেছেন। গ্রেস ইসাবেল রেনের সাথে তার প্রথম বিয়ে ১৯৩২ থেকে ১৯৪১ সাল পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। রেনে পরে এয়ারেই বন্ধু ও সহকর্মী দার্শনিক স্তুয়ার্ত হ্যামশেয়ারকে বিয়ে করেন। ১৯৬০ সালে এয়ার আলবার্তা কন্সট্যান্স (ডি) ওয়েল্সকে বিয়ে করেন, এই সংসারে তার একমাত্র ছেলে ছিল। ১৯৮৩ সালে এ-বিয়ের অবসান ঘটলে তিনি রাজনীতিবিদ নিগেল লওসনের প্রথম স্ত্রী ভানেসা মেরি এডিসনকে বিয়ে করেন। ১৯৮৫ সালে এ-স্ত্রীর মৃত্যু ঘটলে তিনি পুনরায় ডি ওয়েল্সকে বিয়ে করেন। এয়ারের একটা কন্যা, শেইলাহ গ্রাহাম ওয়েস্টব্রুক, হলিউড কলামিস্ট ছিলেন।

মৃত্যুর অভিজ্ঞতা[সম্পাদনা]

১৯৮৮ সালে, মৃত্যুর আগে, What I saw when I was dead শিরোনামে লিখিত এক ছোট নিবন্ধে এয়ার আসন্ন মৃত্যুর অভিজ্ঞতার (near-death experience) এক অদ্ভুত বর্ণনা দেন। এ-অভিজ্ঞতা সম্পর্কে এয়ার প্রথম বলেছেন, “কিছুটা আমার আত্মবিশ্বাসকে দুর্বল করেছিলো যে, আমার প্রকৃত মৃত্যু আমার পরিসমাপ্তি ঘটাবে, যদিও আমি আশা করে চলেছি, এটি হবে” (slightly weakened my conviction that my genuine death ... will be the end of me, though I continue to hope that it will be)। অধিকন্তু, কিছুদিন পর তিনি এটি পুনর্বিবেচনা করে বলেছেন, “আমার যা বলা উচিত ছিলো, আমার অভিজ্ঞতা মৃত্যুর পর কোনো জীবন নেই- এই বিশ্বাসকে নয়, বরং ঐ-বিশ্বাসের প্রতি আমার অনমনীয় দৃষ্টিভঙিকে দুর্বল করেছে” (what I should have said is that my experiences have weakened, not my belief that there is no life after death, but my inflexible attitude towards that belief)। ২০০১ সালে সেবাদানকারী চিকিৎসক ড. জেরেমি জর্জ দাবি করেন যে, এয়ার তাকে আশ্বস্ত করেছেন যে, “আমি একটি স্বর্গীয় অস্তিত্ব দেখেছি। আমি ভীত, আমি আমার সকল বই ও মতামত পুনর্বিবেচনা করতে যাচ্ছি”। যাহোক, এয়ারের পুত্র নাইক (Nick) বলেছেন যে, তিনি কখনো এটা তাকে বলেননি, যদিও তিনি তার পিতার কথা অতি-অসাধারণ হিসেবে দেখেছেন এবং তার পিতার আসন্ন মৃত্যু সম্পর্কিত অভিজ্ঞতার বয়ান সম্পর্কে কিছুটা সম্ভাব্য সংশয় থাকার বিষয়টা তার দীর্ঘ-অনুভূত ছিল।

দার্শনিক কর্ম[সম্পাদনা]

অধিবিদ্যা অসার[সম্পাদনা]

এ. জে. এয়ার অন্যান্য যৌক্তিক ইতিবাদীর মতো অধিবিদ্যা বা তত্ত্ববিদ্যার আলোচনাকে অসার বলেছেন। তিনি বলেন, যৌক্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, অধিবিদ্যার অতীন্দ্রিয় সত্তা সম্পর্কিত শব্দগুলো সত্যও নয়, মিথ্যাও নয়, বরং অর্থহীন। তিনি উল্লেখ করেন, অভিজ্ঞতামূলক হেতুবাক্য থেকে অভিজ্ঞতা-বহির্ভূত কোনোকিছু বৈধভাবে নিঃসৃত হতে পারে না। অতীন্দ্রিয় সত্তার বর্ণনা দিতে গিয়ে অধিবিদ্যকগণ কেবল কথার তুবড়ি উড়ান। অতীন্দ্রিয় অধিবিদ্যার কথা কান্ত (Immanuel Kant)ও বলেছেন। তবে কান্তের সাথে এয়ারের পার্থক্য এই যে, কান্ত জ্ঞানতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙি থেকে আর এয়ার ভাষার যৌক্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে অধিবিদ্যার অসারতা প্রমাণের প্রচেষ্টা চালান। এয়ার অধিবিদ্যার কঠোর সমালোচনা করেছেন। তার মতে, অধিবিদ্যকগণ এমন ধরণের বাক্য ব্যবহার করেন, যা অর্থপূর্ণ বাক্যের শর্তাবলিকে লঙ্ঘন করে। অর্থপূর্ণ বাক্যের মানদণ্ড সম্পর্কে তার বক্তব্য: এর প্রতিটি শব্দের স্বতঃসত্যতা ও তথ্যগততা থাকতে হবে। তত্ত্ববিদ্যক বাক্য গণিত, যুক্তিবিদ্যা বা প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের মতো নয়, তাই এগুলো সত্যও নয়, মিথ্যাও নয়, বরং অর্থহীন। এগুলোকে কোনোভাবেই যাচাই করা যায় না। ফলে, অধিবিদ্যা বর্জনীয়।

যাচাইকরণ নীতি[সম্পাদনা]

এয়ার মনে করেন, কোনো বাক্যের অর্থ সেই বাক্যের যাচাইকরণ নীতির উপর নির্ভরশীল। তিনি ব্যবহারিক যাচাইকরণ ও নীতিগত যাচাইকরণের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করেন। ব্যবহারিক যাচাইকরণ নীতি হলো কোনো বাক্যকে সরাসরি যাচাই করা। কিন্তু এমন অনেক তাৎপর্যপূর্ণ বাক্য রয়েছে, যাদের সরাসরি যাচাই করা যায় না। সেগুলোকে নীতিগতভাবে যাচাই করতে হয়। যেমন: ‘চাঁদে সাপ আছে’- এ-বাক্যকে ব্যবহারিক বা সরাসরিভাবে যাচাই করা যায় না, নীতিগতভাবে যাচাই করতে পারি। কারণ চাঁদে গিয়ে এ-বাক্যের সত্য-মিথ্যা যাচাই করা যাবে। ফলে এ-বাক্যের ব্যবহারিক যাচাইযোগ্যতা না থাকলেও নীতিগত যাচাইযোগ্যতা রয়েছে এবং এ-কারণেই এটি অর্থপূর্ণ। কিন্তু অধিবিদ্যক বাক্য, যেমন, ‘পরমসত্তা অস্তিত্বশীল’-এধরণের বাক্য নীতিগত দিক থেকেও যাচাই করা যায় না। কীভাবে এগুলো যাচাই করা সম্ভবপর হবে, আমরা তাও জানি না। ফলে, অধিবিদ্যক বাক্যগুলো অর্থহীন। এয়ার সবলদুর্বল অর্থেও যাচাইকরণ নীতির পার্থক্য নির্দেশ করেন। যে যাচাইয়ের সাহায্যে কোনো বাক্যকে নিশ্চিতরূপে প্রতিপাদন করা যায়, এয়ার তাকে সবল যাচাইকরণ নীতি বলেছেন। এই নীতি অত্যন্ত কঠোর, কারণ এটি মেনে নিলে অণেক সার্বিক বাক্যকে অর্থপূর্ণ বলে গ্রহণ করা যায় না। যেমন: ‘সকল মানুষ মরণশীল’- এ-জাতীয় সার্বিক বচন সবল অর্থে যাচাইযোগ্য নয়। এ-অসুবিধে দূর করার জন্য এয়ার দুর্বল যাচাইকরণ নীতির আশ্রয় নেন। যে যাচাইকরণ নীতির মাধ্যমে কোনো বাক্যের অর্থ নিশ্চিতরূপে যাচাই করা না গেলেও সম্ভাব্যভাবে তার অর্থ প্রতিপাদন করা যায় তাকে তিনি দুর্বল যাচাইকরণ নীতি বলেছেন। তার দুর্বল যাচাইকরণ নীতি অনুসারে তথ্যসম্পর্কিত বাক্য ব্যতিরেকেও সাধারণ বাক্য এবং অতীত বা ঐতিহাসিক ঘটনাবলি সম্পর্কিত বাক্যের অর্থ ও তাৎপর্য নির্ধারণ করা যায়।

দর্শনের কাজ[সম্পাদনা]

এয়ারের মতে, দর্শনের কাজ হলো বিচারমূলক। শব্দ বা বাক্যের অর্থ পরিষ্করণ ও বিশ্লেষণে দার্শনিককে দৃষ্টি নিবন্ধ করতে হবে। দার্শনিকের ক্রিয়াতৎপরতা মূলত বিশ্লেষণ নিয়ে সংশ্লিষ্ট। বাক্যসমূহের ভাষাগত গঠনের যৌক্তিক বিশ্লেষণ করা দর্শনের প্রধান কাজ। দর্শনের আরেক কাজ হলো সংজ্ঞাকরণ। সংজ্ঞাকরণ ও যৌক্তিক বিশ্লেষণের মধ্যে বিশেষ কোনো পার্থক্য নেই। সংজ্ঞাকরণ বলতে এয়ার প্রাসঙ্গিক (Contexual) বা প্রায়োগিক (definition in use) সংজ্ঞাকে নির্দেশ করেন। প্রায়োগিক সংজ্ঞায় (১) সংজ্ঞা শব্দটিকে কোনো বাক্যে প্রয়োগ করতে হবে; (২) বাক্যটিকে এক বা একাধিক সমার্থক বাক্যে অনুবাদ করতে হবে এবং (৩) এমনভাবে অনুবাদ করতে হবে যাতে সংজ্ঞা শব্দটি অনুবাদলব্ধ বাক্যে অনুপস্থিত থাকে। এই ধরনের সংজ্ঞাকরণের অর্থই হচ্ছে এক ধরনের যৌক্তিক বিশ্লেষণ।

প্রভাব[সম্পাদনা]

এ. জে. এয়ারের দার্শনিক চিন্তা ভিয়েনা চক্রের দার্শনিক ও দেভিদ হিউম দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত। তারই স্পষ্ট প্রকাশ আমরা তার ‘ভাষা, সত্য ও যুক্তিবিদ্যা’ গ্রন্থে লক্ষ করি। এই গ্রন্থ যৌক্তিক অভিজ্ঞতাবাদের মন্ত্রগ্রন্থ এবং সারা পৃথিবীতে দর্শনের একটা কোর্স হিসেবে পাঠ করা হয়। শুধু তাই নয়, এটাকে বিংশ শতাব্দির বিশ্লেষণী দর্শনের ক্লাসিক গ্রন্থ হিসেবেও বিবেচনা করা হয়।

সমালোচনা[সম্পাদনা]

এয়ারের ‘অভিজ্ঞতামূলক জ্ঞানের ভিত্তি’(Foundations of Empirical Knowledge) গ্রন্থে উল্লেখিত ইন্দ্রিয়-উপাত্ত তত্ত্বটি (sense-data theory) জে. এল. অস্টিনের সাড়াজাগানো Sense and Sensibilia গ্রন্থে অতিসমালোচিত হয়েছে। এয়ার তার ‘অধিবিদ্যা ও সাধারণ ইন্দ্রিয়’ (Metaphysics and Common Sense, 1969)) গ্রন্থের "Has Austin Refuted the Sense-data Theory?" গদ্যে এর জবাব দিয়েছেন।

নির্বাচিত প্রকাশনা[সম্পাদনা]

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

টীকা[সম্পাদনা]

  1. Spurling, Hilary (২৪ ডিসেম্বর ২০০০)। "The Wickedest Man in Oxford"The New York Times। ৩১ জানুয়ারি ২০০৮-এ মূল থেকে আর্কাইভ। সংগৃহীত ১ ফেব্রুয়ারি ২০০৮ 

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

সহায়ক পাঠ[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]